আত্মা

৬২/১. আত্মা
Soul (সোল)/ ‘ﺮﻭﺡ’ (রুহা)

ভূমিকা (Prolegomenon)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বিদ্যুৎ পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা বিদ্যুৎ। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা পাখি। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা বিজলি এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা জীবাত্মা। এ পরিভাষাটি শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত পালনকর্তাশ্বাস ইত্যাদি বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তারই রূপক/ বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা রূপে ব্যবহৃত হয়। এজন্য; শ্বরবিজ্ঞানের সঠিক পাঠ উদ্ধার করার জন্য এর সঠিক আত্মতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি উদ্ঘাটন করা প্রত্যেক পাঠকের একান্ত কর্তব্য।

অভিধা (Appellation)
আত্মা (বাপৌরূ)বি প্রাণ, জীবন, জীবাত্মা, soul, ‘ﺮﻭﺡ’ (রুহা) (আঞ্চ) পরান (আল) বাতাস, বায়ু (প্র) ১. বাঙালী পুরাণে বর্ণিত; ১. পরমাত্মা ২. ভূতাত্মা ৩. জীবাত্মা ৪. আত্মারাম ও ৫. আত্মারামেশ্বর ২. ইসলামী পুরাণ অনুসারে; ১. রুহে জিসমানি (رُوحِ ﺟﺴﻤﺎﻨﻰ) ২. রুহে সুলত্বানি (رُوحِ ﺴﻟﻄﺎﻨﻰ) ৩. রুহুল আমিন (رُوحٌ ﺍﻟﻤﻴﻦ) ৪. রুহুল কুদুস (رُوحٌ ﺍﻟﻘﺪﺲ) ও ৫. রুহুল্লাহ (رُوحٌ ﺍﻠﻟﻪ) . বাংলা শ্বরবিজ্ঞনে বর্ণিত; ভূতাত্মা (পঞ্চভূত), মানবাত্মা (মন) মহাত্মা (জ্ঞান), জীবাত্মা (সাঁই) ও পরমাত্মা (কাঁই) . বাংলা শ্বরবিজ্ঞানে বর্ণিত; ১. আগুন ২. জল ৩. মাটি ৪. বাতাস ও ৫. বিদ্যুৎ এ পঞ্চাত্মা বিশেষ . বাঙালী বাউলদের মতে; ১. পরমাত্মা ২. ভূতাত্মা ৩. জীবাত্মা ৪. গোয়াত্মা ও ৫. প্রেতাত্মা (শ্ববি) বিদ্যুৎ, তড়িৎ, অশনি, electricity, ‘كَهْرَبَاء’ (কাহরাবা) (রূপ্রশ) অলোক, আলেক (পরি) প্রাণীদেহে ব্যাপৃত চৈতন্যময়-সত্তা (ফাপ) জান (ফা.ﺠﺎﻦ), জি (হি.ﺠﻰ) (ইংপ) spirit (দেপ্র) এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বিদ্যুৎ পরিবারের বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১. সাধারণত; জীবকুলকে সজীব থাকতে সহায়তাকারী শক্তিকে বাংলায় ‘আত্মা বলা হয় ২. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, জীবদেহের বিদ্যুৎকে রূপকার্থে ‘আত্মা বলা হয় (বাপৌছ) জীবাত্মা (বাপৌচা) বিজলি (বাপৌউ) পাখি (বাপৌরূ) আত্মা (বাপৌমূ) বিদ্যুৎ।

আত্মার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of soul)
১.  আত্মা শুধু থাকে ধড়ে, যত পাপ সব মনে করে, সাধু সূক্ষ্মজ্ঞানের বিচারে, মন দাদা আসামী হয় (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৩)
২.  “এনে জিদ্দার মাটি, গঠলেন বোরক্বা পরিপাটি, মিথ্যা নয় সে কথা খাঁটি, কোন চিজে গঠলেন আত্মা।” (পবিত্র লালন- ৪৬৬/২)

আত্মার সংজ্ঞা (Definition of Soul)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; জীবকুলকে সজীব থাকতে সহায়তাকারী শক্তিকে আত্মা বলে।

আত্মার আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theological definition of soul)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; জীবদেহের বিদ্যুৎকে আত্মা বলে।

আত্মার প্রকারভেদ (Variations of soul)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে আত্মা দুই প্রকার। যথা; ১. উপমান আত্মা ও ২. উপমিত আত্মা।

. উপমান আত্মা (Analogical soul)
সাধারণত; জীবকুলকে সজীব থাকতে সহায়তাকারী শক্তিকে উপমান আত্মা বলে।

. উপমিত আত্মা (Compared soul)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; জীবদেহের বিদ্যুৎকে উপমিত আত্মা বলে।

আবার, বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; আত্মা পাঁচ (৫) প্রকার; ১. ভূতাত্মা (পঞ্চভূত) ২. মানবাত্মা (মন) ৩. মহাত্মা (জ্ঞান) ৪. জীবাত্মা (সাঁই) ও ৫. পরমাত্মা (কাঁই)। এছাড়াও; নিম্ন রূপেও আত্মার বিভাগ করতে দেখা যায়।

(ক) ১. ক্ষিতি ২. অপ ৩. তেজ ৪. মরুৎ ও ৫. ব্যোম (সংস্কৃত)
(খ) ১. পরমাত্মা ২. ভূতাত্মা ৩. জীবাত্মা ৪. প্রেতাত্মা ও ৫. গোআত্মা (বাউল)
(গ) ১. আগুন ২. জল ৩. মাটি ৪. বাতাস ও ৫. বিদ্যুৎ (আত্মতত্ত্ব)
(ঘ) ১. পরমাত্মা ২. ভূতাত্মা ৩. জীবাত্মা ৪. আত্মারাম ও ৫. আত্মারামেশ্বর (হিন্দু)
(ঙ) ১. রুহে জিসমানি (رُوحِ ﺟﺴﻤﺎﻨﻰ) ২. রুহে সুলত্বানি (رُوحِ ﺴﻟﻄﺎﻨﻰ) ৩. রুহুল আমিন (رُوحٌ ﺍﻟﻤﻴﻦ) ৪. রুহুল কুদুস (رُوحٌ ﺍﻟﻘﺪﺲ) ও ৫. রুহুল্লাহ (رُوحٌ ﺍﻠﻟﻪ) (মুসলমান)

. পারম্পরিক আত্মা (Sequential soul)
মরমী, আত্মজ্ঞানী, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও পারম্পরিকগণের বর্ণিত অমৃতজলরূপ আত্মাকে পারম্পরিক আত্মা বলে। যেমন; সাঁই ও কাঁই।

মানবদেহে প্রাপ্ত জীবজল বা অমৃতকে পারম্পরিক আত্মা বলা হয়। যেমন; লালন সাঁইজি বলেছেন; “পর অর্থে পরমঈশ্বর, আত্মা রূপে করেন বিহার, দ্বিদল বারামখানা, শতদল সহস্র দল অনন্ত করুণা” (পবিত্র লালন- ১১৮/২)। আবার পবিত্র কুরানে বলা হয়েছে- “يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا لَا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَانُ وَقَالَ صَوَابًا” “যেদিন আত্মা ও দেবতাগণ শ্রেণিবদ্ধ রূপে দণ্ডায়মান হবে, তখন দয়াল যাকে আদেশ দিবেন, সে ব্যতীত কথা বলতে পারবে না এবং সে সঠিক বলবে” (কুরান, নাবা- ৩৮)

. সাধারণ আত্মা (Common soul)
সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক, জ্যোতিষী, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের বর্ণিত আত্মাকে সাধারণ আত্মা বলে। যেমন;  বিদ্যুৎ।

