চমৎকার

১২/০১. চমৎকার
Miracle (মিরাকল)/ ‘مُعْجِزَة’ (মু’জিযা)

ভূমিকা (Prolegomenon)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর উপমা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা উপমা। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা লৌকিকা। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা আলেয়া এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা অলৌকিককার্য

অভিধা (Appellation)
চমৎকার (বাপৌরূ)বি . বিস্ময়, আশ্চর্য, অদ্ভুত, অবাক ২. লৌকসত্তা, অবাককারী ঘটনা, অলৌকিকভাবে সৃষ্টি সত্তা, Miracle, Marvellous, ‘ﻤﻌﺠﺯﺓ’ মু’জিঝা বিণ অবিশ্বাস্য, চমকপ্রদ, বিস্ময়কর, সুন্দর, উত্তম ক্রিবিণ সুন্দরভাবে, সুষ্ঠুভাবে (প্র) . আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষামূলক রূপকথার ছোট ছোট কাহিনী ২. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত মূলক সত্তার রূপক নামে ঈশ্বরায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক ঈশ্বর, দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক দেবতা-দেবী ও মানবায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক মানুষ, জীবজন্তু, দৈত্য-দানব, গাছ ও অস্ত্র দ্বারা কাল্পনিকভাবে প্রদর্শিত অলৌকিক ঘটনাবলী. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত মূলক সত্তার রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্র দ্বারা নির্মিত মানবকল্যাণমূলক বা আত্মদর্শন বিষয়ক পৌরাণিক কাহিনী বিশেষ (শ্ববি) . উপমা, তুলনা, সাদৃশ্য, উদাহরণ ২. রূপক, ছদ্ম, কৃত্রিম, অপ্রকৃত (রূপ্রশ) ছোটকি, অদ্ভূতকাণ্ড, অলৌকিককার্য, অলৌকিক ঘটনাবলী, বিস্ময়কর ব্যাপার, অদ্ভূদ ব্যাপার (পাসং) কিরামত (ফা.ﻜﺭﺍﻤﺖ) (আসং) মু’জিযা (.ﻤﻌﺠﺯﺓ) (ইপ) মাজাযি (ﻤﺟﺎﺯﻯ), তাশবিহ (.ﺘﺸﺒﻴﻪ), মিসাল (.ﻤﺜﺎﻝ), ইসতেয়ারা (.ﺍﺴﺘﻌﺎﺮﺓ), কিনায়া (.ﻜﻨﺎﻴﻪ) (ইংপ) theurgy, likeness, comparison (দেপ্র) এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর উপমা পরিবারের বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা ও একটি পৌরাণিক রূপক সংস্কার বিশেষ (সংজ্ঞা) . সাধারণত; বিস্ময়কর ঘটনাবলীকে বাংলায় ‘চমৎকার বলা হয় ২. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু, ইন্দ্রিয়াদি, শক্তি ও অবস্থার রূপক নামে ঈশ্বরায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক ঈশ্বর, দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক দেবতা-দেবী ও মানবায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক মানুষ, জীবজন্তু, দৈত্য-দানব, গাছপালা ও অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা কাল্পনিকভাবে প্রদর্শিত আত্মদর্শন বিষয়ক মানবকল্যাণমূলক উপমা, অলৌকিক ঘটনাবলী, কল্পকাহিনী ও পৌরাণিক কাহিনীকে রূপকার্থে ‘চমৎকার বলা হয় (বাপৌছ) অলৌকিককার্য (বাপৌচা) আলেয়া (বাপৌউ) লৌকিকা (বাপৌরূ) চমৎকার (বাপৌমূ) উপমা।

চমৎকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of miracle)
১.   “দেখতে নদী মনমোহিনী- সাবধানে চালাও তরণী, কতজন খায় চুবানি- চমৎকার কাণ্ড কারবার, তের মাস জোয়ার ভাটায়- সাধুগণ পার হয়ে যায়, করে না মরণের ভয়- গুরুচাঁন যার কর্ণধার।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১৬)(মুখ; বুঝিনা দয়ালরে তোর মহিমা অপার, শূন্যেতে গড়িয়া নদী যাত্রী করো পারাপার”)
২.   “নীর আকারে তুমি নূরী, হলে ডিম্ব রূপে অবতারী, সাকারে সৃজন করলে ত্রিভুবন, আকারে চমৎকার ভাব দেখালে।” (পবিত্র লালন- ১৭৮)(মুখ; আল্লাহ কে বুঝে তোমার অপারলীলে, আপনি আল্লাহ ডাকো আল্লাহ বলে”)

চমৎকারের কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of miracle)
১.   “অগাধজলে ত্রিমণ্ডলে, দেখ সাঁই রূপ মহিমা, বলন কয় কিনার নাই, কী চমৎকার কারখানা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৮৮)।২.   “এ কোন চমৎকার লীলা, বিনা মেঘে মিষ্টিবারি, বায়ুর বেগে তাড়াতাড়ি, বরিষণ হয় দুই বেলা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৪২)।৩.   “কুয়াকারে কুয়া ঝরে, বাম অঙ্গ ঘর্ষণ করে, তাইতো; হলো মেঘের আকার, মেয়ের রক্ত- বীজে হয় শক্ত, ফকির লালন বলে লীলা চমৎকার।” (পবিত্র লালন- ৫৪/৪)।৪.   “কোন প্রেমে সে দিন দয়াময়, নারীর চরণ নিলেন মাথায়, একি লীলা চমৎকার– বুঝা হলো ভার, অধীন লালন তাই বলে।” (পবিত্র লালন- ২০৯/৩)।৫.   “গোঁসাইর লীলা চমৎকারা, বিষেতে অমৃত পোরা, অসাধ্যকে সাধ্য করা, ছুঁলে বিষ ওঠে ধেয়ে।” (পবিত্র লালন- ৯৮৭/২)।৬.   “গোপীর যেমন প্রেমাচারী, যাতে বাঁধা রয় বংশীধারী, লালন বলে সে প্রেমেরই, চমৎকার এ জগৎময়।” (পবিত্র লালন- ৯৬০/৪)।৭.   “গোরা হাল ছেড়ে বেহাল হয়েছে, আপনি মেতে জগৎ মাতিয়েছে, মরি হায় কী লীলে কলিকালে, বেদ-বিধি চমৎকারা।” (পবিত্র লালন- ৫০০/৩)।৮.   “তুই শিশু ছেলে আমার, মা হয়ে ভেদ পাই না তোর, লালন বলে শচীকুমার, জগৎ ফেলবে চমৎকারে।” (পবিত্র লালন- ৬৭২/৪)।৯.   “তুণ্ডে তুণ্ডে করল কার, সেকথাটি চমৎকার, সিরাজ সাঁইজি কয় লালন এবার, বুঝ জ্ঞান-দ্বারে।” (পবিত্র লালন- ৭৯০/৪)।১০. “দয়াল তোমার নামের তারিফ করি, সাধ্য কী আমার, তুমি মারলে মারতে পারো, তোমার লীলা অতি চমৎকার।” (পবিত্র লালন- ৫১২/১)।১১.  “দেখরে মন কী চমৎকার শূন্য-ঢেঁকি ধানভানায়, ধান দিলে তুষ রাখিয়া দানাটি খাই গড়ায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৪৫)।১২.  “দেহভাণ্ড কেমন চমৎকার, ভেবে অন্ত পাবে না তার, পঞ্চভূত একত্র করে, কী কীর্তি করে কারিগর।” (পবিত্র লালন- ৫৪৮/১)।১৩. “পেতে সে ধনের সন্ধান, সাধুগণ রয় ত্রস্তবান, উপাসনা করে ঐ রাতে- পেলে সে সাঁইয়ের দরশন, থাকে না জীবের মরণ, চমৎকার দেহতরীতে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৭০)।১৪. “মহাহুতাশন অগ্নি জ্বেলে, খলিলকে দিলে ফেলে, অগ্নিকে ফুলবাগিচা করলে, মহিমা তোমার কী চমৎকার।” (পবিত্র লালন- ৫১২/৩)।১৫. “রূপ-স্বরূপ চমৎকার লীলা আট প্রহরে চলে, হারায় মাণিক জন্মনালে সেই যমুনা শুকালে, বলন কয় দিন থাকতে- মিশে যাও গুরুর জাতে, এক জীবনে এ ধরাতে- পাবিরে স্বরূপ খনি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১৪)।১৬.  “সে প্রেমময়ের প্রেমটি, অতি চমৎকার, যে প্রেমে অধম পাপী হয় গো উদ্ধার।” (পবিত্র লালন- ৯৬৭/১)।১৭. “স্ত্রীলিঙ্গ পুংলিঙ্গ ভবে, নপুংসক না সম্ভবে, যে লিঙ্গ ব্রহ্মাণ্ড পরে, কী দিবে তুলনা তারে, রসিকজনা জানতে পারে, অরসিকে চমৎকারা।” (পবিত্র লালন- ৬০৩/২)

ভালো অর্থে চমৎকারপরিভাষাটির ব্যবহার  (Using the terminology Miracle sense for excellent)
১.   “যারে নিজ শক্তিতে গঠল নারায়ণ, আবার গুরু বলে ভজলেন তার চরণ, একি ব্যবহার- শুনতে চমৎকার, জীবের বুঝা ভার ভূমণ্ডলে।” (পবিত্র লালন- ২৪৪/২)
২.   “সপ্ততল পাতালে সাঁই নীরাকার ডিম্ব ছিল, আকাশের তাপ লইয়া সে আত্মপ্রকাশ করিল, কত শত জীবন খাইয়া- নিজকে গুপ্ত রাখিয়া, বিধাতা কী চমৎকার নাম ফুটাইল দয়াবান।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৯)
৩.   “সাঁইয়ের লীলা দেখে, লাগে চমৎকার, সুরাতে করল সৃষ্টি, সাকার কী সে নীর আকার।” (পবিত্র লালন- ৯৩৮/১)

চমৎকারের সংজ্ঞা (Definition of miracle)
সাধারণত; বিস্ময়কর ঘটনাবলীকে চমৎকার বলে।

চমৎকারের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theological definition of miracle)
১.   বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে, মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু, ইন্দ্রিয়াদি, শক্তি ও অবস্থাকে প্রকৃতির বিষয়বস্তু, শক্তি ও অবস্থার সাথে তুলনামূলক পৌরাণিক বর্ণনাকে উপমা বা রূপকার্থে চমৎকার বলে।
২.   বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে, পৌরাণিক ছোটকি, ছোটগল্প, কাহিনীকে চমৎকার বলে।
৩.   বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে, কোনো পৌরাণিক দেবতা বিষয়ে মানুষের মুখে মুখে গড়ে ওঠা অতিমানবীয় উপন্যাস, উপাখ্যান, কিংবদন্তি ও পৌরাণিক কাহিনীকে চমৎকার বলে। যেমন; মহাদেবের কাহিনী।

চমৎকারের প্রকারভেদ (Variations of miracle)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; চমৎকার তিন প্রকার। যথা; . সাধারণ চমৎকার ও . মহান চমৎকার ও . পৌরাণিক চমৎকার।

. সাধারণ চমৎকার  (Ordinary miracle)
১.   ভিত্তিহীন অমূলক ও অবাস্তব রূপে সাধারণ লোকদের মুখে মুখে গড়ে ওঠা উপাখ্যান বা লোককথাকে সাধারণ চমৎকার বলে।
২.   বাস্তব, অবাস্তব ও রূপক-ব্যাপকের হ্রাস-বৃদ্ধিসহ কোনো ব্যক্তির প্রয়াণপূর্ব ও প্রয়াণোত্তর কার্যকলাপের আলোচনা ও সমালোচনার ওপর জনসাধারণের মুখে মুখে যেসব উপাখ্যানের অস্তিত্বলাভ করে তাকে সাধারণ চমৎকার বলে। যেমন; অমুক ব্যক্তি অমুক অমুক কার্য করেছিল।

. মহান চমৎকার (Great miracle)
১.   বাস্তব, অবাস্তব ও রূপকের হ্রাস-বৃদ্ধিসহ কোনো মহান ব্যক্তির প্রয়াণপূর্ব ও প্রয়াণোত্তর কার্যকলাপের ওপর ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনার দ্বারা জনসাধারণের মুখে মুখে যেসব জনরব, জনশ্রুতি ও লোককথা বা উপাখ্যান সৃষ্টি হয় তাকে মহান চমৎকার বলে।
২.   বাস্তব-অবাস্তব ও রূপকেরর হ্রাস-বৃদ্ধিসহ ব্যক্তির প্রয়াণপূর্ব ও প্রয়াণোত্তর কার্যকলাপের ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ওপর ভিত্তি করে সুমহান রূপকারদের দ্বারা আত্মতত্ত্ব নির্ভর যেসব উপাখ্যান নির্মিত হয় তাকে মহান চমৎকার বলে।

. পৌরাণিক চমৎকার (Mythological miracle)
শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্র এবং পৌরাণিক সংখ্যা সূত্র ব্যবহার করে সুবিজ্ঞ রূপকারদের বিশ্ববাসীর কল্যাণার্থে রূপকার্থে নির্মিত মনোরম কাহিনীকে পৌরাণিক চমৎকার বলে।

সাহিত্য (Literature)
সাহিত্য (বাপৌছ)বি সহিতের ভাব, চিন্তা ও কল্পনার বিন্যস্ত ও কল্পিত লিখিত রূপ।

সাহিত্যের সংজ্ঞা (Definition of literature)
সাধারণত; চিন্তা, ভাবনা ও কল্পনার সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত লেখ্যমালাকে সাহিত্য বলে।

সাহিত্যের প্রকারভেদ (Theological definition of literature)
সাধারণত; সাহিত্য দুই প্রকার। যথা; ১. পদ্য সাহিত্য ও ২. গদ্য সাহিত্য।

. পদ্যসাহিত্য (Poetry)
সাধারণত; চিন্তা ভাবনা ও কল্পনার পদ্যাকার বা ছন্দাকার সুবিন্যস্ত লেখ্যমালাকে পদ্যসাহিত্য বলে।

. গদ্যসাহিত্য (Prose)
সাধারণত; চিন্তা ভাবনা ও কল্পনার গদ্যাকার সুবিন্যস্ত লেখ্যমালাকে গদ্যসাহিত্য বলে।

এছাড়াও; সাহিত্যকে চারভাগে ভাগ করা যায়। যথা; ১. সাধারণ সাহিত্য ২. লোকসাহিত্য ও ৩. পৌরাণিক সাহিত্য।

. সাধারণ সাহিত্য (General literature)
সাধারণত; চিন্তা ভাবনা ও কল্পনার সাধারণ লেখ্যমালাকে সাধারণ সাহিত্য বলে।

. লোক সাহিত্য (Folk-literature)
লোক সাহিত্য (বাপৌছ)বি রূপকথা, লোককথা, লোকগল্প, লোকগাথা ইত্যাদি মৌখিক সাহিত্য, oral literature, ফোকলোরের একটি শাখা।

লোক সাহিত্যের সংজ্ঞা (Definition of Folk-literature)
সাধারণত; লোককাহিনী, রূপকথা ও লোককথা, লোকগাথা, কাল্পনিক সাহিত্য, দেবতাগণের অলৌকিক পৌরাণিক কাহিনীকে লোক সাহিত্য বলে।

. পৌরাণিক সাহিত্য (Fabulous-literature)
পৌরাণিক সাহিত্যের সংজ্ঞা (Definition of mythological literature)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্র এবং মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যার সাহার্যে নির্মিত সাহিত্যকে পৌরাণিক সাহিত্য বলে।

ছোটকি (Shortish)
পুরাণে বর্ণিত ছোট ছোট শিক্ষামূলক পৌরাণিক কাহিনীকে ছোটকি বলা হয়। শ্বরবিজ্ঞানে; ছোটকিকে চমৎকার বলা হয়। অন্যদিকে; চমৎকারকেও ছোটকি বলা হয়। তবে; চমৎকার ও ছোটকির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত; চমৎকারগুলো গভীর দেহতাত্ত্বিক হয় কিন্তু ছোটকিগুলো কেবল ধাঁধার মতো হয়। ছোটকি আকারে ছোট হয় কিন্তু চমৎকার আকারে বড় হয়। ছোটকি অনেকেই নির্মাণ করতে পারে কিন্তু রূপকার ভিন্ন সাধারণ মানুষ চমৎকার নির্মাণ করতে পারে না। নিচে চমৎকার ও ছোটকির মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য তুলে ধরা হলো।

চমৎকার ও ছোটকির পার্থক্য (Difference between miracle and shortish)

চমৎকার (Miracle) ছোটকি (Shortish)
১. সাধারণত; বিস্ময়কর ঘটনাবলীকে চমৎকার বলে। ১. ছোট ছোট অর্থবহ গল্পকে ছোটকি বলে।
২. চমৎকার হলো শ্বরবিজ্ঞানের অংশ। ২. ছোটকি হলো লোকসাহিত্যের অংশ।
৩. এটি; সুবিজ্ঞ রূপকার ভিন্ন সুবিজ্ঞ মনীষীরাও নির্মাণ  করতে পারে না। ৩. এটি; আবাল-বৃদ্ধ সবাই নির্মাণ করতে পারেন।
৪. এটি; যত্রতত্র ব্যবহার করা যায় না। ৪. এটি; যত্রতত্র ব্যবহার করা যায়।
৫. এর দ্বারা কেবল আত্মতত্ত্বভিত্ত্বিক শিক্ষা প্রদান করা হয়। ৫. এর দ্বারা সাধারণ জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করা হয়।
৬. এটি; নির্মাণ করা অত্যন্ত কঠিন। ৬. এটি; নির্মাণ করা তুলনামূলক সহজ।
৭. চমৎকার সংকলন গ্রন্থকেই মহাগ্রন্থ বলে। ৭. একে ছোটকি সংকলন বলে।
৮. এটি; কখনও কখনও অত্যন্ত বৃহত্তম আয়তনেও নির্মিত হয়। ৮. সাধারণত; এটি; ক্ষুদ্রতম আয়তনে নির্মিত হয়।

চমৎকারের পরিচয় (Identity of miracle)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর উপমা পরিবারের একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিশেষ। সাধারণত; বিস্ময়কর ঘটনাবলীকে চমৎকার বলা হয়। অর্থাৎ; চমকপ্রদ ঘটনাবলীই হলো চমৎকার। যেহেতু; মানুষ রক্তমাংসে গড়া একটি কঠিন পদার্থ। তাই; মানুষ কোনো চমকপ্রদ ঘটনা ঘটাতে পারে না। পদার্থ যতক্ষণ পরমাণুতে পরিণত না হয়; ততক্ষণ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। যারফলে; অভিনব কোনকিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। তেমনই; মানুষও যত বড়ই সাধক হোক না কেন; সে কোনো চমৎকার প্রদর্শন করতে পারে না। তবে; এখন প্রশ্ন হতে পারে; সাম্প্রদায়িক মতবাদগুলো প্রচারের সময় অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করা হয়। তাহলে; এসব কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়; সাম্প্রদায়িক মতবাদের মধ্যে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাবলী হলো; বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার সূক্ষ্ম কার্যকলাপের রূপক বর্ণনা। যেমন; বাঙালী পুরাণে বর্ণিত ‘রাবণ কর্তৃক সীতা হরণ’। অন্যদিকে; আরবীয় পুরাণে বর্ণিত ‘বিশ্বনবির মি’রাজ’ গমন ইত্যাদি।

সাধারণত; আত্মতত্ত্বমূলক উপাখ্যান ও আধ্যাত্মিক শিক্ষামূলক ছোট গল্পকে চমৎকার বলা হয়। তবে; শ্বরবিজ্ঞানে; জনশ্রুতি, গুজব, রটনা, জনরব, কিংবদন্তি, রূপকথা, লোককথা, জনপ্রবাদ, লোকপ্রবাদ, লোকমুখে প্রচারিত কথা, লোক পরম্পরায় শ্রুত ও কথিত কথা, যে কথা লোক পরম্পরায় রটে, যে কথা দীর্ঘদিন ধরে লোক মুখে চলে আসছে এসব পরিভাষাকেও চমৎকার বলা হয়। এর ইংরেজি প্রতিশব্দগুলো হলো; myth, mythic, mythical, folk, figurative, metaphor, metaphoricale & allegory. এছাড়াও; এর আরবি প্রতিশব্দগুলো হলো’ আদাবুশ শাহবিয়্যু (ﺍﻻﺪﺐ ﺍﻟﺸﻌﺒﻰ) এবং আফা (.ﺍﻔﻮﺍﻩ) ও মুজিঝা (.ﻤﻌﺟﺯﻩ) ইত্যাদি বলা হয়। অবশিষ্ট বিষয়াদি জানার জন্য লৌকিকা শিরোনাম দেখুন।

শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্র, পৌরাণিক মূলক সংখ্যা ও সংখ্যা সূত্রগুলোর মাধ্যমে সুবিজ্ঞ রূপকারগণ কর্তৃক রূপকার্থে নির্মিত ছোট ছোট পৌরাণিক কাহিনীকে চমৎকার বলা হয়। শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্র, পৌরাণিক মূলক সংখ্যাপৌরাণিক রূপক সংখ্যাগুলোর সাহায্যে রূপকার্থে নির্মিত যুদ্ধ-কাহিনী, জন্ম বিবরণ, প্রয়াণ দিবস, শিক্ষনীয় উপদেশ ইত্যাদি রচনাবলীই চমৎকার। মানুষের মুখরোচক রূপক চমৎকারগুলো একটি জাতির সাম্প্রদায়িক, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুমহান ঐতিহ্য বহন করে।

