ইন্দ্রিয়

৩৪/০১. ইন্দ্রিয়
Sense (সেন্স)/ ‘إحساس’ (ইহসাস)

ভূমিকা (Prolegomenon)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর দেহযন্ত্র পরিবারের একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা দেহযন্ত্র। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা ঘাটিযন্ত্র। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা হারিতহৃষীক এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা ভারতবাসীমহারাজিক

অভিধা (Appellation)
ইন্দ্রিয় (বাপৌরূ)বি দেহযন্ত্র, হৃষীক, প্রত্যঙ্গ, সংজ্ঞাবহ, সংজ্ঞাতন্ত্র, সংবেদনজ, সংবেদনশীল, স্নায়ুবিক, ব্যবস্থা যন্ত্র, কার্যসাধন অঙ্গ, কার্যসাধন উপায়, Sense, ‘إحساس’ (ইহসাস) (প্র) ১. জীবের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, হস্ত ও পদ ইত্যাদি দেহযন্ত্র বিশেষ ২. জীবের কার্য সম্পাদনকারী প্রত্যঙ্গ বিশেষ (যেমন; হাত) (শ্ববি) দেহের স্বয়ংক্রিয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, organism, ‘منظمة’ (মুনাজিমা) (রূপ্রশ) ঘাটি, কেন্দ্র, চক্র, যন্ত্র, হারিত, ভারতবাসী, মহারাজিক (ইংপ) tract, station, device, verdant, equerry, indians, monarchic (ইপ) ‘مخفر’ (মাখফার), ‘جهاز’ (জিহাঝ), ‘مخضوضرة’ (মাখাদুদরা), ‘هنود’ (হুনুদ), ‘ملكي’ (মুলকি) (দেপ্র) এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর দেহযন্ত্র পরিবারের একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা (সংজ্ঞা) . সাধারণত; যে কোনো সংজ্ঞাতন্ত্রকে ইন্দ্রিয় বলা হয় . বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, জীবের কার্য সম্পাদানকারী প্রত্যঙ্গকে রূপকার্থে ইন্দ্রিয় বলা হয় (বাপৌছ) ভারতবাসী ও মহারাজিক (বাপৌচা) হারিত ও হৃষীক (বাপৌউ) ঘাটি ও যন্ত্র (বাপৌরূ) ইন্দ্রিয় (বাপৌমূ) দেহযন্ত্র।

Sense [সেন্স] (GMP)n অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়, অবয়ব, সংগঠন, দেহযন্ত্র, বাগযন্ত্র, কার্যসাধন যন্ত্র, কার্যসাধন উপায়, মতপ্রকাশ মাধ্যম, ব্যবস্থাযন্ত্র, canton, ‘إحساس’ (ইহসাস) (প্র) সংগীত ও নৃত্যকলায় ব্যবহৃত এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র {}

দশ ইন্দ্রিয় (বাপৌছ)বি দশ হৃষীক, ten sense, ‘عشرة إحساس’ (আশরা ইহসাস), ‘عشرة الجهاز’ (আশরাতা আলজিহাজ) {বাং.দশ+ বাং.ইন্দ্রিয়}

ইন্দ্রিয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of sense)
১.    “অযোগে স্নান করতে যায়, তারে কুম্ভীর সর্পে খায়, যে ঘাটের ছন্দি জানে না, সেথায় আছে কত ইন্দ্রিয় রিপু, এখন তাদের চিনলাম না।” (পবিত্র লালন- ১২৮/৪)(মুখ; আমার দেহনদীর বেগ থাকে না, আমি বাঁধব কয় মোহনা, কাম জ্বালাতে জ্বলে মরি কই হলোরে উপাসনা”)
২.   নীরাকার জ্যোতিতে এ ধরণীতে আসে দিনমণি, ভবে তারা সদাই পায় দরশন যারা জ্ঞানী-গুণী, রাসুল হলো তত্ত্ববাহক- অধ্যাত্ম্য জ্ঞানের ধারক, আত্মা ইন্দ্রিয় উদ্দীপক বহনকারক পানি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৭৩)(মুখ; রাসুল গুণমনি- ওরে যার সুপারিশে মুক্তি পাব, মন তাহারে না চিনি তত্ত্ববাহী দূতকে না চিনি”)
৩.   “পড়ে রিপু ইন্দ্রিয়ের ভোলে, মন বেড়ায় ডালেডালে, দু’মনে এক হলে এড়ায় শমন।” (পবিত্র লালন- ১৪২/২)(মুখ; আমার হয় না রে সে মনের মত মন, আমি জানব কী করে সে রাগের করণ”)
৪.   “স্বর্গ হতে আত্মা ইন্দ্রিয় নামে নিধুবনে, মহান যোগ সমান হাজার মাস গণে, অতিবাহন হইলে নিশি- থাকে না রে কালশশী, আবার স্বর্গে যায়রে মিশি রহে না তার নিশানি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৬৪)(মুখ; ক্বদর দীর্ঘ অবতরণ আত্মতত্ত্বখানি, সাধনবলে পায় সে ধন যে জন পারমী”)

ইন্দ্রিয়ের কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of sense)
১.   “আমার ইন্দ্রিয়াদি সব বিবাদী, সদাই বাঁধায় কলহ, কারো কথা কেউ শুনে না, উপায় কী করি বলো।” (পবিত্র লালন- ৩৯৯/৩)
২.   “করব আমি গুরু ভজন, তাতে বাদী হলো ছয়জন, দশ ইন্দ্রিয় মিলে ষোল জন, করল পরাধীন।” (পবিত্র লালন- ৪৯৪/৩)
৩.   “গুরুকে করলে নাগরী প্রীতি, দশ ইন্দ্রিয় হয় রিপুর পতি, লালন বলে প্রেম পিরিতি, গুরু ভজনের রীতি।” (পবিত্র লালন- ৪০৯/৪)
৪.   “ঘুমেরে ঘুম পাড়িয়ে রেখ, চেতন হয় না যেন দেখ, মন তুমি হুঁশিয়ার থেক, সঙ্গে ইন্দ্রিয় জনাদশ।” (পবিত্র লালন- ২৭৫/৪)
৫.   “চিহ্নকে কয়রে কালিমা, দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়খানা, পঞ্চ ভদ্রে মানুষ চেনা, পঞ্চ চিহ্নের নমুনায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮০)
৬.   “জীবদেহের তিন প্রকরণ, দেহ ইন্দ্রিয় জ্ঞান ও মন, শোধন করিলে বলন, যায় তখনই জাতি চলে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৯৫)
৭.   “তিন পাগলে বিশ্ব গঠন ইন্দ্রিয় মন ও জ্ঞান, কেবা সাধু কে সন্ন্যাসী কেবা হয় যবন।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৯)
৮.   “পঞ্চ ইন্দ্রিয় সপ্তমাথা, একুশদিনে বলে কথা, দশদিন পর যায় কোথা, মিলে না সে অন্বেষণ।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৪)
৯.   “প্রকৃতি নীতিই কাঁইয়ের বাণী অবলোকন করলি না, শাস্ত্র-গ্রন্থে দেহভেদ লেখা একবার ভেবে দেখলি না, আত্মা ইন্দ্রিয় মন জ্ঞান- শাস্ত্র নির্মাণ উপকরণ, বিনয় করে বলছে বলন- খোঁজ কর আপন ধড়ে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৮৭)
১০. “শক্তি সাঁই আত্মা ইন্দ্রিয়, রিপু কর্ম ভাবকেন্দ্র, আকাশ ভূমি সূর্য চন্দ্র, চল্লিশগুণ চুরাশি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৫৬)
১১.  “শুনি গো জ্ঞানেন্দ্রিয় গুণে, রইবে সে রিপু নিধনে, ইঙ্গিত যা পায় বিধানে, আমি বলিতে ডরাই।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৬)
১২.  “সাধুসঙ্গ করোরে মন, অনর্থের হয় বিবর্তন, ব্রহ্মজ্ঞানে ইন্দ্রিয় দমন, হবেরে সঙ্গগুণে।” (পবিত্র লালন- ৯৪১/২)

ইন্দ্রিয়ের সংজ্ঞা (Definition of sense)

শ্বরবিজ্ঞানে; সংজ্ঞাবহ (sensory) কোষগুচ্ছ দ্বারা গঠিত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (central nervous system) নির্দিষ্ট অঞ্চলের সাথে সম্পর্কযুক্ত ভৌত ঘটনার প্রতি সাড়া দানকারী ব্যবস্থাকে (যেখানে সঙ্কেতগুলো গৃহীত ও অনুদিত হয়) ইন্দ্রিয় বলে।

ইন্দ্রিয়ের প্রকারভেদ (Types of sense)

সারাবিশ্বের সব শ্বরবিজ্ঞানে ইন্দ্রিয় প্রধানত তিন প্রকার। যথা; ১. জ্ঞানেন্দ্রিয় ২. কর্মেন্দ্রিয় ও ৩. অন্তরিন্দ্রিয় এজন্য বলা হয় যে; মানুষের মধ্যে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় এবং বারোটি অন্তরিন্দ্রিয় বিদ্যমান এছাড়াও; শ্বরবিজ্ঞানে ইন্দ্রিয়কে আরো দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা; ১. বাহ্যেন্দ্রিয় (বহিরিন্দ্রিয় বা বাহিরিন্দ্রিয়) ও ২. অন্তরিন্দ্রিয়এক্ষেত্রে মানুষের বাহ্যেন্দ্রিয় ১০টি এবং অন্তরিন্দ্রিয় ১২টি। অর্থাৎ; ১০টি বাহ্যেন্দ্রিয় ছাড়াও আরো ১২টি অন্তরিন্দ্রিয় রয়েছে। অর্থাৎ; এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে; মানুষের মধ্যে সব মিলে মোট ২২টি ইন্দ্রিয় সক্রিয় রয়েছে

. জ্ঞানেন্দ্রিয় (Perceptive/ Perceptive sense)/ ‘فهيم’ (ফাহাইয়ামা), ‘حاسة’ (হাসসাত)

বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; . চক্ষু ২. কর্ণ ৩. নাসিকা ৪. জিহ্বা ও ৫. ত্বক এই পাঁচটি বাহ্যেন্দ্রিয়কে একত্রে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলা হয়। এগুলোকে আবার; . দর্শনেন্দ্রিয় ২. শ্রবণেন্দ্রিয় ৩. ঘ্রাণেন্দ্রিয় ৪. স্বাদেন্দ্রিয় (রাসন) ও ৫. স্পর্শেন্দ্রিয় বলা হয়।

জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সংজ্ঞা (Definition of perceptive)

জীবের জ্ঞানদানকারী প্রত্যঙ্গগুলোকে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলে।

বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; জ্ঞানেন্দ্রিয় ৫টি। যথা; ১. চক্ষু ২. কর্ণ ৩. নাসিকা ৪. জিহ্বা ও ৫. ত্বক। এদের অন্যনাম ১. দর্শনেন্দ্রিয় ২. শ্রবণেন্দ্রিয় ৩. ঘ্রাণেন্দ্রিয় ৪. স্বাদেন্দ্রিয় ও ৫. স্পর্শেন্দ্রিয়।

জ্ঞানেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of proprioceptor)/ ‘وظائف من إدراكي’ (ওয়াজয়িফ মিন ইদরাকি)

এসব ইন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ হলো বহির্বিশ্বের বিভিন্ন সঙ্কেত (signal) কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরণ করা

. কর্মেন্দ্রিয় (Action sense)

সাধারণত; শ্বরবিজ্ঞানে ১. বাক্ ২. পাণি ৩. পাদ ৪. পায়ু ও ৫. উপস্থ এই পাঁচটি বাহ্যেন্দ্রিয়কে একত্রে কর্মেন্দ্রিয় বলা হয়।

কর্মেন্দ্রিয়ের সংজ্ঞা (Definition of action sense)

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশ অনুসারে কার্য সম্পাদনকারী ইন্দ্রিয়কে কর্মেন্দ্রিয় বলে।

বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; কর্মেন্দ্রিয় ৫টি। যথা; . বাক্ ২. পাণি ৩. পাদ ৪. পায়ু ও ৫. উপস্থ

কর্মেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of proprioceptor)

এসব ইন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশ অনুসারে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়

. অন্তরিন্দ্রিয় (Inner sense)

সাধারণত; শ্বরবিজ্ঞানে ১. জ্ঞান ২. মন ৩. বিচার ও ৪. পরিকল্পনা এই চারটি ইন্দ্রিয়কে একত্রে অন্তরিন্দ্রিয় বলা হয়।

অন্তরিন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of proprioceptor)

জ্ঞান অর্জন করা, স্মরণ রাখা, বিচার করা ও পরিকল্পনা করাই অন্তরিন্দ্রিয়ের প্রধান প্রধান কাজ।