সাধারণ পরমাত্মা (Common ultimate soul)
বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকরা পরমাত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না বটে তবে পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে অবস্থান করার পিছনে অন্য আরেকটি শক্তি রয়েছে বলে তাঁরা স্বীকার করেন অকপটে। অনেক পরমাণু একত্রিত হয়ে অণু গঠনকারী শক্তিকেই সাধারণ পরমাত্মা বলা হয়। যেমন; “মনের-মানুষ সত্য জেনে, বলো এখন যাও কোথায়, হাওয়া রূপে এ দেহে, আত্মা আসে আত্মা যায়” (পবিত্র লালন- ৭৬০/১)

বৈষ্ণব, সহজিয়া, মরমীয়া (ক্যাথলিক. catholic) বাউল, আত্মজ্ঞানী,  আত্মতাত্ত্বিক ও শ্বরবিজ্ঞানীদের একত্রে পারম্পরিক বলা হয়। পারম্পরিকগণ বলেন যে; “সারাজীবন সাধারণ আত্মার আলোচনা শুনে বা সাধারণ আত্মার ওপর শত সহস্র পুস্তক-পুস্তিকা পাঠ করেও কোনো লাভ নেই। কারণ; পারম্পরিকগণ বর্তমান ব্যতীত পরকালের কোনো কথা বিশ্বাস করেন না। অথবা গ্রহণ করতেও চান না। আবার তারা আকার ও সাকার ব্যতীত নিরাকার বা বায়বীয় কোনকিছু আলোচনা ও গবেষণাও করতে চান না। কারণ; মানুষ আকারী জীব। এজন্য; সাধকের উচিত হবে আকার নিয়েই আলোচনা করা। নিরাকার বা বায়বীয় পদার্থ বা নিরাকার শক্তির আলোচনা করার জন্য দার্শনিক, জ্যোতিষী ও বিজ্ঞানীগণ তো রয়েছেন। তাঁরাই নিরাকার বা বায়বীয় পদার্থ ও নিরাকার বা বায়বীয়শক্তি সম্পর্কে পূর্বকাল হতে আলোচনা ও গবেষণা করে আসছেন। এজন্য; এসব তাঁরাই করতে থাক। পারম্পরিকদের আত্মতত্ত্বের বাইরে বা আকার ও সাকারের বাইরে আলোচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।”

তারা আরও বলেন; “নিরাকার আত্মা বা বায়বীয়শক্তি সম্পর্কে যতই জানতে থাকি শুধু জানাই হয় বাস্তবে কোনো লাভ হয় না। এমনকি; এসব বাস্তব জীবনে তেমন উপকারেও আসে না।” পারম্পরিকগণ বাস্তব জীবনে পাওয়া, খাওয়া ও পান করা ভিন্ন কিছুই মানতে চান না। এজন্য; তারা এমন কথা বলেন যে; “বর্তমানে যা পাও হাত পাতিয়া লও, পরকালের পাতা শূন্য থাক।” আবার কেউ কেউ এমন বলেন যে; “নগদ যা পাও হাত পাতিয়া লও, বাঁক্বির খাতা শূন্য থাক, দূরের বাদ্যে লাভ কী তাতে, মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক।” এমন মন্তব্যকারীগণ প্রায় বলে থাকেন যে; “নিরাকার আত্মা বা শক্তিরূপ আত্মার অনেক আলোচনা শুনলাম ও করলাম পেলাম কী!”

দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনা শেষে সাম্প্রদায়িক মনীষী, জ্যোতিষী, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ জীবাত্মা বলতে কেউ খাদ্যসার, কেউ খাদ্যপ্রাণ, কেউ জীবনীশক্তি আবার কেউবা অঙ্কুরোদ্গমশক্তি ইত্যাদিই বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু মরমী, আত্মজ্ঞানী ও পারম্পরিকগণ জীবাত্মা বলতে দ্বিপস্থ জীবের জরায়ুতে ভ্রূণ লালনপালনে নিয়োজিত সুস্বাদু ও সুপেয় শ্বেতবর্ণের মানবজলকে বুঝিয়ে থাকেন। প্রমাণ স্বরূপ নিচের চরণগুলোর উদ্ধৃতি তারা দিয়ে থাকেন।

১.    “ঘরে আছে পাকপাঞ্জাতন, আত্মা পাঁচজন, সে আত্মা দিয়ে করো আত্মসাধন, ফকির লালন তাই কয়।” (পবিত্র লালন- ৬১৮/৪)
২.   “فَرَوْحٌ وَرَيْحَانٌ وَجَنَّةُ نَعِيمٍ” “ফা রাওহুউ ওয়া রাইহানুউ ওয়া জান্নাতুন নায়িম।” অর্থ; “তবে তার জন্য রয়েছে আত্মা, জীবিকা ও সম্পদময় কুঞ্জ।” (কুরান- ওয়াকিয়া- ৮৯)
৩.   “تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ” “তানাজ্ঝালুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ ফিহা বিইজনি রব্বিহিম মিন কুল্লি আমরি” অর্থ; “তারমধ্যে; অবতরণ করে দেবতা ও আত্মা, তাদের প্রতিপালকের আজ্ঞায় প্রত্যেক আদেশে।” (কুরান, ক্বদর- ৪)

সাধারণ জীবাত্মা সর্ব জীবেই রয়েছে পারম্পরিকগণ এমন কথা অকাতরে স্বীকার করলেও পারম্পরিক জীবাত্মার অবস্থান একমাত্র মানবদেহ ভিন্ন অন্য কোথাও স্বীকার করেন না। তাদের যুক্তি হলো; নিরাকার বা বায়বীয় জীবাত্মা বহনকারী সাকার জল বা তরল পদার্থই জীবের জীবাত্মা।

পারম্পরিক, আত্মতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলোর সমন্বয় (The combination of sequential, theological and scientific terminologies)

বিভাগ পরিভাষা
১. পারম্পরিক ১. আকার ২. সাকার ৩. নিরাকার
২. আত্মতাত্ত্বিক ১. দৃশ্য ২. স্পর্শ ৩. অদৃশ্য
৩. বৈজ্ঞানিক ১. কঠিন ২. তরল ৩. বায়বীয়

পারম্পরিকগণের মতে- “মানবদেহের মধ্যে অমৃতসুধারূপ যে মানবজলের মধ্যে প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তি দ্রবিভূত থাকে তা-ই জীবাত্মা।” তারা আরও বলেন; “সাকার বা তরল পদার্থ ব্যতীত নিরাকার বা বায়বীয় কোনো শক্তিকে বা পদার্থকে জীবাত্মা বলে মেনে নিলে তা আকারধারী মানুষের পক্ষে সাধন ও ভজনশক্তির সীমারেখার বাইরে চলে যায়। এমন হওয়া কখনও সম্ভব নয়। এজন্য; মানবীয় সাধ্যশক্তির বাইরের কোনকিছুকে জীবাত্মা নির্ধারণ করা কোনো বিজ্ঞ লোকের উচিত নয়।” তারা আরও বলেন; “বিশ্বের অনেক সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ মহাগ্রন্থ বা মরমী গীতিকাব্যের মধ্যে জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রত্যক্ষ সাধন ভজনের বিশদ বর্ণনা রয়েছে। এজন্য; জীবের জীবাত্মা ও পরমাত্মা সাধন ও ভজনের মতো কোনকিছু না হলে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ, মহাগ্রন্থ ও মরমী গীতিকাব্যের মধ্যে বর্ণিত সব আলোচনাই ব্যর্থ ও অনর্থক হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এমন হতে পারে না। এজন্য; বৈষয়িক জীবাত্মা ও পরমাত্মা নিরাকার বা বায়বীয় হলেও পারম্পরিকগণের জীবাত্মা ও পরমাত্মা অবশ্যই সাকার বা তরল।”