প্রয়াত ব্যক্তির চমৎকার অসংখ্য রূপক ও কাল্পনিক অবাস্তব জনশ্রুতি, কিংবদন্তি, গুজব, রটনা, জনরব, জনবাদ, লোকশ্রুতি, রূপকথা, লোককথা, জনপ্রবাদ, লোকপ্রবাদ, কথিত কথা, লোক পরম্পরায় প্রচলিত কথা, লোকমুখে প্রচারিত কথা, লোক পরম্পরায় শ্রুত ও কথিত কথা, যে কথা লোক পরম্পরায় রটে, যে কথা দীর্ঘদিন ধরে লোক মুখে চলে আসে ইত্যাদি অবাস্তব ও অতীন্দ্রিয় পৌরাণিক কাহিনীতে পরিপূর্ণ। প্রয়াণোত্তর যতদিন যায়; ততই রূপক ও অতীন্দ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী ও কিংবদন্তিতে চমৎকারের কলেবর বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে কোনো সুহৃদয় লেখক বা গবেষক প্রয়াত ব্যক্তির উক্ত জনরব বা জনশ্রুতিগুলো লিখে একত্র করলেই চমৎকার স্থায়ীলাভ করে। অথবা; কয়েক প্রজন্ম পর থেকে চমৎকারও ক্রমে ক্রমে বিলোপ সাধিত হতে থাকে। কোনো এক সময় প্রয়াণোত্তর ব্যক্তির নিষ্ক্রিয় হওয়ার মতো; তার চমৎকারগুলোও কালের গর্ভে চির নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সৃষ্টিলগ্ন হতে এমন কত পৌরাণিক চরিত্র ও চমৎকার যে কালের গর্ভে বিলীন হয়েছে তার ইয়ত্তা কে জানে? যারফলে; কয়েক শতাব্দী পর অমুক নামে কোনো লোক ছিল বলে পাত্তাও পাওয়া যায় না। অথবা ধারণাও করা যায় না। যেমন; মানুষের পূর্বপুরুষ। মানুষ হয়তো চার বা পাঁচ পুরুষের সন্ধান করতে পারে; তদুর্ধ্ব আর কিছুই বলতে পারে না। এখন হয়তো রাষ্ট্রীয় ভুসম্পত্তির কাজগপত্রে কয়েক স্তর পর্যন্ত পূর্বপুরুষের ব্যক্তি-সত্তার নাম ও আবাস পাওয়া যায়; তার ঊর্ধ্বে আর কিছুই পাওয়া যায় না। সদ্য ছবিসহ সামান্য কিছু তথ্য ভূসম্পত্তির কাগজপত্রে লিপিবদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে। এতে ব্যক্তি-সত্তার নাম ও আবাস হয়তো অনন্তকাল পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব হবে। স্মরণীয় যে; বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার ওপরে চমৎকার কমবেশি হয়। একেবারে সাধারণ লোকের চমৎকার পাওয়া যায় না বললেই চলে। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের চমৎকার কখনও কখনও অধিক পরিমাণে গড়ে উঠতে দেখা যায়। অন্যদিকে; অতিমানব ও মহামানবগণের চমৎকার অত্যধিক পরিমাণে গড়ে ওঠে। সাধারণ লোকদের চমৎকার-গুলোর অধিকাংশই অবাস্তব হয়। অন্যদিকে; মহামানবগণের চমৎকারগুলো পুরোটাই হয় রূপক ও আত্মদর্শমূলক।

মহামানবগণের চমৎকারের ক্ষেত্রে বাস্তব-অবাস্তব কিছুই বিচার বিবেচনা না করে সাধারণ লোকজন বলতে থাকে অমুকব্যক্তি প্রয়াণের পূর্বে এমন ছিল, অমুকব্যক্তি প্রয়াণের পূর্বের রাত্রে এসব কর্ম করেছিল। অমুকব্যক্তি প্রয়াণের পূর্বে অমুক স্থানে এসব আশ্চর্য ঘটনাবলী ঘটিয়েছিল ইত্যাদি। এসব ঘটনা শ্রবণ করার পর; ক্রমে ক্রমে জনসাধারণের মনে বাড়তে থাকে ভয়, আতঙ্ক, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিশ্বাস। এ হতে অন্ধ আতঙ্ক ও জ্ঞান অন্ধতার সৃষ্টি হয়। যারফলে; মহামানবগণের ব্যক্তি-সত্তার অবর্তমানে জনশ্রুতি ও জনরবের গুণকীর্তনে আতঙ্কিত কিছু কিছু মানুষ তার সমাধি খুঁজে বের করে সমাধি পূজায় ব্রত হয়। তারা সমাধিতে বাতি জ্বালানো, গোলাপজল ছিঁটানো, সমাধিতে গিলাপ পরানো, সমাধি পরিচর্যা করা, সমাধি পাকা করা, সমাধি টাইলস দ্বারা মোড়ানো, প্রয়াতের আখড়ায় গান গাওয়া ও প্রয়াণ দিবসে অন্ন-পানীয় বিতরণ করা ইত্যাদি কার্যকে অধিক পূণ্যের কার্য মনে করে। কেউবা সমাধির ধুলা গায়ে মেখে রোগ নিরাময় ও সমস্যা দূরীকরণের বিজ্ঞান ও যুক্তি বিরোধী হীন ধৃষ্টতার বৃথা প্রয়াস প্রদর্শন করে। শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা ও পৌরাণিক সংখ্যা সূত্রগুলোর দ্বারা নির্মিত কোনো কোনো পৌরাণিক কাহিনী বা কোনো কোনো চমৎকার; কোনো কোনো মহামানবের ক্ষেত্রে বিশ্ববিখ্যাত হতে দেখা যায়। যেমন; রাম রাবণের যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, হযরত নূহের নৌকা, হযরত সুলাইমানের সিংহাসন ও আংটি, হযরত মুসার লাঠি, সাদ্দাদের স্বর্গ, হযরত মুহাম্মাদের চাঁদদ্বিখণ্ডন, নবির মিরাজ, কারবালার যুদ্ধ, খাজার খড়ম, শাহমাখদুমের কুমির, খানজাহানের বাঘ, মহাত্মা শাহলালের বাঁশ, লালন সাঁইজির অকালের ফল পাকানো, মহাত্মা লাডুমশাহের লাডুম, হিন্দুদের গঙ্গাস্নান, জন্মাষ্টমী, বৌদ্ধদের তীর্থযাত্রা, মুসলমানদের হজ্জ, জমজমের জল, ঈদেমিলাদুন্নবি ও আলাউদ্দিনের চেরাগ ইত্যাদি।

যখনই কোনো মহামানবের চমৎকার কোনো সমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করে; তখন তার লোকশ্রুতি ও জনরব আরও বাড়তে থাকে। যারফলে; সমসাময়িক লেখক ও গবেষকরা উৎসুক হয়ে উদ্যমের সাথে তা গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ করতে থাকে। চমৎকার গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ হওয়ার দ্বারা মহামানবদের সত্তা অধিক অমরত্বলাভ করে। সাধারণ লোকের চমৎকার ও মহামানবগণের চমৎকার উভয় গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ হলেই দেবতা অমরত্বলাভ করে। কিন্তু চমৎকার গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ না হলে কয়েক শতাব্দী পর; তা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ঘটনাবলীর মূলকে আড়াল করে বা গোপনে রেখে রূপকভাবে ছদ্মনাম ব্যবহার করে; ছোট ছোট ছোটকি নির্মাণ পদ্ধতি মানুষ কয়েক হাজার বছর পূর্বেই আবিষ্কার করেছিল। যেমন; আদিকাল হতে দেখা যায়; গ্রামপ্রধান বা গ্রাম্য মোড়লরা বিচারকার্য আরম্ভ করার পূর্বেই দায়ী ও অভিদায়ীকে (বাদী-বিবাদী) বুঝানোর জন্য; প্রথমে অনুরূপ ছোটখাট পৌরাণিক কাহিনী শোনায়। এমন ছোটকি শোনানো হয়; অভিযোক্তা (accuser) বা দোষীর নিকট হতে প্রকৃত গোপন তথ্যাদি উদ্ধার করার জন্য। যারফলে; অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে; ঘটনাবলীর অনুরূপ ছোটকি বর্ণনা করে তার পরিণাম ও ফলাফল বর্ণনা করা হলে এবং অভিযোক্তাকে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করার সুযোগ দিলে; অতি সহজেই অভিযোক্তা বা দোষীর স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। অতি সহজেই বৈঠকও শেষ করা যায়।

এমন ছোট ছোট ছোটকিই চমৎকার। তবে; এমন ছোটকি অত্যন্ত সাধারণ। কিন্তু আধ্যাত্মিক ছোটকি বা চমৎকার অত্যন্ত তথ্যবহুল। অধিকাংশ ছোটকি বা চমৎকার একমাত্র মানবদেহ ও বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা নিয়ে নির্মিত। যেসব ছোটকি বা চমৎকারের বর্ণনা বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীবাঙালী পৌরাণিক সংখ্যা সারণী এর সাথে মিল রয়েছে; সেসবই প্রকৃত পুরাণ। যেসব ছোটকি বা চমৎকারের বর্ণনা বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীপৌরাণিক সংখ্যা সারণী এর সাথে মিল নেই; তা কখনই আধ্যাত্মিক ছোটকি নয়। শ্বরবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এসবকে ভ্রান্ত বা অবাঞ্ছিত বলা হয়। আত্মতত্ত্ব বা দেহতাত্ত্বিক এসব ছোটকি ও চমৎকারকে প্রপকও বলা হয়। মহান চমৎকার অসংখ্য রূপক ও কাল্পনিক জনরব, জনশ্রুতি, অবাস্তব ও অতীন্দ্রিয় পৌরাণিক কাহিনীতে পরিপূর্ণ হতে দেখা যায়। ব্যক্তির প্রয়াণোত্তর যতদিন যায়; ততই রূপক ও অতীন্দ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী ও কিংবদন্তি বাড়তে থাকে। যারফলে; ক্রমে ক্রমে জনগণের মধ্যে; একদিকে বাড়তে থাকে ভয়-ভীতি; অন্যদিকে; বাড়তে থাকে প্রেম, ভালোবাসা, অন্ধভক্তি ও অন্ধবিশ্বাস। অন্ধভক্তি ও অন্ধবিশ্বাস হতে অন্ধ আতঙ্ক ও জ্ঞান অন্ধতা সৃষ্টি হয়। গণমানুষের জনশ্রুতি ও জনরবের গুণকীর্তনে আতঙ্কিত একদল মানুষ; তার সমাধি খুঁজে বের করে সমাধি পূজায় ব্রত হয়। কেউ পুণ্য অর্জন করার জন্য ও কেউ মনষ্কামনা পূরণের জন্য সেখানে যাওয়া-আসা করতে থাকে। এরপর হতে সূচনা হয়; উক্ত সমাধিতে বাতি জ্বালানো, সুগন্ধি জল ছিঁটানো, তার নামের ওপর গান গাওয়ানো, প্রয়াণদিবসে অন্ন-পানীয় দান করা, সমাধি পরিচর্যা করা, সমাধির উত্তরোত্তর উন্নয়ন করা, সমাধি পাকা করা, আধুনিককালে সমাধি টাইলস দ্বারা মুড়ানো এবং সমাধির ওপর বিশাল বিশাল স্তম্ভ (মিনার) নির্মাণ করা। সাধারণ লোকজন এসবকে অতি উত্তম কার্য বা উত্তম উপাসনা মনে করেই তা করে। আবার অনেকে সমাধির উন্নয়নকার্য করাকে অনেক পুণ্যের কাজ বলেও মনে করে। কেউ কেউ সামাধির ধূলি গায়ে মেখে; বিভিন্ন রোগ নিরাময় ও বিভিন্ন সমস্যা বিদূরিত করার মতো বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তি বিরোধী হীন কর্মও করে।

যখন কোনো মহান চমৎকার সমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করে; তখন তার লোকশ্রুতি, জনশ্রুতি ও জনরব আরও বাড়তে থাকে। যারফলে; সমসাময়িক উৎসুক লেখক ও গবেষকরা স্বস্ব গ্রন্থাদিতে তা লিপিবদ্ধ করতে যার পর নাই আগ্রহী হয়ে ওঠে। চমৎকার গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ হওয়ার দ্বারা ব্যক্তি-সত্তা অমরত্বলাভ করে। উল্লেখ্য; সাধারণ চমৎকার কিংবা মহান চমৎকার উভয়ের ক্ষেত্রের প্রযোজ্য যে; তা গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ হওয়ার পর ব্যক্তি-সত্তা অমরত্বলাভ করে। কিন্তু চমৎকারগুলো কোনো গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ না হলে; কয়েক যুগ বা কয়েক শতাব্দীর মধ্যে তা কালের গর্ভে আবার বিলীন হয়ে যায়। নিচে কয়েকটি চমৎকার তুলে ধরা হলো।

. বাঙালী পৌরাণিক চমৎকার (Bengali mythological miracle)
একদা মহাদস্যু রত্নাকর দস্যুবৃত্তির জন্য গহীন অরণ্যের মধ্যে পায়ে চলা একটি পথের পাশে ওঁৎ পেতে বসে রইলেন। স্বর্গধামের মহাপ্রভু ব্রহ্মা তাঁর নিজস্ব দূত নারদকে ডেকে বললেন; “নারদ! মর্ত্যধাম পাপ ও কলুষে ভারী হয়ে ওঠেছে। এজন্য; একবার মর্ত্যে যাওয়া একান্ত কর্তব্য। নারদ বললেন; “প্রভু! তাই হোক।” অতঃপর; ব্রহ্মা ও নারদ উভয়ে মানব রূপ-ধারণ করে মর্ত্যধামে অবতরণ করলেন। তারপর; যে পথে দস্যু রত্নাকর দস্যুবৃত্তির জন্য ওঁৎ পেতে বসে ছিলেন; গহীন অরণ্যের ঐ পথ ধরে চলতে লাগলেন। হঠাৎ রত্নাকর তাদের সামনে এসে তাদের আক্রমণ করলেন। উম্মুক্ত অস্ত্র ধারণ করে বললেন; “তোমাদের নিকট যাকিছু আছে তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও। অন্যথায়; আমি তোমাদের হত্যা করব।”

পথচারী রূপী ব্রহ্মা বললেন; “যাকিছু আছে তোমাকে দিয়ে দিবো, তার পূর্বে তোমার নিকট কিছু প্রশ্ন করব। তোমাকে তার সঠিক উত্তর দিতে হবে।” রত্নাকর বললেন; “বলুন।” ব্রহ্মা বললেন; “তুমি দস্যুবৃত্তি বা অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করে যাদের লালনপালন করো; তারা কী তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হবেন?” তখন রত্নাকর বললেন; “হ্যাঁ অবশ্যই!” ব্রহ্মা আবার বললেন; “তুমি কী তাদের জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়েছো?” রত্নাকর বললেন; “না তো!” ব্রহ্মা বললেন; “তুমি আমাদেরকে দড়ি দিয়ে এই মৃতগাছের সাথে বেঁধে; তোমার পরিবারের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করে এসো; তারা সত্যিই তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হবেন কী না?” অতঃপর; রত্নাকর একটি শক্ত দড়ি দিয়ে ব্রহ্মা ও নারদকে উক্ত মরাগাছের সঙ্গে ভালোভাবে বেঁধে গৃহে ফিরে গেলেন। প্রথমে তার মাতাকে জিজ্ঞেস করলেন; “হে পরম শ্রদ্ধেয়া জননী! আপনি জানেন যে; আমি দস্যুবৃত্তি করে পরিবার পালনপোষণের অর্থাদি সংগ্রহ করি। যা আপনিও গ্রহণ করেন। আপনি বলুন আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হবেন কী না?” তার মাতা দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিলেন; “আমি তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছি, আপন স্তন্যদান করে বড় করে তুলেছি—, আমি তোমার পালনপোষণের প্রাপ্য, আমাকে পালনপোষণ করা তোমার দায়িত্ব। কিন্তু আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের কোনরূপ ভাগী হব না।”

অতঃপর; তিনি পিতার নিকট জানতে চাইলে; পিতাও উত্তর দিলেন; “আমি খেয়ে না খেয়ে অনেক কায়ক্লেশ করে তোমাকে পালনপোষণ করে বড় করেছি। এজন্য; আমাকে পালনপোষণ করাও তোমার দায়িত্ব। তুমি যে বৃত্তি দ্বারাই আমাকে পালনপোষণ করো না কেন; আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী আমি হব না।” অতঃপর; তিনি সন্তানদের নিকট জানতে চাইলে; সন্তানরাও উত্তর দিলেন; “তুমি জন্ম দিয়েছ। এজন্য; আমরা পৃথিবীতে এসেছি। এখন পালনপোষণ করা তোমার দায়িত্ব। তুমি যে বৃত্তি দ্বারাই পালনপোষণ করো না কেন; আমরা তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হব না।” অবশেষে; মনক্ষুণ্ন হয়ে রত্নাকর আপন স্ত্রীর নিকট বিষয়টি জানতে চাইলেন। স্ত্রীও উত্তর দিলেন যে; “তুমি ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেই আমাকে স্ত্রী রূপে তোমার ঘরে এনেছ। এজন্য; আমাকে ভরণপোষণ করা তোমার দায়িত্ব। তুমি যে বৃত্তি দ্বারাই আমাকে ভরণপোষণ করো না কেন; আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হব না।” এবার রত্নাকরের চৈতন্য উদয় হলো। তিনি বিষণ্ন মনে উক্ত স্থানে ফিরে এলেন। অতঃপর; পথচারী রূপী ব্রহ্মা ও নারদের বন্ধন মুক্ত করে দিলেন। তিনি বললেন; “হে মহাত্মন! এবার আপনারা বলুন কিরূপে আমার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে? আমার চন্দ্রচেতন হওয়ার পর আমি অনেক হত্যা করেছি। আর হত্যা করতে চাই না। বরং; আমি এখন মুক্তি পেতে চাই।” অতঃপর; ব্রহ্মা বললেন; “এ মরাগাছের গোড়ায় বসে তুমি “হরে কৃষ্ণ হরে রাম” বীজ মন্ত্রটি জপনা করতে থাকো। যখন দেখবে মৃতগাছটি ফুলে-ফলে ভরে গেছে; তখন তোমার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হবে।” অতঃপর; রত্নাকর উক্ত মরাগাছের গোড়ায় বসে ধ্যানস্থ হয়ে; উক্ত মন্ত্রটি জপনা করতে আরম্ভ করলেন। অতঃপর; মানব রূপী ব্রহ্মা ও নারদ আবার স্বর্গধামে প্রত্যাগমন করলেন।

দীর্ঘ বারো বছর পর ব্রহ্মা নারদকে ডেকে বললেন; “নারদ! মর্ত্যধামের অবস্থা কিরূপ? চলো মর্ত্যধাম ঘুরে আসি।” অতঃপর; ব্রহ্মা ও নারদ মনুষ্য বেশ ধারণ করে উক্ত বৃক্ষস্থলে আগমন করলেন। ব্রহ্মা বললেন; “নারদ রত্নাকরকে অন্বেষণ করো।” নারদ উক্তগাছের গোড়া তন্নতন্ন করে অন্বেষণ করে কোথাও না পেয়ে; ব্রহ্মার নিকট বললেন; “প্রভু! রত্নাকরকে তো কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে; আর কী করতে পারি?” ব্রহ্মা বললেন; “উইঢিবির সাথে কর্ণ লাগিয়ে দেখ মন্ত্র জপনার শব্দ পাওয়া যায় কী না?” অতঃপর; নারদ উইঢিবির সঙ্গে কর্ণ লাগিয়ে মন্ত্র জপনার শব্দ শুনতে পেলেন। ব্রহ্মা উইঢিবি ভেঙ্গে রত্নাকরকে বের করার আদেশ দিলেন। তারপর; নারদ উইঢিবিটি ভেঙ্গে তাকে বের করলো। উইপোকার সংস্কৃত নাম বাল্মীক। মহাদস্যু রত্নাকরকে বাল্মীকঢিবি হতে বের করা হয়েছে বলে; তার নাম দেওয়া হলো বাল্মীকি।

বাল্মীকি নয়ন মেলে দেখলেন যে; মরাগাছটি ফুলেফলে সুশোভিত ওঠেছে। এসময় নারদ নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন; “বাল্মীকি আপনার নামজপনা সুদীর্ঘ একযুগ পূর্ণ হয়েছে। আপনার পাপের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়েছে। এজন্য; মরাগাছটি ফুলেফলে সুশোভিত হয়ে ওঠেছে।” এবার তিনি ব্রহ্মার দিকে ইঙ্গিত করে করলেন যে; ইনিই মহাপ্রভু ব্রহ্মা!” সঙ্গে সঙ্গে মহামতি বাল্মীকি স্বয়ং ব্রহ্মাকে মানব বেশে সশরীরে পেয়ে ভক্তি প্রদর্শন করলেন। অতঃপর; নারদ বললেন; “বাল্মীকি আপনার চৈতন্য বা সুমতি আনয়নের জন্যই আমরা মর্ত্যে আগমন করেছি।” মহাদুস্য রত্নাকর আজ হতে হলেন মহামতি বাল্মীকি। অতঃপর; একদিন নারদ বাল্মীকির নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে রামচন্দ্রের কাহিনী শুনিয়ে দেবলোকে প্রস্থান করেন। একদিন বাল্মীকি ভরদ্বাজসহ তমসানদীর তীরে ভ্রমণরত অবস্থায় অকস্মাৎ দেখেন যে; বনমধ্যে কামক্রীড়ারত এক ক্রৌঞ্চমিথুনের ক্রৌঞ্চকে জনৈক ব্যাধ শরাঘাত করলে ক্রৌঞ্চী করুণসুরে বিলাপ করতে আরম্ভ করলো। এ দৃশ্য দেখে শোকাভিভূত বাল্মীকির মুখ হতে একটি শ্লোক নির্গত হয়। তা হলো;

            “মা নিষাদ! প্রতিষ্ঠাং স্ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতমাঃ।”

কথিত আছে যে; এ শোকটিই আদি-শ্লোক ছিল। স্বয়ং ব্রহ্মা বাল্মীকির আশ্রমে উপস্থিত হয়ে বলেন যে; তাঁর সংকল্পেই বাল্মীকির কণ্ঠ হতে অনুপম ছন্দময় সে আদি-শ্লোকটি নিঃসৃত হয়েছে। এ মন্ত্রটি অবলম্বন করে তিনি বাল্মীকিকে রামায়ণ নির্মাণের নির্দেশ করেন। অতঃপর; মহামতি বাল্মীকি মহাগ্রন্থ রামায়ণ নির্মাণ সমাপ্ত করেন। পরবর্তীকালে রামচন্দ্রের আদেশে লক্ষ্মণ গর্ভবতী সীতাকে বাল্মীকির আশ্রমে পরিত্যাগ করে যান। এ স্থানে সীতার দু’জন যমজপুত্র কুশ ও লব জন্মগ্রহণ করেন। বাল্মীকি প্রথমে এদের দু’জনকে রামায়ণ গান করতে শেখান। অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলে বাল্মীকি কুশ ও লবকে নিয়ে রামের সভায় উপস্থিত হন। উক্তস্থানেই তাদের কণ্ঠ হতে সর্বপ্রথম রামায়ণ গান প্রচারিত হয়।

এসব চমৎকার নির্দিষ্ট কিছু বিধিমালা অনুসরণ করেই নির্মাণ করা হয়। এমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চমৎকারগুলো নির্মাণ করতে হলে; রূপকারকে অবশ্যই প্রথমে কিছু কিছু উপাদান গ্রহণ করতে হয়। চমৎকার নির্মাণের জন্য গ্রহণকৃত উপাদানাগুলো অবশ্যই বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা পরিবার ও দেবতা পরিবারের মধ্য থেকে হতে হয়। অন্যদিকে; চমৎকারের মধ্যে ব্যবহৃত গাণিতিক সংখ্যাগুলো অবশ্যই পৌরাণিক সংখ্যা সূত্রগুলোর মধ্যে থেকে হতে হয়।

এছাড়াও; চমৎকার নির্মাণের পূর্বে একজন রূপকারকে অবশ্যই চিন্তা করতে হয় যে; যেভাবেই চমৎকার নির্মাণ করা হোক না কেন; তা যেন মানুষের বোধগম্যের মধ্যেই থাকে। যদি কোনো চমৎকার মানুষের বোধগম্যের বাইরে যায়; তবে সেটি পরবর্তীকালে কারো কোনো উপকারে আসে না। চমৎকারের মধ্যে চয়িত ছদ্মনাম, অব্দ, দিন ও ক্ষণের সংখ্যাগুলো কোনো রূপকার কখনই বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার বাইরের কোনো উৎস্য হতে গ্রহণ করতে পারবে না। কারণ; সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদ কেবলই আত্মতত্ত্বনির্ভর। এযাবৎ আত্মতত্ত্বের বাইরে সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক কোনো মতবাদ গড়ে ওঠে নি। আর কোনো দিন গড়ে উঠতেও পারে না। তাই; সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিকদের চমৎকারের বিষয়বস্তু না জেনে ও না বুঝে; তা বর্ণনা করা; বা তার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-পর্যালোচনা করা; কিংবা তার সত্যাসত্য বিচার করা; সাধারণ বক্তা, লেখক ও গবেষকদের চরম অন্যায়। সাধারণ মানুষই কেবল নয়। বরং গবেষক, লেখক, জ্যোতিষী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা চমৎকার না বুঝাও এক প্রকার চমৎকার। কারণ; সবাই যদি সহজেই চমৎকার বুঝতে পারে; তবে তা চমৎকার হয়ইবা কী করে?