ইন্দ্রিয়ের পরিচয় (Identity of sense)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর দেহযন্ত্র বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিশেষ। সাধারণত; জীবের জৈব অস্ত্রকেই দেহযন্ত্র বা ইন্দ্রিয় বলা হয়। প্রাণী বিজ্ঞানীদের গণনা মতে; এখন পর্যন্ত প্রায় তের লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। স্মরণযোগ্য যে; প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রজাতির প্রাণীর নাম যুক্ত হচ্ছে এ সারণীতে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তের লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ১৮টি ইন্দ্রিয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। যথা; ১. চক্ষু ২. কর্ণ ৩. নাসিকা ৪. জিহবা ৫. ত্বক ৬. বাক্ ৭. পাণি ৮. পাদ ৯. পায়ু ১০. শিশ্ন ১১. যোনি ১২. শিং ১৩. শুণ্ড ১৪. লেজ ১৫. থলে ১৬. পালক ১৭. মন ও ১৮. জ্ঞান। উল্লেখ্য; মুখ জিহ্বার অন্তর্ভুক্ত। তারমধ্যে থলেটি হচ্ছে শাবক বহনকারী থলে। এটি; কেবল ক্যাঙ্গারু প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়। এটি; দুর্লভ ও একমাত্র প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়। অনেক প্রজাতির প্রাণীর শিং আছে। শুণ্ড কেবল হাতির মধ্যে দেখা যায়। এছাড়া; আঘাত করার মতো লেজ সর্প জাতির মধ্যে দেখা যায়। আর; কোনকিছু আঁকড়ে ধরার মতো লেজ এক জাতীয় বানরের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া; সাঁতার কাটার মতো লেজ মৎস্যকুলে ও কাঁটাযুক্ত লেজ সজারু (Hedgehog) প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়। এছাড়া; সজারুর দেহে কাঁটাযুক্ত পালক দেখা যায়। শিশ্ন ও যোনি প্রজনন, বিনোদন ও সাধন কার্যে একইসাথে ব্যবহৃত হয়। এজন্য; শ্বরবিজ্ঞানে এদেরকে একটি ইন্দ্রিয় রূপে গণনা করা হয়। তবে; এ দুটি ইন্দ্রিয় যুগল রূপে উপস্থ নামে পরিচিত। মন ও জ্ঞান দৃশ্যমান নয় বলে শ্বরবিজ্ঞানে এদের ইন্দ্রিয়ের মধ্যে গণনা করা হয় না।

উপরোক্ত বিবিধ বিষয়াদি বিবেচনা করে জীবের ইন্দ্রিয় ১০টি বলেই শ্বরবিজ্ঞানে উল্লেখ করা হয়। তবে; সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক ঘরানার মনীষীদের মধ্যে ইন্দ্রিয় সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি করতে দেখা যায়। যেমন; সহজিয়া মনীষীদের মতে; ইন্দ্রিয় ৩টি। যথা; ১. অঙ্গ ২. কথা ও ৩. মন। তাই; তাদের কর্মও তিন প্রকার। যথা; ১. কায়িক ২. বাচনিক ও ৩. মৌনিক। ইসলামী পুরাণ অনুসারে; জীবের ইন্দ্রিয় ৭টি। আবার অধিকাংশের মতে; ১০টি। যাইহোক সারাবিশ্বের অধিকাংশ সাম্প্রদায়িক, পারম্পরিক ও আত্মজ্ঞানী মনীষীর মতে; ইন্দ্রিয় সংখ্যা ১০টি। তাই; শ্বরবিজ্ঞানে; জীবের ১০টি ইন্দ্রিয়ের বর্ণনা দেখা যায়। জীবের ইন্দ্রিয়াদি হচ্ছে; ১. চক্ষু ২. কর্ণ ৩. নাসিকা ৪. জিহ্বা ৫. ত্বক ৬. বাক্ ৭. পাণি ৮. পাদ ৯. পায়ু ও ১০. উপস্থ। প্রাণী ছোট বা বড় হোক; যে প্রজাতির প্রাণীর ইন্দ্রিয় সংখ্যা যতোধিক স্বয়ংক্রিয়; সে প্রজাতির প্রাণী ততো শক্তিশালী। যার নাই ইন্দ্রিয় শক্তি তার নাই ভগবান ভক্তি। কেঁচোর ইন্দ্রিয় সংখ্যা ৩টি। যথা; ১. জিহ্বা ২. পায়ু ও ৩. ত্বক। তাই; সে দুর্বল। হাতির ইন্দ্রিয় সংখ্যা ১২টি। যথা; ১. চক্ষু ২. কর্ণ ৩. নাসিকা ৪. শুণ্ড ৫. জিহ্বা ৬. ত্বক ৭. বাক্ ৮. পাণি ৯. পাদ ১০. পায়ু ১১. উপস্থ ও ১২. লেজ। তাই; সে কেঁচোর চেয়ে শক্তিশালী। মানুষের ইন্দ্রিয় ১০টি। যথা; ১. চক্ষু ২. কর্ণ ৩. নাসিকা ৪. জিহ্বা ৫. ত্বক ৬. বাক্ ৭. পাণি ৮. পাদ ৯. পায়ু ও ১০. উপস্থ। ইন্দ্রিয়াদি ব্যবহার সুবিধা ও স্বয়ংক্রীয়তার দিক বিবেচনা করে মানুষ সবার সেরা। কারণ; বিশ্বের অন্য কোনো প্রাণীর মানুষের হাতের মতো হাত নেই। এছাড়াও; অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মানুষের চিন্তাশক্তি অনেক উন্নত। ইন্দ্রিয়ের সুবিধা ও কার্যকারীতার দিক দিয়েই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব। অন্যদিকে; “বিধাতা মানুষকে অমুক অমুক কারণে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” সাম্প্রদায়িকদের এমন কথা ভিত্তিহীন। কারণ; বিধাতা সব প্রাণীরই সৃষ্টিকর্তা। তবে; তিনি কাউকে শ্রেষ্ঠ ও কাউকে হেয় করবেন কেন? বিধাতার নিকট সব প্রাণী সমান হওয়াই যুক্তিযুক্ত।


মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহ

(The human senses)

ভূমিকা (Prolegomenon)

গোলাপকে মনে হয় লাল, শাপলা সাদা, অপরাজিতা নীল, মরিচ ঝাল, আমলকী টক, কাক কালো, ময়ূর বিচিত্র রঙে রাঙানো, আগুন উষ্ণ, বরফ শীতল। কেন এমন মনে হয়? কিসের কারণে মানুষ এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে? কোন অদৃশ্য শক্তি, না মানুষের শারীরিকি বিশেষ গঠন? পাখি উড়ে যাওয়ার যে মনোরম হৃদয় কাঁপানো দৃশ্যটি মানুষ চোখ দিয়ে অনায়াসে টেনে উপভোগ করে, প্রিয়তমার প্রিয় হাত ধরে রক্তের পর্দায় বুঝতে পারে কিভাবে ঢেউ উছলে পড়ছে; বুঝতে পারে সবচেয়ে সুখী চোখ দুটির রঙ! এসবের কারণ হলো ইন্দ্রিয়। মানুষকে পৃথিবীর রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধের সন্ধান দিয়েছে ইন্দ্রিয়। মানুষকে এত বিচিত্র রূপের সন্ধান অন্য কোনো সত্তায় দেয় নি, দিয়েছে কেবল প্রিয় ইন্দ্রিয়গুলো। মানুষ আদিকাল থেকেই অনুভূতি ও ইন্দ্রিয় নিয়ে যথেষ্ট কৌতুহলী ছিল। তার ওপর যদি এমন কোনকিছুর অনুভূতির ধারণা তাদের মাথায় আসে; যা আপাত জানা ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাহলে তো কথাই নেই! মানুষ স্থুলভাবে জেনে এসেছে যে; বিভিন্ন ধরণের অনুভূতি প্রাপ্তির জন্য মানুষের মোট পাঁচটি ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক/ স্পর্শ) রয়েছে। আর এখান থেকেই মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ধারণার উদ্ভব হয়েছে। অর্থাৎ; এই পাঁচটি ইন্দ্রিয় দ্বারা যেসব অনুভূতি পাওয়া যায়; তার বাইরে কোনকিছু অনুভূত হলে মানুষ তাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কাজ মনে করে।

তবে; সেই আদিকাল হতে অদ্যাবধি মানুষ ইন্দ্রিয় সংখ্যার বির্তক শেষ করতে পারে নি। একদল গবেষক বলেন মানুষের ইন্দ্রিয় ৫টি। আরেক দল গবেষক বলেন মানুষের ইন্দ্রিয় ৭টি। আবার; আরেক দল গবেষক বলেন মানুষের ইন্দ্রিয় ১০টি। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের পক্ষে অনেক যুক্তি-প্রমাণও উপস্থাপন করেছেন। অবাক হওয়ার বিষয় হলো সেগুলো কী বাহ্যেন্দ্রিয় নাকি অন্তরিন্দ্রিয় তা কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলেন নি তবে; এখন পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ বড় বড় আত্মতাত্ত্বিক ও মরমী গবেষকের মতে; মানুষের বাহ্যেন্দ্রিয়ের সংখ্যা ১০টি। কিন্তু বর্তমান গবেষকগণ বলছেন যে; মানুষ নয়টা ইন্দ্রিয়র অধিকারী। কোনো কোনো গবেষক বলে থাকেন যে; মানুষের ২১টিরও অধিক ইন্দ্রিয় রয়েছে। তবে সাধারণত মানুষ যে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের কথা বলে থাকে। তারমধ্যে; সবচয়ে বেশি তত্পর হচ্ছে মানুষের ঘ্রাণেন্দ্রিয়।

তারমধ্যে মানুষের জ্ঞানেন্দ্রিয় ৫টি। যথা; ১. দর্শণেন্দ্রিয় ২. শ্রবণেন্দ্রিয় ৩. ঘ্রাণেন্দ্রিয় ৪. স্বাদেন্দ্রিয় ও ৫. স্পর্শেন্দ্রিয়। যদিও উল্লিখিত ৫টি ইন্দ্রিয় মিলেই জ্ঞানেন্দ্রিয়। যদিও শাখা-উপশাখায় এর প্রকারভেদ বিভিন্ন। অন্যদিকে; ১. বাক্ ২. পাণি ৩. পাদ ৪. পায়ু ও ৫. উপস্থ; এই পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়। তবে; মজার বিষয় হলো; আত্মতাত্ত্বিক ও মরমীগণ এগুলোকে কর্মেন্দ্রিয় নামে চেনে ও জানে। কিন্তু দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ এগুলোকে ইন্দ্রিয় রূপে গণ্য করেন না। আর জ্ঞান, মন, বিচার ও কল্পনাকে বলা হয় অন্তরিন্দ্রিয়। এরপরও; ইন্দ্রিয়ের কিছু বিষয় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সেগুলো হলো; ১. আত্মেন্দ্রিয় ২. খিদেন্দ্রিয় ৩. চাপেন্দ্রিয় ৪. চুলকানেন্দ্রিয় ৫. চৌম্বকেন্দ্রিয় ৬. তাপেন্দ্রিয় ৭. তৃষ্ণেন্দ্রিয় ৮. বর্জ্য-নিষ্কাশনেন্দ্রিয় ৯. ব্যথান্দ্রিয় ১০. ভারসাম্যেন্দ্রিয় ১১. রসায়নেন্দ্রিয় ও ১২. সময়েন্দ্রিয় ইত্যাদি।

খোঁজ মিলেছে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের!

(Sixth sense is discovered!)

মানুষের ইন্দ্রিয় পাঁচটি। চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক। কিন্তু মানুষের আরেকটি ইন্দ্রিয়ও আছে, যাকে গবেষকেরা এতোদিন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে আসছেন। যা দেখা যায় না, ছোঁয়াও যায় না; শুধু অনুভব করা যায়। এর অবস্থান কোথায় এতদিন তাও ছিল অজানা। এবারে মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্বের কথা জানিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের গবেষকেরা। তাঁদের দাবি, তাঁরা মানুষের মস্তিষ্কের একটি অঞ্চলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কার্যক্রম চিহ্নিত করতে পেরেছেন। সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এ গবেষণার তথ্য। নেদারল্যান্ডসের ইউট্র্যাক্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আটজন ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। গবেষণার সময় এতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তনশীল বিন্দুর অবস্থান বিশ্লেষণ করতে বলা হয়েছিল। এসময় গবেষকেরা তাঁদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এতে তাঁরা প্রত্যেকের মস্তিষ্কের একটি মানচিত্র পান। গবেষকেরা এর নাম দেন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মানচিত্র (Topographical map)। গবেষকেরা দেখেছেন, প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সংখ্যার ধারণা বা পূর্বানুমানের বিষয়টি কাজ করেছে। গবেষকেদের দাবি, তাঁরা মস্তিষ্কের যে মানচিত্রটি পেয়েছেন সে অঞ্চলটিই মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি তৈরি করে। (তথ্যসূত্র; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি; প্রথম আলো; ১২/ ০৯/ ২০১৩)

মস্তিষ্কের ট্রপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র

বিজ্ঞানীরা এর বাইরে আরো একটি ইন্দ্রিয়কে প্রধান রূপে দাবি করেছে। সেটি হলো; মন। মন কোনো কানেক্টর ছাড়া অতি সহজে অন্যের দুঃখ-কষ্ট, ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না বুঝতে পারে এবং উপভোগ করতে পারে। আবার; অনেকে মনকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও বলে থাকে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অনুভূতি বলতে বুঝায়; যা প্রচলিত কোনো গ্রাহকের (receptor) সাহায্য ছাড়া সরাসরি মনের মাধ্যমে অনুভূত হয়! এই ধরনের অনুভূতির ধারণার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো; ভবিষ্যত দেখা/ অনুমান করা, অশরীরীদের সাথে যোগাযোগ (যেমনটি দেখানো হয়েছে ১৯৯৯ সালের হলিউড মুভি “The Sixth Sense”এ), ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও কোনো ঘটনা ঘটার সময় তা অনুভূত হওয়া, ইত্যাদি। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলতে প্রচলিতভাবে যা বুঝায়; তা সত্যই আছে কি? লেখাটির মূল বিষয় হলো; সত্যই কি মানুষের মাত্র ৫টি/ ৭টি/ ১০টি ইন্দ্রিয় রয়েছে? নাকি তা একটি ভ্রান্ত ধারণা মাত্র? নাকি ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা আরো অধিক।

কারো সামনে একটি আইস ব্যাগ রাখা হলো; কিন্তু স্পর্শ করতে দেওয়া হলো না। তবুও সে ঠাণ্ডা শিহরণ অনুভব করছে। এবার ভাববার বিষয় হলো; কোন ইন্দ্রিয় দিয়ে এটা হলো? বিজ্ঞানীরা এর নাম দেন টেনশন সেন্সর। আরো আছে তৃষ্ণার্ত হওয়ার ইন্দ্রিয়। ক্ষুধা পাওয়ার অনুভূতির ভিন্ন ইন্দ্রিয়। আরেকটি সেন্সর হলো; স্ট্রেচ। ফুসফুস, ব্লাডার, পাকস্থলীতে এর উপস্থিতিও রয়েছে। এই সেন্সর প্রভাব বিস্তার করে রক্তনালিতে। যারফলে; মানুষ মাথাব্যথা অনুভব করে। তাই; বিজ্ঞানীরা এখন সহমত যে; মানুষের এখন পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া ইন্দ্রিয় সংখ্যা ৫টি/ ৭টি/ ১০টি নয়; বরং ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা ২১টির ওপরে। এমনকি; মানুষভেদে এর সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধিও হতে পারে! মানুষের অবস্থার ওপর নির্ভর করে ইন্দ্রিয়ের হ্রাস-বৃদ্ধি হোক বা না হোক। মানুষের সবকিছু উপভোগ করার জন্য ইন্দ্রিয়ের অবদান অপরিসীম। নতুবা পাথর আর প্রাণীর পার্থক্য কোথায়?