পারম্পরিকদের এ মতবাদটির ব্যাপারে বর্তমানে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন; বর্তমানে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে; বিশ্বের সব পদার্থের তিনটি অবস্থা যথা; ১.কঠিন ২.তরল ও ৩.বায়বীয়। যে কোনো কঠিন পদার্থকে তাপ দিতে থাকলে এক সময় তা তরল অবস্থা প্রাপ্ত হয় এবং উক্ত তরল পদার্থে আরও তাপ দিতে থাকলে তা বায়বীয় রূপলাভ করে। পরিশেষে বায়বীয় পদার্থ হতে শক্তি উৎপত্তি হয়। আবার কোটি কোটি বছর পর শক্তি বায়বীয় পদার্থের রূপলাভ করে। অতঃপর; নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট তাপের বিনিময়ে তা আবার তরল ও কঠিন রূপলাভ করে। তাহলে বলা যায় সব শক্তিই পদার্থ এবং সব পদার্থই শক্তি। আরও বলা যায়- বৈষয়িকসাহিত্যে যে শক্তিকে আত্মা বলা হয়- মৈথুনে শুক্ররুদ্ধ অবস্থায় প্রায় এক হাজার শ্বাস প্রয়োগ করলে তা তরল রূপলাভ করে। এ তরল রূপটিকেই পারম্পরিকগণ আত্মা বলে গণ্য করে থাকেন। তারা আরও বলে থাকেন; মানুষ একটি কঠিন পদার্থ। কঠিন-মানুষের পক্ষে তরল উপাস্য সাধন করা সহজসাধ্য কিন্তু কঠিন-মানুষের পক্ষে বায়বীয় উপাস্য সাধন করা কোনমতেই সম্ভব নয়।

এ সূত্র হতেই তারা মাতৃগর্ভে প্রাপ্ত সুস্বাদু ও সুপেয় শ্বেতবর্ণের মানবজলকে জীবাত্মা ও কৃষ্ণবর্ণের মধুবৎ সুপেয় জলকে পরমাত্মা বলে থাকেন। তারা আরও বলেন; “শুক্ররুদ্ধ কামসাধনবলে এ দুটি আত্মার সাথে সাধকগণ প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ দর্শনলাভ করে থাকেন।” তাদের মতে- “জীবাত্মারূপ শ্বেতবর্ণের মানবজলের দর্শনলাভকারীদের সাঁইজি বা বৈষ্ণব বলা হয়। যেমন; লালন সাঁইজি। পরমাত্মারূপ কৃষ্ণবর্ণের মানবজলের দর্শনলাভকারীদের কাঁইজি বা ব্র‏হ্মচারী বলা হয়। যেমন; বলন কাঁইজি ও লোকনাথ ব্র‏হ্মচারী।”

পারম্পরিক জীবাত্মা (Sequential electronegativity)
পারম্পরিকগণের জীবাত্মা বৈষয়িক অভিধাগুলো হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পারম্পরিকগণ মনে করেন- স্রষ্টাই পরমাত্মা এবং জীবনীশক্তিই জীবাত্মা। পালনকর্তা স্রষ্টা হতে পারেন না এবং স্রষ্টাও পালনকর্তা হতে পারেন না। স্রষ্টা ও পালক সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সত্তা। এ সত্তা সম্পূর্ণ মানবদেহের মধ্যেই অবস্থিত। শ্বরবিজ্ঞানে; ব্যবহৃত কোনো সত্তার অস্তিত্ব আত্মদর্শনের বাইরে নেই। পারম্পরিকগণের সূত্র হলো; যা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তা আছে মানবভাণ্ডে। যেমন; পবিত্র করানে বলা হয়েছে- “ وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ (২০) وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ (২১) ” অর্থ; “ বিশ্বাসীদের জন্য যা আছে বিশ্বব্র‏হ্মাণ্ডে, তা আছে মানবভাণ্ডে কিন্তু তোমরা তা জানো না।” (কুরান, যারিয়াত, ২০-২১)

তাঁরা মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু, শক্তি ও অবস্থার মূল আড়ালে রেখে রূপক নামে পৌরাণিক চরিত্রায়ন করে ১. বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা সৃষ্টি করে ২. প্রকৃতির সাথে তুলনা করে ৩. চরিত্র রূপায়ণ করে ও ৪. প্রপক বা চমৎকার সৃষ্টি করে পুরাণ নির্মাণ করে থাকেন। পারম্পরিক আত্মার উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

১.   “فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ” “অতঃপর; যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তারমধ্যে; আত্মা ফুৎকার করব, তখন তোমরা তাকে ভক্তি করবে” (কুরান, হিজর- ২৯)
২.   “وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِنْ رُوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَاتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِ وَكَانَتْ مِنْ الْقَانِتِينَ” “হর্ম্যরে কন্যা অষ্ঠি যে স্বীয় জননেন্দ্রিয়কে সংরক্ষণ করেছিল অতঃপর; আমরা তন্মধ্যে স্বীয় আত্মা ফুৎকার করেছিলাম এবং সে অপন প্রতিপালকের বাক্যগুলো ও তাঁর গ্রন্থাদিকে সত্যতার সাথে গ্রহণ করেছিল এবং সে অনুগতদের একজন ছিল” (কুরান, তাহরিম- ১২)

শ্বরবিজ্ঞানে; ব্যবহৃত প্রতিটি সত্তার ন্যূনতম চারটি করে পরিচিতি রয়েছে যথা; . আভিধানিক পরিচিতি . রূপক পরিচিতি . প্রকৃতির সাথে তুল্য পরিচিতি ও . চরিত্র রূপে রূপায়ণ। মানবদেহের মধ্যে প্রাপ্ত সৃষ্টির অনুঘটক-সত্তাকে ভারতবর্ষের পারম্পরিকগণ আভিধানিক নাম দিয়েছেন ঈশ্বর এবং  ছদ্মনাম দিয়েছেন ব্র‏হ্মা বা কাঁই ও আরববিশ্বের পারম্পরিকগণ আভিধানিক নাম দিয়েছেন খালেক (ﺨﺎﻟﻖ) এবং ছদ্মনাম দিয়েছেন আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ)। পারম্পরিক বা মহাবিজ্ঞানীগণ বলেন; “জীবের সৃষ্টিক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী স্বায়ম্ভুর অর্থ জীবনীশক্তি, শুক্র, সাঁই, কাঁই, যৌনোত্তেজনা, কানাই, বলাই ইত্যাদি। এ সত্তাগণই প্রকৃতপক্ষে জীবের অন্ত স্রষ্টা। আদিস্রষ্টা স্রষ্টাই। আদিস্রষ্টা পারম্পরিকগণের আলোচ্য বিষয় নয়। আদি স্রষ্টা নিয়ে পুরাণ নির্মাণও করা হয় না। বিষয়টি নিয়ে অত্র গ্রন্থের ৭ম খণ্ডের সৃষ্টিকর্তা অনুচ্ছেদে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে।

স্রষ্টার সৃষ্টিকৃত অণুজীব বা ক্ষুদ্রজীব প্রকৃতিতে বসবাসের উপযোগী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যিনি বা যে সত্তা জরায়ুতে ভ্রূণ লালনপালন করেন তাকেই পালক বা পালনকর্তা বলা হয়। এ পালনকর্তা উদ্ভিদকুলের ফুলের জরায়ুতে মিষ্ট রস রূপে অবস্থান করেন। মৌমাছি সুকৌশলে তা তুলে এনে চাকে সঞ্চিত করলে সে পালনকর্তাকেই আমরা মধু বলি। এটা ন্যূনাধিক সব ফুলের মধ্যেই অবস্থিত। এ সুমিষ্টরস ব্যতীত কোনো ফুলেরই পরাগায়ন সম্ভব নয়। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত; ১. টক ২. ঝাল ৩. তিক্ত ৪. মিষ্ট ৫. লবণ ও ৬. কষা; এ ষড়স্বাদের রসের মধ্যে একমাত্র মিষ্টরস ব্যতীত অবশিষ্ট- পঞ্চস্বাদের রসের মধ্যে জীবের ভ্রূণ সৃষ্টি হতে পারে না। জীবের ভ্রূণ সৃষ্টি হওয়ার পর জঠর হতে স্বাভাবিক পরিবেশে প্রকাশিত হওয়া বা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লালন-পালনকারী দেবতা বা সত্তাই পারম্পরিকগণের পালনকর্তা বা জীবাত্মা। মানুষের ক্ষেত্রে মানুষের জরায়ুর মধ্যে প্রায় দশ মাস যে দেবতা বা সত্তা সন্তান লালনপালন করেন তিনিই আদি-পালনকর্তা বা জীবাত্মা। পিতা-মাতা হলো; অন্তপালনকর্তা। এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে না জেনে ও না বুঝেই সাম্প্রদায়িকরা অযথা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে; যাঁরা এ বিষয়গুলো ভালোভাবে জানেন ও বুঝেন তাঁরা কখনই সাম্প্রদায়িকতা কিংবা উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসবাদে পতিত হন না।