তাই বলা যায়; চমৎকার চিরকালই চমৎকার! উল্লেখ্য; রূপক ও ব্যাপক পরিভাষা, পৌরাণিক রূপক সংখ্যা, স্থান ও অব্দ ব্যতীত চমৎকার নির্মাণ করা হয় না। এজন্য; সবাই সহজে চমৎকারগুলো বুঝতে পারে না। বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষাগুলোর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা না জানা ও না বুঝা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিই চমৎকার বুঝে উঠতে সক্ষম হয় না। চমৎকার নির্মাণের আরও চমকপ্রদ বিষয়টি হলো; সর্বকালে ও সর্বযুগেই চমৎকার নির্মাতা রূপকারগণ কয়েকশত কিংবা কয়েক হাজার বছর পূর্বে গিয়ে চমৎকার নির্মাণ করেন। এজন্য; প্রায়সই পাঠক ও শ্রোতারা চমৎকার পাঠ করা বা শোনামাত্রই বলে ওঠে এগুলো অবশ্যই বাস্তব। এসব ঘটনা বাস্তব না হলে; নির্মাতাগণ নির্মাণ করেছেন কী করে? অথচ; তারা একটিবারও বিবেচনা করেন না যে; উপন্যাস, নাটক, পুথি, জারি ও সারিগান কিভাবে উৎপত্তি হয়? যেহেতু; তাদের একটু গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন যে; উপন্যাস, ছায়াছবি, —– ও সারিগান কোনো ঘটনা না ঘটলেও; কাল্পনিকভাবে নির্মাণ করা যায়। অতএব; চমৎকারও কোনো ঘটনা না ঘটলেও নির্মাণ করা যায়। যুগে যুগে রূপকারগণ বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কার্যকলাপ গভীরভাবে অবলোকন করে সেসব রূপকার্থে শিক্ষামূলক উপাখ্যান রূপে নির্মাণ করেন। যেমন; কোথাও মন ও জ্ঞানের যুদ্ধ, কোথাও ভালো ও মন্দের যুদ্ধ; আবার কোথায় শিশ্ন ও যোনির কামযুদ্ধকে বাস্তব রূপদান করা হয়। এজন্য; বলা যায়; সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পুরাণের যুদ্ধ কেবলই চমৎকার কিন্তু বাস্তব নয়।

শ্বরবিজ্ঞানের চমৎকারগুলোকে যারা বাস্তব বলে মনে করে; তাদের এ মতিভ্রম হতে বিজ্ঞলোকদের সব সময় দূরে থাকা প্রয়োজন। কারণ; যারা রূপকথাকে বাস্তব বলে মনে করে; তাদের জ্ঞান কখনই সুস্থ নয়। তারা যে কোনো সময় যা-তা করে বসতে পারে; এতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্ধবিশ্বাসী ও অজ্ঞ সাম্প্রদায়িকরাই অধিক এমন হয়। এজন্য; সব বুদ্ধিমানের কাজ হলো; অজ্ঞ ও অন্ধবিশ্বাসী সাম্প্রদায়িকদের থেকে দূরে থাকা। কারণ; সাম্প্রদায়িক রূপকথা বা পৌরাণিক কাহিনীর জন্য; তারা কেবল তর্ক-বিতর্ক করেই ক্ষ্যান্ত হয় না। বরং; মারামারি, হত্যা ও বধ-বলির মত কার্যাদি করতেও রীতিমত প্রস্তুত। তারা সাম্প্রদায়িক পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে কেউ করে আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণ, কেউ করে রাজনৈতিক দলগঠন, কেউ করে দাওয়াতী কাফেলা, আবার কেউ গড়ে তোলে সাম্প্রদায়িক বিদ্যালয়, ধনাগার, ভোজনালয় এবং উপাসনালয়। কিন্তু তারা কেউ জানে না যে; এসব করে প্রকৃতপক্ষে কিবা হবে? চমৎকারটি নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত উপাদানের একটি সারণী নিচে তুলে ধরা হলো।

বাঙালী পৌরাণিক চমৎকারটির উপাদানাদি (The elements of the Bengali mythological miracle)

ক্র মূলক রূপক উপমান চারিত্রিক ছদ্মনাম
১. উপস্থ কণ্ডনি যমজপুত্র ভগবান
২. কানাই রজকিনী লব
৩. কাম/ সঙ্গম উপাসনা কামক্রীড়া
৪. কৈশোরকাল বনবাস ১২ বছর
৫. চন্দ্রচেতনা আগুন কামভাব উদয়
৬. জরায়ু নিধুয়া স্বর্গধাম
৭. জ্ঞান গুরু পথচারী ব্রহ্মা
৮. দেহ পৃথিবী অরণ্য, উইঢিবি, মরাগাছ, মর্ত্যধাম
৯. পালনকর্তা সাঁই রামচন্দ্র
১০. বলাই/ শিশ্ন বিম্বল ক্রৌঞ্চ, দড়ি, ব্যাধ, লক্ষ্মণ, বাল্মীক মদন কুশ
১১. বৈতরণী/ যোনিপথ নদী তমসা নদী, পথ বৈতরণী
১২. ভগ/ জরায়ুমুখ ঘাট দস্যু/ মহাদস্যু ভৃগুমুনি রত্নাকর
১৩. ভৃগু/ জরায়ুমুখ ত্রিবেণী আখেটক, পথচারী, ভৃগুমুনি নারদ
১৪. যৌবনকাল সেতু সুশোভিত গাছ
১৫. শুক্র ধন, সম্পদ ক্রৌঞ্চী, সীতা
১৬. শুক্রধর অটল
১৭. শুক্রপাত মৃত্যু হত্যা/ দস্যুবৃত্তি
১৮. সাম্প্রদায়িক সংস্কার মন্ত্র হরে কৃষ্ণ হরে রাম

. আরবীয় চমৎকার (Arabian miracle)
‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’ নামক গ্রন্থে রূপকথায় কথিত আছে যে; নিজাম নামে এক মহাদস্যু ছিল। পায়ে চলা গভীর অরণ্যে পথে তিনি দস্যুবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। একদা পথচারীর সর্বস্ব লুণ্ঠন করার জন্য তিনি পথের পাশে ওঁৎ পেতে বসে ছিলেন। একজন সন্ন্যাসী একাকী ঐ পথ ধরে চলতে চলতে; সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। হঠাৎ দস্যু নিজাম সন্ন্যাসীর সামনে এসে তাঁকে আক্রমণ করলেন। উম্মুক্ত অস্ত্র ধারণ করে তাঁকে বললেন; “তোমার নিকট যাকিছু আছে তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও। অন্যথায়; আমি তোমাকে হত্যা করব।”

সন্ন্যাসী বললেন; “আমার নিকট যাকিছু আছে তোমাকে দিয়ে দিবো; তার পূর্বে আমি তোমার নিকট কিছু প্রশ্ন করব। তুমি সঠিক উত্তর দিবে।” তখন দস্যু নিজাম বললেন; “বলুন।” অতঃপর; সন্ন্যাসী বললেন; “তুমি দস্যুবৃত্তি বা অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ দ্বারা যাদের লালনপালন করো; তারা কী তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হবেন?” তখন নিজাম বললেন; “হ্যাঁ অবশ্যই!” অতঃপর; সন্ন্যাসী আবার বললেন; “তুমি তাদের জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়েছ কী?” তখন নিজাম বললেন; “না তো!” তারপর; সন্ন্যাসী আবার বললেন; “দড়ি দিয়ে আমাকে এই মৃতগাছের সাথে বেঁধে; তুমি তোমার পরিবারের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করে এসো; সত্যিই তারা তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হবেন কী না?” অতঃপর; দস্যু নিজাম একটি শক্ত দড়ি দিয়ে সন্ন্যাসীকে উক্ত মরাগাছের সঙ্গে ভালোভাবে বেঁধে গৃহে ফিরে গেলেন। প্রথমে তিনি তার মাতাকে জিজ্ঞেস করলেন; “হে পরম শ্রদ্ধেয়া জননী! আপনি জানেন যে; আমি দস্যুবৃত্তি করে পরিবার পালনপোষণের অর্থাদি সংগ্রহ করি। যা আপনিও গ্রহণ করেন। আপনি বলুন আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হবেন কী না?” নিজামের এমন প্রশ্নের উত্তরে তাঁর মাতা দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিলেন; “আমি তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছি, আপন স্তন্যদান করে বড় করে তুলেছি, আমি নিজে না খেয়ে তোমাকে দিয়েছি—। সেজন্য; আমি তোমার পালনপোষণের প্রাপ্য। অতএব; আমাকে পালনপোষণ করা তোমার দায়িত্ব। কিন্তু আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের কোনরূপ ভাগী হব না।” মাতার এমন উত্তর শুনে নিজামা অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। অতঃপর; তিনি তাঁর পিতার নিকট বিষয়টি জানতে চাইলে তিনিও উত্তর দিলেন; “আমি খেয়ে না খেয়ে অনেক কায়ক্লেশ করে তোমাকে পালনপোষণ করে বড় করেছি। এজন্য; আমাকে পালনপোষণ করাও তোমার দায়িত্ব। তুমি যে বৃত্তি দ্বারাই আমাকে পালনপোষণ করো না কেন; আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হব না।”

এবার তিনি অত্যন্ত মনক্ষুণ্ন হয়ে বিষয়টি তাঁর সন্তানদের নিকট জানতে চাইলেন। তখন তাঁর সন্তানরা উত্তর দিলেন যে; “তুমি জন্ম দিয়েছ। এজন্য; আমরা পৃথিবীতে এসেছি। এখন পালনপোষণ করা তোমার দায়িত্ব। তুমি যে বৃত্তি দ্বারাই পালনপোষণ করো না কেন; আমরা তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হব না।” অতঃপর; যারপর নাই; মনক্ষুণ্ন হয়ে নিজাম আপন স্ত্রীর নিকট বিষয়টি জানতে চাইলেন। তখন তাঁর স্ত্রীও উত্তর দিলেন যে; “তুমি ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেই আমাকে স্ত্রী রূপে তোমার ঘরে এনেছ। এজন্য; আমাকে ভরণপোষণ করা তোমার দায়িত্ব। তুমি যে বৃত্তি দ্বারাই আমাকে ভরনপোষণ করো না কেন; আমি তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের ভাগী হব না।” এবার নিজামের চৈতন্য উদয় হলো। তিনি বিষণ্ন মনে উক্ত স্থানে ফিরে এলেন। অতঃপর; পথচারী রূপী সন্ন্যাসীর বন্ধন মুক্ত করে দিলেন। তারপর; অত্যন্ত করুণ চাহনি নিয়ে তিনি সন্ন্যাসীর উদ্দেশ্যে বললেন; “হে মহাত্মন! এবার আপনি বলুন কিরূপে আমার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে? আমার চন্দ্রচেতনা উদয় হওয়ার পর আমি অনেক হত্যা করেছি। আর হত্যা করতে চাই না। বরং; আমি এখন মুক্তি পেতে চাই। এবার আমাকে প্রায়শ্চিত্তের উপায় বলুন। এবার আমার আত্মমুক্তির উপায় বর্ণনা করুন।”

অতঃপর; সন্ন্যাসী বললেন; “এ মরাগাছটির গোড়ায় বসে তুমি ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ এ মন্ত্রটি জপনা করতে থাকো। দীর্ঘ একযুগ পর যখন দেখবে এ মৃতগাছটি ফুলেফলে ভরে উঠবে; তখন তোমার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হবে। অতঃপর; নিজাম উক্ত মরাগাছটির গোড়ায় বসে ধ্যানমগ্ন হয়ে; উক্ত মন্ত্রটি জপনা করতে আরম্ভ করলেন। তখন পথচারী রূপী সন্ন্যাসীও তাঁর গন্তব্যস্থলে গমন করলেন। বারো বছর পূর্ণ হতে অবশিষ্ট মাত্র একদিন। ঘটনা ক্রমে ঐদিন ঐ অঞ্চলের প্রেমিক যুগলের প্রেমিকা মারা গেছে। অতঃপর; অঞ্চলবাসী দস্যু নিজামের সাধনবৃক্ষের সামনেই তাকে সমাধিস্থ করেছেন। গভীর রাতে লম্পট প্রেমিক সমাধি হতে প্রেমিকার শব উত্তোলন করলেন। তারপর; তার সাথে অপকর্ম করার জন্য উদ্যোত হলেন। এসব দৃশ্য দেখে দস্যু নিজাম মনে মনে ভাবতে লাগলেন; সাধুবাবার কথা অনুসারে আগামিকালই বারো বছর পূর্ণ হবে। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হবে। কিন্তু আমার চোখের সামনে এতবড় পাপ হতে দেবো না। আমি তাকে অবশ্যই হত্যা করব। এ পাপের জন্য যদিও আমাকে আরও একযুগ তপস্যা করতে হয় তাও করব। অতঃপর; তিনি সে পাপিষ্ঠ প্রেমিককে হত্যা করলেন। রজনী ভোর হলো। সূর্য্যের আলো চারিদিকে দৃশ্যমান হতে আরম্ভ করলো। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দেখতে পেলেন; উক্ত মরাগাছটি ফুলেফলে সুশোভিত হয়ে ওঠেছে। সে হতে মহাদস্যু নিজাম নিজামুদ্দিন অলিতে পরিণত হলেন। বর্তমানে প্রায় অধিকাংশ মুসলমান মনীষীর মুখেই এ চমৎকারটি শুনতে পাওয়া যায়। এখানেও; বলে রাখা প্রয়োজন যে; হিন্দু ও মুসলমান রূপকারদের চমৎকার নির্মাণের সূত্র ও উপাদান এক ও অভিন্ন। শুধু তাই নয়; বিশ্বের সব ভাষার সব শ্বরবিজ্ঞানের সর্বপ্রকার চমৎকার নির্মাণের সূত্র ও উপাদান এক ও অভিন্ন। বিশ্বের সব শ্বরবিজ্ঞানের চমৎকার এক ও অভিন্ন সূত্র দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। এজন্য; একটি সফটওয়ার নির্মাণ করে এক ক্লিকে পুরো পুরাণকে কুরান আকারে; কুরানকে বেদ আকারে; ত্রিপিটককে কুরান আকারে; এবং কুরানকে ত্রিপিটক আকারে পড়া যাবে। যেমন; কম্পিউটার ও মোবাইলের ভাষা পরিবর্তন করা যায়। বৈদ্যুতিক যন্ত্রাদির ভাষা পরিবর্তনের মতোই শ্বরবিজ্ঞানের ভাষা পরিবর্তন করা যাবে।

অত্যন্ত মজার বিষয় হলো সারা বিশ্বের সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মনীষী, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবিদ ও অনুবাদকরা শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ ও পুরাণে বর্ণিত রূপক ও কাল্পনিক ঘটনাগুলোকে বাস্তব ঘটনা বলে বুঝে ও বুঝিয়ে থাকে। এসব যে মানুষের শিক্ষামূলক উপমা, এসব যে নির্মাণকৃত পৌরাণিক কাহিনী, এসব যে মানবিক সূক্ষ্ম কার্যকলাপের রূপক উপমা সাম্প্রদায়িকরা জানেও না এবং বুঝেও না। তাই; যুগে যুগে সাম্প্রদায়িকদের মধ্য থেকে কেবলই সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের আবির্ভাব হয়েছে। সাম্প্রদায়িকরা কখনই কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিক সৃষ্টি করতে পারে নি। মুসলমান রূপকারগণ এ চমৎকারটি নির্মাণ করতে যেসব উপাদান ব্যবহার করেছেন তা নিচে তুলে ধরা হলো।

আরবীয় পৌরাণিক চমৎকারটির উপাদানাদি (The elements of the Arabian mythological miracle)

ক্র মূলক রূপক উপমান চারিত্রিক ছদ্মনাম
১. উপস্থ (যোনিশিশ্ন) কণ্ডনি প্রেমিক যুগল ভগবান
২. কৈশোরকাল বনবাস ১২ বছর
৩. চন্দ্রচেতনা আগুন কামভাব
৪. জ্ঞান গুরু পথচারী, সাধুবাবা চৈতন্য সন্ন্যাসী
৫. দেহ পৃথিবী অরণ্য, মরাগাছ, সমাধি, সাধনবৃক্ষ
৬. বলাই (শিশ্ন) বিম্বল দড়ি, প্রেমিক মদন
৭. বৈতরণী (যোনিপথ) নদী পথ
৮. ভগ (জরায়ুমুখ) ঘাট মহাদস্যু ভৃগুমুনি নিজাম
৯. যৌবনকাল সেতু সুশোভিত গাছ
১০. শুক্র ধন, সম্পদ প্রেমিকা রতী
১১. শুক্রধর অটল মুক্তি
১২. শুক্রপাত পাপ, মৃত্যু অপকর্ম, দস্যুবৃত্তি হত্যা
১৩. মূলমন্ত্র মন্ত্র আল্লাহ

প্রায় তিন হাজার বছর (৩,০০০) পূর্বে সংস্কৃত ভাষায় নির্মিত বাঙালী পৌরাণিক চমৎকার ও প্রায় আটশত বছর (৮০০) পূর্বে ফার্সি ভাষায় নির্মিত আরবীয় পৌরাণিক চমৎকার দুটির মধ্যে কিছু আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উপরোক্ত চমৎকার দুটি নির্মাণের মধ্যে প্রায় বাইশ শত বছর (২,২০০) সময়ের ব্যবধান রয়েছে। এছাড়াও; রয়েছে ভাষার ব্যবধান। তবুও; চমৎকার দুটির নির্মাণের মোট ১৮টি উপাদানের মধ্যে ১৩টি উপাদান অবিকল দেখতে পাওয়া যায়। চমৎকারগুলো নির্মাণের কৌশল ও সূত্রগুলো যদি এক ও অভিন্ন না হতো; তবে এমন অবিকল হওয়া কখনই সম্ভব হতো না। চমৎকার তো সরাসরি পুরাণ। আর সারা বিশ্বের সব রূপকারের জন্য পুরাণ নির্মাণ উপাদান এক ও অভিন্ন। পুরাণ নির্মাণ উপাদান শিরোনামে এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো পুরাণ নির্মাণের উপাদান সম্পর্কে জানা ও বুঝা সবারই একান্ত প্রয়োজন। এখনও যারা চমৎকার সম্পর্কে বুঝে না। এখনও চমৎকার নির্মাণের উপাদান সম্পর্কে যাদের জ্ঞান নেই। যেমন; তারা সাম্প্রদায়িক মতবাদ সম্পর্কেও বুঝে না; তেমনই; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ পড়েও বুঝে না। হোক সে ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব বা ঠাকুর-পুরোহিত। অথবা হোক সে আল্লামা-আলেম বা মোল্লা-মুন্সি। ভারতবর্ষের চমৎকারকে আরবীয়রা মুজেযা বলে থাকে। এছাড়াও; কেউ কেউ কারামতও বলে থাকে। চমৎকার, মুজেযা ও কারামত যাই বলি না কেন। এসব কেবল বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার ছদ্মনাম ও পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র দ্বারা নির্মাণ করা হয়। তাই; সারা বিশ্বের সব পুরাণে বর্ণিত চমৎকার, মুজেযা ও কারামতের বিষয়বস্তু এক ও অভিন্ন। কেবল ভাষার পার্থক্য মাত্র। চমৎকার দুটির নির্মাণ উপাদানাদি নিচে তুলে ধরা হলো।

চমৎকার দুটি নির্মাণ করার উপাদানাদি (Construction ingredients of the two miracles)

ক্র মূলক রূপক উপমান চারিত্রিক ছদ্মনাম
১. উপস্থ কণ্ডনি যমজপুত্র, প্রেমিক যুগল ভগবান
২. কানাই রজকিনী লব
৩. কাম (সঙ্গম) উপাসনা কামক্রীড়া
৪. কৈশোরকাল বনবাস ১২ বছর
৫. চন্দ্রচেতনা আগুন কামভাব
৬. জরায়ু নিধুয়া স্বর্ধধাম
৭. জ্ঞান গুরু পথচারী, সাধুবাবা চৈতন্য, সন্ন্যাসী ব্রহ্মা
৮. দেহ পৃথিবী অরণ্য, উইঢিবি, মরাগাছ, মর্ত্যধাম, সমাধি, সাধনবৃক্ষ স্থান
৯. পালনকর্তা সাঁই রামচন্দ্র
১০. বলাই (শিশ্ন) বিম্বল ক্রৌঞ্চ, দড়ি, প্রেমিক, ব্যাধ, লক্ষ্মণ, বাল্মীক মদন কুশ
১১. বৈতরণী (যোনিপথ) নদী তমসা নদী, পথ বৈতরণী
১২. ভগ (জরায়ুমুখ) ঘাট দস্যু/ মহাদস্যু ভৃগুমুনি, নিজাম রত্নাকর
১৩. ভৃগু (জরায়ুমুখ) ত্রিবেণী আখেটক, পথচারী, ভৃগুমুনি নারদ
১৪. যৌবনকাল সেতু সুশোভিত গাছ
১৫. শুক্র ধন, সম্পদ প্রেমিকা ক্রৌঞ্চী, সীতা সম্পদ
১৬. শুক্রধর অটল মুক্তি
১৭. শুক্রপাত মৃত্যু অপকর্ম, দস্যুবৃত্তি, পাপ হত্যা
১৮. মূলমন্ত্র মন্ত্র আল্লাহ, হরে কৃষ্ণ হরে রাম