অন্ধের দিকে তাকালে অনুভব করা যায় যে; চোখ ছাড়া তার পথচলা কতটা কঠিন। বধিরের দিকে তাকালে অনুভব করা যায় যে; মানুষের কথোপকথন শুনতে না পাওয়া ও অন্যান্য প্রাণীর শব্দ না শুনে পথচলা তার জন্য কতটা মারাত্মক। বোবার দিকে তাকালে অনুভব করা যায় যে; মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে না পারা ও অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে কথা বলতে না পারা তার জন্য কতটা মারাত্মক। এসব দেখেই ইন্দ্রিয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। এই যে, ভালোবাসা সৃষ্টি হলো; সেটাও একটা ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি। সত্যি সব রহস্যই বড় অদ্ভূত। তাই; ইন্দ্রিয়গুলো মানুষের মৌলিক পুঁজি। মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান। রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধ উপভোগ করার জন্য ইন্দ্রিয়ের বিকল্প নেই। (তথ্যসূত্র; প্রিয় ইন্দ্রিয়; বাবুল আবদুল গফুর; ০১ লা আগস্ট, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ)


ইন্দ্রিয় তন্ত্র

(Sensory system)

ইন্দ্রিয় তন্ত্র বলতে স্নায়ুতন্ত্রের একটি অংশকে বুঝায়, যেটি নানাবিধ ইন্দ্রিয়জাত তথ্য প্রক্রিয়া করে। একটি ইন্দ্রিয়তন্ত্র ইন্দ্রিয় সংগ্রহক, স্নায়বিক পথ এবং মস্তিষ্কের যেসব অংশ ইন্দ্রিয় সংগ্রহণের সাথে জড়িত, সেগুলি নিয়ে গঠিত। সাধারণভাবে স্বীকৃত ইন্দ্রিয় তন্ত্রগুলির মধ্যে আছে দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, স্বাদ ও ঘ্রাণের সাথে সম্পর্কিত ইন্দ্রিয়সমূহ। কোনো সংগ্রাহক অঙ্গ এবং সংগ্রাহক কোষসমূহ বিশ্বের যে বিশেষ অংশের প্রতি সাড়া দেয়, তাকে সংগ্রাহী জগৎ (receptive field) বলে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর যেসব অংশের আলো মানুষের চোখের রড ও কোন কোষে এসে পড়ে, সেগুলিই চোখের সংগ্রাহী জগৎ। এ পর্যন্ত দর্শনেন্দ্রিয়, শ্রবণেন্দ্রিয় ও স্পর্শেন্দ্রিয়ের সংগ্রাহী জগৎ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।


পরিচিত ইন্দ্রিয়সমূহ

(Known sense)

সাধারণত; ইন্দ্রিয় বলতে বুঝায় “এমন একটা ব্যবস্থা যেটি সংজ্ঞাবহ (sensory) কোষগুচ্ছ দ্বারা গঠিত। যে কোষগুলো একটি নির্দিষ্ট ভৌত ঘটনার প্রতি সাড়া দেয়। যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (central nervous system) নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের সাথে সম্পর্কযুক্ত (যেখানে সঙ্কেতগুলো গৃহীত ও অনুদিত হয়)। মূল কথা হলো; “মানুষের মাত্র পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে” এমন কথা একেবারেই ভুল! মানুষের পাঁচটির অধিক ইন্দ্রিয় রয়েছে। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন যে; মানুষের ইন্দ্রিয় সংখ্যাটি বাইশটি বা তারও অধিক হতে পারে! তবে; সাধারণ মানুষ পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের কথা জানে। আর গুরুবাদী মরমীগণ ১০টি বাহ্যেন্দ্রিয়ের কথা জানে। আবার; কেউ কেউ ১. জ্ঞানেন্দ্রিয় ২. কর্মেন্দ্রিয় ও ৩. অন্তরিন্দ্রিয় মিলে ১৫টি ইন্দ্রিয়ের কথাও জানে

. দর্শনেন্দ্রিয় (Optic/ Opthalmoceptor) (অপথ্যালমো ক্যাপ্টর)

. শ্রবণেন্দ্রিয় (Acoustics/ Aural/ Auricular/ Audioceptor)

. ঘ্রাণেন্দ্রিয় (Olfactory/ Olfacoceptor)

. স্বাদেন্দ্রিয় (রাসন) (Gustatory/ Gustaoceptor)

. স্পর্শেন্দ্রিয় (Touching/ Touchier/ Touchy/ Tactioceptor)

সাধারণত; মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয় হলো; চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহব্বা ও নির্মোক (Sight, Hearing, Smell, Taste & Touch)। তবে; ইন্দ্রিয়গুলোকে দর্শনেন্দ্রিয়, শ্রবণেন্দ্রিয়, ঘ্রাণেন্দ্রিয়, স্বাদেন্দ্রিয় ও স্পর্শেন্দ্রিয় নামে ডাকাই উত্তম।

প্রচলিত পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ধারণা

আর যেসব ইন্দ্রিয় সম্পর্কে অনেকেই অবগত নয়; সেগুলো এবং ইন্দ্রিয় সম্পর্কে মানুষের ভাবনার সীমাবদ্ধতাগুলোই এই লিখার মূল বিষয়। তবে; লেখাটিকে পূর্ণতা প্রদানের জন্য সেগুলোর পাশাপাশি প্রায় জানা ইন্দ্রিয়গুলোকেও সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষকগণ ইতোমধ্যেই যেসব মানব ইন্দ্রিয় সম্পর্কে অবগত আছেন; তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ইন্দ্রিয়গুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।


. দর্শনেন্দ্রিয় (Eye/ Sight/ Eyesight/ Vision/ Visual organ/ Sense of sight/ Opthalmoceptor) 

চক্ষু (Eye)/ ‘عين’ (আইয়ান)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা এবং চক্ষু পরিবারের পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সত্তা বিশেষ। এর বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা দ্রষ্টা। এটি একটি মূলক-প্রধান সত্তা।

মূলত চোখের রেটিনার (retina) দুটি ভিন্ন ধরনের গ্রাহক কোষ দর্শনের কাজ করে। যথা; কোন কোষ এবং রড কোষ। কোন কোষ মানুষের চোখে রঙের অনুভূতির কাজ করে। তবে; উজ্জ্বলতার প্রতি সামান্য সংবেদনশীল। তাই; মৃদু আলোর জন্য উপযোগী নয়। অন্যদিকে; রড কোষ উজ্জ্বলতার প্রতি অধিক সংবেদনশীল। তাই; মৃদু আলোতে দর্শনের কাজ করে। তবে; রঙের অনুভূতি প্রদানে অক্ষম। এই কোষগুলো অপটিক স্নায়ুর (optic nerve) সাথে সংযুক্ত। সেজন্য; এই কোষগুলো অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে তথ্য প্রেরণ করে। যা সেখানে প্রক্রিয়াকরণের (processing) হয়। তারপর; মানুষ দর্শনের অনুভূতি লাভ করে।

চোখের কোন কোষ এবং রড কোষ

দর্শনেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of Eye)

দর্শনেন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ দেখা। এছাড়াও; এটি অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করে। যেমন; চোখ কোনকিছু দেখে মস্তিষ্কে সংবাদ প্রেরণ করে। তারপর; জ্ঞান মনকে অন্যান্য ইন্দ্রিয় প্রস্তুত করার জন্য সতর্ক করে। যেমন; বিষধর সাপ দেখলে পা দৌড়ে পালায়। এছাড়াও; দর্শনেন্দ্রিয়ের অন্যান্য কাজ হলো;

১.    চর্ম-চক্ষু দ্বারা স্থূলবস্তু দর্শন করা যায়। যেমন; আকার, আকৃতি, রং, রূপ ও চলমানতা।

২.   জ্ঞান-চক্ষু দ্বারা অতি সহজে বৃত্তি ও ব্যবসা করা যায়।

৩.   অন্তর-চক্ষু দ্বারা কল্পনা, বিচার ও বিবেচনা করা যায়।

৪.   দিব্য-চক্ষু দ্বারা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের বিষয়াদি অনুধাবন করা যায়।


. শ্রবণেন্দ্রিয় (Ear, audition, organ of hearing/ Audioceptor) 

কর্ণ (Ear)/ ‘الأذن’ (আলউজন)

কর্ণ (বাপৌচা)বি . কান, শ্রোত্র, শ্রাবক, শ্রবনেন্দ্রিয় qক্রি শ্রবণ করা, হৃদয়ঙ্গম করা, কথা বা শব্দ অনুধাবন করা . হাল, বৈঠা, মাঝি, কাণ্ডারী . কোণ, কোনা, চতুর্ভূজের বিপরীত কোণা যুক্তকারী রেখা, ear (ইয়ার), ‘الأذن’ (আলউজন)।

কোনো মাধ্যম হতে (যেমন বায়ু অথবা পানি) কম্পন সনাক্তকরণ এবং মস্তিষ্কে তার অনুবাদই হচ্ছে শ্রবণ। যখন; কোনো কম্পন কানের পর্দার সংস্পর্শে আসে; তখন তা সেখানেও কম্পনের সৃষ্টি করে। তারপর; তা অন্তঃকর্ণে (inner ear) অবস্থিত কক্‌লিয়া (cochlea) নামক একটি প্যাঁচানো নালিকার মধ্যে সঞ্চারিত হয়। অতঃপর; সংলগ্ন স্নায়ুর মাধ্যমে সেটি সঙ্কেত (signal) রূপে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরিত ও অনূদিত হয়। তবে; প্রাণীজগতের একটা নির্দিষ্ট প্রজাতি শব্দের কম্পাঙ্কের একটা নির্দিষ্ট পরিসরই সনাক্ত, অনুভব, ও অনুবাদ করতে সক্ষম। মানুষের ক্ষেত্রে তা ২০ থেকে ২০,০০০ হার্টজ।

শ্রবণেন্দ্রিয়ের অবস্থান ও গঠন

শ্রবণেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of Ear)

শ্রবণেন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ শোনা। এছাড়াও; এটি অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করে। যেমন; আক্রমণাত্মক বা ভয়ঙ্কর কোনো শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে চোখকে তা দেখার জন্য মস্তিষ্কে সঙ্কেত প্রেরণ করে। এছাড়াও; শ্রবণেন্দ্রিয়ের অন্যান্য কাজ হলো;

১.   কর্ণ দ্বারা জীবকুল শব্দগুলোর বোধ অনুধাবন করে।

২.   কর্ণ দ্বারা জীবকুল সুরের ভালোমন্দ বিচার ও বিবেচনা করে।

৩.   যেসব প্রাণীর চোখ নেই তারা কর্ণ দ্বারা শব্দ সঙ্কেত ব্যবহার করে চলাফেরা করে।


. ঘ্রাণেন্দ্রিয় (Nose, Smell/ Scent/ Olfactory/ Organ of smell/ Sense of smell Olfacoceptor)

নাসিকা (Nose)/ ‘أنف’ (আনিফা)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তানাসিকা পরিবারের পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সত্তা বিশেষ। এর বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বাঁশী। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা বীণ এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা শিঙ্গা। এটি একটি রূপক-প্রধান সত্তা।

এটি মানুষের ঘ্রাণের অনুভূতি সৃষ্টি করে। নাকের নাসারন্ধ্রের অভ্যন্তরে কিছু বিশেষ সংবেদী কোষ এই কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। যখন; কোনো কিছুর অণু এই কোষগুলোর নির্দিষ্ট গ্রাহকে যুক্ত হয়; তখন; কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সঙ্কেত যায় এবং ঘ্রাণের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এই অণুগুলো মূলত তিন ধরনের হয়; যথা; উদ্বায়ী ক্ষুদ্র গন্ধযুক্ত অণু (Volatile small molecule odorants), অনুদ্বায়ী প্রোটিন অণু (non-volatile proteins) ও অনুদ্বায়ী হাইড্রোকার্বন অণু (non-volatile hydrocarbons)।

ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কার্যপদ্ধতি

ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of Nose)

ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ ঘ্রাণ গ্রহণ। এছাড়াও; এটি অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করে। যেমন; দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্য মুখ যেন গলধঃকরণ না করে। সেজন্য সে মস্তিষ্কে সঙ্কেত প্রেরণ করে। এছাড়াও; ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের অন্যান্য কাজ হলো;

১.    নাসিকার সাহায্যে সুঘ্রাণ ও দুর্গন্ধ অনুভব করা যায়।

২.    এর সাহায্যে শ্বাসগ্রহণ বর্জনের মাধ্যমে বাতাস হতে জীবনধারণের অম্লজান গ্রহণ করা যায়।

৩.   এর সাহায্যে কোনো কোনো কাজের শুভাশুভ ফলাফল অগ্রিম জানা যায়।

৪.   এর সাহায্যে ইচ্ছা অনুযায়ী পুত্র ও কন্যা সন্তান উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ; সূর্যশ্বাসের দ্বারা পুত্রসন্তান ও চন্দ্র শ্বাসের দ্বারা কন্যাসন্তান সৃষ্টি করা যায়।

৫.   চন্দ্র শ্বাসের দ্বারা মানবদেহ হতে অমৃত সুধা আহরণ করা যায়।

৬.   সূর্যশ্বাসের দ্বারা মানবদেহ হতে অমৃত মধু আহরণ করা যায়।

. স্বাদেন্দ্রিয় (Taste/ Gustation/ Gust/ Organ of taste/ Gustaoceptor)

জিহ্বা (Tongue)/ ‘لسان’ (লিসান)

সাধারণত; জিহ্বাকে স্বাদেন্দ্রিয় বা রসনেন্দ্রিয় বলা হয়। খাবারের গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে স্বাদ। মানুষের জিহ্বার মৌলিক স্বাদ ৭টি। যথা; টক, ঝাল, লবণ, কষা, তিক্ত, মিষ্ট ও উমামি। এগুলো মৌলিক স্বাদ নামে পরিচিত। মৌলিক স্বাদ হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র স্বাদ। যা অন্যান্য স্বাদগুলোর সমন্বয়েও সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। ১৯০৮ সালে ড. কিকুনায়ে ইকেদা কমবু দাশি স্যুপের (কেলপের স্যুপ স্টক) স্বাদের ওপর গবেষণা করেন। অতঃপর; তিনি একটি স্বাদ আবিষ্কার করেন। তিনি এই স্বাদের নাম দেন ‘উমামি। তারপর; তিনি আরো আবিষ্কার করেন যে; এই স্বাদের উপাদান হচ্ছে গ্লুটামেট।

মানুষ মৌলিকভাবে সাত প্রকার স্বাদ পায়; যথা; মিষ্টি, নোনতা, ঝাল, কষা, টক, তেতো ও উমামি (এমিনো এসিড গ্লুটামেট এর স্বাদ; যা মাংস ও মসলাদার খাদ্যে উপস্থিত থাকে)। বাকি স্বাদগুলো এসব স্বাদের সমন্বয়েই অনুভূত হয়। এটা নিয়েই বিতর্ক আছে যে; স্বাদেন্দ্রিয় একাই ৭টি ইন্দ্রিয় নিয়ে গঠিত। কারণ; এই সাত রকমের স্বাদ  জিহ্বার স্বাদ-কোরকের (taste bud) ৭টি আলাদা আলাদা গ্রাহকের মাধ্যমে গৃহীত হয়। তবে; সাধারণত; এটিকে একটি ইন্দ্রিয় রূপেই বিবেচনা করা হয়। এই ইন্দ্রিয় হতে সংলগ্ন স্নায়ু তন্তুর (nerve fiber) মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরিত সঙ্কেত মূলত স্বাদ-কোরকের গ্রাহকে খাদ্যকণার রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন হয়।

স্বাদকোরকের গঠন

স্বাদেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of taste)

স্বাদেন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ স্বাদ অনুভব করা। এছাড়াও; এটি অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করে। যেমন; অধিক লবণ ও অধিক ঝাল স্বাদযুক্ত খাদ্য মুখ যেন গলধঃকরণ না করে। সেজন্য সে মস্তিষ্কে সঙ্কেত প্রেরণ করে। এছাড়াও; স্বাদেন্দ্রিয়ের অন্যান্য কাজ হলো;

১.    এর দ্বারা কথা বলা যায়।

২.   এর দ্বারা অন্ন-পানীয় গলাদঃকরণ করা যায়।

স্বস্ব প্রকৃতি জানার সহজ উপায়

(Easy way to learn the nature of the respective)

স্বাভাবিক তাপমাত্রার ১/৪ এক গ্লাস থেকে একচুমুক পান করুন, একটু থামুন, আরেক চুমুক পান করুন। স্বাদের বিষয় চিন্তা করুন। যদি তিতা লাগে; তার অর্থ পিত্তপ্রকৃতি; যদি মিষ্টি লাগে; তার অর্থ কফপ্রকৃতি; যদি টক লাগে; তার অর্থ বায়ুপ্রকৃতি। এ পরীক্ষাটি সকালে নাস্তা খাওয়ার আগে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। মানুষের আহার এবং পান করার মূল উদ্দেশ্য শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ বিশুদ্ধ রক্ত, তাপ ও শক্তি সৃষ্টি করা এবং রসনাকে তৃপ্তি দেওয়া। স্বাদ ছয় প্রকার। যথা; ১. মিষ্ট ২. লবণ ৩. টক ৪. ঝাল ৫. কষা ও ৬. তিক্ত। সাধারণত; অধিকাংশ মানুষ শেষ দুটিকে এড়িয়ে চলে। এতে মানুষের পরিপাকক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে ও রক্তের সমতা ব্যাহত হয়। যারফলে; বিভিন্ন প্রকার রোগব্যাধি সৃষ্টি হয়। এমনকি; ক্যান্সারও হয়। কিন্তু এ দুইটি স্বাদ মিষ্টি খাবারের কুফলকে অকার্যকর করতে সাহায্য করে। সাথে সাথে রক্তও শোধন করে। এ দুইটি স্বাদ পরিপাকক্রিয়া শক্তিশালী করার মাধ্যমে অগ্নি বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ; দেহ গাড়ির স্টার্টারের কাজ করে। তাই; প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য সারণীতে এই দুইটি স্বাদযুক্ত খাবারও অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন। মহাত্মা গান্ধি দৈনন্দিন আহারের সারণীতে অপরিহার্য রূপে নিমপাতার চাটনি রাখতেন। পাশ্চাত্যের অনেক চিকিৎসকের মতেও যেসব ভারতীয় নিমপাতা খান, তাদের স্বাস্থ্য অনেক ভালো এবং রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও অধিক। এমনকি; তিক্ত খাবার ব্লাড ক্যান্সারও প্রতিরোধ করে।

মানুষ রান্নার চুলাতে যে মানের ও পরিমাণের কয়লা বা কাঠ দেয়; সে বিষয়ে মানুষ দৃষ্টি রাখে। ঠিকমতো জ্বলার জন্য মানুষ তাতে যথেষ্ট বাতাসও যোগাই। এরফলে আগুন সর্বত্র তাপ দেয়, তাতে ধোঁয়া ও ছাইও কম হয়। মানুষের পেটেও একই রকমের চুলা আছে। মানুষের গ্রহণকৃত খাদ্য-পানীয়ের প্রভাবের কথা মানুষের জানা প্রয়োজন। জল, অগ্নি ও ইন্ধন; এ তিনটি মূল উপাদানের অনুপাতে খাদ্য মানুষের দেহের তারতম্য ঘটায়। মানুষের পেটে অগ্নি ঠিকমতো অটুট রাখতে হবে; যাতে স্বাভাবিকভাবে খাদ্যাদি পরিপাক হয়। ৩৫ বছরের পর মানুষের সতর্ক থাকা উচিত। স্মরণীয় সব ধরণের খাদ্য মানুষের পেটে পরিপাক হয় না। তাই; অপরিপক্ক খাদ্য এড়িয়ে চলতে হবে। কোনো কোনো ব্যক্তির একটি বিশেষ খাদ্য সহ্য হতে পারে। তবে; ঐ খাদ্য অন্যদের সহ্য না-ও হতে পারে। যেমন; যাদের দেহে অগ্নি-উপাদান অধিক, তাদের দই ও ঘোল ইত্যাদি সহ্য হবে। কিন্তু যাদের দেহে জল-উপাদান অধিক, তাদের দই ও ঘোল সহ্য হবে না। আবার গ্রীষ্মকালে দই ও ঘোল খাওয়া ভালো কিন্তু বর্ষাকালে ভালো নয়। (তথ্যসূত্র; আলেক সাঁই; দেহপ্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার সহজ উপায়)


. স্পর্শেন্দ্রিয় (Touch/ Feeling/ Skin/ Sense of touch/ Tactioceptor) 

ত্বক (Skin)/ ‘بشرة’ (বুশারা)

স্পর্শেন্দ্রিয় মানুষের ত্বকে উপস্থিত বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকের সমন্বয়ে গঠিত। এটি মানুষের ত্বকে যান্ত্রিক চাপ (Mechanical pressure) ও বিকৃতির প্রতি সাড়া প্রদান করে। মানুষের ত্বকে প্রধানত চার ধরনের গ্রাহক এই কাজে নিয়োজিত। যথা; তলাকৃতি কণিকা (Lamellar corpuscles), স্পর্শগ্রাহ্য কণিকা (Tactile corpuscles), স্পর্শগ্রাহ্য চাকতি (Tactile discs), এবং রাফিনি কণিকা (Ruffian corpuscle)। এই গ্রাহকগুলো প্রান্তীয় (peripheral) স্নায়ু তন্তুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সঙ্কেত প্রেরণ করে। যা মানুষের মধ্যে স্পর্শের অনুভূতি সৃষ্টি করে।

ত্বকে স্পর্শের বিভিন্ন ধরণের গ্রাহক

স্পর্শেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of touch)

স্পর্শেন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ বস্তুর ধরণ চিহ্নিত করা। এছাড়াও; এটি অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে সহায়তা করে। যেমন; অন্ধকারে পথ চলার সময়ে সাপের ওপর পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে মস্তিষ্কে সঙ্কেত প্রেরণ করে। এবং সে বলে যে; পা যেন অতি দ্রুত পলায়ন করে। অন্যথায় মহা বিপদ হতে পারে। এছাড়াও; স্পর্শেন্দ্রিয়ের অন্যান্য কাজ হলো;

১.    এর দ্বারা স্পর্শ জ্ঞানলাভ করা যায়।

২.   এর দ্বারা শীতল-উষ্ণতা অনুভব করা যায়।

 


কর্মেন্দ্রিয়

(Action sense/ Organ of action)/

‘جهاز العمل’ (জিহাঝুল আমাল)

এখন পর্যন্ত; বিজ্ঞানীগণ কর্মেন্দ্রিয়কে স্বীকার করতে চান না। তাদের মতে; ১. বাক্ ২. পাণি ৩. পাদ ৪. পায়ু ও ৫. উপস্থ এগুলো কোনো ইন্দ্রিয় নয়। কারণ; এসব প্রত্যঙ্গ অন্য কোনো ইন্দ্রিয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। তাই; তারা এগুলোকে স্বাধীন স্বকীয় ইন্দ্রিয় রূপে স্বীকার করতে চান না। অন্যদিকে; আত্মতাত্ত্বিক ও মরমীগণ এগুলোকে স্বাধীন স্বকীয় ইন্দ্রিয় রূপে স্বীকার করেন।

কর্মেন্দ্রিয়ের সংজ্ঞা (Definition of action sense)

সাধারণত; শ্বরবিজ্ঞানে ১. বাক্ ২. পাণি ৩. পাদ ৪. পায়ু ও ৫. উপস্থ এই পাঁচটি বাহ্যেন্দ্রিয়কে একত্রে কর্মেন্দ্রিয় বলা হয়।

কর্মেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of proprioceptor)

সাধারণত; জীবের কর্ম সম্পাদনকারী ইন্দ্রিয়কে কর্মেন্দ্রিয় বলে।

ইন্দ্রিয়ের প্রকারভেদ (Variations of organ)

বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; কর্মেন্দ্রিয় ৫টি। যথা; ১. বাক্ ২. পাণি ৩. পাদ ৪. পায়ু ও ৫. উপস্থ।

. বাক্ (Gabriel)

বাক (বাপৌছ)বি বলন, ভাষণ, speak, Gabriel, orator, ‘ﻗﻮﻞ’ (ক্বওল), ‘ﺠﺑﺮﺍﺌﻴﻞ’ (জিব্রাইল)।

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর ইঙ্গিত পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা ইঙ্গিত, বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা প্রত্যাদেশ। এর  বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা ঐশিবাণী, দীপন দৈববাণী, অন্যান্য বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা গীর্বাণ, গীষ্পতিসুবোলএবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা অবতারঐশিদূত

বাকের কাজ (Jobs of Gabriel)

১.    বাক্ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়।

২.   এর সাহায্যে আদেশ নিষেধ ও উপদেশ করা যায়।

. পাণি (Hand)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বলাই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক অশালীন মূলক সত্তা শিশ্ন, বাঙালী পৌরাণিক রূপান্তরিত মূলক সত্তা বলাই । এর বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিম্বল। এর অন্যান্য বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা আঁচল, আঙ্গুল, খুঁটি, গাছ, চরণ, পদ, বৈঠা, রশিলাঠি। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা অনস্থী, কর্ণ, জগাই, জনক, দৈত্যশুক্রাচার্য এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা কামগুরু, কিরীটী, বণিক, বাবা, মরাশ্রীচরণ

পাণির কাজ (Jobs of hands)