পারম্পরিকগণের পালনকর্তা বা জীবাত্মার প্রকৃত বাস্তবতা যদি নাই থাকত তবে কেন তাঁরা এত কালি ব্যয় করে এত পৃষ্ঠা কাগজ নষ্ট করবেন? হ্যাঁ পারম্পরিকগণের পালনকর্তা বা জীবাত্মার তরলরূপ অবশ্যই রয়েছে। তা হলো মানবের জরায়ুতে প্রাপ্ত সুমিষ্টরস। যিনি জীবের ভ্রূণ লালন-পালনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবতারিত হন। দ্বিপস্থ জীবের নর-নারী মিলনের ফলে জরায়ুতে যে ভ্রূণের সৃষ্টি হয় তিনি এসে তা লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যথা সময় লালন-পালনের পর গর্ভ হতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়। মানুষের ক্ষেত্রে জরায়ু বা জঠর হতে তিনটি ধারা প্রবাহিত হয়। প্রথম ধারাটি রক্তিম এটিকে ঋতুস্রাব বলে- যা প্রকৃতির নিয়মে প্রতি মাসেই যথা সময়ে প্রবাহিত হয়। এটা অসার এবং দুষিত রক্তধারা। দ্বিতীয় ধারাটিকে সাঁই, বিষ্ণু, বুদ্ধ, ঈশ্বর, বিশ্বকর্মা ও লালন ইত্যাদি বলা হয়- যা মানবসন্তান লালনপালনের জন্য জরায়ুতে যথা সময়ে অবতারিত হয়। সাধকগণ সাধনবলে তাঁর সাথে প্রত্যক্ষ দর্শনলাভ করে সাঁইজি, বৈষ্ণব ও সিদ্ধার্থ ইত্যাদি উপাধিলাভ করেন। এটা সুস্বাদু ও সুপেয় শ্বেতবর্ণের মানবজল। আরবীয় পারম্পরিকগণ ফুরাত (ﻔﺭﺍﺖ) বলে, ফার্সি পারম্পরিকগণ আবহায়াত (ﺁﺐﺤﻴﺎﺖ) বলে, সংস্কৃত পারম্পরিকগণ সোম, বাঙালী পারম্পরিকগণ অমৃতসুধা, পালি পারম্পরিকগণ শীল ও লালন সাঁইজি মীন বলে এর নাম করণ করেছেন।

পারম্পরিকরা সিরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড (Cerebro spinal fluid) বা মস্তিস্ক মেরুজলকে জীবাত্মা বলে থাকেন। রক্ত যখন মস্তিষ্কে যায়, তখন হৃদপিণ্ডের প্রথম ও দ্বিতীয় ভেন্ট্রীলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং সেখানে রক্ত থেকে মস্তিষ্ক মেরুজল টেনে বের করা হয়। একেই বলে প্রধান জীবনরস বা জীবনজল, নেক্টার (nectar) বা ভাইটাল লাইফ জুস (vital life juice)। পারম্পরিক যোগিগণ একে অমৃতসুধা বলে থাকেন। বর্ণিত এ রস মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়ে এবং মেরুদণ্ডের মধ্যস্থিত বৈয়াম্বুর মাধ্যমে প্রোস্টেট গ্রন্থি পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং নিউরণ মোটরকে সক্রিয় রাখে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার অমৃতসুধার মধ্যে- প্রোটিন ১৫- ৪৫ মিলিগ্রাম, গ্লুকোজ ৪০- ৫০ মিলিগ্রাম, ক্লোরাইড ৭২০- ৭৫০ মিলিগ্রাম, কোষ- ০.৫ মিলিগ্রাম +লসিকা ইত্যাদি থাকে।

মানবদেহে প্রতি সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় ১২৫ মিলি মস্তিষ্ক মেরুজল উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ; প্রতিদিন প্রায় ৪৪৫ মিলি মস্তিষ্ক মেরুজল মানবদেহে সৃষ্টি হয়- যার থেকে ২০০ হতে ২৫০ মিলি শর্করা সৃষ্টি হয়ে শরীরের কোষগুলোর প্রয়োজন মেটায়। এ মস্তিষ্ক মেরুজল কখনই রক্তের সঙ্গে মিশে না। অনেক পূর্বে পারম্পরিক যোগী বিবাগী বা সাধু ও সন্ন্যাসীগণ মানবদেহে এর সন্ধানলাভ করেন। অতঃপর; একটি বিশেষ পদ্ধতির সাহায্যে এটা আহরণ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। পারম্পরিকরাই এ মেরুজল প্রথম পান করতে সক্ষম হন। এ ক্রিয়াকে অমৃতপান বলা হয়। এ অমৃত পান করলে ক্ষুধা ও পিপাসা অনেকটা হ্রাস পায়। পারম্পরিকগণ এ অমৃতসুধা পান করে অত্যন্ত অল্প খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে, সুস্থ ও দিব্য জীবনযাপন করতেন (আপনার স্বাস্থ্য আপনার হাতে)

পারম্পরিকগণ এ মস্তিষ্ক মেরুজলকেই সাঁই বা বিষ্ণু বলে থাকেন। সাঁই বা বিষ্ণু প্রতিটি দ্বিপস্থ জীবের মাতৃগর্ভে অবস্থান করে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লালনপালন করেন বলেই তাঁকে পালক বা পালনকর্তা বা লালনপালনকর্তা বলা হয়। পরিশেষে বলা যায় লালনপালনকর্তাকে লালনকর্তা, পালনকর্তা বা সংক্ষেপে লালন বলা হয়। জীবের লালনপালনকর্তাকেই বাংলাভাষায় রূপকভাবে সাঁই, ইংরেজি ভাষায় রূপকভাবে এড়ফ এবং আরবি ভাষায় রূপকভাবে রব (ﺮﺐ) বা রাসুল (ﺮﺴﻮﻝ) বা মুহাম্মদ (ﻤﺤﻤﺪ) বলা হয়। এছাড়াও; কোনো কোনো অঞ্চলে আত্মার আরও চারটি প্রকার দেখতে পাওয়া যায়। যথা; ১. শক্তিশালী আত্মা ২. মহিমাময় আত্মা ৩. বৈদেহী আত্মা ও ৪. দেহধারী আত্মা। নিচে এদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো। আমরা আশা করি এ আলোচনা পাঠককুলের জন্য যথেষ্ট হবে।

. শক্তিশালী আত্মা (Stronger soul) (রুহুল কুদুস. رُوحٌ ﺍﻟﻘﺪﺲ)
নিরাকার ও সর্বপ্রকার বাঁধামুক্ত সত্তাকে শক্তিশালী আত্মা বলে।

নিরাকার জগৎ হতে মহিমাময় জগতে প্রেরণের পূর্বে এ আত্মগুলো নিরাকার জগতে অত্যন্ত শক্তিশালী রূপে প্রভুর একত্ববাদের বীজসহ অবস্থান করে। তারা সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীনভাবে প্রভুর সৃষ্টিকুলের সর্বত্রই সমানভাবে বিরাজমান থাকে। তখন আত্মগুলো সময়, দূরত্ব, দেহ, ভুল, শত্রু ও কূপ্রবৃত্তি ইত্যাদি বাঁধামুক্তভাবে বিরাজমান থাকে। এ আত্মগুলোকেই শক্তিশালী আত্মা বলা হয়। লত্বিফায়ে সির এদের সংযোগ স্থান।