চমৎকার দুটির মূলশিক্ষা (Basic education of the two miracles)
উপরোক্ত চমৎকার দুটির মূলশিক্ষা হলো; রমণে শুক্র নিয়ন্ত্রণের দ্বারা ক্রমে ক্রমে কাম হতে নিষ্কামিতা অর্জন করা। এখানে; মানুষ হত্যা দ্বারা শুক্রপাত বুঝানো হয়েছে। যেহেতু; একবার শুক্রপাতের দ্বারা অসংখ্য শুক্রকীট হত্যা করা হয়। বিজ্ঞনীরা বলে; মানুষ একবার কাম করলে; যে পরিমাণ শুক্রপাত হয়; তারমধ্যে; প্রায় চার কোটি (৪,০০,০০,০০০) শুক্রাণু থাকে। যারা শুক্রপাত করে তাদেরকে আবার গর্ভে যেতে হয়। অতঃপর; মাত্র ৩০৯ দিন বা ৩১০ দিন গর্ভবাস (অজ্ঞাতবাস, অন্তর্বাস, বনবাস) পর্ব শেষ করে পুনর্জন্ম গ্রহণের দ্বারা আবার এ ভূপৃষ্ঠে আসতে হয়। অর্থাৎ; আবার সন্তান রূপ-ধারণ করতে হয়। জন্ম হতে প্রায় বারো (১২) বছর পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীদের মরাগাছ বলা হয়। এসময় তাদের চন্দ্রচেতনা (যৌনোত্তেজনা) থাকে না। তাই; কামযজ্ঞও করতে পারে না। কামযজ্ঞ না থাকার কারণে তাদের নিকট শুক্র-মতিও থাকে না। এজন্য; জন্ম হতে বারো (১২) বছর পর্যন্ত বয়সকে অচন্দ্রচেতন (ঘুমন্তকাল, মরাদেহ) বা মরাগাছ বলা হয়। অতঃপর; এগারো হতে চল্লিশ (১১-৪০) বছর পর্যন্ত বয়সকালকে তারুণ্যময় ও শুক্র-মতি সদৃশ ফুলেফলে ভরা উদ্দীপ্তকাল বা যৌবনকাল বলা হয়। এ সময়ে আত্মজ্ঞানী পাকাগুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে শুক্রপাত সদৃশ নরহত্যা বা আত্মহত্যা বন্ধ করতে হয়। অতঃপর; অটল হওয়া দ্বারা কাম হতে নিষ্কামী হতে হয়। শ্বরবিজ্ঞানে; নিষ্কামী হওয়াকেই পূর্ব জন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত শেষ হওয়া বলা হয়। এসব স্পষ্ট কথা সরাসরি বলা যায় না। এজন্য; শ্বরবিজ্ঞানের আশ্রয় গ্রহণ করে পৌরাণিক কাহিনীর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়। যার প্রমাণ বিশ্বের সব সাম্প্রদায়িক মহাকাব্যে দেখা যায়। যেমন;

১.   “ভিড় হ্রাস হলে; কানীনের চারপাশের লোকেরা এবং তার বারোজন শিষ্য সে গল্পের বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন। অতঃপর; কানীন বললেন; “কাঁইয়ের রাজ্যের গোপন সত্য একমাত্র তোমাদেরকেই জানতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু; অন্যদের নিকট রূপক গল্পের মধ্য দিয়ে সমস্ত কথা বলা হয়েছে। যেন পবিত্র গ্রন্থের কথামত তারা তাকিয়ে দেখতে না পায়। এবং শুনেও বুঝতে না পারে। তাহলে হয়তো তারা কাঁইয়ের দিকে ফিরবে এবং ক্ষমা পাবে।” (ইঞ্জিল, মার্ক- ৪/১০- ১২)

২.   “وَسَكَنتُمْ فِي مَسَاكِنِ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ وَتَبَيَّنَ لَكُمْ كَيْفَ فَعَلْنَا بِهِمْ وَضَرَبْنَا لَكُمْ الْأَمْثَالَ” অর্থ; “যারা আপন জীবনের প্রতি অত্যাচার করেছে। তারা তাদের স্থানেই বাস করেছে। তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছি তা তোমাদের নিকট প্রকাশিত হয়েছে। এবং তোমাদের জন্য উপমাস্বরূপ বর্ণনা করেছি।” (কুরান, ইব্রাহিম- ৪৫)

এছাড়াও; বিশ্বের প্রায় সব মহা গ্রন্থে রূপকার্থে পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা করার প্রমাণ রয়েছে। স্বরণীয় বিষয় হলো যে; পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে; সাহিত্য চার প্রকার। যেমন; ১.সাধারণ সাহিত্য ২.লোক সাহিত্য, ৩.লোকসাহিত্য ও ৪.পৌরাণিক সাহিত্য। সাম্প্রদায়িক গ্রন্থে বর্ণিত চমৎকার, মুজেযা ও কারামতগুলোকেই পুরাণ বলা হয়। কেবল রূপক বিষয়বস্তু দ্বারা এ সাহিত্যটি নির্মাণ করা হয়। কেবল পুরাকারে ঘটনা দ্বারা এ সাহিত্যটি নির্মাণ করা হয়। এজন্য; একে পুরাণ বলা হয়।

সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ (Schismatical book)
সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ (বাপৌছ)বি সাম্প্রদায়িকদের ধর্মাচার গ্রন্থ, সাম্প্রদায়িক নীতি সম্বলিত গ্রন্থ।

সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের সংজ্ঞা (Definition of schismatical book)
সাধারণত; সাম্প্রদায়িকরা যে গ্রন্থের নিয়মনীতি আবশ্যক রূপে মান্য করে তাকে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ বলে।

এখানে; আরও একটু বলে রাখা প্রয়োজন যে; এযাবৎ বিশ্বে যত প্রকার সাহিত্য নির্মিত হয়েছে; তারমধ্যে; এ পুরাণই সর্বাপেক্ষা পুরনো। এটিই আজ পর্যন্ত সার্বজনীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আরও বলা যায় যে; পুরাণ হতেই সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের উদ্ভব হয়েছে। মূলতঃ; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ নতুন কোনো স্বাধীন বা অনন্য সাহিত্য নয়। কারণ; পুরাণ হতে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ সৃষ্টি করা হয়। বিশ্ববিখ্যাত রূপকারগণ যুগে যুগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে রূপকার্থে পুরাণ নির্মাণ করেন; মানুষের নৈতিক শিক্ষা এবং সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন পদ্ধতি প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য। রূপকারদের প্রয়াণোত্তর কালে সাম্প্রদায়িক মনীষীরা সেসব সুমহান ও বিশ্ববিখ্যাত পুরাণকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক নীতিমালা ও সাম্প্রদায়িক গ্রন্থাদি নির্মাণ করে। সেজন্য; বলা হয়; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ প্রকৃতপক্ষে কোনো মৌলিক সাহিত্য নয়। “শ্বরবিজ্ঞানে; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থকে পুরাণের পরগাছা বলা হয়।” সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ হলো পুরাণে বর্ণিত দেবতার ওপর ধারাবাহিক ও অলৌকিকভাবে নির্মিত চমৎকার সমগ্র।

সারাবিশ্বের সব সাম্প্রদায়িক গ্রন্থে দেবতাগণকে স্বর্গীয় অবতার নামে উল্লেখ করা হয়। পুরাণ যেভাবে বাস্তব জ্ঞান দ্বারা নির্মাণ করা হয়; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ তেমন বাস্তব জ্ঞান দ্বারা নির্মাণ করা হয় না। সাম্প্রদায়িক গ্রন্থগুলো কেবল অন্ধবিশ্বাস নির্ভর করেই নির্মাণ করা হয় (এখানে; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ বলতে মূল গ্রন্থের ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলোকে বুঝানো হয়েছে)। চরম বাস্তবতা নির্ভর পুরাণ এবং চরম অন্ধবিশ্বাস নির্ভর সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। এজন্য; শ্বরবিজ্ঞানে বলা হয়; সব পুরাণই সাহিত্য কিন্তু সব সাহিত্যই পুরাণ নয়। তবে সাধারণ পাঠক ও শ্রোতাকুল তা সহজে অনুমান করতে পারে না। পৌরাণিক সাহিত্যাদি নির্মিত হয় সুমহান আত্মজ্ঞানী দার্শনিক ও সুবিজ্ঞ রূপকারদের দ্বারা। অন্যদিকে; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ নির্মিত হয় নির্বোধ সাম্প্রদায়িক মনীষী, বৈখ্যিক ও টৈকিকদের দ্বারা। সাম্প্রদায়িক মনীষী ও বৈখ্যিকরা কেবল শ্বরবিজ্ঞানের মনগড়া ব্যাখ্যাই করতে পারে। কিন্তু অভিনব পুরাণ নির্মাণ করতে পারে না। তবে; দুয়েকজন এমনও রূপকার রয়েছে; যাঁরা শ্বরবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও করতে পারে। আবার অভিনব পুরাণ নির্মাণও করতে পারে। বেদব্যাস, জারির তাবারী ও বলন কাঁইজি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এ সূত্র অনুযায়ী ভারতবর্ষে বেদ ও গীতা শ্বরবিজ্ঞান। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ পুরাণ। অন্যদিকে; উপনিষদ, পুরোহিতদর্পণ সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ। তেমনই; গ্রিক অঞ্চলে বাইবেল, তোরাহ, যাবুর ও ইঞ্জিল শ্বরবিজ্ঞান। কিন্তু ইলিয়াড, ওডিসি ও ঈনিদ পুরাণ। তাদৃশ পারস্য অঞ্চলে কুরান শ্বরবিজ্ঞান। কিন্তু কাসাসুল কুরান, কাসাসুল আউলিয়া, হেকায়াতে সাহাবা প্রভৃতি পুরাণ। অন্যদিকে; হাদিস, ফেকা, তাফসির সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ। এসব কারণে প্রত্যেককে আগে দেখতে হবে কোনটি শ্বরবিজ্ঞান, কোনটি পুরাণ ও কোনটি সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ।

পৌরাণিক সাহিত্য ও সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের পার্থক্য

(Differences between mythological literature and schismatical book)

পৌরাণিক সাহিত্য সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ
১. শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তার পৌরাণিক চরিত্রায়ন করে রূপকভাবে নির্মিত সাহিত্যকে পৌরাণিক সাহিত্য বলে। ১. সাম্প্রদায়িকদের শাস্ত্রীয় গ্রন্থকে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ বলে।
২. এ সাহিত্যের কাজ হলো নতুন নতুন চমৎকার ও দেবতা সৃষ্টি করা। ২. এর কাজ মানুষ ও স্বর্গীয় অবতারদের অলৌকিককার্য নির্মাণ করা।
৩. এর কাজ হলো রূপক বর্ণনার মাধ্যমে শুক্রনিয়ন্ত্রণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, সুখীপরিবার গঠন ও সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠনের সুশিক্ষা প্রদান করা। ৩. এর কাজ হলো অন্ধবিশ্বাসপ্রবণ অলৌকিক পৌরাণিক কাহিনীর ওপর নির্ভর করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন করা।
৪. এর দ্বারা মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়। ৪. এর দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়।
৫.  এর দ্বারা ব্যক্তি কেন্দ্রিক শিক্ষা দেওয়া হয়। ৫.  এর দ্বারা সামগ্রিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
৬. এর সৃষ্টি আছে কিন্তু ধ্বংস নেই। ৬. এর সৃষ্টি ও ধ্বংস উভয় আছে।
৭. এটি; সুবিজ্ঞ শ্বরবিজ্ঞানীদের দ্বারা নির্মিত হয়। ৭. এটি; সাম্প্রদায়িক মনীষীদের দ্বারা নির্মিত হয়।
৮. কেবল আত্মতত্ত্ব হতে শ্বরবিজ্ঞানের উৎপত্তি। ৮. কেবল শ্বরবিজ্ঞান হতে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের উৎপত্তি।
৯. এটি; আদি বিজ্ঞান। ৯. এটি; কৃত্রিম সাহিত্য।
১০. এর আবিষ্কারের বয়স ছয় হাজার (৬,০০০) বছর। ১০. এর আবিষ্কারের বয়স দুই হাজার পাঁচশত (২,৫০০) বছর।

শ্বরবিজ্ঞান নির্মাণের গোড়ার কথা

(The earlier speak of the theology construction)

মানবসভ্যতার সপ্তযুগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা, বিষয়টিকে আরও স্বচ্ছ করে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। মানবসভ্যতার সাতটি যুগ হলো;

১.   আধুনিকযুগ (১,৯০০ খ্রিস্টাব্দ হতে বর্তমানকাল পর্যন্ত)।

২.   মধ্যযুগ (১,৬০০- ১,৮০০ খ্রিস্টাব্দ)।

৩.   আদিমযুগ (১,২০০- ১,৫০০ খ্রিস্টাব্দ)।

৪.   ধাতুরযুগ (১,১০০- ১,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।

৫.   প্রস্তরযুগ (১,৬০০- ৬,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।

৬.   প্রগৈতিহাসিকযুগ (৬,১০০- ৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।

৭.   আদিযুগ (৮,১০০- ৪৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।

উল্লেখ্য; আধুনিক বিজ্ঞানীদের সর্বসম্মতিক্রমে পৃথিবীর আদিপ্রাণী অম্বুকের উদ্ভবের পর হতেই জীবসভ্যতার যুগ ধরা হয়। তবে; কেবল ৪৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতেই মানবসভ্যতা যুগ ধরা হয়। পদার্থযুগ, শক্তিযুগ ও কারযুগকে সভ্যতার যুগ বলা হয় না।

৮.   পদার্থযুগ (১,৫০০,০০,০০,০০০- খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

৯.   শক্তিযুগ (১,৫০০,০০,০০,০০০- খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

১০. কারযুগ (১,৫০০,০০,০০,০০০- খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

বর্তমানে অধিকাংশ বিজ্ঞানী একমত যে; প্রায় একঅব্জ পাঁচনর্ব্যুদ (১৫৯) বছর পূর্বে পৃথিবীর আদিপ্রাণী অম্বুকের সৃষ্টি বলে । বর্তমানে অনেক গবেষক ও মনীষী ধারণা করেন যে; প্রায় দশলক্ষ বছর (১০,০০,০০০) পূর্বে মানবজাতির উদ্ভব হয়েছে। মানুষের উদ্ভবের পর হতে প্রায় দুইলক্ষ বছর (২,০০,০০০) মানবসভ্যতার কোনো উন্নয়ন হয় নি। অতঃপর; প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর (৫০,০০০) পূর্বে কিছুটা ইঙ্গিত রূপেই ভাষার আবিষ্কার হয়। তখন হতেই মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা আরম্ভ হয়। মানবসভ্যতার আধুনিকযুগ হতে প্রস্তরযুগ পর্যন্ত শিল্পকলা, স্থাপত্যবিদ্যা ও ভাস্কর্য নির্মাণে মানুষের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন; আধুনিক সভ্যতায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে লোহা, তামা ও ইস্পাত ইত্যাদি। আবার বস্ত্রাদি নির্মাণের জন্য ব্যবহার হচ্ছে তুলা। তেমনই; প্রস্তরযুগে ভাস্কর্য ও শিল্প নির্মাণের জন্য অধিক ব্যবহার করা হতো পাথর ও মাটি।

আদিযুগের মানুষ প্রযুক্তি নির্মাণ, বা প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা প্রযুক্তি নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত উপাদানের ব্যবহার জানতো না। তখন; মানুষের কেবল আহার ও বিহার ব্যতীত সময় কাটানোর মতো কোনো বিনোদন ব্যবস্থাই ছিল না। আহার অন্বেষণ ও বন্য জীবজন্তুর আক্রমণ হতে আত্মরক্ষার জন্য; মানুষ তখন দলবদ্ধ বা সঙ্গবদ্ধভাবে বসবাস করতো। তখন; আহার ও বিহারের ফাঁকে ফাঁকে গোত্রপ্রধান বা দলপ্রধানরা স্বস্ব দল বা গোত্রের উচ্ছৃংখল, বিচ্ছৃংখল, উগ্র ও চরমপন্থীদের সুচ্ছৃংখল, সঙ্গবদ্ধ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শিক্ষামূলক বিভিন্ন ছোটকি বা চমৎকার নির্মাণে ব্যস্ত থাকত। কারণ; তখন ছোটকি বা চমৎকার নির্মাণ করতে কেবল জ্ঞান ভিন্ন অন্য কোনো উপকরণের প্রয়োজন হতো না। আর এসব নির্মাণের জন্য তাদের কাগজ ও লেখনীর কোনো প্রয়োজন হতো না। তখন; এসব তারা মনে মনে নির্মাণ করতো। মুখে মুখে প্রচার করতো। আবার মাঝে মাঝে দলপ্রধানরা স্বস্ব নির্মিত ছোটকি ও চমৎকার বৈঠকীও করতো।

মানুষের আজকের কথ্য ও লেখ্য ভাষা আবিষ্কার ও ভাষার ব্যবহার আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিতের মাধ্যমেই স্রষ্টার ভয়ভীতি দ্বারা দুষ্টদের শাসন ও পালন করা হতো। তখন স্বর্গের সুখ ও নরকের ভয় দেখানো প্রথার প্রচলন ছিল না; তা শক্ত করেই বলা যায়। তবে; স্রষ্টার ভয় যে দেখান হতো তাও বলা যায়। তখন ইঙ্গিতেই বলা হতো স্রষ্টা সবকিছু দেখেন। এজন্য; তোমরা অন্যায় করলে স্রষ্টা তোমাদের শাস্তি দিবেন। রূপকার দলপ্রধানদের নির্মিত ছোটকি বা চমৎকারগুলোর নামধাম ব্যবহার করে অন্যান্য দলপ্রধানরা; তা দ্বারা দুর্বলদের ভয়ভীতি দেখিয়ে শাসন-পালনও করতো।

প্রত্যেক গোত্র-প্রধানরা তখন অন্যায়ের পরিমাণ অনুযায়ী অন্যায়কারীকে শাস্তি অবশ্যই দিতো। তা নাহলে দল বা গোত্র পরিচালনা করা কোনমতেই সম্ভব হতো না। এছাড়াও; তারা অপরাধীদের ইঙ্গিতের মাধ্যমেই তাদের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনাও দিতো। নির্মিত নিরাকার স্রষ্টার ভয় দেখিয়ে দুষ্টদের শাসন করার পদ্ধতি; তখনই রূপকার্থে আবিষ্কার হয়েছিল বা প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল বলে অনুমান করা যায়। এ সাহিত্যের বিষয়বস্তু নিয়ে রূপকার্থে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা, আদিমানব, বর্থ্য, স্বর্গ ও নরক নির্ধারণ করে নির্মিত নীতি ও নৈতিকতা শিক্ষামূলক গল্প-কাহিনীকেই পুরাণ বলা হয়।

এবার শক্ত করেই বলা যায়; প্রগৈতিহাসিকযুগ ও ধাতুরযুগ; এমনকি; প্রস্তরযুগেই এ পুরাণ শিল্পের আবিষ্কার হয়েছিল। কারণ; যে কোনো শিল্প সৃষ্টি করতে হলে অনেক উপকরণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রস্তুরযুগে শিল্পগুলো সৃষ্টি করার কোনো উপাদান অবশ্যই ছিল না। তাই; শিল্পকার্যে মানুষ আত্মনিয়োগ করতে পারতো না। কিন্তু পুরাণ নির্মাণ করতে কেবল জ্ঞান ও বুদ্ধি ভিন্ন অন্য কোনো উপাদানের প্রয়োজন হয় না। পুরাণ শিল্পের মূল উপাদান হলো চারটি। যথা; ১. পৌরাণিক মূলক সত্তা ও ২. পৌরাণিক রূপক পরিভাষা এবং ৩. পৌরাণিক মূলক সংখ্যা ও ৪. পৌরাণিক রূপক সংখ্যা। এ দ্বারাই দেবতা ও চমৎকার অনায়াসে সৃষ্টি করা যায়। আর এসব উপাদান মানবদেহেই অফুরন্ত পাওয়া যায়। বর্তমানকালের পুরাণ নির্মাতা রূপকারদের উচিত সর্বপ্রথমে শ্বরবিজ্ঞানের মৌলিক উপাদানের The basic elements of  Theology . নরদেহের আদিকারণ (শুক্র) . নারীদেহের আদিকারণ (রজ) . বর্থ্য (ব্যত্যয়কারী) . সংহারকর্তা (কামোত্তেজনা) . সৃষ্টিকর্তা (কালো বর্ণের মানবজল) . পালনকর্তা (সাদা বর্ণের মানবজল) . দৈবকর্মী (ইন্দ্রিয়াদি) . মুক্তি (অটল) . সাংবাদিক (মুখের কথা, বলন) ১০. স্বর্গ (শান্তি) (স্বর্গের পরিমাণ; শান্তি আগমন কারণ) ও ১১. নরক (অশান্তি) (নরকের পরিমাণ; অশান্তি আগমন কারণ); আকার-প্রকার, আয়তন-অবস্থান, আবাস-নিবাস, বংশসারণী, সংখ্যা পরিমাণ ও কার্যক্রম নির্ধারণ করা। অতঃপর; স্রষ্টা সম্মেলন ও দৈব সম্মেলন ইত্যাদি নির্ধারণ করা। অতঃপর; তাদের সবার ছদ্মনাম নির্ধারণ করা। তারপর; কেবল পুরাণ নির্মাণ আরম্ভ করা উচিত। যেমন; বাঙালী পুরাণ অনুসারে;আরও বলা যায়; প্রাগৈতিহাসিক যুগ হতেই পৌরাণিক সাহিত্য গুরু পরম্পরার মাধ্যমে কালাতিপাত করতে করতে লেখনপদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এসেছিল। অতঃপর; লেখন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ায় তা চামড়া, প্রস্তর ও গাছের পাতায় লিখে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়। তারপর; কাগজ আবিষ্কার হওয়ার পর পুরাণগুলো গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করা আরম্ভ হয়। এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না যে; পৃথিবীর কোনো প্রদেশে প্রথম শ্বরবিজ্ঞানের আবিষ্কার আগে হয়েছিল। তবে; এশিয়া মহাদেশেই সর্বপ্রথম মানববসতি স্থাপিত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষণালব্ধ অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সূত্র ধরে বলা যায়; পুরাণ সর্বপ্রথম উদ্ভাবন হয়েছিল এশিয়া মহাদেশে। বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা ও ব্যাপক পরিভাষা নির্মাণ করে সাহিত্য নির্মাণ; এটি একটি শিল্প। এ শিল্পটির নাম পৌরাণিক শিল্প। অত্যন্ত বাস্তবতার ভিত্তিতে বলা যায়; পুরাণ নির্মাণ শিল্পটি মানবসভ্যতার সর্বপ্রাচীন শিল্প। এজন্য; “পৌরাণিক শিল্পকে মানব সভ্যতার প্রথমশিল্প বা আদিশিল্প বলা হয়।” তবে; বিশিষ্ট রূপকার, আচার্য ও ঋষিগণের অভাবে বর্তমানে এ শিল্পটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।