১.    পাণি দ্বারা স্থূল দ্রব্যাদি ধারণ করা যায়।

২.   এর দ্বারা খাদ্য গ্রহণসহ দৈহিক ক্রিয়া কর্মগুলো সম্পাদন করা যায়।

. পাদ (Footsie)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বলাই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক অশালীন মূলক সত্তা শিশ্ন, বাঙালী পৌরাণিক রূপান্তরিত মূলক সত্তা বলাই, বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিম্বল। এর অন্যান্য বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা আঁচল, আঙ্গুল, খুঁটি, গাছ, বৈঠা, লাঠিহাত। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা অনস্থী, কর্ণ, জগাই, জনক, দৈত্যশুক্রাচার্য এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা কামগুরু, কিরীটী, বণিক, বাবা, মরাশ্রীচরণ

পাদের কাজ (Jobs of footsie)

১.     পাদের সাহায্যে জীবকুল স্বাভাবিক চলাফেরাসহ আহারগুলো সংগ্রহ কার্যাদি সম্পাদন করে।

২.   এর সাহায্যে হাঁটা চলাসহ দৈহিক ক্রিয়াকর্মগুলোও সম্পাদন করা যায়।

. পায়ু (Anus)

প্রতিটি জীবের মল ত্যাগকারী ইন্দ্রিয়কে পায়ু বলা হয়। তবে; উদ্ভিদের পায়ু নেই। কারণ; উদ্ভিদের মল নেই। তাই; তারা মল ত্যাগও করে না। উদ্ভিদ পাতা দ্বারাই খাদ্য প্রস্তুত করে এবং পাতা দ্বারাই রেচন করে।

১.    এর দ্বারা রেচন কার্য করা হয়।

২.   এর দ্বারা দেহের অসার বর্জ্য বের হয়।

১০. উপস্থ (Genitalia)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা। এর বাঙালী পৌরাণিক অশালীন মূলক সত্তা যোনি-শিশ্ন। এর বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা কণ্ডনী। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা ঘানী। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা জনিত্র এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা দ্বাপর ও ভগবান। এটি একটি ছদ্মনাম-প্রধান সত্তা।

উপস্থের কাজ (Jobs of genitalia)

১.    উপস্থ জীবকুলকে মৈথুন প্রশান্তি ও বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

২.   প্রজনন তন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সত্তা কানাই ও বলাই। বিপরীতধর্মী নারী ও নরের নিকট অবস্থান করায় একাকী ভবঘুরে বা যাযাবর জীবন হতে প্রাণীকুলকে সঙ্গবদ্ধ ও সাংসারিক জীবনে আবদ্ধ হতে সাহায্য করে। আমরা শিশ্ন ও যোনি অনুচ্ছেদে ভিন্ন ভিন্নভাবে এর আলোচনা করেছি।


অন্তরিন্দ্রিয়

(Inner sense)

এছাড়াও; মানুষের অভ্যন্তরে অনেকে ইন্দ্রিয় রয়েছে। মানুষের অভ্যন্তরের ইন্দ্রিয়গুলোকে একত্রে অন্তরিন্দ্রিয় বলা হয়। যেমন; কয়েকটি অন্তরিন্দ্রিয় হলো; ১. আত্মেন্দ্রিয় ২. খিদেন্দ্রিয় ৩. চাপেন্দ্রিয় ৪. চুলকানেন্দ্রিয় ৫. চৌম্বকেন্দ্রিয় ৬. তাপেন্দ্রিয় ৭. তৃষ্ণেন্দ্রিয় ৮. বর্জ্য-নিষ্কাশনেন্দ্রিয় ৯. ব্যথান্দ্রিয় ১০. ভারসাম্যেন্দ্রিয় ১১. রসায়নেন্দ্রিয় ও ১২. সময়েন্দ্রিয়। এছাড়াও; আরো কিছু ইন্দ্রিয় রয়েছে। যেমন; ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সময় এবং দিক-সংক্রান্ত অনুভূতি। ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতি মানুষের দেহ কখন পুষ্টি চাচ্ছে তা ব্যক্ত করে।

১১. চাপেন্দ্রিয় (Baroceptor) 

এটি সব মেরুদণ্ডী প্রাণীর ধমনীতে অবস্থান করে। সাধারণত; চাপেন্দ্রিয় রক্তচাপের প্রতি সংবেদনশীল এবং রক্তচাপজনিত তথ্য সবসময় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক রক্তচাপ অটুট রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। মূলত; এগুলো রক্তচাপের পরিবর্তনের সাথে সাথে ধমনীগাত্রের সংকোচন/ প্রসারণের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে।

হৃদপিণ্ডের ধমনীতে চাপগ্রাহকের অবস্থান


১২. তাপেন্দ্রিয় (Thermoceptor) 

এর দ্বারা মানুষ তার চারপাশের তাপমাত্রাকে টের পায়। এই অনুভবই মানুষকে তার দেহের তাপমাত্রাকে সমমাত্রিক রাখে। এর দ্বারাই মানুষ বুঝতে পারে যে; কখন লেপমুড়ি দিতে হবে আর কখন ঠাণ্ডা ঘোল পান করতে হবে। তাপেন্দ্রিয় নিরাপদ পরিসরের মধ্যে তাপমাত্রার পরম ও আপেক্ষিক পরিবর্তনের সঙ্কেত প্রেরণে সক্ষম। মজার বিষয় হচ্ছে; উষ্ণতা ও ঠাণ্ডার অনুভূতি ভিন্ন ধরনের গ্রাহক দ্বারা সম্পন্ন হয়। স্তন্যপায়ী জীবের ক্ষেত্রে মনে করা হয় যে; গরমের অনুভূতির জন্য তাদের প্রান্তীয় সংজ্ঞাবহ ব্যবস্থার মায়োলিন আবরণবিহীন সি-তন্তু (Unmyelinated C-fibers) দায়ী। আর ঠাণ্ডার অনুভূতি প্রদানে এই কাজ সম্পন্ন করে প্রান্তীয় সংজ্ঞাবহ ব্যবস্থার মায়োলিন আবরণবিহীন সি-তন্তু ও পাতলা মায়োলিন আবরণযুক্ত A ডেলটা তন্তু (thinly myelinated A delta fibers)। তাপেন্দ্রিয়কেও একাধিক ইন্দ্রিয়ের সমতুল্য ধরা হয়; তবে; তা শুধু এজন্য নয় যে উষ্ণ ও ঠাণ্ডার অনুভূতির জন্য ভিন্ন ধরনের গ্রাহক বিদ্যমান, তাপমাত্রার পরিবর্তন সনাক্তকরণের কৌশলের ভিত্তিতেও ভিন্ন ধরনের গ্রাহক আছে। নিজের দেহতাপ পর্যবেক্ষণ করা তাপেন্দ্রিয়ের প্রধান কাজ।

ত্বকের তাপগ্রাহক তন্তুসমূহ

 


১৩. চুলকানেন্দ্রিয় (Pruriceptor) 

শুনতে অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে চুলকানির জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ইন্দ্রিয় রয়েছে! এটিও ত্বকের প্রান্তীয় স্নায়ু ব্যবস্থার সি-তন্তুর কাজ। তবে; এই সি-তন্তুগুলো গঠনগত দিক থেকে তাপেন্দ্রিয়ের সি-তন্তুগুলোর মতো হলেও কৌশলগত দিক থেকে ভিন্ন। মানুষের দেহের মোট সি-তন্তুর মাত্র ৫% এই ধরনের সি-তন্তু অধিকার করে। সাধারণত; এই তন্তুগুলোতে বিভিন্ন ধরণের যান্ত্রিক, তাপীয় ও রাসায়নিক উদ্দীপনার কারণেই চুলকানি অনুভূত হয়। তন্তুগুলো এসব উদ্দীপনা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে দেয় এবং সেখান থেকে চুলকানি প্রতিবর্তী সাড়ার উৎপত্তি হয়। যখন কেউ চুলকায়; তখন ত্বকের একই স্থানের স্পর্শেন্দ্রিয় ও ব্যথান্দ্রিয়ের বিভিন্ন গ্রাহককে উদ্দীপনা প্রদান করে। যা ঐ স্থানের চুলকানির অনুভূতিতে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই; চুলকালে মানুষের চুলকানি প্রশমিত হয়। তবে; চুলকালে প্রকৃতভাবে চুলকানি থেকে সাময়িক মুক্তি ঘটে মাত্র।

চুলকানেন্দিয়ের কাজ (Jobs of pruriceptor)

চুলকানেন্দ্রিয়ের মূল কাজ হলো; মানুষের ত্বকে বা কলাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি নির্দেশের মাধ্যমে মানুষকে সতর্কতা প্রদান করা; যাতে মানুষ যথাসময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

চুলকানির সঙ্কেতের গতিপথ

১৪. ব্যথান্দ্রিয় (Nociceptor) 

এক সময় বিশেষজ্ঞরা মনে করতেন যে; স্পর্শের মতো অনুভূতিগুলোর অতি আধিক্যের কারণেই ব্যথা অনুভূত হয়। কিন্তু পরে ব্যথান্দ্রিয়ের নিজস্ব স্বতন্ত্র সংজ্ঞাবহ ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া যায়। মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ব্যথান্দ্রিয়ের গ্রাহকগুলো কিছু সংজ্ঞাবহ নিউরন। যেগুলো বিভিন্ন ধরণের বাহ্যিক/ আভ্যন্তরীণ ক্ষতিকর (noxious) উদ্দীপনা গ্রহণে সক্ষম। এরা শরীরের প্রায় সব অঞ্চলেই অবস্থান করে। মানুষের শরীরে অবস্থানের ভিত্তিতে ব্যথার অনুভূতি প্রদানের জন্য তিন ধরনের গ্রাহকের উপস্থিতি রয়েছে। যথা; ত্বকীয় (cutaneous), কায়িক (somatic) এবং আন্তরযন্ত্রীয় (visceral)। এরা যথাক্রমে ত্বক, অস্থি এবং আভ্যন্তরীণ অঙ্গে অবস্থিত।

ব্যাথান্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of nociceptor)

এর মাধ্যমে মানুষ শরীরে ব্যথার অনুভূতি প্রত্যক্ষভাবে বুঝতে পারে।

ত্বকের ব্যাথা-গ্রাহক (বামে) ও ব্যাথার সঙ্কেতের গতিপথ (ডানে)

 


. আত্মেন্দ্রিয় (Proprioceptor) 

এটি অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি ইন্দ্রিয়। এর নামের অর্থ দাঁড়ায় নিজের ওপরে অধিকার

আত্মেন্দ্রিয়ের ভিন্ন ভিন্ন ধরণের গ্রাহক

আত্মেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of proprioceptor)

মানুষ এই ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই শরীরের বিভিন্ন অংশের আপেক্ষিক অবস্থান বুঝতে পারি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে; এই ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই মানুষ চোখ বন্ধ করেই আঙ্গুল দিয়ে যার যার নাক/ কনুই ঠিকঠাক স্পর্শ করতে পারে; কিম্বা যার যার পিঠের যথাস্থানেই চুলকাতে পারে।  এই বিশেষ অনুভূতিটি মানুষকে তার দেহের আয়তন অনুসারে পরিমাপ সম্পর্কে সচেতন রাখে। যে কোনো সময়-পরিসরে দেহকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে।

এই ইন্দ্রিয়টি ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহকের সাহায্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির সমন্বয়ের মাধ্যমেই শরীরের বিভিন্ন অংশের আপেক্ষিক অবস্থান বুঝতে সহায়তা করে। তাই; এটিকেও একাই একাধিক ইন্দ্রিয়যুক্ত রূপে গণ্য করা হয়। মূলত; এই সমন্বয়মূলক কাজে তিন ধরণের গ্রাহক নিয়োজিত রয়েছে। যথা; পেশীতে অবস্থিত পেশী মাকুযন্ত্র (muscle spindle), কন্ডরাতে (tendon) অবস্থিত গলগি কন্ডরা অবয়ব (golgi tendon organ) এবং অস্থিসন্ধিতে অবস্থিত তন্তুময় ঠুলি (fibrous capsule)। পেশী মাকুযন্ত্র পেশীর দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন সম্পর্কিত, এবং গলগি কন্ডরা অবয়ব ও তন্তুময় ঠুলি পেশীর টানের ও অস্থিসন্ধির কোণের পরিবর্তন সম্পর্কিত তথ্য কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরণ করে। যা সেখানে প্রক্রিয়াজাত হয়। আবার; এই পেশী মাকুযন্ত্রই ফুসফুস, পাকস্থলী কিম্বা অন্ত্রের (intestine) মতো অভ্যন্তরস্থ অঙ্গের পেশীতে অবস্থান করে পীড়ন (stress) গ্রাহক রূপে কাজ করে।

ইতোপূর্বে পরিচিত ইন্দ্রিয়ের আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও; ইন্দ্রিয় কী, জানা ৫টি ইন্দ্রিয়, এবং পাশাপাশি ৫টি স্বল্প পরিচিত ইন্দ্রিয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে অপ্রচলিত কয়েকটি ইন্দ্রিয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

১৬. ভারসাম্যেন্দ্রিয় (Equilibrioceptor) 