. মহিমাময় আত্মা (Glorious soul) (রুহুল্লাহ. رُوحٌ ﺍﻠﻟﻪ)
প্রভুর মহিমার বসন পরিহিত আত্মাকে মহিমাময় আত্মা বলে।

নিরালা ও নিরাকার জগৎ হতে অত্যন্ত শক্তিশালী আত্মগুলো মহিমাময় জগতে প্রেরণ করা হয়। এখানে; দুই মর্যাদার মধ্যবর্তী স্থানে আত্মগুলোকে প্রভুর মহিমার জ্যোতির বসন পরানো হয়। যারফলে; আত্মগুলোর প্রবলশক্তির কিছুটা লোপ পায়। এভাবে আত্মগুলো ক্রমান্বয়ে সীমাবদ্ধতার দিকে ধাবিত হতে থাকে। এসময় আত্মগুলো চর্মচক্ষে প্রকাশিত হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। প্রভুর মহিমার বসন পরিহিত এমন আত্মগুলোকেই মহিমাময় আত্মা বলা হয়। লত্বিফায়ে নফস্ এদের সংযোগ স্থান।

. বৈদেহী আত্মা (Disembodied soul) (রুহুল আমিন. رُوحٌ ﺍﻟﻤﻴﻦ)
দেহহীন বসনে সুসজ্জিত ও অপেক্ষাকৃত ন্যূন শক্তিশালী আত্মাকে বৈদৈহিক আত্মা বলে।

দেহহীন আত্মাকে ভ্রাম্যমান আত্মাও বলা হয়। প্রভুর মহিমাময় জ্যোতির বসন পরিহিত অবস্থায় আত্মগুলোকে দেহহীনধামে পাঠানো হয়। অতঃপর; দেহহীন জ্যোতি দ্বারা আত্মগুলোকে পুণঃ সুসজ্জিত করা হয়। যারফলে; আত্মগুলোর শক্তি আরও কিছুটা সীমিত হয় পড়ে। এ সময় দেহ ছাড়াই আত্মগুলো সর্বত্র চলাফেরা করতে থাকে। এছাড়াও; এ সময় তারা দেহ ধারণ করে হঠাৎ কোথাও প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। দেহহীন বসনে সুসজ্জিত ও অপেক্ষাকৃত ন্যূন শক্তিশালী আত্মগুলোকে বৈদৈহিক আত্মা বলা হয়। লত্বিফায়ে ক্বলব এদের সংযোগ স্থান।

. দেহধারী আত্মা (Corporeal soul) (রুহে জিসমানী. رُوحِ ﺟﺴﻤﺎﻨﻰ)
বাতাসের সাথে সম্পৃক্ত আত্মাকে দেহধারী আত্মা বলে।

বৈদৈহিক আত্মাকে নশ্বরধামের সুষমজ্যোতি দ্বারা পুনঃ আচ্ছাদিত করে দৃশ্যমান রূপে বিকশিত করা হয় বা দেহধারী করা হয়। এভাবে বৈদৈহিক আত্মগুলো পরিপূর্ণ দেহধারণ করার পর মানুষের চক্ষে ধরা পড়ে। দেহধারী আত্মাকেই জীবাত্মা বলা হয়। এর স্থান দেহের রক্ত ও মাংসের মধ্যেস্থলে। তবে; বড়পিরের মতে; এদের স্থান যার যার বক্ষদেশে। এসব আত্মা নিদর্শনীয় জ্যোতির সাথে সম্পৃক্ত থাকে। অধিকাংশ আধ্যাত্মবাদীদের মতে; জীবের শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্বারা এ আত্মা জীবের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। এজন্য; বাতাস প্রগমন বন্ধ হলেই জীবদেহকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ; বাতাসের সাথে সম্পৃক্ত আত্মাকে দেহধারী আত্মা বলা হয়। এমনই ভাবে আত্মা নিয়ে কত জল্পনা কল্পনা এ পৃথিবীতে যে রয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হয় হিন্দুদের কয়েক হাজার আত্মা কল্পনা এবং মুসলমানদের কয়েক হাজার আত্মা কল্পনার পাতালপুরিতে চাপা পড়ে গেছে প্রকৃত আত্মার স্বরূপের বর্ণনা ও বিবরণাদি। এজন্য; আমরা আগেই বলেছি বর্তমানে আধ্যাত্মিক জ্ঞান আহরণ করা আর চায়ের চামচ দিয়ে সাগর ছেচা সমান।

পঞ্চাত্মার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (Short Introduction of pentasoul)
. ভূতাত্মা (Elementary soul)

আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে জীব সৃষ্টির আদি-পঞ্চভূতকে একত্রে ভূতাত্মা বলে। যথা; ১. আগুন ২. জল ৩. মাটি ৪. বাতাস ও ৫. বিদ্যুৎ।

. জীবাত্মা (Electronegativity)
জীবদেহের বিদ্যুৎকে জীবাত্মা বলে।

বিদ্যুৎ এক প্রকার শক্তি। এ শক্তিটি ব্যতীত প্রাণী ও উদ্ভিদ এক মুহূর্তও বাঁচতে পারে না। সেজন্য; এ বিদ্যুৎকেই জীবের প্রকৃত জীবাত্মা বলা হয়। হৃদপিণ্ডের মাধ্যমে দেহে যখন রক্ত সঞ্চালিত হয়। তখন রক্তের কণিকার ঘর্ষণে এ বিদ্যুৎটি জীবদেহে উৎপন্ন হয়। এ শক্তিটি জীবদেহে বিদ্যমান থাকাকে জীবের জীবিত থাকা বলা হয়। এ শক্তিটি দেহ হতে বিলুপ্ত হওয়াকে জীবের প্রয়াণ বলা হয়। কোনো কারণে হৃদযন্ত্রটি বিকল হয়ে গেলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যারফলে; বিদ্যুৎ উৎপন্নও বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য; জীব প্রয়াণলাভ করে। এ বিদ্যুৎকেই জীবদেহের ভিতরের জীবাত্মা বলা হয়। এছাড়াও; জীবদেহের বাইরে স্থিরবিদ্যুৎ নামক অন্য একটি জীবাত্মা বিশ্বব্যাপী বিরাজিত রয়েছে। এ হতে বুঝা যায় মানুষের জীবাত্মা দুটি। একটি হলো দেহের ভিতরে অবস্থিত চলবিদ্যুৎ এবং অন্যটি দেহের বাইরে অবস্থিত স্থিরবিদ্যুৎ। অর্থাৎ; বিশ্বব্যাপী বিরাজিত জীবাত্মা বলতে মহাজগতের স্থিরবিদ্যুৎ এবং জীবদেহের জীবাত্মা বলতে জীবদেহের ভিতরে বিদ্যমান চলবিদ্যুৎ বুঝায়।

বিদ্যুতের প্রকারভেদ (Variations of electricity)
বিদ্যুৎ দুই প্রকার। যথা; ১. স্থিরবিদ্যুৎ ও ২. চলবিদ্যুৎ।

. স্থিরবিদ্যুৎ (Static electricity)
যেখানে সৃষ্টি হয় সেখানেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এমন বিদ্যুৎকে স্থিরবিদ্যুৎ বলে। যেমন; শীতকালে চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ানোর সময়ে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তা-ই স্থিরবিদ্যুৎ।