১.    নরদেহের আদিকারণ (শুক্র)          = মনু/ গোবিন্দ/ বিবস্বান/ আদম/ এ্যডাম

২.   নারীদেহের আদিকারণ (রজ)         = শতরূপা/ সরস্বতী/ হাওয়া/ ইভ

৩.   ব্যত্যয়কারী                             = বর্থ্য/ শয়ত্বান

৪.   সংহারকর্তা (কামোত্তেজনা)           = যম/ আযরাইল/ আখেঞ্জেল

৫.   সৃষ্টিকর্তা (কালো বর্ণের প্রাণরস)     = কাঁই/ ব্র‏হ্মা/ ঈশ্বর/ আল্লাহ/ লর্ড

৬.   পালনকর্তা (সাদা বর্ণের প্রাণরস)    = সাঁই/ বিষ্ণু/ রাসুল/ রব

৭.   দৈবকর্মী (ইন্দ্রিয়াদি)                   = দেবতা/ angel/ messenger

৯.   সাংবাদিক (মুখের কথা, বলন)       = বলন/ নারদ/ নবি/ জিব্রাইল/ গ্যাবরিল৮.   মুক্তি                                     = অটল

১০. শান্তি                                     = স্বর্গ

      শান্তি আগমন কারণ                    = স্বর্গের পরিমাণ (৩ ও ৮)

      স্বর্গের ছদ্মনাম                          = বাঙালী পুরাণ অনুসারে; স্বর্গ মোট ৮টি। যথা; ১. ভূর্লোক ২. ভুবর্লোক ৩. স্বর্লোক ৪. মহর্লোক ৫. জনলোক ৬. তপলোক ৭. সত্যলোক ও ৮. অলোক।

১১. অশান্তি                                  = নরক

      অশান্তি আগমন কারণ                 = নরকের পরিমাণ

      নরকের ছদ্মনাম                        = বাঙালী পুরাণ অনুসারে; নরক মোট ২৮টি। যথা; ১. অন্ধকূপ ২. অন্ধতামিস্রা ৩. অবাতনিরোধন ৪. অবীচি ৫. অয়হপান ৬. অসিপত্রবন ৭. কালসূত্রা ৮. কুম্ভীপাকম ৯. কৃমিভোজা ১০. ক্ষারকর্দমা ১১. তপ্তশূর্মী ১২. তামিস্রা ১৩. দন্দশূকা ১৪. পর্যাবর্তনা ১৫. পূয়োধ ১৬. প্রাণবধা ১৭. বজ্রকণ্টকশাল্মালী ১৮. বিসাশনা ১৯. বৈতরণী ২০. মহারৌরব ২১. রক্ষভোজনা ২২. রৌরব ২৩. লালাভক্ষম ২৪. শূকরমুখা ২৫. শূলপ্রোথাম ২৬. সংদংশন ২৭. সারমেয়াদানা ও ২৮. সূচীমুখা। বাঙালী পুরাণ মতে; এসব অশেষ যন্ত্রণার স্থান।

অন্যদিকে; আরবীয় মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক রূপক সংস্কার মতে;

১.    নরদেহের আদিকারণ (শুক্র)          = আদম (ﺁﺪﻢ)

২.   নারীদেহের আদিকারণ (রজ)         = হাওয়া (ﺤﻮﺍﺀ)/ নবি (ﻧﺑﻰ)

৩.   ব্যত্যয়কারী (বর্থ্য)                     = শয়ত্বান (ﺸﻴﻄﺎﻦ)

৪.   সংহারকর্তা (কামোত্তেজনা)           = আযরাইল (ﻋﺫﺭﺍﺌﻴﻞ)

৫.   সৃষ্টিকর্তা (কালো বর্ণের প্রাণরস)     = আল্লাহ (ﺍﻟﻟﻪ)

৬.   পালনকর্তা (সাদা বর্ণের প্রাণরস)    = রাব্বা (ﺮﺐ)/ রাসুল

৭.   দৈবকর্মী (ইন্দ্রিয়াদি)                   = ‘ملاك’ (মালাকি)

৮.   মুক্তি (শুক্র নিয়ন্ত্রণ)                    = আলি (ﻋﻟﻰ)

৯.   সাংবাদিক (মুখের কথা, বলন)       = জিব্রাইল (ﺠﺑﺮﺍﺌﻴﻞ)

১০. শান্তি                                     = জান্নাত (ﺟﻧﺔ)

      শান্তি আগমন কারণ                    = স্বর্গের পরিমাণ

      স্বর্গের ছদ্মনাম                          = ইসলামী পুরাণ অনুসারে; স্বর্গ ৮টি। যথা; ১. জান্নাতুল আদন (ﺟﻧﺖ ﺍﻟﻌﺪﻦ) ২. জান্নাতুল ক্বারার (ﺟﻧﺖ ﺍﻠﻘﺮﺍﺮ) ৩. জান্নাতুল খুলদ (ﺟﻧﺖ ﺍﻟﺨﻠﺪ) ৪. জান্নাতুস সালাম (ﺟﻧﺖ ﺍﻠﺴﻼﻡ) ৫. জান্নাতুন না’ইম (ﺟﻧﺖ ﺍﻟﻧﻌﻴﻢ) ৬. জান্নাতুল ফেরদাউস (ﺟﻧﺖ ﺍﻟﻔﺮﺪﻮﺱ) ৭. জান্নাতুল মা’ওয়া (ﺟﻧﺖ ﺍﻟﻤﺎﻮﻯ) ও ৮. জান্নাতুল মাকান (ﺟﻧﺖ ﺍﻠﻤﻜﺎﻦ)। অথবা ১. আদন (ﻋﺪﻦ) ২. ক্বারার (ﻘﺮﺍﺮ) ৩. খুলদ (ﺧﻠﺪ) ৪. সালাম (ﺴﻼﻡ) ৫. না’ইম (ﻨﻌﻴﻡ) ৬. ফেরদাউস (ﻔﺮﺪﻮﺲ) ৭. মা’ওয়া (ﻤﺎﻮﻯ) ও ৮. মাকান (ﻤﻜﺎﻦ)।

১১. অশান্তি                                  = জাহান্নাম (ﺠﻬﻧﻢ)/ গেহেন্না

      অশান্তি আগমন কারণ                 = নরকের পরিমাণ

      নরকের ছদ্মনাম                        = ইসলামী পুরাণ অনুসারে; নরক ৭টি। যথা; ১. ওয়াইল (ﻮﻴﻞ) ২. জাহিম (ﺟﺤﻴﻢ) ৩. লাযা (ﻟﻇﻰٰ) ৪. সা’ইর (ﺴﻌﻴﺮ) ৫. সাক্বার (ﺴﻗﺮ) ৬. হাবিয়া (ﻫﺎﻮﻴﺔ) ও ৭. হুত্বামা (ﺤﻄﻤﺔ)।

এবার নতুন নতুন পুরাণ সৃষ্টির জন্য;

১.    নরদেহের আদিকারণ (শুক্র)          = আদিম

২.   নারীদেহের আদিকারণ (রজ)         = আদিমা

৩.   ব্যত্যয়কারী                             = বর্থ্য

৪.   সংহারকর্তা (কামোত্তেজনা)           = যম

৫.   সৃষ্টিকর্তা (কালো বর্ণের প্রাণরস)     = কাঁই

৬.   পালনকর্তা (সাদা বর্ণের প্রাণরস)    = সাঁই

৭.   দৈবকর্মী (ইন্দ্রিয়াদি)                   = দেবতা

৮.   মুক্তি                                     = অখণ্ডতা

৯.   সাংবাদিক (১) (মুখের কথা)          = বলন

১০. সাংবাদিক (২) (নারীদের রজ)       = বসিধ

১১. শান্তি                                     = স্বর্গ

      শান্তি আগমন কারণ                    = স্বর্গের পরিমাণ

      স্বর্গের ছদ্মনাম                          = ১. দৈহিকা ২. বৈচন ও ৩. মৈনাক

১২. অশান্তি                                  = নরক

      অশান্তি আগমন কারণ                 = নরকের পরিমাণ

      স্বর্গের ছদ্মনাম                          = ১. কৈকাজ ২. গোমড়া ও ২. বৈচাল

অর্থাৎ; বিশ্বের অন্যান্য সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদ, শ্বরবিজ্ঞান ও পুরাণে বর্ণিত সত্তার ছদ্মনামের সাথে যাতে অবিকল না মিলে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। এবার কিছু স্থান ও কিছু চরিত্রের অভিনব ছদ্মনাম নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে; স্থান ও চরিত্রগুলোর ছদ্মনাম যাতে অন্যান্য সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদ, শ্বরবিজ্ঞান ও পুরাণের ছদ্মনামের সাথে অবিকল না মিলে। সৃষ্টিকর্তা ও দৈবকর্মীদের সম্মেলন স্থানের ছদ্মনাম সমান সৃষ্টিকর্তার আবাসস্থলের ছদ্মনাম =

দৈবকর্মীদের আবাসস্থলের ছদ্মনাম =

যুদ্ধ সংঘটন স্থানের ছদ্মনাম =

বিনোদন ও ভ্রমণ স্থানের ছদ্মনাম =

চমৎকার নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় চরিত্রের অভিনব ছদ্মনাম;

অনূঢ়ার সন্তান        = কানীন

উপমা                 = চমৎকার/ লৌকিকা

চশমা                  = উচোখ

টেলিভিশন            = চিত্রিকা

দাসী, পরিচারিকা    = মানুরী

দৈবকর্মী             = দেবতা

নায়ক                 = বৈমল্য

নায়িকা                = বৈমলা

বাম                    = সব্য


যৌবন
                = হিল্লোলমহারাণী               = হৈলুপা

রাজা                  = হৈলাদ

মোটাশিরা            = বৈয়াম্বু

সঙ্গম                  = সংগ্রাম (বৈতরণীর ওপর পুনঃ অধিকার প্রতিষ্ঠা)

সহকারী               = ঠাণ্ডু (কৌতুক অভিনেতা)

সিনেমা হল           = চিত্রালয়, চিত্রাগার

স্বর্গীয় গান            = বৈঠকারি

এবার আলোচ্য দেবতা ও স্থানগুলোর ছদ্মনাম দ্বারা চমৎকার বা ছোটকি নির্মাণ আরম্ভ করতে হবে। শুক্রনিয়ন্ত্রণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, সুখী ও সমৃদ্ধশালী ছোট পরিবার গঠন, মানুষের সচ্চরিত্র গঠন ও আত্মশুদ্ধিমূলক বিষয়ের ওপর রূপকার্থে শিক্ষামূলক অত্যন্ত সারগর্ভ ও সংক্ষিপ্তভাবে অভিনব চমৎকার বা ছোটকি নির্মাণ করতে হবে।

আলোচ্য পুরাণ ও সাম্প্রদায়িক মতবাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যে কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্কারের ওপর সুসংগঠিত জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপনের পরিপূর্ণ নীতিমালাকে সাম্প্রদায়িক মতবাদ বলা হয়। কিন্তু বাঙালী পৌরাণিক দেবতাপৌরাণিক সংখ্যা সূত্রগুলোর দ্বারা চমৎকার ও অলৌকিক সাহিত্য নির্মাণ শিল্পকে পুরাণ বলা হয়। বর্তমানে পুরাণ নির্মাণ শিল্পটি মারা গেছে। অন্যদিকে; সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদ নির্মাণ শিল্পটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। কার্যত দেখা যায়; একটি সাম্প্রদায়িক মতবাদের ওপর কয়েকশত কিংবা কয়েক হাজার পর্যন্ত পারম্পরিক মতবাদ গড়ে ওঠেছে। এও দেখা যায় যে; একটি পুরাণের ওপর একাধিক সাম্প্রদায়িক মতবাদ গড়ে ওঠেছে। অর্থাৎ; সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদ নির্মাণ শিল্পটি বর্তমানে অধিক শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে; পুরাণ নির্মাণ শিল্পটি পৃথিবীর বুকে বর্তমানে আর টিকে নেই। এজন্য; পৃথিবীর কোনো প্রদেশেই বিগত প্রায় হাজার বছরের মধ্যে একটিও নতুন বা অনন্য পুরাণ গড়ে ওঠে নি। অর্থাৎ; রামায়ণ, মহাভারত, ভারতীয় পুরাণাদি, ইলিয়াড, ওডিসি, ঈনিদ, হাদিস ও তাফসির ব্যতীত আর কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ পুরাণ বিগত হাজার বছরের মধ্যেও আর গড়ে ওঠে নি। আশা করা যায়; এ পুস্তক-পুস্তিকাগুলো আবার পুরাণ নির্মাণ শিল্পটি গড়ে তুলতে যথেষ্ট সাহায্য করবে।

পুরাণ সমৃদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ভাষাই সমৃদ্ধ হতে পারে না। অর্থাৎ; ভাষা সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য পুরাণের অতীব প্রয়োজন। পৃথিবীর বুকে যে ভাষায় পুরাণ যতোধিক; সে ভাষা ততো সমৃদ্ধশালী। এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় একটিও অনন্য পুরাণ গড়ে ওঠে নি। সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক যেসব পুরাণ এদেশে পাওয়া যায়; সবই সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফার্সি ও গ্রিক হতে অনুবাদকৃত। স্মরণীয় যে; সাধারণ উপন্যাস শ্বরবিজ্ঞান বা পুরাণের মধ্যে গণ্য নয়। যেমন; মেজদিদি। কারণ; এটি; সাধারণ উপন্যাস। অন্যদিকে; বেদ, ত্রিপিটক ও বাইবেল অনন্য শ্বরবিজ্ঞান। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি, ঈনিদ, ‘বিষাদসিন্ধু’, ‘মহাশ্মশান’ শ্বরবিজ্ঞান নির্ভর পুরাণ। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হলে; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে হলে; এখন হতেই অনন্য শ্বরবিজ্ঞান ও পুরাণ নির্মাণ আরম্ভ করতে হবে। আর বাংলা ভাষায় পুরাণ নির্মাণ আরম্ভ করতে হলে এর সূত্র ও তথ্য-উপাত্ত প্রণয়ন করা অর্থাৎ; শ্বরবিজ্ঞান নির্মাণ করা অতীব প্রয়োজন। এজন্য; এখনি বিশেষ কিছু লেখক ও গবেষকের এর ওপর কাজ আরম্ভ করা উচিত। এ কাজ সফলভাবে করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ; ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন কাজ করা অনেক কঠিন ব্যাপার। নিচে পুরাণ ও সাম্প্রদায়িক মতবাদের পার্থক্য তুলে ধরা হলো।

পৌরাণিক সাহিত্য ও সাম্প্রদায়িক মতবাদের পার্থক্য

(Difference between fabulous literature and schismatical doctrine)

পৌরাণিক সাহিত্য সাম্প্রদায়িক মতবাদ
১. বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর দ্বারা রূপকভাবে নির্মিত সাহিত্যকে পৌরাণিক সাহিত্য বলে। ১.   নির্দিষ্ট সংস্কারের ওপর সুসংগঠিত জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের পরিপূর্ণ নীতিকে সাম্প্রদায়িক মতবাদ বলে।
২. এর নির্মাতাকে রূপকার বলে। ২.   এর নির্মাতাকে সাম্প্রদায়িক মনীষী বলে।
৩. দেবতা, পৌরাণিক মূলক সংখ্যা ও সংখ্যা সূত্রের দ্বারা পৌরাণিক সাহিত্য নির্মাণ করা হয়। ৩. পৌরাণিক সাহিত্য হতে সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ করা হয়।
৪. এটি; নির্মিত হয় আগে। ৪. এটি; নির্মিত হয় কয়েকশত বছর পরে।
৫. এর ভিত্তি মানবদেহ। ৫.  এর ভিত্তি পৌরাণিক সাহিত্য ও অন্ধবিশ্বাস।
৬. এটি; বিশ্বাবাসীর সাহিত্য সম্পদ। ৬. এটি; নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্পদ।
৭. এটি; নির্মাণ করা অত্যন্ত কঠিন। ৭. এটি; নির্মাণ করা অপেক্ষাকৃত সহজ।
৮. এর মূলশিক্ষা আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন। ৮. এর মূলশিক্ষা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শান্তিশৃংখলা রক্ষা করা।
৯.  এর দ্বারা মানুষ মহান ও বিশ্ব বরেণ্য রূপে গড়ে ওঠে। ৯. এর দ্বারা মানুষ উগ্র, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধোন্মাদ রূপে গড়ে ওঠে।

চমৎকার নির্মাণের উপাদান

(The construction components of the miracle)

বিশ্বের সর্বত্র সর্বভাষায় ও সর্ব মতবাদে চমৎকার রূপে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী ও লোককথা নির্মাণের মূল উপাদান এক ও অভিন্ন। বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত ৯৯টি বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা ও সংখ্যা-সূত্রগুলোর দ্বারা চমৎকার নির্মাণ করা হয়। নায়ক-খলনায়ক, নায়িকা-খলনায়িকা ও স্থান রূপে শতাধিক বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা ব্যবহার করে পৌরাণিক চমৎকার নির্মাণ করা হয়। আর দিবস ও বর্ষ রূপে পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত সংখ্যাগুলো ব্যবহার করে রূপক চমৎকার নির্মাণ করা হয়। উল্লেখ্য; শ্বরবিজ্ঞানের ৯৯টি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর বাইরে চমৎকার, মুজেযা ও কারামত হয় না। শ্বরবিজ্ঞানের ষড়াশ্রয়ের সর্বশেষ স্তর রূপাশ্রয়ে প্রবেশকারী মহান রূপকারগণ বিশ্ববিখ্যাত চমৎকার নির্মাণ করেন।


৪০ পৌরাণিক মূলক সংখ্যা
সব চমৎকারই বিজ্ঞ রূপকার, সাধু, সন্ন্যাসী বা সুবিজ্ঞ মনীষীদের সৃষ্টি। চমৎকার অর্থই বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীপৌরাণিক সংখ্যা সারণী দ্বারা নির্মিত মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর কার্যকলাপের রূপক ব্যাখ্যা বা রূপক বিবরণ। আত্মতত্ত্বের বাইরে চমৎকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। যদিও সাম্প্রদায়িক পৌরাণিক কাহিনী শোনার পর বাস্তব কিংবা অতিবাস্তব বলে মনে হয়। চমৎকারে ব্যবহৃত সুন্দর সুন্দর ও অনুপম নামগুলোকেই দেবতা বলা হয়। লোকমুখে প্রচারিত পৌরাণিক কাহিনীগুলোই চমৎকার। যেসব পৌরাণিক কাহিনী উপমিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তাগুলো শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার সাথে হুবহু বা অবিকল মিলে যায় কেবল সেসবই প্রকৃত চমৎকার। চমৎকারের উপাদানাদি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর সাথে অমিল হলে তা সাধারণ চমৎকার বা ভ্রান্ত ও উদ্ভুট্টি গল্পগুজব। এ ভ্রান্ত ও উদ্ভুট্টি গল্পগুজব শ্বরবিজ্ঞানের অংশ নয়। তবে; তাত্ত্বিক চমৎকার হলে তা অবশ্যই শ্বরবিজ্ঞান। শ্বরবিজ্ঞানে; আলোচ্য চমৎকারগুলোকেই প্রপক বলা হয়। চমৎকার নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়; বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর ৯৯টি বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক, চারিত্রিক ও ছদ্মনাম পরিভাষা এবং বাঙালী পৌরাণিক মূলক সংখ্যাগুলো। বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক নামে দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক চরিত্রকে দেবতা বলা হয়। যেমন; কয়েকজন বাঙালী পৌরাণিক দেবতা হলেন; অটল, অর্যমা, ঊষা, কাঁই, বলন, লালন ও সাঁই প্রভৃতি। চমৎকার নির্মাণের জন্য দেবতা ছাড়াও গাণিতিক যেসব পৌরাণিক মূলক সংখ্যা ব্যবহার করা হয় তা নিচে তুলে ধরা হলো।

(40 mythological radical number)

সারাবিশ্বের সব শ্বরবিজ্ঞানে ও পুরাণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০টি পৌরাণিক মূলক সংখ্যার সন্ধান পাওয়া যায়।

পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সংখ্যা

(Mythological real radical number)

. এক নিরীক্ষ . দুই ফল . তিন তার . চার চন্দ্র . পঞ্চ বাণ . ছয় রিপু . সাত কর্ম . আট অঙ্গ . নয় দ্বার ১০. দশ ইন্দ্রিয় ১১. এগারো রুদ্র ১২. বারো নেতা ১৩. তের নদী ১৪. চৌদ্দ ভুবন ১৫. পনের চল ১৬. ষোলকলা ১৭. আঠারো ধাম ১৮. ঊনিশ রক্ষী ১৯. বিশ কর্মী ২০. একুশ দিন ২১. তেইশ জোড়া ২২. চব্বিশ পক্ষ ২৩. পঁচিশ গুণ ২৪. সাতাশ নক্ষত্র ২৫. ত্রিশ বছর ২৬. বত্রিশ ফুল ২৭. তেত্রিশ দেবতা ২৮. ছত্রিশ রবি ২৯. বাহান্ন হাট ৩০. চুয়ান্ন মাথা ৩১. বাহাত্তর স্পন্দন ৩২. আশি কর ৩৩. চুরাশি ফের ৩৪. দুইশত ছয় জন ৩৫. তিনশত দশ অব্দ ৩৬. তিনশত ষাট মূর্তি ৩৭. পাঁচশত সৈন্য ৩৮. ছয়শত ছেষট্টি ‘প্রপাচ এবং ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি প্রপারিচ ৩৯. হাজার মাস ও ৪০. কোটি ঊর্ণ।

এছাড়াও; বিশ্ববরেণ্য শ্বরবিজ্ঞানীগণ সম্পূর্ণ একমত হয়ে নিচের ১২টি পৌরাণিক রূপক সংখ্যাকেও প্রায় পৌরাণিক মূলক সংখ্যার মতো সমমান বলেই গণ্য করেন। ১. তেত্রিশ দেবতা (স্থাপন) ২. চল্লিশ তলা (যোজক) ৩. তিপ্পান্ন গলি (যোজক) ৪. পঞ্চান্ন ধারা (যোজক) ৫. ষাট হাত (শূন্যক) ৬. তিষট্টি বাই (স্থাপন) ৭. ছেষট্টি তল (স্থাপন) ৮. সত্তর জন (শূন্যক) ৯. সাতাত্তর পালা (স্থাপন) ১০. নব্বই ভাগ (শূন্যক) ১১. নিরানব্বই নাম (স্থাপন) ও ১২. শতদল (শূন্যক)।

এছাড়াও; পৌরাণিক মূলক সংখ্যাগুলোকে আড়াল করে বর্ণনা করার জন্য; যেসব সংখ্যা-সূত্রের দ্বারা পৌরাণিক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করে ব্যবহার করা হয় তা নিচে উল্লেখ করা হলো।