এই ইন্দ্রিয়টিও অত্যন্ত মজার। এটি মানুষের ভারসাম্য অটুট রাখতে সাহায্য করে। সাধারণত; মানুষের ত্বরণ ও দিক পরিবর্তনকে সনাক্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে তার তথ্য প্রেরণের মাধ্যমে এটির কাজ সম্পন্ন হয়। এই ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই মানুষ মাধ্যাকর্ষণের অনুভূতি লাভ করে। এই ইন্দ্রিয়ের সংজ্ঞাবহ ব্যবস্থার নাম তরলপূর্ণ কায়াস্থিতি ব্যবস্থা (fluid filled vestibular system)। যা মানুষের অন্তঃকর্ণে অবস্থিত। সত্যিকারের ভারসাম্য রক্ষায় এবং চলমান অবস্থায় কোনো বস্তুর প্রতি দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত রাখতে এই ইন্দ্রিয়টি দর্শনেন্দ্রিয় ও আত্মেন্দ্রিয়ের সাথে একাত্মভাবে কাজ করে। কায়াস্থিতি ব্যবস্থা মূলত ভিন্ন ভিন্ন অক্ষে সজ্জিত তিনটি তরলপূর্ণ অর্ধচন্দ্রাকৃতি নালীর (semicircular canal) সম্মিলন (converge) এবং তাদের মধ্যস্থিত ওটোলিথ অঙ্গ (otolith organ) নিয়ে গঠিত। এই নালী তিনটিকে বলা হয় সম্মুখ নালী (anterior canal), পশ্চাৎ নালী (posterior canal) ও অনুভূমিক নালী (horizontal canal)। আর তরলটিকে বলা হয় অন্তর্মেদক (endolymph)।

ভারসাম্যেন্দ্রিয়ের কাজ (Jobs of equilibrioceptor)

এর কাজ দেহের ভারসাম্য বজায় রাখা। এর কৃপাতেই মানুষ হাঁটা বা দৌড়ানোর সময়ে পড়ে না।

কর্ণে তরলপূর্ণ কায়াস্থিতি ব্যবস্থার অবস্থান (বামে) ও তার গঠন (ডানে)

১৭. রসায়নেন্দ্রিয় (Chemoceptor) 

মূলত রসায়নেন্দ্রিয় কিছু সংজ্ঞাবহ গ্রাহক যেগুলো রাসায়নিক সঙ্কেতকে ক্রিয়া বিভবে (action potential) পরিবর্তন (transduction) করতে পারে। এই ইন্দ্রিয়ের একটি নির্দিষ্ট গ্রাহক পরিবেশের একটি নির্দিষ্ট (বা নির্দিষ্ট গ্রুপের) রাসায়নিক পদার্থের উদ্দীপনা সনাক্ত করতে সক্ষম। প্রকৃতপক্ষে; ঘ্রাণেন্দ্রিয় এবং স্বাদেন্দ্রিয়ের গ্রাহকগুলোই হচ্ছে প্রধান দুই শ্রেণীর রসায়নেন্দ্রিয়। তবে; এছাড়াও মানুষের দেহের অভ্যন্তরীণ কিছু সংজ্ঞাবহ নিউরন রাসায়নিক সঙ্কেতকে ক্রিয়া বিভবে পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ু তন্ত্রের মেডুলা (medulla) অঞ্চলকে নির্দেশ প্রদান (trigger) করে। মূলত যেটি রক্তবাহিত গ্রন্থিরস (hormone), ঔষধ, লবণ, কার্বন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদির পরিমাণ শনাক্তকরণে নিয়োজিত। বমি প্রতিবর্তী ক্রিয়ার (vomiting reflex) সাথেও রসায়নেন্দ্রিয় জড়িত।

মানব শরীরে এক ধরনের রসায়নেন্দ্রিয়ের অবস্থান


১৮. চৌম্বকেন্দ্রিয় (Magnetoceptor) 

এটি এমন একটি সংজ্ঞা (sense) যেটি কোনো জীবকে চৌম্বকক্ষেত্র সনাক্তকরণের ক্ষমতা দান করে যা দিক, উচ্চতা, ও অবস্থান নির্ণয়ের কাজে লাগে। আসলেই এই ইন্দ্রিয়টি মানুষের আছে কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। ক্রিপ্টোক্রোম (cryptochrome) নামের একটি প্রাচীন প্রোটিনের ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ প্রায় সকল প্রাণী শাখায় বিদ্যমান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যার মূল কাজ দেহের দৈনন্দিন ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু পাখিসহ আরো কিছু প্রাণীর চোখে এই প্রোটিনের উপস্থিতির কারনেই তারা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দেখতে পায় (কিছু প্রাণী দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারে); যেমন; হোমিং কবুতর (Columba livia domestica), ড্রসোফিলা মাছি (Drosophila melanogaster), বড় বাদামী বাদুড় (Eptesicus fuscus),  সমুদ্র স্লাগ (Tochuina tetraquetra), স্বচ্ছ গোলকৃমি (Caenorhabditis elegans) ইত্যাদি। আর এর মাধ্যমেই পাখিরা অনেক উঁচুতে থেকেও (নিচে ভালোমত রাস্তা না দেখেও) ঠিকঠাক চলাফেরা করতে পারে।

মানুষের চোখেও ক্রাই-১ (CRY-1) ও ক্রাই-২ (CRY-2) নামে ক্রিপ্টোক্রোমের দুইটি সংস্করণ রয়েছে। যেগুলো মানুষের দেহঘড়ি (body clock) নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। কিন্তু এগুলো দিয়ে মানুষ আদৌ চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করতে পারে কিনা? না পারলে কেনো পারে না তা এখনো গবেষণার বিষয়। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে; গবেষণায় দেখা গেছে যে; মানুষের ক্রাই-২ প্রোটিন সৃষ্টির জিন (gene) ত্রুটিপূর্ণ জিন সম্বলিত ড্রসোফিলা মাছিতে (Drosophila melanogaster) প্রবেশ করালে তাদের চৌম্বকক্ষেত্র দেখার ক্ষমতা সফলভাবে পুনরোদ্ধার হয়! আবার; কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন যে; মানুষের কিছুটা হলেও চৌম্বকক্ষেত্রের অনুভূতি রয়েছে। তবে; এর ক্রিয়াকৌশল এখনো পুরোপুরি জানা যায় নি; তবে; তাঁরা ধারণা করেন যে; এজন্য দায়ী মানুষের নাসারন্ধ্রে সঞ্চিত ফেরিক লৌহ (ferric iron)। যার শক্তিশালী চৌম্বকধর্ম (magnetism) রয়েছে।

মানব চোখে ক্রিপ্টোক্রোমের অবস্থান

১৯. সময়েন্দ্রিয় (Chronoceptor) 

এখনো সময়েন্দ্রিয় বিতর্কের বিষয়। তবুও বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্যও জানা গেছে। মানুষ কিভাবে সময়ের অনুভূতি লাভ করে এখনো তার কোনো একক কৌশল পাওয়া যায় নি। তবে; সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের যে যথাযথ সময়ের অনুভূতি আছে তা সর্বজন স্বীকৃত। মানুষ সময়ের অনুভূতি কোনো প্রান্তীয় গ্রাহকের পরিবর্তে সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমেই অনুভব করতে পারে। যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের আলাদা আলাদা অঞ্চলের আলাদা আলাদা কার্যসম্পাদনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়; অঞ্চলগুলোর মধ্যে সেরেব্রাল কর্টেক্স (cerebral cortex), সেরেবেলাম (cerebellum) ও ভিত্তিগত গ্যাংলিয়া (basal ganglia) উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে যে; কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কিছু অঞ্চল সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে (explicit timing) নিয়োজিত (যেখানে বর্তমানের কোনো ঘটনার অন্তর্গত সময়কাল তা অতিবাহনের অভিজ্ঞতাপূর্বক গণনা করা হয়)। অন্য অঞ্চলগুলো সূচিত সময় নির্ধারণে (implicit timing) কর্মরত (যেখানে ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার অন্তর্গত সময়কাল শুধুমাত্র অনুমানপূর্বক হিসাব করা হয়)। তবে; কিছু অঞ্চল রয়েছে যা উপরোক্ত দুধরনেরই সময় নির্ধারণে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীদের মতে; কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন ধরণের বিপুল সংখ্যক ঘড়ি ব্যবস্থা (clock system) রয়েছে। যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন হারে টিক-টিক করে (tick-tocking); যেমন; কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কিছু অংশ মিলিসেকেন্ডের গণনা কষে, কিছু অংশ যুগের গণনা অটুট রাখে।

উপরোক্ত ঘড়ি ব্যবস্থাগুলোর ফলাফলগুলোর একীভূতকরণের মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বহির্বিশ্বকে মানুষের নিকট ঠিকঠাক প্রতিফলিত করে। মানুষের যে সময়েন্দ্রিয় আছে তার দ্বারাই মানুষ সময়ের জ্ঞানলাভ করতে পারে। যার সময়েন্দ্রিয় ঠিকঠাক কাজ করে না; কেবল সেই বুঝতে পারে যে তার গুরুত্ব কতটুকু? একটি মজার বিষয় হচ্ছে যে; এই রকম ত্রুটিপূর্ণ সময় জ্ঞানের উদাহরণ কিন্তু কম নয়। এই ধরণের ত্রুটি (সাময়িক/ স্থায়ী) বয়স বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরণের ঔষধ, মাদকদ্রব্য, রোগ, আবেগ ইত্যাদির জন্য হতে পারে; উদাহরণস্বরূপ; যথাক্রমে স্টিমুলেন্ট, কোকেইন, সিজোফ্রেনিয়া ও ভয়। এই ধরনের ত্রুটির (সাময়িক) কারণেই একজন মারিহুয়ানা নেশাগ্রস্তের কাছে ২০ মিনিটকে ২ ঘণ্টার মতো লাগে। মানুষের কাছে সুখের সময়কে দ্রুত মনে হয়, কিংবা অনেকেই অফিসের কাজের/ একাডেমিক ক্লাসের সময়কে ধীরগতির বোধ করেন!

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে নিয়োজিত অঞ্চল (বামে) ও সূচিত সময় নির্ধারণে নিয়োজিত অঞ্চল (ডানে)


২০. খিদেন্দ্রিয় (Esurioceptor) 

খিদের বিপরীত শব্দ পরিতৃপ্তি (satiety), যেমন খিদে লাগলে খাওয়ার ইচ্ছা জাগে; তেমনি পরিতৃপ্তির ফলে খাওয়ার ইচ্ছে চলে যায়। এই খিদে ও পরিতৃপ্তি নিয়ন্ত্রণে দুইটি গ্রন্থিরস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যাদের নাম যথাক্রমে ঘ্রেলিন (ghrelin) ও লেপটিন (leptin); ঘ্রেলিনকে বলা হয় খিদে গ্রন্থিরস এবং লেপটিনকে পরিতৃপ্তি গ্রন্থিরস। এই ঘ্রেলিন ও লেপটিনের তারতম্যের ওপরেই মানুষের খিদে লাগা বা না লাগা নির্ভর করে। সংক্ষেপে ব্যপারটা অনেকটা এরকম যে; যখন মানুষ খায়, তখন মানুষের দেহে উৎপন্ন শক্তি চর্বিকোষ (adipocytes) রূপে সঞ্চিত হয়। মানুষ খেতে থাকলে সঞ্চিত চর্বিকোষগুলোর সংখ্যায বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধি একটি মাত্রা পার হওয়ার পর; তারা লেপটিন নিঃসৃত করে। এই লেপটিন রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাসে (hypothalamus) অবস্থিত  আর্কুয়েটনিউক্লিয়াসের (arcuate nucleus) লেপটিন-গ্রাহকে যুক্ত হয়। অতঃপর; তা শক্তির ভারসাম্য (energy homeostasis) নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিতৃপ্তির উদ্রেক করে।

উল্লেখ্য যে এই আর্কুয়েট নিউক্লিয়াস হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মেডিওবেসাল (mediobasal) হাইপোথ্যালামাসের নির্দিষ্ট একগুচ্ছ নিউরন। কয়েক ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে রক্তে লেপটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় ও ঘ্রেলিন নিঃসৃত হয়। যারফলে; মানুষের খিদে পায়। এই লেপটিনের লেপটিন-গ্রাহকে যুক্ত হওয়ার হার কোনো ত্রুটির কারণে হ্রাস পেলে শরীরে যথেষ্ট চর্বিকোষ সঞ্চিত থাকার পরও মানুষের ক্রমাগত খিদে পাবে এবং মানুষ দিন দিন স্থূলতর হতে থাকবে!