আদি চতুর্ভূত যখন কোথাও সুষম পরিবেশে ও সুষম পরিমাণে একত্রিত হয়; তখনই জীবকোষ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে; কণিকা কণিকার ঘর্ষণে স্থিরবিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সদ্যসৃষ্ট কোষটি ধ্বংস হওয়ার পূর্বেই যদি প্রয়োজনীয় স্থিরবিদ্যুৎ গ্রহণ করতে পারে তবে অবশ্যই সে কোষটি জীবিত হয়। অতঃপর; জীবকোষটি জীবন্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের দেহ পরিচালনা করার মতো দেহের ভিতরে আন্ত চলবিদ্যুৎ উৎপন্ন আরম্ভ করে- যাকে বলা হয় জীবের জীবাত্মা। তারপর; প্রজননের মাধ্যমে মাতৃকোষ হতে ভ্রূণকোষে সঞ্চারিত হওয়ার মাধ্যমে জীবাত্মা বিশ্বের সব জীবকে বাঁচিয়ে রাখে। এ স্থিরবিদ্যুৎ হতেই পৃথিবী গ্রহের সর্বপ্রথম সৃষ্টি আদিপ্রাণী অম্বুক জীবাত্মালাভ করেছিল। এখনও সব প্রজাতির আদিপ্রাণীগুলো এভাবেই জীবাত্মালাভ করে থাকে।

. চলবিদ্যুৎ (Running electricity)
যে কোনো পরিবাহির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎকে চলবিদ্যুৎ বলে। যেমন; পাখা ঘুরানোর বিদ্যুৎ।

চলবিদ্যুৎ বর্তমান বিশ্বের সব শক্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে বর্তমান বিশ্বের প্রায় সবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ভিন্ন কোনো ক্রমেই একটি দিবসও কল্পনা করা যায় না। প্রযুক্তিজগৎ তো প্রায় শতভাগই বিদ্যুৎনির্ভর। এছাড়াও; ঘরের রান্নাবান্নার কাজ হতে আরম্ভ করে কলঘর, কার্যালয় ও আড্ডালয় পর্যন্ত বিদ্যুৎনির্ভর। এককথায় বলা যায় চলবিদ্যুৎ ব্যতীত প্রায় সারাবিশ্বই অচল। আবার এ চলবিদ্যুৎই হলো জীবের দেহের ভিতরের জীবাত্মা। কারণ; চলবিদ্যুৎ না থাকলে একটি মুহূর্ত পর্যন্ত জীবদেহ বেঁচে থাকে না। আবার জীবদেহের ভিতরের জীবাত্মা বা চলবিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি মাত্র উপাদানের সন্ধান প্রকৃতিতে পাওয়া যায় যথা; ১. অম্লজান (অক্সিজেন. oxygen) ও ২. অঙ্গারাম্লজান (কার্বন ডাইঅক্সাইড. Carbon dioxide)।

. অম্লজান (oxygen. অক্সিজেন)
এক প্রকার মৌলিক বায়বীয় পদার্থরূপ প্রাণবায়ুকে অম্লজান বলে।

এটি; যদিও জীবের প্রকৃত-সত্তা নয়, তবুও; বলন কাঁইজির যুগান্তকারী আত্মা সম্পর্কীয় মতবাদটি প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ; প্রাগৈতিহাসিক যুগ হতে আদিমযুগ, মধ্যযুগ এমনকি; আধুনিক যুগের একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত দার্শনিক ও বিজ্ঞানীগণ এটিকে আত্মা বলে অভিমত পোষণ করে আসছেন। এটিই জীবদেহের জীবাত্মারূপ বিদ্যুৎ সৃষ্টির একমাত্র উপাদন। এটি একটি পদার্থ। অম্লজান নামক এ পদার্থটি ছাড়া বিশ্বের কোনো প্রাণীই বাঁচতে পারে না। প্রাণীকুল নাসিকা যোগে শ্বাস গ্রহণের দ্বারা ও মৎস্যকুল কানের ফুলকার সাহায্যে এ পদার্থটি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করে থাকে। তেমনই; আলাপী যন্ত্রেরও জীবাত্মা দেখা যায়। তাহলো যন্ত্রটির বিদ্যুৎকোষ। এটি; বিদ্যুৎকোষ ছাড়াও চলে না। টাওয়ার বা কেন্দ্র হলো; আলাপীর পরমাত্মা মাত্র।

. অঙ্গারাম্লজান (Carbon dioxide. কার্বন ডাইঅক্সাইড)
একবার পুড়ানো হয়েছে এমন অম্লজানকে অঙ্গারাম্লজান বলে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রাণীকুল অম্লজান ছাড়া একমুহূর্তও বাঁচতে পারে না। প্রাণীকুল নাসিকার শ্বাসের মাধ্যমে অম্লজান গ্রহণ করে জীবন ধারণ করে। জীবন ধারণকারী এ অম্লজানকে প্রাণীকুলের প্রাণবায়ু বলা হয়। প্রাণীকুল ফুসফুসের মাধ্যমে অম্লজান গ্রহণ করে যে বর্জ্য ত্যাগ করে তাকেই অঙ্গারাম্লজান বলা হয়। প্রাণীকুলের বর্জনকৃত অঙ্গারাম্লজান উদ্ভিদকুল গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। অঙ্গারাম্লজান ছাড়া উদ্ভিদকুল এক মুহূর্তও বাঁচতে পারে না বলে অঙ্গারাম্লজানকে স্থূলভাবে উদ্ভিদের জীবাত্মা উৎপাদনকারী একমাত্র পাদার্থ বলা হয়। উদ্ভিদকুল পাতা ও ছালের মাধ্যমে সালোক সংশ্লেষণের দ্বারা এ অঙ্গারাম্লজান গ্রহণ করে ও অম্লজান ত্যাগ করে থাকে। উল্লেখ্য যে; অম্লজান ও অঙ্গারাম্লজান প্রাণীকুলের প্রকৃত জীবাত্মা না হলেও জীবাত্মা সৃষ্টি করার একমাত্র উপাদান। সেজন্য; গত একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা এ দুটি পদার্থকে জীবের জীবাত্মা বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু ব্যাপক গবেষণা ও অধ্যাবসায়ের পর পৃথিবী বিখ্যাত আত্মজ্ঞানী দার্শনিক বলন কাঁইজি জীবদেহের বিদ্যুৎকে জীবের প্রকৃত জীবাত্মা বলে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

. পরমাত্মা (Ultimate soul)
এটি; এক প্রকার শক্তি। এ শক্তিটি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপী বিরাজিত। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত এ শক্তিটির নাম ও পরিচয় কোনকিছুই আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নি। তবে; অভিকর্ষণশক্তি, আলোকশক্তি, চুম্বকশক্তি, পারমানবিকশক্তি, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ, শূন্যশক্তি, মাধ্যাকর্ষণশক্তি ও সৌরশক্তির মতো যে কোনো একটি শক্তি প্রাণী ও উদ্ভিদের পরমাত্মা রূপে কাজ করছে। আরও বিশ্বাস হয় যে; প্রাণী উদ্ভিদ জড়বস্তু দৃশ্য ও অদৃশ্য সর্ব সৃষ্টিকুলেই এ শক্তিটি কাজ করছে। তা না হলে দিকদর্শন (কম্পাস, Compass) ও চুম্বক (magnet) জড় বস্তু হয়েও জীবন্ত প্রাণীর মতো কাজ করে কেন? চুম্বক ও দিকদর্শন যন্ত্রের মধ্যে যে শক্তিটি কাজ করছে তাকেই সারাবিশ্বের পরমাত্মা বলা যায়। এছাড়াও; বস্তুর একটি কণা অন্য কণার সাথে যুক্তকারী শক্তি বা পরমাণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী শক্তিকে পরমাত্মা না বলে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরিশেষে অবশ্যই এতটুকু বলা যায় যে; পরমাত্মা বলতে যে শক্তিটিই বুঝানো হোক না কেন তা অবশ্যই সারাবিশ্ব ব্র‏‏হ্মা- জুড়েই পরিব্যাপ্ত। এ শক্তিটি শুধু সৌরজগতের মধ্যেই নয় বরং মহাশূন্যের মহাধারে যতজগৎ রয়েছে সব জগতেই বিদ্যমান। এটিই আদি শক্তি। অন্যান্য শক্তিগুলো এ শক্তিটির রূপান্তর মাত্র।