মহাধীমান বলন কাঁইজির পৌরাণিক সংখ্যা সূত্র

(Mythological number formula of omniscient lordship Bolon)

.১.. পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র

(Mythological radical number formula)

.১.. পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র

(Mythological radical numbers formula)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যা দ্বারা পৌরাণিক সংখ্যা নির্মাণ সূত্রকে পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র বলে। যেমন; মানবের দশটি (১০) ইন্দ্রিয় হতে ১০ ভাই

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যা দ্বারা পৌরাণিক সংখ্যা নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র বলে। যেমন; মানবের দশটি (১০) ইন্দ্রিয় হতে ১০ ভাই

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

“মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তুর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যা দ্বারা নতুন পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়।”

.২.০. পৌরাণিক রূপক সংখ্যা সূত্র

(Mythological metaphor number formula)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত পৌরাণিক মূলক সংখ্যা যোগ, গুণ, স্থাপন এবং ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন ‘পৌরাণিক রূপক সংখ্যা’ নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক রূপক সংখ্যা সূত্র বলে।

পৌরাণিক রূপক সংখ্যার সংজ্ঞা

(Definition of mythological metaphor number)

.   মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির পরিমাণ জ্ঞাপক কোনো পৌরাণিক মূলক সংখ্যা আড়াল করে তার যে কৃত্রিম সংখ্যা দ্বারা ছোটকি, উপমা ও পৌরাণিক চমৎকারে ব্যবহার করা হয় তাকে পৌরাণিক রূপক সংখ্যা বলে। যেমন; ৩২,০০০ সৈন্য (৩২ ফুল হতে)।

.   মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর পরিমাণ জ্ঞাপক কোনো পৌরাণিক মূলক সংখ্যাকে আড়াল করে তার সম্পর্কে কিছু বলার জন্য সৃষ্ট কৃত্রিম সংখ্যাকে পৌরাণিকি রূপক সংখ্যা বলে। যেমন; ষাট হতে ষাইট্যা

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

 “একাধিক পৌরাণিক মূলক সংখ্যার যোগ, গুণ, স্থাপক কিংবা শূন্যক পদ্ধতি দ্বারা সৃষ্ট নতুন পৌরাণিক সংখ্যা কে পৌরাণিক রূপক সংখ্যাবলে।”


২.২.৩.০. পৌরাণিক যোজক রূপক সংখ্যা সূত্র

(Mythological adder metaphor number formula)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত পৌরাণিক মূলক সংখ্যা যোগ করে নতুন ‘পৌরাণিক রূপক সংখ্যা’ নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক যোজক রূপক সংখ্যা সূত্র বলে।

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

 “শ্বরবিজ্ঞানে বিভিন্ন পৌরাণিক মূলক সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন পৌরাণিক যোজক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু গণিতে করা যায় না।” যেমন; ৫৩ গলি।

২.২.৪.০. পৌরাণিক গুণক রূপক সংখ্যা সূত্র

(Mythological multiplier metaphor number formula)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত পৌরাণিক মূলক সংখ্যা গুণ করে নতুন ‘পৌরাণিক রূপক সংখ্যা’ নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক গুণক রূপক সংখ্যা সূত্র বলে। যেমন; ২৮।

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত এক বা একাধিক পৌরাণিক মূলক সংখ্যা গুণ করে নতুন পৌরাণিক গুণক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, পৌরাণিক মূলক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।”

২.২.৫.০. পৌরাণিক স্থাপক রূপক সংখ্যা সূত্র

(Mythological installer metaphor number formula)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত পৌরাণিক মূলক সংখ্যা বিভিন্নভাবে স্থাপন করে নতুন ‘পৌরাণিক রূপক সংখ্যা’ নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক স্থাপক রূপক সংখ্যা সূত্র বলে। যেমন; ৯৯৯।

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত এক বা একাধিক পৌরাণিক মূলক সংখ্যা বিভিন্নভাবে স্থাপন করে নতুন পৌরাণিক স্থাপক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, পৌরাণিক মূলক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।”

২.২.৬.০. পৌরাণিক শূন্যক রূপক সংখ্যা সূত্র

(Mythological depletory metaphor number formula)

পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত পৌরাণিক মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন ‘পৌরাণিক রূপক সংখ্যা’ নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক শূন্যক রূপক সংখ্যা সূত্র বলে। যেমন; ৪০।

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

১.   পৌরাণিক মূলক সংখ্যায় শূন্য (০) হ্রাস-বৃদ্ধি করলে; গাণিতিকভাবে দশগুণ পরিবর্তন হয়, কিন্তু; শ্বরবিজ্ঞানে পৌরাণিক মূলক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।”

২.     “পৌরাণিক সংখ্যা সারণীতে বর্ণিত পৌরাণিক মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য হ্রাস-বৃদ্ধি করে নতুন পৌরাণিক শূন্যক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, পৌরাণিক মূলক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।”

চমৎকার নির্মাণ কৌশল (Miracle construction techniques)

দেবতা নির্মাণের চেয়ে চমৎকার নির্মাণ তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহজ। কারণ; দেবতা নির্মাণ অর্থ বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার সম্পূর্ণ অভিনব নাম সৃষ্টি। কিন্তু চমৎকার নির্মাণ অর্থ হলো; অভিনবভাবে সৃষ্ট বাঙালী পৌরাণিক দেবতা, পৌরাণিক মূলক সংখ্যাপৌরণিক রূপক সংখ্যা সূত্রগুলোর দ্বারা শিক্ষামূলক ছোট ছোট পৌরাণিক কাহিনী, ভ্রমণকাহিনী ও যুদ্ধ-কাহিনী নির্মাণ করা। যেমন; কোনো রূপকার পুরুষজাতির শিশ্নের ‘বলা’ বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ্য করে তার ছদ্মনাম বা দেবতা সৃষ্টি করেছে ‘বলাই’। বাংলা ‘বলা’ পরিভাষাটির আভিধানিক অর্থ হলো; “বাড়া, বৃদ্ধি পাওয়া, বড় হওয়া, প্রশস্ত হওয়া (রুটি বলা, গাছটি দ্রুত বলে ওঠল)।” কামোত্তেজনা উপস্থিত হলে পুরুষজাতির শিশ্ন ক্রমে ক্রমে বলে বড় হয়। এজন্য; ‘বলা’ ধাতুর সাথে ‘আই’ প্রত্যয় যুক্ত করে ‘বলাই’ নামক একটি অভিনব দেবতা বা পরিভাষা সৃষ্টি করাই অত্যন্ত কঠিন কাজ। অথবা অত্যন্ত কঠিন আবিষ্কার। যা করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে কোনো রূপকার নারীজাতির যোনির ‘কানা’ বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ্য করে তার ছদ্মনাম বা দেবতা সৃষ্টি করেছে ‘কানাই’। বাংলা ‘কানা’ পরিভাষাটির আভিধানিক অর্থ হলো; “ছিদ্র, ফুটা, রন্ধ্র, ছেঁদা, ফোঁকা, ফাটা, ফাটল, ফাঁক (কানা কলসিতে জল থাকে না)।” যোনির মুখ ছিদ্র বা কানা বলে ‘কানা’ শব্দমূলের সাথে ‘আই’ প্রত্যয় যুক্ত করে ‘কানাই’ নামক একটি অভিনব দেবতা বা পরিভাষা সৃষ্টি করাই অত্যন্ত কঠিন কাজ। অথবা অত্যন্ত কঠিন আবিষ্কার। যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এবার নির্মিত ‘বলাই’ ও ‘কানাই’ দেবতা দ্বারা চমৎকার নির্মাণ আরম্ভ করা যায়। ‘কানাই’ ও ‘বলাই’ দেবতা দ্বারা সৃষ্ট কয়েকটি রূপক শ্লোক তুলে ধরা হলো;

১.   “কানাই বলাই ছিল ভালো, মাছের ধারা তারাই পেল, মাছ ধরিয়া যায় তারা, আমি লালন ভাবছি বসে, সার হলো মোর লালপড়া।” (পবিত্র লালন- ৩৪৯/৫)

২.   “চুরি করে ছয়টি চোরা, আমার বলাই পড়ে ধরা, মারিস না রে নিষ্ঠুর মারা, তোর অথৈ পারাপারে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৫)

৩.   “তোরে জানাই ওরে কানাই, নির্দোষী আমার বলাই, বলন কয় পড়শি জ্বালায়, আমার বলাই চুরি করে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৫)

৪.   “মারিস না কানাই ওরে, যতনের অবুঝ বলাইরে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৫)


বেদব্যাস
(Viviparous)পুরাণ নির্মাণ করার জন্য সর্বপ্রথমে নিজেই দেবতা নির্মাণ করতে হবে। অথবা পূর্বকালে সুমহান রূপকারগণের দ্বারা নির্মিত দেবতাগণের আত্মদর্শন ভিত্তিক প্রকৃত অভিধা উত্তমভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। দেবতাগণের আত্মদর্শন ভিত্তিক বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তাগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করার পূর্বে কোনো ক্রমেই পুরাণ নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া উচিত নয়। যেমন; ‘বরুণ’ দৈবসত্তা দ্বারা মানুষের কোনো সত্তা বুঝায় এবং ‘রাবণ’ দৈবসত্তা দ্বারা কোনো সত্তা বুঝায়? এসব বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষার প্রকৃত অভিধা না জেনে ও না বুঝেই পুরাণ নির্মাণ করতে আরম্ভ করলে; তা হবে চরম আত্মঘাতি। কারণ; একদিকে; হবে ভাষার অপূরণীয় ক্ষতি; অন্যদিকে; পাঠকরা পড়বে চরম বিপদে। যেমন; মরমী গীতিকাররা ‘রাধা’ দেবতা নিয়ে একের পর এক গীতিকাব্য নির্মাণ করেই চলেছে। সবার কেবল একই ধারণা ‘রাধা’ ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পালক মামা আয়েন ঘোষের স্ত্রী এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রেমিকা। তাই; অনেক ক্ষেত্রে গীতিকাব্যের প্রকৃত ভাব উদ্ধার করা যায় না।

মহাগ্রন্থ বেদের বিভাগকর্তা ব্যাস নামক মহর্ষি। তিনি বশিষ্টের প্রপৌত্র, শক্ত্রির পৌত্র, পরাশরের পুত্র ও শুকদেবের পিতা। তার মাতার নাম সত্যবতী। বর্ণ কৃষ্ণ এবং তিনি দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই; তার নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। মহাগ্রন্থ বেদ এর বিভাগকর্তা বেদব্যাস কৃষ্ণদ্বৈপায়ন নামে বিখ্যাত। তিনি বেদকে শতশাখাযুক্ত চারভাবে বিভক্ত করে বেদব্যাস নামে অভিহিত হন। তিনি মহাভারত, অষ্টাদশ মহাপুরাণ ও উপপুরাণ, বেদান্ত দর্শন এবং ভাগবত নির্মাণ করেছেন। ব্যাস সংহিতা তাঁর স্মৃতি ও বেদান্ত তাঁর দর্শন। এছাড়াও; পাতঞ্জল দর্শনের উৎকৃষ্ট টীকাও তিনি প্রণয়ন করেন।

কথিত আছে; মহাভারত লিপিবদ্ধ করবার জন্য তিনি ব্রহ্মার নিকট উপদেশ নিতে গেলে ব্রহ্মা বলেন যে; গণেশই মহাভারতের লিপিকার হবেন। গণেশ এ মর্মে লিপিকার হতে সম্মত হন যে; তিনি একবার লেখতে আরম্ভ করলে তাঁর লেখনী আর থামবে না। ব্যাস ভাবলেন যে; তাঁর নির্মাণে আট হাজার আটশত (৮,৮০০) এমন দুর্বোধ্য শ্লোক রয়েছে; যার অর্থ গণেশ বুঝতে পারবেন কিনা সন্দেহ। এজন্য; ব্যাসও গণেশকে বললেন; “আমি যা বলে যাবো, আপনি তার অর্থ না বুঝে লেখতে পারবেন না।” এতে গণেশ সম্মত হলেন। গণেশ সর্বজ্ঞ হলেও কঠিন কঠিন শ্লোক লেখবার সময়ে তাঁকে বিশেষ চিন্তা করতে হতো। আর সে অবসরে ‘বেদব্যাস’ অনেক শ্লোক মনে মনে নির্মাণ করে নিতেন।

একদিন মৎস্যগন্ধা সত্যবতী পিতার আদেশে যমুনায় নৌকা পারাপার করছিলেন। এমন সময় ঋষি পরাশর পারাপারের জন্য নৌকায় উঠেন। রূপবতী মৎস্যগন্ধাকে দেখে পরাশর অত্যন্ত কামাতুর হয়ে পড়লেন এবং তার সঙ্গম কামনা করলেন। এমন স্থানে ও এমন সময়ে মৎস্যগন্ধা সঙ্গমকার্যে আপত্তি প্রকাশ করলেন। তখন পরাশর কুজ্ঝটিকার সৃষ্টি করে মৎস্যগন্ধাকে জানালেন যে; তাঁর সঙ্গে সঙ্গমের ফলে মৎস্যগন্ধার কুমারীত্বের কোনো ক্ষতি হবে না। পরাশর আরও বর দিলেন যে; মৎস্যগন্ধা সুগন্ধযুক্তা হবেন। এ সঙ্গমের ফলে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের জন্ম হয়। ব্যাসজননী মৎস্যগন্ধা পরে সত্যবতী নামে পরিচিত হন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন জন্মের সাথে সাথেই মাতার অনুমতি নিয়ে তপস্যায় রতো হন। তিনি মাতাকে বলে যান যে; কোনো বিশেষ প্রয়োজনে তাঁকে স্মরণ করলেই তিনি মাতার নিকট উপস্থিত হবেন।

সত্যবতীর সাথে মহারাজ শান্তনুর বিবাহ হয়। তাঁর দু’জন পুত্রের জন্ম হয়। তারমধ্যে; চিত্রাঙ্গদ অতি অল্প বয়সে ও বিচিত্রবীর্য নিঃসন্তান অবস্থায় পরলোকগমন করেন। অতঃপর; সত্যবতীর অনুরোধে ব্যাস বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুকে জন্ম দেন। সঙ্গমকালে ব্যাসের দীপ্ত নয়ন, কৃষ্ণবর্ণ ও পিঙ্গল জটাজুট দেখে অম্বিকা ভয়ে চক্ষু নির্মীলিত করেছিলেন। এজন্য; ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হন। ভয়ে অম্বালিকা পাণ্ডুবর্ণ হয়ে যান বলে পাণ্ডুও পাণ্ডুবর্ণ হন। সত্যবতী অম্বিকাকে পুনর্বার ব্যাসের নিকট যেতে বললেন। তখন; তিনি ভয়ে তার এক রূপসী দাসীকে ব্যাসের নিকট পাঠিয়ে দেন। ব্যাস এ দাসীর গর্ভে বিদুরকে জন্ম দেন। মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাস স্বয়ং জড়িত ছিলেন। ব্যাসের বিধান অনুযায়ীই পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন। তার বরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকালে সঞ্জয় দিব্যচক্ষুলাভ করেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থেকেও ধৃতরাষ্ট্রের নিকট যুদ্ধের ঘটনাবলী বর্ণনা করতে সক্ষম হন। ধৃতরাষ্ট্রাদির প্রার্থনায় তিনি যোগবলে যুদ্ধে মৃত জীষ্মাদিকে দর্শন করিয়ে তাদের পিতা, মাতা ও স্ত্রীদের প্রীত করান। তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে দিব্যচক্ষু দান করেন। বেদব্যাস কৌরব ও পাণ্ডবদের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। বিভিন্ন বিপদকালে তিনি তাদের উপদেশ দিয়ে উপকৃত করতেন। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের পর ইনি পাণ্ডবদের ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী প্রভৃতিকে বিভিন্ন শান্তনা ও সংশয় উচ্ছেদক উপদেশ প্রদান করেন। এসব বিবরণ মহাভারতের স্ত্রী, শান্তি অনুশাসন ও স্বর্গারোহণ পর্বে দেখা যায়।


হযরত মুহাম্মদের চমৎকার
একবার এক অপ্সরাকে দেখে ‘বেদব্যাসে’র রেতঃপাত হয়। অপ্সরা ভীত হয়ে শুকপক্ষীর আকার ধারণ করে পলায়ন করেন। এ রেতঃপাত হতে শুকদেবের জন্ম হয়। রেতঃপাতের পর তিনি শুকপক্ষীকে দেখেছিলেন বলে এ পুত্রের নাম রাখেন শুকদেব। বেদ বিভাগ ও মহাভারত নির্মাণ ব্যতীত বেদব্যাস বেদান্ত দর্শনও নির্মাণ করেন। বাঙালী পুরাণে ব্যাস শ্রীকৃষ্ণের অংশ বলে প্রসিদ্ধ। ভারতীয় বিভিন্ন পুরাণ আলোচনা করে দেখা যায় যে; কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ভিন্ন ভিন্ন কল্পে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাস রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁকে বিষ্ণু ও ব্রহ্মার স্বরূপ বলা হতো। কল্পে কল্পে সাম্প্রদায়িক মতবাদের অবনতি দেখে মতবাদ রক্ষার জন্য মহাপ্রভু ব্রহ্মা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাস রূপে অবতীর্ণ হয়ে বেদ-রক্ষা ও বেদ বিভাগ করে প্রচার করেছেন। ব্যাস ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়। বেদ বিভাগকারী ঋষিদের সম্মানসূচক উপাধি বিশেষ। তবে; বেদব্যাসের উল্লেখ যতসম্ভব একমাত্র বেদ বিভাগকর্তা এ বেদব্যাসকেই বুঝায়। বেদ বিভাগ করে তিনি সুমন্ত, জৈমিনী, পৈল, বৈশম্পায়ন ও পুত্র শুকদেবকে অধ্যয়ন করান। অতঃপর; মহাভারত সম্বন্ধেও তাদের উপদেশ প্রদান করেন। তারপর; লোমহর্ষণ মুনিকে তিনি ইতিহাস ও পুরাণপাঠের শিষ্য বলে গ্রহণ করেন। বেদব্যাস চিরঞ্জীবীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।

(The miracle of magnanimous Muhammad)

কুরানে বর্ণিত হযরত মুহাম্মাদ অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন। অর্থাৎ; দৈবদূত কাঁইয়ের পক্ষ হতে কোনো দৈববাণী এনে তাঁর নিকট ব্যক্ত করলে; তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তা তাঁর শিষ্যদের নিকট প্রকাশ করতেন। শিষ্যগণ কেউই উপস্থিত না থাকলে তাঁর সহধর্মিনীদের নিকট তা প্রচার করতেন। অতঃপর; তাঁর বিজ্ঞ শিষ্যদের মধ্যে কেউ কেউ সে দৈববাণীগুলো লিখে রাখতেন। কথিত আছে যে; তাঁর অনেক শিষ্যই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অধিক শিক্ষিত ছিলেন। আবার এও কথিত আছে যে; সুদীর্ঘ তেইশ (২৩) বছর যাবৎ পবিত্র কুরান অবতীর্ণ হয়েছিল।


চমৎকার নির্মাণ আরম্ভ
(Start the miracle construction)আবার এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় যে; দৈববাণীগুলো প্রথমে শিষ্যদের দ্বারা মুখস্ত করানো হতো। পরবর্তীকালে শিক্ষিত শিষ্যদের দ্বারা লিখে রাখা হতো। জারির তাবারীর নির্মিত ইসলামের রূপক ইতিহাস হতে জানা যায় যে; যাজকের পরিনির্বাণের পর; প্রায় ২৫-৩০ বছরের ব্যবধানে কুরান গ্রন্থাকারে সম্পাদন করা হয়। অন্যমতে; কুরান অবতীর্ণ হওয়ার সূচনাকাল হতে প্রায় আটচল্লিশ (২৫+২৩ = ৪৮) বছর পর পরিপূর্ণ গ্রন্থাকারে সম্পাদিত হয়। এ বক্তব্যটিও আরবীয় রূপকার জারির তাবারী (সর্বপ্রথম ইসলামের রূপক ইতিহাস নির্মাণকারী) ও হাদিস (বাণী) নির্মাতাদের পুরাণ হতে নির্মিত। কোন কোন সূত্র দ্বারা চমৎকার নির্মাণ করা হয়; তাই এ অনুচ্ছেদের আলোচ্য বিষয়। নিচে চমৎকার নির্মাণের নিয়মাবলী আলোচনা করা হলো।

সুবিজ্ঞ ও সুমহান সাধু, সন্ন্যাসী, মুনি ও ঋষিগণ কর্তৃক বিশ্বের সব চমৎকার নির্মিত। চমৎকার অর্থই বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীপৌরাণিক সংখ্যা সারণী দ্বারা নির্মিত মানবীয় কার্যকলাপের রূপক বিবরণ। আত্মতত্ত্বের বাইরে চমৎকারে বর্ণিত বিষয়বস্তুর কোনো অস্তিত্ব নেই। যদিও সাম্প্রদায়িক পৌরাণিক কাহিনীগুলো শোনার পর তা বাস্তব বা ইতিহাস বলে মনে হয়। চমৎকার নির্মাণের সময় দেবতার চেয়ে পরিভাষাটির বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার প্রতি অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়। এজন্য; দেখা যায়; বিভিন্ন ঘটনা নির্মাণের সময় একই দেবতা ঘটনান্তরে ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মনামে ব্যবহার করা হয়। যেহেতু; প্রতিটি বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা পরিবারেই একাধিক হতে প্রায় কয়েকশত বা কয়েক হাজার পর্যন্ত বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা রয়েছে। এজন্য; একই উপমিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন উপমা নির্মাণ করা হয়। সাথে সাথে একেক ঘটনায় একেক ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়। স্মরণীয় যে; বিভিন্ন উপমায় একই দেবতার ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করা রূপকার বা নির্মাতার শৈল্পিক পাণ্ডিত্য। প্রত্যেক বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা পরিবারে একাধিক ছদ্মনাম বা উপমান নাম থাকার কারণে পুরাণ আরও হৃদয়গ্রাহী, কঠিন ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। যারফলে; কয়েক শতাব্দী পর চমৎকারের মধ্যে ছদ্মনাম রূপে ব্যবহৃত দেবতাগুলোর দেহতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি উদ্ঘাটন করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে।

. বিষয়ভিত্তিক ঘটনাবলী নির্মাণ পদ্ধতি

(1. Construction methods of thematic events)

বিষয়ভিত্তিক ঘটনাবলী নির্মাণ করতে হলে; একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে উক্ত বিষয়ের মধ্য হতে প্রয়োজন অনুসারে নায়ক, নায়িকা, খলনায়ক, খলনায়িকা, টেঁটন, প্রতারক, স্থান ও সময় ইত্যাদি চরিত্র গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর; দিন, মাস, বছর ও শতাব্দী রূপে ঐ বিষয়ের সংখ্যাগুলোকে ব্যবহার করতে হবে। যেমন; ভাষার স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে বিষয়ভিত্তিক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