এবার দেখি ঘ্রেলিন কী করে। যখন লেপটিনের কারণে মানুষ খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং মানুষের পাকস্থলীর খাদ্যও পরিপাক হয়ে পাকস্থলী শূন্য (empty) হয়ে যায়, তখন পরিপাকতন্ত্রের ঘ্রেলিনার্জিক কোষগুলো (ghrelinergic cells) ঘ্রেলিন নিসৃত করে ও মানুষের খিদে পায়। অন্যদিকে খাদ্য গ্রহণের ফলে পাকস্থলী প্রসারিত (stretched) হলে ঘ্রেলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। ঘ্রেলিন-গ্রাহকও লেপটিন-গ্রাহকের মতোই ঐ আর্কুয়েট নিউক্লিয়াসেই অবস্থিত। ঘ্রেলিন তার গ্রাহকের সাথে যুক্ত হয়ে শুধু খিদেরই উদ্রেক করে না, সাথে পরিপাক অম্ল ক্ষরণ (gastric acid secretion) ও পরিপাকতন্ত্রের নড়াচড়া (gastrointestinal motility) বৃদ্ধি করে। যা খাদ্যকে অন্ত্রে পরিশোষণের উপযুক্ত করতে সাহায্য করে। ঘ্রেলিন যদি কোনো ত্রুটির কারণে অধিক নিঃসৃত হয়; তবে লেপটিন তার গ্রাহকে যুক্ত স্বল্প হওয়ার ত্রুটির মতো এক্ষেত্রেও শরীরে যথেষ্ট চর্বিকোষ সঞ্চিত থাকা পরও ক্রমাগত খিদে পাবে। যারফলে; মানুষের দেহ দিন দিন স্থূলতর হতে থাকবে। আর কোনো ধরণের ত্রুটির কারণে এই দুই ঘটনার উল্টো ঘটলে মানুষের শরীরে খাদ্যের প্রয়োজন থাকার পরও সামান্য সামান্য খিদে পাবে। মানুষ দিন দিন শীর্ণতর হতে থাকবে! উপরোক্ত আলোচনায় লক্ষণীয় যে ঘ্রেলিন ও লেপটিন এখানে প্রাণরাসায়নিক সংবাদ বাহক (biochemical messenger)। আর এখানে খিদেন্দ্রিয় রূপে মূলত হাইপোথ্যালামাসের আর্কুয়েট নিউক্লিয়াসে অবস্থিত লেপটিন ও ঘ্রেলিন গ্রাহকগুলোই বিবেচিত।

খিদে ও পরিতৃপ্তি নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

২১. তৃষ্ণেন্দ্রিয় (Osmoceptor) 

মানুষের শরীরে জলের পরিমাণ হ্রাস পেলে তৃষ্ণা পায় এবং তার সাথে মূত্র ত্যাগের পরিমাণও হ্রাস পায়। তবে মূত্রের ঘনত্ব বেশি হয়। মানুষের শরীরে তরলের ঘাটতি হলে দেহাভ্যন্তরের তরলগুলোর (রক্ত, কোষমধ্যস্থ তরল, আন্তঃকোষীয় তরল ইত্যাদি) ঘনত্ব বেড়ে যায় ও আয়তন হ্রাস পায়। এবং দ্রবের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে রক্ত পরিবহন ব্যবস্থায় (systemic) অভিস্রবণিক চাপের তারতম্য (tonicity) অন্ত-অভিস্রবণিক (hypotonic) হয়। এই পরিবর্তনগুলো সনাক্তকরণের মাধ্যমেই মানুষের মস্তিষ্কে তৃষ্ণার অনুভূতি জাগে ও সামান্য মূত্র ত্যাগের সঙ্কেত দেয়। অল্প মূত্র ত্যাগের জন্য একটি প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যার নাম আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন (arginine vasopressin); এটি নিঃসৃত হয় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত পশ্চাৎ পিটুইটারি (posterior pituitary) গ্রন্থি থেকে। এবং এটি বৃক্ককে (kidney) নিয়ন্ত্রণ করে অল্প পরিমাণে কিন্তু ঘন মূত্র উৎপাদন করতে। কিন্তু মানুষের শরীর কিভাবে বুঝে যে দেহাভ্যন্তরের তরলের ঘনত্ব, আয়তন, অভিস্রবণিক চাপ ইত্যাদির পরিবর্তন হয়েছে?

এখানেই আসে তৃষ্ণেন্দ্রিয়ের কথা। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে; এসব পরিবর্তন শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত অর্গানাম ভাস্কুলোসাম অব দ্যা ল্যামিনা টার্মিনালিস (organum vasculosum of the lamina terminalis) বা সংক্ষেপে ওভিএলটি (OVLT) এবং সাবফরনিকাল অঙ্গ (subfornical organ) বা সংক্ষেপে এসএফও (SFO) নামের গহ্বর পরিবৃত্ত অঙ্গ (circumventricular organ) দুটিই প্রধান গ্রাহক অঙ্গ রূপে কাজ করে। এরাই দেহাভ্যন্তরের তরলের উপরোক্ত পরিবর্তনগুলো রক্ত পরিবহন ব্যবস্থা হতে শনাক্ত করে। এবং এরাই মানুষের তৃষ্ণার অনূভুতি জাগায় ও সাথে আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন নিঃসরণের সঙ্কেত দেয়। সুতরাং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে; এই গ্রাহক অঙ্গ দুটিই প্রধানত মানুষের তৃষ্ণেন্দ্রিয়ের কাজ করে। তবে; আলাদাভাবে তৃষ্ণার সঙ্কেত ও আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন নিঃসরণের সঙ্কেতের জন্য এদের মধ্যস্থিত একই ধরনের নাকি ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহক দায়ী তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ওভিওএলটি ও এসএফও এর অবস্থান (উপরে) এবং তৃষ্ণা ও আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিনের জন্য একীভূত ও আলাদা গ্রাহকের ধারণা (নিচে)

 

২২. বর্জ্যনিষ্কাশনেন্দ্রিয় (Excretioceptor) 

সময় মতো যে মানুষের মল-মূত্র ত্যাগ করার ইচ্ছা জাগে, তার জন্যেও আলাদা ইন্দ্রিয় রয়েছে। অন্যথায় মানুষের মল-মূত্র ত্যাগ করার ইচ্ছা জাগতো না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে; মল-মূত্র ত্যাগ বন্ধ হয়ে যেতো। বরং মানুষের মল-মূত্র ত্যাগ করার ইচ্ছার অনুভূতি হওয়া ছাড়াই এসব কার্য সম্পাদন হতো! মল ত্যাগের অনুভূতি জাগানোর জন্য দায়ী গ্রাহক ও মূত্র ত্যাগের অনুভূতি জাগানোর গ্রাহক আলাদা আলাদা। তবুও; তাদের একই ইন্দ্রিয় রূপে উপস্থাপনের কারণ-দুটির গ্রাহকই অবস্থানগত দিক থেকে ভিন্ন। তবে; গঠনগত ও কার্যপদ্ধতির দিক থেকে প্রায় একই। মূলত এরা প্রসারণ (stretch) গ্রাহক। এছাড়াও; গবেষণায় দেখা গেছে; মূত্র ত্যাগ ও মল ত্যাগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। যেমন; মূত্র নিস্কাশনের ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত স্ফিংটার পেশী (urethral sphincter) এবং মল নিষ্কাশনের ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত স্ফিংটার পেশী (anal sphincter) শুধুমাত্র একই সাথেই সংকুচিত হতে পারে এবং মূত্র নিষ্কাশনের সময় একসাথে দুটিই শিথিল (relax) থাকে।

মূত্রনিষ্কাশন  (Urinary exhaust)

যখন মূত্রথলি (urinary bladder) অপূর্ণ থাকে তখন তার মধ্যে চাপ সামান্য থাকে। মূত্রথলির মসৃণ পেশীর কিছু নিজস্ব সংকোচণজনিত কর্মকাণ্ড (contractile activity) থাকে। কিন্তু যখন মূত্রথলি প্রায় পূর্ণ হয়ে যায় তখন তার ভেতর উচ্চচাপের উদ্ভবের ফলে পেশীগুলোর স্বাভাবিক সংকোচন কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটে। যার কারণে মূত্রথলির দেয়ালে অবস্থিত প্রসারণ গ্রাহকে ক্রিয়া বিভবের (action potential) উৎপত্তি হয়। যা প্রসারণ গ্রাহক হতে সংজ্ঞাবহ নিউরনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছায় এবং মানুষের মূত্র ত্যাগের ইচ্ছা জাগ্রত করে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের যে অঞ্চলগুলো মূত্র ত্যাগের সাথে জড়িত তারমধ্যে পন্টাইন মাইকচুরিশান কেন্দ্র (potine micturition center), পেরিএকুইডাক্টাল গ্রে (periaqueductal gray), এবং সেরেব্রাল কর্টেক্স (cerebral cortex) অন্যতম।

মলনিষ্কাশন  (Stool exhaust)

মল নিষ্কাশনের অনুভূতির উদ্রেককরণ পদ্ধতি মূত্র নিষ্কাশনের অনুভূতি জাগানোর পদ্ধতির প্রায় অনুরূপ। যখন; মলাধার (rectal ampulla) অপূর্ণ থাকে তখন তারমধ্যে চাপ কম থাকে। কিন্তু যখন মলাধার প্রায় পূর্ণ হয়ে যায় তখন তার ভেতর উচ্চচাপের উদ্ভবের ফলে পেশীগুলোর স্বাভাবিক সংকোচন কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটে। যারফলে; মূত্রথলির দেয়ালে অবস্থিত প্রসারণ গ্রাহকে ক্রিয়া বিভবের উৎপত্তিহয়। যা প্রসারণ গ্রাহক হতে সংজ্ঞাবহ নিউরনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছায় এবং মানুষের মল ত্যাগের ইচ্ছা হয়।

মূত্রনিষ্কাশনের স্নায়বিক ব্যবস্থা (বামে) ও মলনিষ্কাশনের স্নায়বিক ব্যবস্থা (ডানে)

এই ছিল এখন পর্যন্ত গবেষণাপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য মানব ইন্দ্রিয়সমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। এখন মানব ইন্দ্রিয় নিয়ে মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ইন্দ্রিয় সম্পর্কে মানুষের ভাবনার সীমাবদ্ধতাসমূহ

(Limitations of human thinking about senses)

বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই যাকিছু বর্তমানে প্রচলিত; বা চোখের সামনে যাকিছুর উদাহরণ পাওয়া যায়; তার বাইরে জানতেই চাই না; আর ভাবনা তো দূরের কথা! এ কারণে মানুষের জ্ঞান ও চিন্তাভাবনা সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। ইন্দ্রিয় সম্পর্কে চিন্তাভাবনাও এই প্রভাবমুক্ত নয়। ইন্দ্রিয় সম্পর্কে সেরকমই কিছু চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও সেসব বিষয়ে ভাবনা লেখাটির এই অংশের আলোচ্য বিষয়।

. সীমাবদ্ধতা (“মানুষ বর্তমান ইন্দ্রিয়সমূহকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপে মনে করে।”)

মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যাকিছু অনুভব করে তাতে মনে হয় যেন ওটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ অনুভূতি। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে কোনো একটি উদ্দীপনাকে মানুষ যতটুকু পরিসরে অনুভব করতে পারে, তার চেয়ে অধিক কিছু সে অনুভব করতে পারে না। তাই; তা নিয়ে কোনো ধারণাও মানুষের মাথায় আসে না। যদি না মানুষ কৌতূহলী হন। যেমন; ধরা যায় মানুষ আলোর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিসরই (৩৯০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার) দেখতে পায়। যাকে বলা হয় দৃশ্যমান আলোক বর্ণালী (visible light spectrum)। কিন্তু মানুষের চোখ অবলোহিত (infra-red), পোলারিত (polarized), বা অতি বেগুনি (ultra violet) রশ্মি দেখতে পায় না। আবার; মানুষের জিহ্বার স্বাদকোরকে মূলত মিষ্টি, নোনতা, টক, তেতো, এবং উমামি এই ৫ ধরনের স্বাদের গ্রাহকই রয়েছে, বাকি স্বাদগুলো এসব স্বাদের সমন্বয়েই অনুভূত হয়। এরকম কয়ধরনের স্বাদগ্রাহক হওয়া সম্ভব তা কেউ বলতে পারে না; হয়তো ৫০ বা ৫০০০! অর্থাৎ; মানুষ বর্তমানে যে খাবারকে অনেক সুস্বাদু মনে করে; আরো মৌলিক স্বাদগ্রাহক থাকলে তা হয়তো আরো সুস্বাদু মনে হতো। অথবা; হয়তো ওটাকে আর সুস্বাদুই মনে হতো না; ঐ খাবারেরই কিছু উপাদানের মন্দ স্বাদের (যেগুলো আগে পেতেন না, তার) সাথে ভালোগুলোর সাংঘর্ষিক অনুভূতির কারণে।

. সীমাবদ্ধতা (“মানুষ তার জানা ইন্দ্রিয়গুলোর বাইরে অন্যগুলোর ব্যাপারে জানতেও চাই না, ভাবেও না।”)

মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহের থেকে ভিন্ন ধরনের ইন্দ্রিয় সম্পর্কে মানুষ ভাবতে পারে না। যা মানুষ উপলব্ধি করতে পারে না, তা নিয়ে ভাবা জটিল কাজ। যেমন; মানুষ ত্রিমাত্রিক (সময়সহ চতুর্মাত্রিক) জগতের জীব। তাই; এর চেয়ে ওপরের মাত্রা কেমন সেই সম্পর্কে ভাবা মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য। তবে; মানুষের চেয়ে ভিন্ন ইন্দ্রিয়ের ধারণা অন্তত তার চেয়ে সহজ। আর মানুষের চেয়ে ভিন্ন ইন্দ্রিয় বর্তমানেই বিভিন্ন জীবে পাওয়া যায়! কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো; বাদুড় ও সিটেশানদের (cetacean) শব্দতরঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে গতিপথের বাধার অবস্থান নির্ণয় (echolocation), হাঙ্গর ও শুশুকের (dolphin) বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন শনাক্তকরণ (electroception), মাছ ও কিছু উভচরের জলের প্রবাহ ব্যবস্থা অনুধাবন (current detetction), মৌমাছি ও কাটলফিসের (cuttlefish) পোলারিত আলো শনাক্তকরণের সাহায্যে নিজেদের দিক সজ্জাকরণ (polarized light direction), মাকড়শার বহিঃকাঠামোর কিছু গ্রাহকের মাধ্যমে তার ওপর প্রযুক্ত বল ও কম্পনের তথ্য গ্রহণ (slit sense) ইত্যাদি।

. সীমাবদ্ধতা (“অন্য কোনো জীবের নির্দিষ্ট কোনো ইন্দ্রিয় মানুষের চেয়েও উন্নত হতে পারে। এটা সাধারণ মানুষ মনে করে না।”)

মানুষের এই ধারণার মূল কারণ নিজেদেরকে জীবজগতের সেরা জীব মনে করা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ভাবে না যে; ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জীব আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যে সেরা হতে পারে (সেটাও মানুষের জানা তথ্যের উন্নয়ন ও কালের সাথে পরিবর্তনশীল)। তবে প্রাকৃতিক নির্বাচনে (natural selection) ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাপেক্ষে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রাধান্য পায়। এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয় যে; বিবর্তন একটি এলোমেলো (random) প্রক্রিয়া। তাই; একটি নির্দিষ্ট জীব একই সাথে সব বৈশিষ্ট্যে সেরা হতে পারে না। মানুষের চেয়ে উন্নত ইন্দ্রিয়সম্পন্ন প্রাণীও অনেক পাওয়া যাবে। যেমন; গ্রিজলি ভালুক (grizzly bear) সর্বোচ্চ ১৮ মাইল দূরে থেকে ঘ্রাণ নিতে সক্ষম! আবার; ম্যান্টিস চিংড়ি (mantis shrimp) দৃশ্যমান আলোর সাথে সাথে পোলারিত আলো, অবলোহিত রশ্মি, ও অতি বেগুনি রশ্মিও দেখতে পায়! অন্যদিকে; এক প্রজাতির মথ (the greater wax moth) সর্বোচ্চ ৩০০ কিলোহার্টজ কম্পাঙ্ক পর্যন্ত তরঙ্গ শুনতে পায়, যেখানে মানুষের সর্বোচ্চ শ্রবণ সীমা ২০ কিলোহার্টজ মাত্র!