. মানবাত্মা (Human soul)
আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে মনকে মানবাত্মা বলে।

. মহাত্মা (Super soul)
আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে জ্ঞানকে মহাত্মা বলে।

সাধু, গুরু ও গোঁসাইগণ শ্বরবিজ্ঞানে; আত্মা নিয়ে যত আলোচনা করে থাকেন; তা সবই পারম্পরিক আত্মা। অর্থাৎ; শ্বরবিজ্ঞানে; বৈষয়িক আত্মার তেমন কোনো আলোচনা করা হয় না। বিস্তারিতভাবে জানার জন্য বলন কাঁইজির নির্মিত আত্মতত্ত্ব ভেদ (২য় খণ্ড) গ্রন্থটি অধ্যয়ন করার অনুরোধ রইল।

আত্মার পরিচয় (Identity of soul)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বিদ্যুৎ পরিবারের অধীন একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিশেষ। জীবদেহের বিদ্যুৎকে আত্মা বলা হয়। অথবা সাধারণত; জীবদেহের বিদ্যুৎকে জীবের প্রকৃত জীবাত্মা বলা হয়। সারা বিশ্বে বিরাজিত মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে জীবের পরমাত্মা বলে এখন পর্যন্ত শ্বরবিজ্ঞানীদের ধারণা। কিন্তু এতেই আত্মার পরিচয় উপস্থাপন শেষ হয়ে যায় না। ওপরে বর্ণিত আত্মাদ্বয় একান্তই সাধারণ ধারণা। আত্মার সাধারণ ধারণা ও পারম্পরিক ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় মতবাদে আত্মার সংজ্ঞা, আকার ও প্রকার সবকিছুই ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষেই আত্মার সাধারণ ধারণা ও পারম্পরিক ধারণা মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। নিচে আত্মা সাধারণ ও পারম্পরিক ধারণার পার্থক্য তুলে ধরা হলো।

সাধারণ ও পারম্পরিক আত্মা ধারণার পার্থক্য সারণী (The difference table of the common & sequential soul concepts)

সাধারণ ধারণা পারম্পরিক ধারণা
১.   জীবদেহের মধ্যে বিরাজিত অদৃশ্য এক সত্তাকে আত্মা বলে। ১.    সাধারণভাবে সাধনীয় মানব-জলকে পারম্পরিক আত্মা বলে।
২.   জীবদেহের বিদ্যুৎকে জীবাত্মা বলে। ২.   শুভ্রবর্ণের মস্তিষ্ক মেরুজলকে জীবাত্মা বলে। যেমন; সাঁই।
৩.   সারাবিশ্বে বিরাজিত একটি শক্তিকে পরমাত্মা বলে। ৩.   কৃষ্ণবর্ণের মানবজলকে পরমাত্মা বলে। যেমন; কাঁই।
৪.   পঞ্চভূতকে ভূতাত্মা বলে। ৪.   দেহকে ভূতাত্মা বলে।
৫.   জীবদেহকে জীবিত রাখার বিদ্যুৎ শক্তিকে জীবাত্মা বলে। ৫.   জীব সৃষ্টির আদি উপাদন অমৃতকে জীবাত্মা বলে।

পূর্বকালে মানুষ আত্মা-সত্তা সম্পর্কে জানত না বলে অনেকেই আত্মা সম্পর্কে অনেক অবাস্তব ও অবান্তর মতামত ব্যক্ত করতেন। কিন্তু বর্তমানে দর্শন ও বিজ্ঞানের চরম উন্নতির ফলে; মানুষ আত্মার অস্তিত্বের সন্ধানলাভ করতে পেরেছেন। যে শক্তি জীবদেহকে বাঁচিয়ে রাখে সেটিই জীবের জীবাত্মা। শ্বরবিজ্ঞানের আত্মা পরিভাষাটি সব সময় বৈষয়িক ও পারম্পরিক এ দুটি অর্থ প্রদান করে। বৈষয়িক জীবাত্মা বলতে জীবদেহের বিদ্যুৎকে বুঝায় এবং পারম্পরিক জীবাত্মা বলতে স্বাধীষ্ঠানচক্রের অমৃতজল বুঝায়। একজন ব্যক্তির; ১. দেহ ২. আত্মা ৩. মন ও ৪. জ্ঞান; এ চারটি প্রধান সত্তার মধ্যে আত্মা গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগ, আদিমযুগ, ধাতুরযুগ, প্রস্তরযুগ ও প্রাগৈতিহাসিক যুগে শক্তির বাস্তবতা প্রমাণের জন্য কোনো প্রযুক্তি বা শক্তিগুলোর কোনো নাম ছিল না। এজন্য; পূর্বকালের মানুষ শক্তি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না। যেহেতু; আত্মা এক প্রকার শক্তি। এজন্য; তারা আত্মা সম্পর্কেও কিছুই জানত না। তাই; তারা কেউ মানুষের রক্তকে আত্মা বলত আবার কেউ দেহের রসকে আত্মা বলত। অতঃপর; মানুষ সৃষ্টির ১. আগুন ২. জল ৩. মাটি ও ৪. বাতাস; এ আদি চতুর্ভূতের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়।

আদি-চতুর্ভূতের জ্ঞান প্রাপ্তির পর মানুষ দেহের আগুন, জল, মাটি ও বাতাসকে আত্মা বলতে আরম্ভ করেন। গবেষকদের কেউ আগুনকে, কেউ জলকে আবার কেউ বাতাসকে জীবের আত্মা বলে অভিহিত করতে আরম্ভ করেন। আবার কেউ কেউ এ চারটি আদিভূতকে একত্রেই আত্মা বলা আরম্ভ করেন। এ মতবাদ হতে সর্বপ্রথম আত্মার সংখ্যা চারটিতে উন্নীত হয়ে যায়। আরও অনেক পরে এ চারটি আদিভূত ব্যতীত আরও একটি আত্মা রয়েছে এমন মতবাদের উৎপত্তি হয়। জীবদেহের রক্ত, রস বা আদি-চতুর্ভূত এসবের একটিও জীবের প্রকৃত আত্মা নয় বরং আত্মা এসবের আরও অনেক ঊর্ধ্বের কোনকিছু হবে। যতসম্ভব জানা যায়; ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে ৩৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দার্শনিক এরিস্টটল জীবদেহের আদি-চতুর্ভূতের বাইরে আত্মার অস্তিত্বের মতবাদ প্রকাশ করেন। তখন যদিও তিনি আত্মার কোনো নাম প্রকাশ করেন নি। তারপরও; তিনি অধিকশক্তি প্রয়োগ করেই বলেছিলেন- “আত্মা এক প্রকার শক্তি। এটি; দেহের ভিতরেও নয় এবং বাইরেও নয় বরং বিশ্বের সর্বত্রই এ শক্তিটি বিরাজিত।” তারপর; এ মতবাদটি সর্বস্তরে ব্যাপক সমাদৃত হয়ে ওঠে। তখনই; এটি; একদল লোক পূর্বের আদিভূত নামক চারটি আত্মার সাথে যুক্ত করে আত্মার সংখ্যা করে পাঁচটি। গত বিংশ শতাব্দীর আটের দশক পর্যন্ত আত্মার সংখ্যা পাঁচটিই ছিল। অতঃপর; গত বিংশ শতাব্দীর শেষের দুই দশক হতে আত্মার সংখ্যা আবার হ্রাস পেতে থাকে। তখন হতে কেবল জীবাত্মা ও পরমাত্মা নামে দুটি আত্মার মতবাদ প্রচার হতে আরম্ভ করে। বর্তমানেও অধিকাংশ গবেষকের মতে; আত্মা কেবল দুটি, তা হলো জীবের জীবাত্মা ও পরমাত্মা। এ মতবাদটিই অধিক প্রচার প্রসার হতে দেখা যাচ্ছে।