তিন ভাষার গল্প (The story of the three languages)

“একবার বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষাত্রয় যমুনা নদীর তীরে একটি গোলাপ কুঞ্জে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হলেন। বাংলা ইংরেজীকে বললেন; “আপনার ভাইবোন কয়জন দয়া করে জানাবেন দাদা?” ইংরেজি বললেন; “আমরা ২১টি ভাই ও ৫টি বোন।” এমন উত্তর শুনে আরবি বললেন; “আমি বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে পারলাম না।” আবারও ইংরেজি বললেন; “২১টি ব্যঞ্জনবর্ণ হলাম ভাই। কারণ; আমরা কারো সাথে সহবাস করতে যাই না। অন্যেদিক; ৫টি স্বরবর্ণ হলো আমাদের বোন। কারণ; তারা সব বর্ণের সাথে এবং প্রায় সব শব্দের সঙ্গেই সহবাস করেন।” একথা শুনে আরবি বললেন; “তাহলে আমাদের বোন ৩টি।” সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা বললেন; “তাহলে আমাদের বোন মোট ১১টি।”

. আধ্যাত্মিক ঘটনাবলী নির্মাণ পদ্ধতি

(2. Construction methods of spiritual events)

আধ্যাত্মিক ঘটনাবলী নির্মাণ করতে হলে; দেবতাগণের মধ্য হতে প্রয়োজন অনুসারে নায়ক, নায়িকা, খলনায়ক, খলনায়িকা, টেঁটন, প্রতারক, স্থান ও সময় ইত্যাদি চরিত্র গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর; দিন, মাস, বছর ও শতাব্দী রূপে সংখ্যা-সূত্রগুলো ব্যবহার করতে হবে। যেমন; আধ্যাত্মিক জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে আধ্যাত্মিক ঘটনামূলক আধুনিক পৌরাণিক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

“দীর্ঘ বারো বছর অতিবাহিত হওয়ার পর যুবরাজ বৈয়াম্বু পিতার হারানো রাজ্য ফিরে পেলেন। অতঃপর; তিনি মনস্থ করলেন যে; এ রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী রমণীকে তিনি জীবনসঙ্গিনী রূপে গ্রহণ করবেন। এখন তাঁর পিতা-মাতা কেউই জীবিত নেই। বিবাহের অনুমতি নিবেন কোথায় থেকে? তাই; বিবাহের অনুমতির জন্য তিনি যমুনা নদীর তীরবর্তী অমরার তাপসকুল শিরোমনি মহাত্মা ‘বলন কাঁইজি’র নিকট গমনের অভিপ্রায় করলেন। তিনদিন পর অমরাতে উপস্থিত হলেন। অতঃপর; বসিধকে জিজ্ঞেস করলেন; “কাঁইজির সাথে কখন কথা বলা যাবে?” বসিধ বললেন; “সোমবার প্রথম যামে তিনি এসে বসেন।” বসিধের কথামতো সোমবার প্রথম যামে বৈয়াম্বু কাঁইজির নিকট নিজের অবস্থার কথা জানিয়ে বিবাহের অনুমতি প্রার্থনা করলেন।”

অতঃপর; মহানসাধক মহাধীমান বলন কাঁইজি তাঁকে জানালেন; “অগ্নি পিষ্টন করা যথাযথ রূপে না শিখে বিবাহ করলে তুমি বিবাহের তৃতীয় দিবসে মারা যাবে। তারপর; ৩০৯ বছর ব্যবধানে জীবিত হবে। অতঃপর; আবার একটি নতুন রাজ্যের রাজা হবে। তারপর; বিবাহের অনুমতির জন্য তুমি আবারও আমার নিকট আসবে। এরূপে ত্রিশ হাজার বার (৩০,০০০) তুমি আমার নিকটে এসেছো। তাতে তো তোমার লাভ হয় নি। যাও আগে অগ্নিপিষ্টন করো। তারপর; বিবাহ করো!” যুবরাজ বৈয়াম্বু এহেন মহামূল্যবান উপদেশ পেয়ে; একদিকে; অভিমুগ্ধ হলেন; অন্যদিকে; তিনি যার পর নাই মনক্ষুণ্নও হলেন। অবশেষে; রাজ্য ও সংসার পরিত্যাগ করে যুমনা নদীর তীরে ৩টি অগ্নিকুণ্ডলী প্রস্তুত করলেন। তারপর; অগ্নিসাধনে রতো হলেন। প্রথম অগ্নিকুণ্ডলীটি দীর্ঘ একমাস প্রজ্জ্বলিত করার পর; প্রথমে ডান পা অগ্নির ওপর স্থাপন করলেন; সঙ্গে সঙ্গে পা পুড়ে গেল। আবার দ্বিতীয় অগ্নিকুণ্ডলীটি দীর্ঘ একমাস প্রজ্জ্বলিত করার পর; বাম পা অগ্নির ওপর স্থাপন করলেন; সঙ্গে সঙ্গে তাও পুড়ে গেল। আবার তৃতীয় অগ্নিকুণ্ডলীটি দীর্ঘ একমাস প্রজ্জ্বলিত করার পর; ডান হাত অগ্নির ওপর স্থাপন করলেন; সঙ্গে সঙ্গে তাও পুড়ে গেল। তিনি কোনো উপায়ান্তর না দেখে; আবার মহাসাধক মহাধীমান বলন কাঁইজির শরণাপন্ন হলেন। কাঁইজি বললেন; “তুমি অগ্নির পঞ্চসখীর সন্ধান করো! তারাই তোমাকে অগ্নিপিষ্টন শিক্ষা দিবে। তবেই; তুমি পুড়ার হাত হতে রক্ষা পাবে।”

অবশেষে; বৈয়াম্বু সপ্ততল পাতালে গিয়ে অগ্নির পঞ্চসখীর নিকট হতে অগ্নিপিষ্টন মন্ত্র শিক্ষা করলেন। অতঃপর; জ্বলন্ত অগ্নিপিষ্টন কৌশল শিক্ষা করে তিনি কাঁইজির নিকট উপস্থিত হলেন। কাঁইজি সহাস্য বদনে বললেন; “যাও রাজ্য শাসন করো হাজার রমণী তোমায় পূজো দিবে স্বয়ং সাঁই এসে তোমায় দর্শনদান করবেন।”

. যুদ্ধ বিষয়ক উপাখ্যান নির্মাণ পদ্ধতি

(3. Construction methods of episode about the war)

যুদ্ধ বিষয়ক উপাখ্যান নির্মাণের ক্ষেত্রে দেবতাগণের মধ্য হতে রণাঙ্গন ও যুদ্ধাস্ত্র নির্ধারণ করতে হবে। অতঃপর; দিন, মাস, বছর, যুগ ও শতাব্দীর জন্য সংখ্যা-সূত্রগুলো ব্যবহার করতে হবে। যেমন; যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে যুদ্ধ বিষয়ক আধুনিক পৌরাণিক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

পাহাড়ী রাজা অনস্থী বসিধের মাধ্যমে নিধুয়াপতিকে জানিয়ে দিলেন যে; বার্ষিক হাজার স্বর্ণমুদ্রা কর পরিশোধ করতে তিনি সম্পূর্ণ অপারগ। এতদ শ্রবণে নিধুয়াপতি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রেরিত বসিধকে হত্যা করলেন। তারপর; দশ হাজার পদাতিক, আট হাজার অশ্বারোহী, দুই হাজার গজারোহী, এক হাজার তীরন্দাজ ও তিন হাজার (৩,০০০) লেঠেল বাহিনী নিয়ে আক্রমণের জন্য পাহাড় অভিমুখে যাত্রা করলেন। অতঃপর; তিনি বসিধের মাধ্যমে অনস্থীর নিকট এ সংবাদ প্রেরণ করলেন। দীর্ঘ একমাস পাহাড়ী দুর্গম পথ-প্রান্তর অতিক্রম করার পর; তারা ফল্গুনদীর তীরে এসে চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হলেন। অতঃপর; অনেক কষ্টে ফল্গুনদী অতিক্রম করে তারা নিধুয়া প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। তারপর; নিধুয়ার পশ্চিমপার্শ্বে তাদের বিশ্রামাগার নির্মাণ করলেন। তারপর; প্রথমে তিন হাজার (৩,০০০) লেঠেলবাহিনী অতর্কিতে পাহাড় আক্রমণের জন্য প্রেরণ করলেন। যুদ্ধ এড়ানোর কোনো পথ না পেয়ে পাহাড়রাজ অনস্থী অতি কষ্টে এবং অতি দ্রুত এক হাজার (১,০০০) তীরন্দাজ বাহিনী গঠন করলেন। অতি অল্প সময়ের জন্য তিনি তাদের ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে পারলেন না। অবশেষে; স্বয়ং ভূপতির অতর্কিত আক্রমণের হাত হতে দেশকে রক্ষা করার জন্য; তিনি উক্ত সামান্য বাহিনী নিয়েই নিধুয়া অভিমুখে অগ্রসর হলেন। দীর্ঘ তিনদিন তিনরাত পায়ে হেঁটে নিধুয়ার পূর্বপার্শ্বে পাহাড়ের প্রবেশদ্বারের নিকটে অবস্থান গ্রহণ করলেন। অতঃপর; এখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য; যুদ্ধের সর্বপ্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। নিধুয়া প্রান্তর হতে পাহাড়ে প্রবেশের একটিমাত্র পথ ছিল। মথুরার লেঠেলবাহিনী সেপথ ধরে অগ্রসর হতে লাগলো। অতঃপর; ওঁৎ পেতে বসে থাকা পাহাড়ীয় তীরন্দাজ বাহিনী সুকৌশলে পূর্বে প্রেরিত তিন হাজার লেঠেলবাহিনীকে সম্পূর্ণ হত্যা করলেন। দূত মাধ্যমে এ করুণ পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে নিধুয়াপতি পদাতিকবাহিনী প্রেরণ করলেন। তারাও সে সুড়ঙ্গ পথে মারা পড়লো। অবশেষে; তিনি অশ্বারোহী ও গজারোহী বাহিনী  প্রেরণ করলেন। তারপর; তারাও মারা পড়লো। অবশেষে; তিনি নিজেই তীরন্দাজ বাহিনীসহ অগ্রসর হতে আরম্ভ করলেন। তুমুলযুদ্ধ শেষে যুদ্ধের তৃতীয় দিনে নিধুয়াপতি পাহাড়রাজ অনস্থীর হাতে বন্দী হন ও নিহত হন। এভাবেই এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।”

. জন্মদিন সম্পর্কিত উপাখ্যান নির্মাণ পদ্ধতি

(4. Construction methods of episode related the birthday)

জন্মদিন নির্মাণের ক্ষেত্রে যে দেবতার জন্মদিন নির্মাণ করা হবে মানবদেহে তাঁর অবস্থা ও অবস্থানের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করে; পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্রগুলোর সাহায্যে তা অবশ্যই নির্মাণ করতে হবে। যেমন; সাঁইয়ের আগমন দিবসের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে জন্মদিবসমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো। “ত্রয়োবিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত মহাগ্রন্থ ‘পরিনির্বাণ’ এর নির্মাণকারী মন্মথ নদীয়া অঞ্চলের পাঁচবিবি চৌকির গাঙ্গোয়া গ্রামে ষোল শত দুই (১,৬০২) বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের চতুর্থ দিবস সোমবার প্রত্যুষে জন্মগ্রহণ করবেন। তাঁর পিতার নাম হবে মোড়লচাঁন ও মাতার নাম হবে বসুধা। তিনি পঙ্গু প্রতিবন্ধী রূপে জন্মগ্রহণ করবেন। মাতার গর্ভে রেখে তাঁর পিতা পরলোকগমন করবেন। মাত্র চার বছর বয়সে মাতাও পরলোকগমন করবেন। তারপর; তিনি মাতুলালয়ে লালিত পালিত হবেন।”

. প্রয়াণদিবস নির্মাণ পদ্ধতি

(5. Construction methods of deathday)

প্রয়াণদিবস নির্মাণের ক্ষেত্রে যে দেবতার প্রয়াণ দিবস নির্মাণ করতে হবে; আত্মদর্শনে তাঁর অবস্থা ও অবস্থানের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করতে হবে। অতঃপর; পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র এর সাহায্যে তা অবশ্যই নির্মাণ কতে হবে। যেমন; সাঁই ও কাঁইয়ের প্রত্যাবর্তন দিবসের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে প্রয়াণদিবসমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো। “রত্নাগড়ের রাজা হৈলাদ গত বারোশত (১,২০০) বঙ্গাব্দের সাত (৭) ভাদ্র সোমবার অপরাহ্নে পরলোকগমন করেন। প্রয়াণকালে তাঁর বয়স হয়েছিল তিয়াত্তর (৭৩) বছর। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন বলে প্রয়াণকালে শুধু তাঁর প্রাণপ্রিয় তিনজন মহীয়সী রেখে যান। রত্নরাজগণের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে স্বল্পবয়সে প্রয়াণলাভ করেন। তিনি ছিলেন সপ্ত রত্নরাজের পঞ্চম রাজা।”

. কুলুজি নির্মাণ পদ্ধতি

(6. Construction methods of genealogy)

কুলুজি বা বংশবিবরণী (শাজরা.ﺸﺠﺮﺓ) নির্মাণ করার ক্ষেত্রে বলাই, ভৃগু ও সাঁই পরিবার হতে অবশ্যই পুরুষ চরিত্রগুলো গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে; শুক্র পরিবার হতে অবশ্যই নারী চরিত্রগুলো গ্রহণ করতে হবে। তারপর; কুলুজি নির্মাণ করতে হবে। যেমন; কতদিন পর পর দয়াল সাঁইয়ের আগমন হয়; তার জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে কুলুজিমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো। দয়াল সাঁইয়ের অনন্ত নামের মধ্যে একটি নাম হলো ‘লালন’। আমরা লালন হতে তাঁর সাতাশজন গুরুত্বপূর্ণ ঊর্ধ্বতন পুরুষ পর্যন্ত বংশবিবরণী বা কুলুজি নির্মাণ করব। কুলুজিবিবরণীটি হলো;

১. মহাপুরুষ লালন সাঁইজি (সমীক্ষার জন্য)।

“তাঁর পিতা ছিলেন; ২. অমির

তাঁর পিতা ছিলেন; ৩. আয়ুষ্য

তাঁর পিতা ছিলেন; ৪. আসব

তাঁর পিতা ছিলেন; ৫. গোরাচাঁদ

তাঁর পিতা ছিলেন; ৬. জগদ্বন্ধু

তাঁর পিতা ছিলেন; ৭. জনার্দন

তাঁর পিতা ছিলেন; ৮. জীবাম্বু

তাঁর পিতা ছিলেন; ৯. নদেরচাঁন

তাঁর পিতা ছিলেন; ১০. নরেশ

তাঁর পিতা ছিলেন; ১১. নিতাই

তাঁর পিতা ছিলেন; ১২. নিমাই

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৩. পাবন

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৪. প্রণব

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৫. বিশ্বরূপ

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৬. মঞ্জুঘোষ

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৭. মুকুন্দ

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৮. মৃগাঙ্ক

তাঁর পিতা ছিলেন; ১৯. মৈত্রেয়

তাঁর পিতা ছিলেন; ২০. লোকনাথ

তাঁর পিতা ছিলেন; ২১. শচীশ

তাঁর পিতা ছিলেন; ২২. শশাঙ্ক

তাঁর পিতা ছিলেন; ২৩. শ্রীনাথ

তাঁর পিতা ছিলেন; ২৪. সত্যবান

তাঁর পিতা ছিলেন; ২৫. সুধাংশু

তাঁর পিতা ছিলেন; ২৬. হরিশ্চন্দ্র

তাঁর পিতা ছিলেন; ২৭. হিমাংশু।”

এরূপে কেবল শততমই নয়; যে কোনো সত্ত্বার হাজারতম পূর্বপুরুষ কিংবা গুরু পরম্পরাও অতি সহজেই নির্মাণ করা যায়।

. প্রেমকাহিনী নির্মাণ পদ্ধতি

(7. Construction methods of lovestory)

হৃদয়বিদারক প্রেমকাহিনী নির্মাণ করতে হলে বলাই বা সাঁই পরিবার হতে অবশ্যই পুরুষ চরিত্রগুলো গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে; শুক্র পরিবার হতে অবশ্যই নারী চরিত্রগুলো গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর; প্রেমকাহিনী নির্মাণ করতে হবে। যেমন; শুক্র ও মোতি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে প্রেমকাহিনীমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

“রাজা হৈলাদের শাসনকালে পৃথিবী ছিল স্বর্গনীড় তুল্য। ছিল পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গোরু। গোলা ভরা ধান ছিল। আর ছিল মন মাতানো সারিগান। বলা যায়; রাজা হৈলাদের শাসনকাল ছিল প্রাগৈতিহাসিক সোনালীযুগ। তখন; পথের মাঝে হাজার স্বর্ণমুদ্রা ফেলে রাখলেও তুলে নেওয়ার মতো কোনো লোক ছিল না। রাজা হৈলাদের একমাত্র কন্যা ছিল বৈমলা। একদিন বৈমলা জলক্রীড়ায় গিয়ে ব্যাধ নন্দন বৈমল্যের প্রেমাবিষ্টা হয়ে পড়েন। বৈমল্য পিতার সাথে আখেটি করতে এসেই হৈলাদ নন্দিনী বৈমলার প্রেমমুগ্ধ হন। রাজপুরীতে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর; রাজা হৈলাদ বৈমল্যকে বললেন; “হৈলাদ নন্দিকে অঙ্কসাথী করতে হলে বৈমল্যকে অবশ্যই হাজার (১,০০০) ক্রোশ হর্ম্য-সুড়ঙ্গ খনন করতে হবে।” বৈমল্য একাই বারো (১২) বছর পর্যন্ত হাজার ক্রোশ হর্ম্যসুড়ঙ্গ খনন করে হৈলাদপুরীতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। অবশেষে; রাজা হৈলাদ কন্যাদানে চাতুরির আশ্রয় গ্রহণ করতে উদ্যোত হলেন। তখন; ব্যাধ নন্দন বৈমল্য রাজা হৈলাদকে হত্যা করলেন। অতঃপর; বারো (১২) বছর পর আবার জীবিত করে বললেন; “হে পিতশ্রী! বৈমলাকে সহধর্মিনী রূপে পাবার জন্য আপনি যদি আমাকে আরও অধিক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করতেন। তবে; আমি তাই করতাম। কারণ; আমি জানি পরিশ্রমের চেয়ে প্রেমের মূল্য অধিক।”

. গুরু-শিষ্য কাহিনী নির্মাণ পদ্ধতি

(8. Construction methods of preceptor-disciple saga)

গুরু-শিষ্য কাহিনী নির্মাণ করতে হলে; জ্ঞান পরিবার হতে অবশ্যই গুরু চরিত্র এবং মন পরিবার হতে অবশ্যই শিষ্য চরিত্র গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর; গুরু-শিষ্য কাহিনী নির্মাণ করতে হবে। যেমন; গুরু-শিষ্যের মধ্যে গভীর প্রেমপ্রীতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে গুরু-শিষ্যমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

“একবার বংশীম শিষ্যত্বপদ গ্রহণের জন্য মহাসাধক ও মহাজ্ঞানী মহাধীমান বলন কাঁইজির নিকট উপস্থিত হলেন। কাঁইজি চারটি দিগন্ত বিধ্বংসী বাণ তার হাতে তুলে দিয়ে চারদিকে নিক্ষেপ করতে আদেশ দিলেন। তিনি আরও বললেন; “তার নিক্ষিপ্ত বাণে যদি চারিদিক বিধ্বস্ত হয়; তবে তিনি তাকে শিষ্য রূপে গ্রহণ করবেন।” অসহায় হয়ে বংশীম ক্রমান্বয়ে তীর নিক্ষেপ আরম্ভ করলেন। তাঁর নিক্ষিপ্ত বাণে পশ্চিমদিকে বিধ্বস্ত হলো চন্দ্র, দক্ষিণদিকে ভষ্ম হলো সাগর এবং পূর্বদিকে ম্লানময় হলো সূর্য। অতঃপর; চতুর্থ বাণটি নিক্ষেপ করার পূর্বেই কাঁইজি তাঁর হস্ত ধারণপূর্বক বললেন; এ বাণটি আর নিক্ষেপ করো না। আজীবন তোমার সঙ্গেই সঙ্গেই রাখবে। বংশ পরম্পরা ক্রমে তোমার অধঃস্তন পুরুষদের মধ্যে বাণটি সম্প্রদান করতে থাকবে। আন্তঃমহাদেশীয় যুদ্ধে যে-ই বেঁচে থাকবে অবৈধ আগ্রাসন বন্ধের জন্য বাণটি নিক্ষেপ করতে বলবে। তাতে বিশলাখ (২০,০০,০০০) মানুষের প্রাণ রক্ষা পাবে।”

. ভ্রমণকাহিনী নির্মাণ পদ্ধতি

(9. Construction methods of the traveling saga)

ভ্রমণকাহিনী নির্মাণ করতে হলে; জ্ঞান পরিবার হতে অবশ্যই গুরু চরিত্র এবং মন পরিবার হতে অবশ্যই শিষ্য চরিত্র গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর; ভ্রমণকাহিনী নির্মাণ করতে হবে। যেমন; ভেবেচিন্তে আদেশ বা নিষেধবাক্য প্রয়োগ শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিচে ভ্রমণকাহিনীমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

“এক সম্রাট সম্রাজ্ঞী, প্রয়োজনীয় মাঝি, কর্ণধার, নাবিক ও ঘাতকসহ সপ্ত নৌকা যোগে সমুদ্রভ্রমণে বের হলেন। ঐ সমুদ্রসীমায় জলদস্যুদের উপদ্রব ছিল সবচেয়ে অধিক। সম্রাটীয় নৌকাশ্রেণি সে জলদস্যুদের কবলে পতিত হলো। সম্রাট কর্ণধারদের ডেকে বললেন; “নৌকাশ্রেণি কূলের দিকে অগ্রসর করো।” কর্ণধাররা বললেন; “মহারাজ সমুদ্রের এ পার্শ্বটি জলদস্যুদের অঞ্চল। এজন্য; নৌকাশ্রেণি তটস্থ করলে আরও অধিক বিপদের সম্মুখীন হবো।” অতঃপর; সম্রাট বললেন; “হে সুবিজ্ঞ কর্ণধাররা! সাগরের মধ্যে দস্যুদের আক্রমণের চেয়ে সৈকত নিরাপদ হবে। অতএব; দ্রুত নৌকাশ্রেণি সৈকতের দিকে অগ্রসর করা হোক।” নৌকাসারি সৈকতের নিকটবর্তী হলে সম্রাট ঘাতককে ডেকে বললেন; “দস্যুবৃত্তি দেখামাত্র চেনা-অচেনা সবাইকে হত্যা করবে। দস্যুরা সম্রাটীয় নৌশ্রেণিতে উঠে দস্যুতা আরম্ভ করলেন। অতঃপর; ঘাতকও চেনা-অচেনা সবাইকে ক্রমান্বয়ে হত্যা করতে লাগলেন। অবশেষে; সম্রাটকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। তখন; সম্রাট আশ্চর্য হয়ে বললেন; “হে ঘাতক চেনা লোকদের ছেড়ে দাও শুধু অচেনা দস্যুদের হত্যা করো।”। অতঃপর; সম্রাট ঘুরে ঘুরে দেখলেন যে; ঘাতক সম্রাজ্ঞী, মাঝি, কর্ণধার, নাবিক ও দস্যু কাউকেই বাঁচিয়ে রাখে নি। অতঃপর; সম্রাট অবশিষ্ট জীবন তার ভুল আদেশের জন্য অনুশোচনা করলেন।”