. সীমাবদ্ধতা (“ভিন্ন জীবে একই ধরনের ইন্দ্রিয়ের ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে না।”)

অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে; অন্য প্রাণীরাও চোখ দিয়ে দেখবে, কান দিয়ে শুনবে, কিম্বা জিহ্বা দিয়ে স্বাদ নিবে; আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সুদীর্ঘ সময়কে বিবেচনায় নিলে, কোন ইন্দ্রিয় কোথায় হবে এটাও এলোমেলো পরিব্যপ্তির (random mutation) মাধ্যমে উদ্ভব। ইন্দ্রিয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। তাই; কোনো নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত ইন্দ্রিয়ের সার্বজনীন সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা সুনির্দিষ্ট অবয়ব কোনোটাই থাকা সম্ভব নয়। এই ব্যাপারেও চমকপ্রদ উদাহরণ বর্তমানকালের পৃথিবীতেই বিদ্যমান আছে। যেমন; পোকামাকড়েরা (insects) তাদের শুঁড়ে (antenna) অবস্থিত বিশেষ সংবেদী কোষের মাধ্যমে এবং সাপেরা জিহ্বা ও ভোমেরোন্যাসাল অঙ্গের (vomeronasal organ) সমন্বয়ে ঘ্রাণের অনুভূতি নিতে পারে। মাছি ও প্রজাপতিদের স্বাদেন্দ্রিয় রয়েছে তাদের পায়ে। যারফলে; তারা যেটাতেই বসে সেটারই স্বাদ পায়; আর ক্যাটফিশের পুরো ত্বকই স্বাদেন্দ্রিয়ের কাজ করে। যারফলে; জলে তাদের আশেপাশে যাকিছুই মিশ্রিত থাকে সেটারই স্বাদ নিতে পারে! আবার; ব্রিটল তারামাছের (brittle star) পুরো ত্বকই চোখ রূপে কাজ করে! অন্যদিকে; ভ্যাম্পায়ার বাদুড়েরা নাকের মাধ্যমে অবলোহিত রশ্মি দেখতে পায়।

. সীমাবদ্ধতা (“একাধিক ইন্দ্রিয় মিলে কখনো সমন্বিতভাবে একটি ইন্দ্রিয়ের মতো আচরণ করতে পারে না।”)

সহজ কথায় ব্যাপারটা এমন যে; ধরা যায় কেউ নির্দিষ্ট পরিসরের শব্দ তরঙ্গের শ্রবণানুভূতির সাথে সাথে একটি নির্দিষ্ট স্বাদ অনুভব করলো; এভাবে কি একাধিক ইন্দ্রিয় সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে না? যেমন; ১০০ থেকে ২৫০ হার্টজ কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গের জন্য কমলা লেবুর মতো স্বাদ, আবার ২৫১ থেকে ৩৭০ এর জন্য তেঁতুলের মতো স্বাদ। আবার; এমনও হতে পারে যে; স্বাদের সাথে রঙ দর্শনের সমন্বয়কৃত ইন্দ্রিয় ব্যবস্থা; ধরা যায় মিষ্টি কোনকিছুর স্বাদ নিলে সাথে স্বচ্ছ হলুদ রঙের অনুভূতি, ঝালের জন্য স্বচ্ছ বেগুনী, টকের জন্য স্বচ্ছ নীল ইত্যাদি। মজার বিষয় হলো; যে সিন্যাস্থেসিয়া (synesthesia) নামক কেন্দ্রীয় স্নায়ু ব্যবস্থার এক শ্রেণীর ত্রুটির জন্য এই ধরণের অনুভূতির ব্যাপার বর্তমানেই মানুষের মধ্যেই ঘটে! যেমন; শ্রবণের সাথে রঙের সমন্বয় (chromesthesia), শ্রবণের সাথে দেহের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গে স্পর্শের অনুভূতির সমন্বয় (auditory tactile synesthesia), নির্দিষ্ট শব্দ শ্রবণের সাথে নির্দিষ্ট স্বাদের সমন্বয় (Lexical-gustatory synesthesia) ইত্যাদি; এগুলো সবই কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ধরণের সিন্যাস্থেসিয়া।

. সীমাবদ্ধতা (“নতুন কোনো ইন্দ্রিয়ের উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন কথা ভুল।”)

মানুষ ভবিষ্যতের নতুন কোনো ইন্দ্রিয় সম্পর্কে তেমন চিন্তা করে না। তবে; বাস্তবে সম্ভাবনার নিরিখে তাঁর সংখ্যা অগণিত! কারণ; সহজ; দীর্ঘকাল ধরে জিনের সেই এলোমেলো পরিব্যপ্তি ও তার থেকে অসংখ্য প্রকারণের সম্ভাবনা, সাথে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে প্রাকৃতিক নির্বাচন। মানুষ ভবিষ্যতের সেসব ইন্দ্রিয় সম্পর্কে জানতে পারে না। তবে; অগণিত সম্ভাবনা থেকে কিছু নিজের মতো কল্পনা করে নিলে ক্ষতি কী? হয়তো একসময় এমন কোনো ইন্দ্রিয় গঠিত হবে; যা দিয়ে আরেকজনের সুখ-দুঃখের অনুভূতি অনুভূত হবে; বা কোনোটি দিয়ে বুঝা যাবে পদার্থের আণবিক গঠন, কোনো ইন্দ্রিয় হয়তো মাপতে পারবে অম্লত্ব/ক্ষারকত্ব, কিংবা কোনোটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে কোনো কিছুর উপস্থিতি বর্তমান ইন্দ্রিয়সমূহের পদ্ধতি ভিন্ন অন্য কোনো কৌশলে শনাক্ত করতে পারবে। সত্যি কথা হলো মানুষ যতই চেষ্টা করুক না কেন, সুদূর ভবিষ্যতের ইন্দ্রিয়গুলো কীরকম হবে; তা বেশিরভাগই মানুষের চিন্তায় আসবে না। কারণ যা নেই বা যার জ্ঞান নেই; তা চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে; যদি জীবজগতে স্বাদেন্দ্রিয় না থাকত; তাহলে কি তার কথা মানুষ কল্পনা করতে পারতো? তবে এটা সত্য যে; মানুষের সাধ্যমত কল্পনা করতে থাকলেই কল্পনার পরিসর দিন দিন বিস্তৃত হতে থাকে।

উপসংহার (Conclusion)

কালির আঁচড় দিতে দিতে প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ধারণাটি নিশ্চয়ই আর আগের মতো নেই। সুতরাং; প্রচলিত অর্থে এখন থেকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় শব্দটিও আর ব্যবহার করা উচিত হবে না। যদি অপরিচিত কোনো অনুভূতির জন্য দায়ী ইন্দ্রিয়কে সম্বোধন করতেই হয়, তবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এর পরিবর্তে অতীন্দ্রিয় (extra-sense) শব্দটি ব্যবহার করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আর প্রত্যেকের নিজের ভাবনার পরিসরকে দিন দিন আরো বিস্তৃত করতে হবে। আইনস্টাইন বলেছিলেন কল্পনা জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। তবে; তিনি যৌক্তিক কল্পনার কথাই বলেছিলেন। তাই মনে হয়, নিশ্চয় তিনি হাঁসজারু বা বকচ্ছপের মতো যা খুশি কল্পনা করে বিশ্বাস করতে বলেন নি। আর এখানে ইন্দ্রিয় নিয়ে চিন্তার যেসব সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; তার বাইরে যদি ইন্দ্রিয়ের চিন্তায় ভিন্ন কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা কারো মাথায় আসে; তবে তা উল্লেখ করলে খুশি হবো, সাথে তার বিপরীতে সে বিষয়ে মানুষের চিন্তাগুলোও ব্যক্ত করতে পারে। বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক সবাই, অজ্ঞানতার অন্ধকার দূরীভূত হোক। সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক কুণ্ঠাগত মনের বিকাশ হোক।

বিঃ দ্রঃ আলোচনার সুবিধার্থে পুরো সিরিজটিতে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বলতে কখনো মস্তিষ্ক, কখনো মেরুরজ্জু, আবার কখনো একসাথে দুটোকেই বুঝানো হয়েছে। তবে; জেনে রাখা ভালো যে মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু মিলেই কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠিত।

বহিঃসংযোগ (External links)

1.    মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা

2.    প্রবন্ধ; প্রিয় ইন্দ্রিয়; বাবুল আবদুল গফুর; সামহোয়্যার ইন

3.    আলেক সাঁই; দেহপ্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার সহজ উপায়

তথ্যসূত্র (References)

(Theology's number formula of omniscient theologian lordship Bolon)

১ মূলক সংখ্যা সূত্র (Radical number formula)
"আত্মদর্শনের বিষয়বস্তুর পরিমাণ দ্বারা নতুন মূলক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়।"

রূপক সংখ্যা সূত্র (Metaphors number formula)

২ যোজক সূত্র (Adder formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে ভিন্ন ভিন্ন মূলক সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন যোজক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, গণিতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায় না।"

৩ গুণক সূত্র (Multiplier formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে এক বা একাধিক মূলক-সংখ্যার গুণফল দ্বারা নতুন গুণক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৪ স্থাপক সূত্র (Installer formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে; এক বা একাধিক মূলক সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে স্থাপন করে নতুন স্থাপক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৫ শূন্যক সূত্র (Zero formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন শূন্যক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

< উৎস
[] উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
() ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
> থেকে
√ ধাতু
=> দ্রষ্টব্য
 পদান্তর
:-) লিঙ্গান্তর
 অতএব
× গুণ
+ যোগ
- বিয়োগ
÷ ভাগ

Here, at PrepBootstrap, we offer a great, 70% rate for each seller, regardless of any restrictions, such as volume, date of entry, etc.
There are a number of reasons why you should join us:
  • A great 70% flat rate for your items.
  • Fast response/approval times. Many sites take weeks to process a theme or template. And if it gets rejected, there is another iteration. We have aliminated this, and made the process very fast. It only takes up to 72 hours for a template/theme to get reviewed.
  • We are not an exclusive marketplace. This means that you can sell your items on PrepBootstrap, as well as on any other marketplate, and thus increase your earning potential.

পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী

উপস্থ (শিশ্ন-যোনি) কানাই,(যোনি) কামরস (যৌনরস) বলাই (শিশ্ন) বৈতরণী (যোনিপথ) ভগ (যোনিমুখ) কাম (সঙ্গম) অজ্ঞতা অন্যায় অশান্তি অবিশ্বাসী
অর্ধদ্বার আগধড় উপহার আশ্রম ভৃগু (জরায়ুমুখ) স্ফীতাঙ্গ (স্তন) চন্দ্রচেতনা (যৌনোত্তেজনা) আশীর্বাদ আয়ু ইঙ্গিত ডান
চক্ষু জরায়ু জীবনীশক্তি দেহযন্ত্র উপাসক কিশোরী অতীতকাহিনী জন্ম জ্ঞান তীর্থযাত্রা দেহাংশ
দেহ নর নরদেহ নারী দুগ্ধ কৈশোরকাল উপমা ন্যায় পবিত্রতা পাঁচশতশ্বাস পুরুষ
নাসিকা পঞ্চবায়ু পঞ্চরস পরকিনী নারীদেহ গর্ভকাল গবেষণা প্রকৃতপথ প্রয়াণ বন্ধু বর্তমানজন্ম
পালনকর্তা প্রসাদ প্রেমিক বসন পাছধড় প্রথমপ্রহর চিন্তা বাম বিনয় বিশ্বাসী ব্যর্থতা
বিদ্যুৎ বৃদ্ধা মানুষ মুষ্ক বার্ধক্য মুমুর্ষুতা পুরুষত্ব ভালোবাসা মন মোটাশিরা যৌবন
রজ রজপট্টি রজস্বলা শুক্র মূত্র যৌবনকাল মনোযোগ রজকাল শত্রু শান্তি শুক্রপাত
শুক্রপাতকারী শ্বাস সন্তান সৃষ্টিকর্তা শুক্রধর শেষপ্রহর মূলনীতি সন্তানপালন সপ্তকর্ম স্বভাব হাজারশ্বাস
ADVERTISEMENT
error: Content is protected !!