গবেষণা হতে বলতে পারি এখন পর্যন্ত কেবল মানুষের জীবাত্মার সন্ধান পাওয়া গেছে কিন্তু পরমাত্মার সন্ধান এখনও পাওয়া যায় নি। যারফলে; আমরা এ গ্রন্থে কেবল জীবাত্মার আলোচনা করেই গ্রন্থের সমাপ্তি করব। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে; বৈষয়িক আত্মা ও পারম্পরিক আত্মা এক নয়। বৈষিক আত্মা হলো; জীবদেহের বিদ্যুৎ এবং পারম্পরিক আত্মা হলো মানবদেহে প্রাপ্ত অমৃতরস বা সুধারস। এজন্য; বলা যায় বৈষয়িক আত্মা বিদ্যুতের মুক্তি দেওয়া ও না দেওয়ার কোনকিছুই নেই। বৈষয়িক আত্মা কয়েক প্রকার রয়েছে- যা আমরা পূর্বে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছি। অর্থাৎ; জীবের প্রকৃত আত্মা হলো জীবদেহের বিদ্যুৎ। দেহের বিদ্যুৎকে জীবের প্রকৃত জীবাত্মা বলা হয়। কেবল প্রয়াণ বা তিরোধান ভিন্ন কিন্তু আত্মমুক্তির বিধান বিশ্বের কোনো মতবাদেই আলোচিত হয় নি। তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় আত্মমুক্তি হওয়া বা আত্মমুক্তি দেওয়ার বিষয়টি কেবলই পারম্পরিক আত্মার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ; মানবদেহে প্রাপ্ত সুধারস বা অমৃতরস আহরণ ও সেবনের সাথেই আত্মমুক্তির বিষয়টি সম্পৃক্ত। গুরু ও গোঁসাইরা অটলতা দ্বারা কিভাবে পারম্পরিক আত্মারূপ অমৃতরস বা সুধারস আহরণ ও সেবন করে মানুষের জন্ম-মৃত্যু চির রহিত করেন তা আলোচনা করাই সমীচীন হবে। অটলতা দ্বারা আত্মমুক্তির বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে; নারীদেহে অবস্থিত অনেক প্রকার রসের মধ্যে সাধনযোগ্য দুটি পবিত্ররস উৎপন্ন হয়। একটিকে বলা হয় সুধারস ও অন্যটিকে বলা হয় মধুরস। শ্বরবিজ্ঞানে; সুধারসকে মানুষের আত্মা বলা হয়। একটা রসকে আত্মা বলার কারণ হলো; সুধারস মানবদেহকে সবল, সুঠাম ও দীর্ঘায়ু প্রদান করে এবং মানুষকে দিব্যজ্ঞানী করে থাকে। এজন্য; এ রসকে মানুষের আত্মার সঙ্গে তুলনা করে আত্মা বলা হয়। কিন্তু প্রকৃত বিষয় হলো; জীব লালন-পালনকারী একটি রস কখনই জীবের আত্মা হতে পারে না।

উল্লেখ্য যে; বিগত কয়েক শতাব্দী পূর্বেই শ্বরবিজ্ঞানে সুধারসকে আত্মা বলা আরম্ভ হয়েছে। যেমন; লালন সাঁইজি বলেছেন; আত্মা রূপে সে অধর, সঙ্গী অংশকলা তার, ভেদ না জেনে বনে বনে ফিরলে কী হয় (পবিত্র লালন- ৩৭৪/৩)। আবার ‘বলন তত্ত্বাবলী’ কাব্য গ্রন্থটির মধ্যে পারম্পরিক আত্মার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা হলো; আত্মা নামিবে ভুবনে হইলে মিলন সুদিন সুজনে, দেহ ভাঙ্গিয়া গড়িবে যেদিন, সে দিনটি রেখ স্মরণে (বলন তত্ত্বাবলী- ১১)। পরিশেষে বলা যায় যে; আত্মামুক্তির স্থলে আত্মমুক্তি বলাই শ্রেয়। কারণ; আত্মামুক্তি দেওয়া যায় না বরং আত্মমুক্তিলাভ করা যায়।

তথ্যসূত্র (References)

(Theology's number formula of omniscient theologian lordship Bolon)

১ মূলক সংখ্যা সূত্র (Radical number formula)
"আত্মদর্শনের বিষয়বস্তুর পরিমাণ দ্বারা নতুন মূলক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়।"

রূপক সংখ্যা সূত্র (Metaphors number formula)

২ যোজক সূত্র (Adder formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে ভিন্ন ভিন্ন মূলক সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন যোজক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, গণিতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায় না।"

৩ গুণক সূত্র (Multiplier formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে এক বা একাধিক মূলক-সংখ্যার গুণফল দ্বারা নতুন গুণক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৪ স্থাপক সূত্র (Installer formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে; এক বা একাধিক মূলক সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে স্থাপন করে নতুন স্থাপক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৫ শূন্যক সূত্র (Zero formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন শূন্যক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

< উৎস
[] উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
() ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
> থেকে
√ ধাতু
=> দ্রষ্টব্য
 পদান্তর
:-) লিঙ্গান্তর
 অতএব
× গুণ
+ যোগ
- বিয়োগ
÷ ভাগ

Here, at PrepBootstrap, we offer a great, 70% rate for each seller, regardless of any restrictions, such as volume, date of entry, etc.
There are a number of reasons why you should join us:
  • A great 70% flat rate for your items.
  • Fast response/approval times. Many sites take weeks to process a theme or template. And if it gets rejected, there is another iteration. We have aliminated this, and made the process very fast. It only takes up to 72 hours for a template/theme to get reviewed.
  • We are not an exclusive marketplace. This means that you can sell your items on PrepBootstrap, as well as on any other marketplate, and thus increase your earning potential.

পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী

উপস্থ (শিশ্ন-যোনি) কানাই,(যোনি) কামরস (যৌনরস) বলাই (শিশ্ন) বৈতরণী (যোনিপথ) ভগ (যোনিমুখ) কাম (সঙ্গম) অজ্ঞতা অন্যায় অশান্তি অবিশ্বাসী
অর্ধদ্বার আগধড় উপহার আশ্রম ভৃগু (জরায়ুমুখ) স্ফীতাঙ্গ (স্তন) চন্দ্রচেতনা (যৌনোত্তেজনা) আশীর্বাদ আয়ু ইঙ্গিত ডান
চক্ষু জরায়ু জীবনীশক্তি দেহযন্ত্র উপাসক কিশোরী অতীতকাহিনী জন্ম জ্ঞান তীর্থযাত্রা দেহাংশ
দেহ নর নরদেহ নারী দুগ্ধ কৈশোরকাল উপমা ন্যায় পবিত্রতা পাঁচশতশ্বাস পুরুষ
নাসিকা পঞ্চবায়ু পঞ্চরস পরকিনী নারীদেহ গর্ভকাল গবেষণা প্রকৃতপথ প্রয়াণ বন্ধু বর্তমানজন্ম
পালনকর্তা প্রসাদ প্রেমিক বসন পাছধড় প্রথমপ্রহর চিন্তা বাম বিনয় বিশ্বাসী ব্যর্থতা
বিদ্যুৎ বৃদ্ধা মানুষ মুষ্ক বার্ধক্য মুমুর্ষুতা পুরুষত্ব ভালোবাসা মন মোটাশিরা যৌবন
রজ রজপট্টি রজস্বলা শুক্র মূত্র যৌবনকাল মনোযোগ রজকাল শত্রু শান্তি শুক্রপাত
শুক্রপাতকারী শ্বাস সন্তান সৃষ্টিকর্তা শুক্রধর শেষপ্রহর মূলনীতি সন্তানপালন সপ্তকর্ম স্বভাব হাজারশ্বাস
ADVERTISEMENT
error: Content is protected !!