১০. ভবিষ্যদ্বাণী নির্মাণ পদ্ধতি

(10. Construction methods of the prediction)

“ভবিষ্যদ্বাণী নির্মাণ করতে হলে; দেবতাগণের মধ্য হতে প্রয়োজন অনুসারে স্থান ও সময় গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর; দিন, মাস, বছর ও শতাব্দী সময় রূপে সংখ্যা-সূত্রগুলো ব্যবহার করতে হবে। যেমন; আধ্যাত্মিক জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য; নিচে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক একটি চমৎকার নির্মাণ করা হলো।

আন্তমহাদেশীয় যুদ্ধ নির্মাণ পদ্ধতি

(Construction methods of the intercontinental war)

স্বৈরশাসনের সূত্র ধরে সর্বপ্রথম শ্রমিক বিদ্রোহের সূচনা হবে। শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা শ্রমিকরা নির্যাতিত হতে হতে শাসক শ্রমিক সংঘর্ষের দ্বারা দেশে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হবে। অতঃপর; শাসকগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী দেশে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াবে। পার্শ্ববর্তী দেশটি যুদ্ধোন্মত্ত দেশটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। সেজন্য; তাদের দেশেও অনুরূপ গৃহযুদ্ধের সূচনা হবে। পাশাপাশি অবস্থিত সাতটি রাষ্ট্র গৃহযুদ্ধের করালগ্রাসে পতিত হবে। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ উভয়জাতিই এ যুদ্ধে অনুঘটক রূপে কাজ করবে। অতঃপর; পূর্ব শত্রুতার সূত্র ধরে একদেশ অন্য দেশকে গুপ্ত আক্রমণ করবে। যুদ্ধাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখে শত্রুপক্ষ চিহ্নিত হওয়ার পর; দেশগুলো পরস্পরের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল (Duration of war)

আন্তমহাদেশীয় এ যুদ্ধটির স্থায়িত্বকাল ত্রিশ (৩০) বছরের ঊর্ধ্বে হবে না।

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি (Casualty of war)

মহাধ্বংসকর এ যুদ্ধে দেশগুলোর উৎপাদনমুখী শিল্প ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারো ক্ষতির দায়দায়িত্ব অন্য কেউ গ্রহণ করবে না। যুদ্ধ পরবর্তী প্রায় বারো (১২) বছরের পূর্বে এ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। অর্থাৎ; ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃস্থাপন ও পুনরুৎপাদন আরম্ভ করতে তাদের প্রায় এক যুগের মতো সময় লাগবে।

যুদ্ধের নিষ্পত্তি (Disposal of war)

আন্তর্জাতিক বিচারবিভাগ উক্ত ৭টি রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীকে কারো মৃত্যুদণ্ড এবং কারো কারো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে যুদ্ধের পরিপূর্ণ নিষ্পত্তি করবে। তবে; এ যুদ্ধে প্রকৃত শ্রমিকগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য বেতন বা পারিশ্রমিক পাওয়ার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হবে।

যুদ্ধের সময়সীমা (Deadlines of the war)

চলতি একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক হতে ভয়াবহ এ যুদ্ধের ক্ষেত্র  প্রস্তুত হতে থাকবে। পরবর্তীকালের অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই এ ধ্বংসযজ্ঞটি সংঘঠিত হবে।”

১১. ঐশিবাণী নির্মাণ পদ্ধতি

(11. Construction methods of the prophecy)

সারা বিশ্বের সুমহান রূপকার মনীষীগণ যুগে যুগে যেসব পুরাণ নির্মাণ করেছেন তা-ই বর্তমান ঐশিবাণী রূপে স্বীকৃতিলাভ করেছে। সুবিজ্ঞ রূপকারগণের দ্বারা নির্মিত পুরাণই কয়েক শতাব্দী পরে ঐশিবাণী বা আকাশবাণীতে রূপান্তরিত হয়। এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো; শ্বরবিজ্ঞানের ভাব ও ভাষা যখনই গবেষকদের বোধগম্যের বাইরে যায়; অথবা গবেষকরা যখনই শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ ও পুরাণকে মহাকল্যাণকর বলে ধারণা করে; তখনই তাকে ঐশিবাণী বা মহাবাণী রূপে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। যেমন; ‘রামায়ণ’। পূর্বকালে ‘রামায়ণ’ ছিল কেবলই একটি উপন্যাস। কিন্তু ‘রামায়ণ’ এখন রীতিমত হিন্দুদের ভজনীয় ও পূজনীয় গ্রন্থ রূপে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়েছে। তেমনই; ‘জঙ্গে কারবালা’। ‘জঙ্গে কারবালা’র ঘটনাবলী পূর্বকালে সর্বস্তরের মুসলমানদের নিকট; কেবল উপন্যাসের ঘটনাবলী রূপেই সুপরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানকালে সেগুলো মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক পৌরাণিক কাহিনী আবার কোথাও সাম্প্রয়িক ইতিহাসে রূপান্তরিত হয়েছে। তেমনই; বঙ্গদেশের ‘লালনগীতি বঙ্গদেশের লালনগীতি আজ হতে একশত বছর পূর্বে কেবলই গীতি রূপেই গাওয়া হতো। কিন্তু এখন এটি; কেবল ‘লালনগীতি’ নেই। এটি; রীতিমত মানববাদীদের সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ রূপে স্বীকৃতিলাভ করেছে। তাদের অত্যন্ত ভজনীয় ও পূজনীয় গ্রন্থের শ্রেণিতে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছে। এযাবৎ সারাবিশ্বে ঐশিবাণী নির্মাণের দুটি পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়; ১.পদ্যরীতি ঐশিবাণী ও ২.গদ্যরীতি ঐশিবাণী।

. পদ্যরীতির ঐশিবাণী (1. Verse style prophecy)

ছন্দে ছন্দে যেসব শ্বরবিজ্ঞান নির্মাণ করা হয় তাকে পদ্যরীতি ঐশিবাণী বলে।

. গদ্যরীতির ঐশিবাণী (2. Prose style prophecy)

গদ্যরীতিতে যেসব শ্বরবিজ্ঞান নির্মাণ করা হয় তাকে গদ্যরীতি ঐশিবাণী বলে।

আবার কখনও কখনও একই শ্বরবিজ্ঞানের মধ্যে পদ্য ও গদ্যরীতির সংমিশ্রণও দেখা যায়। যেমন; হিন্দুদের বেদ। বেদ এর মধ্যে কোথাও কোথাও পদ্য; আবার কোথাও কোথাও গদ্যরীতিও দেখা যায়। তেমনই; মুসলমানদের কুরান। কারণ; কুরানের মধ্যেও কোথাও কোথাও পদ্য ও কোথাও কোথাও গদ্যরীতি লক্ষ্য করা যায়। নিচে কয়েকটি ঐশিবাণী নির্মাণ করে দেখানো হলো।

.                 কাঁই কাঁইরে (মজার)

            খাল কেটেছে ভারি কৌশলে

একবিন্দু জল নাইরে খালে

            কাপড় ভিজে ঝাঁপ দিলে।

আকাশে হয় ভাটা জোয়ার

কূল ভাঙ্গে পাতালে তার

ঢাকানগরের অবাক ব্যাপার

            টার্মিনাল মহাখালে।

সাড়ে নয় ক্রোশ দীর্ঘ খালে

আট আঙ্গুলি বৈঠা ফেলে

সুরসিক সব যায়রে কূলে

            অরসিক ডুবে জলে।

দেখে খালের তর্জনগর্জন

কত সাধু হয় অচেতন

ভাবিয়া কয় কাঁইজি বলন

            দৌড় মারে সকল ফেলে।”

.                 চাঁদ হয়েছে চাঁদে উদয়

চাঁদে চাঁদে চন্দ্রগ্রহণ

            চাঁদেই বিশ্ব জ্যোতির্ময়।

আপন গর্ভে রেখে পতি

অনূঢ়া হয় গর্ভবতী

জলের মাঝে জ্বলছে বাতি

            আকাশে বসিয়া সাঁই।

হিন্দুরা কয় কাশীধামে

মুসলমানরা কয় মদিনে

চাঁদের উদয় হচ্ছে দিনে

            রাতে সে চাঁদ গুপ্ত রয়।

ননি খেতে মদনচোরা

আপন বুকে মারল ছোরা

বলন কয় কেমন গোরা

            ভেবে অন্ত নাহি পায়।”

.                 ভুলে খেলি ভুলের গুলি

ভুলে মরণ ভুলে জনম

            ভুলে রলি পেট ফুলি।

মরার সঙ্গে ব্যভিচার দায়

ধরা পড়ে করো হায়ঃ হায়ঃ

যার মরা তারই গলায়

            কেউ দেয় না রশি খুলি।

ঘরে ঘরে পতিতালয়

যার পতিতা তার সঙ্গে রয়

কেউ করে না মরণের ভয়

            তারে নিয়ে ঢোলাঢোলি।

বাপ্পুতে একঘাটে মরে

কপালটারে দোষী করে

বলন কয় বিনয় করে

            দেখ ভুলের নথি খুলি।”

চমৎকার নির্মাণ সূত্রাবলী (Miracle building formulas)

চমৎকার নির্মাণের উপাদান প্রধানত দুটি। যথা; ১. পৌরাণিক চরিত্র ও ২. পৌরাণিক সংখ্যা।

১. পৌরাণিক চরিত্র (1. Mythological character)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির আভিধানিক নাম আড়াল করে রূপক নামে ঈশ্বরায়ন, দেবতায়ন ও মানবায়ন করে নির্মিত চরিত্রকে বাঙালী পৌরাণিক চরিত্র বলে। যেমন; ‘শুক্র হতে সীতা এবং শিশ্ন হতে মহাদেব।

২. পৌরাণিক সংখ্যা (2. Mythological number)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যা ও পৌরাণিক যোজক, গুণক, স্থাপক ও শূন্যক সংখ্যা সূত্র দ্বারা নির্মিত পৌরাণিক রূপক সংখ্যাকে একত্রে পৌরাণিক সংখ্যা বলে।

============= নিচে ঠিক করতে হবে =============

 

 

 

 

. পৌরাণিক মূলক সংখ্যা

(2. Mythological radical number)

বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা ও মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তুর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যা।

পৌরাণিক মূলক সংখ্যার সংজ্ঞা (Definition of radical number)

সাধারণত; মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যাকে পৌরাণিক মূলক সংখ্যা বলে। যেমন; ৩২ ফুলব্যাখ্যা; মানুষের ৩২টি থাকার কারণে ৩২ ফুল একটি মূলক সংখ্যা।

পৌরাণিক মূলক সংখ্যার প্রকারভেদ

(Variations of mythological radical number)

বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, পৌরাণিক মূলক সংখ্যা দুই প্রকার। যথা; ১. পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সংখ্যা ও ২. পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যা।

. পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সংখ্যা

(1. Mythological real radical number)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যাকে পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সংখ্যা বলে। যেমন; ৩২ ফুলব্যাখ্যা; মানুষের ৩২টি থাকার কারণে ৩২ ফুল একটি পৌরাণিক মূলক সংখ্যা

এযাবৎ; বিশ্বের বিভিন্ন শ্বরবিজ্ঞানে ও পুরাণে ব্যবহৃত প্রকৃত মূলক সংখ্যা; . এক নিরীক্ষ . দুই ফল . তিন তার . চার চন্দ্র . পঞ্চ বাণ . ছয় রিপু . সাত কর্ম . আট অঙ্গ . নয় দ্বার ১০. দশ ইন্দ্রিয় ১১. এগারো রুদ্র ১২. বারো নেতা ১৩. তের নদী ১৪. চৌদ্দ ভুবন ১৫. পনের চল ১৬. ষোলকলা ১৭. আঠারো ধাম ১৮. ঊনিশ রক্ষী ১৯. বিশ কর্মী ২০. একুশ দিন ২১. তেইশ জোড়া ২২. চব্বিশ পক্ষ ২৩. পঁচিশ গুণ ২৪. সাতাশ নক্ষত্র ২৫. ত্রিশ বছর ২৬. বত্রিশ ফুল ২৭. তেত্রিশ দেবতা ২৮. ছত্রিশ রবি ২৯. বাহান্ন হাট ৩০. চুয়ান্ন মাথা ৩১. বাহাত্তর স্পন্দন ৩২. আশি কর ৩৩. চুরাশি ফের ৩৪. দুইশত ছয় জন ৩৫. তিনশত দশ অব্দ ৩৬. তিনশত ষাট মূর্তি ৩৭. পাঁচশত সৈন্য ৩৮. ছয়শত ছেষট্টি ‘প্রপাচ এবং ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি প্রপারিচ ৩৯. হাজার মাস ও ৪০. কোটি ঊর্ণ।

পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্রের সংজ্ঞা

(Definition of mythological radical number formula)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি এর পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যা দ্বারা পৌরাণিক সংখ্যা নির্মাণ সূত্রকে ‘পৌরাণিক মূলক সংখ্যা সূত্র বলে। যেমন; মানবের দশটি (১০) ইন্দ্রিয় হতে ‘দশ (১০) ইন্দ্রিয়’।

পৌরাণিক মূলক সংখ্যার সংজ্ঞা

(Definition of mythological radical number)

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যাকে পৌরাণিক মূলক সংখ্যা বলে। যেমন; ৩২ ফুলব্যাখ্যা; মানুষের ৩২টি থাকার কারণে ৩২ ফুল একটি পৌরাণিক মূলক সংখ্যা

. পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যা (Mythological associate radical number)

পৌরাণিক মূলক সংখ্যার মতো অধিক ব্যবহৃত পৌরাণিক রূপক সংখ্যাকে পৌরাণিক সহযোগী মুলক সংখ্যা বলে। যেমন; ৫২ বাজার ৫৩ গলি।

পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যা (Mythological associate radical number)

পৌরাণিক মূলক সংখ্যার মতো অধিক ব্যবহৃত পৌরাণিক রূপক সংখ্যাকে পৌরাণিক সহযোগী মুলক সংখ্যা বলে। যেমন; ৫২ বাজার ৫৩ গলি।

সারাবিশ্বের সব শ্বরবিজ্ঞান ও পুরাণে; এমন কিছু পৌরাণিক সংখ্যা রয়েছে; যেগুলো প্রায় পৌরাণিক মূলক সংখ্যার মতো ব্যবহার হতে দেখা যায়। কাঁইজি এদের পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যা নামে নামকরণ করেছেন। তাঁর মতে; এমন পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যা ১২টি। যথা; . তেত্রিশ দেবতা (স্থাপক) . চল্লিশ তলা (যোজক) . তিপ্পান্ন গলি (যোজক) . পঞ্চান্ন ধারা (যোজক) . ষাট হাত (শূন্যক) . তেষট্টি বাই (স্থাপক) . ছেষট্টি তল (স্থাপক) . সত্তর জন (শূন্যক) . সাতাত্তর পালা (স্থাপক) ১০. নব্বই ভাগ (শূন্যক) ১১. নিরানব্বই নাম (স্থাপক) ও ১২. শতদল (শূন্যক)।

অর্থাৎ; পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যাগুলো হলো; ৩৩, ৪০, ৫৩, ৫৫, ৬০, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৭৭, ৯০, ৯৯ ও ১০০। তবে; সর্বদা পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যাগুলো পৌরাণিক মূলক সংখ্যার অধীনে বর্ণনা করা হয়।

৩৩. (তেত্রিশ দেবতা) (স্থাপক) (Thirty three Angels)

৪০. (চল্লিশ তলা) (যোজক) (Forty floors)

৫৩. (তিপ্পান্ন গলি) (যোজক) (Fifty three lanes)

৫৫. (পঞ্চান্ন ধারা) (যোজক) (Fifty-five methods)

৬০. (ষাট হাত) (শূন্যক) (Sixty hands)

৬৩. (তেষট্টি বাই) (স্থাপক) (Sixty three goodbyes)

৬৬. (ছেষট্টি তল) (স্থাপক) (Sixty six bases)

৭০. (সত্তর জন) (শূন্যক) (Seventy person)

৭৭. (সাতাত্তর পালা) (স্থাপক) (Seventy seven stories)

৯০. (নব্বই ভাগ) (শূন্যক) (Ninety shares)

৯৯. (নিরানব্বই নাম) (স্থাপক) (Ninety nine names)

১০০. (শতদল) (শূন্যক) (Hundred Groups)

চৌদ্দ কোটি সংখ্যাটির কোনো বাস্তবতা মাবনদেহে নেই। এজন্য; অবশ্যই এটি একটি পৌরাণিক রূপক সংখ্যা। মানবদেহের দৈর্ঘ্য যার যার হাতের সাড়ে তিন হাত। ভাবতেও অবাক লাগে যে; রূপকারগণ মানবদেহের দৈর্ঘ্য দ্বারা কেমন চমৎকারভাবে পৌরাণিক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করেছেন। প্রথমে মানবদেহের সাড়ে তিন হাত দৈর্ঘ্যকে পোয়ায় পরিণত করে চৌদ্দ পোয়া করেছেন। যেমন; একহাত সমান চার পোয়াহাত। এজন্য; সাড়ে তিন হাত সমান ১৪ পোয়া হাত।

সূত্রটির গাণিতিক বিশ্লেষণ

(Mathematical analysis of this formula)

আমরা জানি ১ সের সমান ৪ পোয়া। তাদৃশ ১ হাত সমান ৪ পোয়া হাত।

          ১  হাত সমান ৪ পোয়াহাত

\       হাত সমান Ï ৪ = =  = ১৪ পোয়াহাত।

এটি একটি পৌরাণিক মূলক সংখ্যা। সুমহান রূপকারগণ আবার চৌদ্দ (১৪) পোয়া হাত পৌরাণিক মূলক সংখ্যাটিকে আড়াল করার জন্য উক্ত পৌরাণিক মূলক সংখ্যাটির পরে {১৪, (০০,০০,০০০)} সহগ রূপে অতিরিক্ত ৭টি শূন্য (০০০০০০০) বসিয়ে চৌদ্দ কোটি (১৪,০০,০০,০০০) শূন্যক-সংখ্যাটি সৃষ্টি করেছেন।

সূত্রটির গাণিতিক বিশ্লেষণ

(Mathematical analysis of this formula)

১৪, (০০০০০০০)

= ১৪ (০০০০০০০)

= ১৪ ০০০০০০০

= ১৪,০০,০০,০০০।

 হাত > 14 পোয়া > 14 কোটি বা > 14 > 14,00,00,000 সংখ্যাটির সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ; মূলক > রূপক > ব্যাপক সৃষ্টি করেছেন। এবার বলা যায়  হাত হলো মানবদেহের দৈর্ঘ্যের পৌরাণিক প্রকৃত মূলক সংখ্যা। আর ১৪ পোয়া হলো মানবদেহের দৈর্ঘের পৌরাণিক রূপক সংখ্যা। অন্যদিকে; ১৪ কোটি হলো মনবদেহের দৈর্ঘ্যের ব্যাপক সংখ্যা।

মহাগ্রন্থীয় প্রমাণ (Evidence of magnum opus)

এযাবৎ বিশ্বের বিভিন্ন পুরাণে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ১২টি পৌরাণিক সহযোগী মূলক সংখ্যা হলো; ১.তেত্রিশ দেবতা (স্থাপন) ২.চল্লিশ তলা (যোজক) ৩.তিপ্পান্ন গলি (যোজক) ৪.পঞ্চান্ন ধারা (যোজক) ৫.ষাট হাত (শূন্যক) ৬.তিষট্টি বাই (স্থাপন) ৭.ছিষট্টি তল (স্থাপন) ৮.সত্তর জন (শূন্যক) ৯.সাতাত্তর পালা (স্থাপন) ১০.নব্বই ভাগ (শূন্যক) ১১.নিরানব্বই নাম (স্থাপন) ও ১২.শতদল (শূন্যক)।“এক সময়ে কোশলরাজ প্রসেনজিৎ বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষুসঙ্ঘকে নানাবিধ দ্রব্য সাজিয়ে মহাদানকার্য সম্পন্ন করেছিলেন। তাতে রাজার চৌদ্দ কোটি (১৪,০০,০০,০০০) ধন ব্যয় হয়েছিল। সেজন্য; তাকে অসদৃশ দান বলা হতো। এ বিরাট দান কার্যে রাজার দুইজন মন্ত্রী অতিশয় দুঃখিত হয়েছিলেন।” (ত্রিপিটক- ধম্মপদ- ৩২১)

পৌরাণিক রূপক সংখ্যার প্রকারভেদ

(Variations of mythological metaphor number)

শ্বরবিজ্ঞানে পৌরাণিক রূপক সংখ্যা মোট পাঁচ প্রকার। যথা; ১. শূন্যক সংখ্যা ২. স্থাপন সংখ্যা ৩. যোজক সংখ্যা ৪. গুণক সংখ্যা ও ৫. ব্যাপক সংখ্যা। আধ্যাত্মিক সূত্রাবলী গ্রন্থটির মধ্যে পৌরাণিক রূপক সংখ্যাগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।

এছাড়াও; চমৎকার নির্মাণের আরও কিছু নিয়মাবলী মেনে চলা একান্ত কর্তব্য। যেমন;

১.   চমৎকার নির্মাণের জন্য কমপক্ষে তিন হাজার বছর পিছনে যেতে হবে।

২.   এটা নির্মাণের উপাদান রূপে আধুনিক প্রযুক্তি বা বৈজ্ঞানিক কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না।

৩.   এটা নির্মাণের জন্য আধুনিক কোনো স্থান বা আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা যাবে না।

চমৎকার নির্মাণের সম্বন্ধ-সূত্র

(Relation formula of the miracle construction)

চমৎকার নির্মাণের সম্বন্ধ-সূত্র ২টি। যথা; ১. পুরুষ সম্বন্ধ সূত্র ও ২. নারী সম্বন্ধ সূত্র।

. পুরুষ সম্বন্ধ সূত্র (Male relation formula)

১.    আত্মাকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই দেহকে নারী ধরতে হবে।

২.   জ্ঞানকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই মনকে নারী ধরতে হবে।

৩.   গুরুকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই শিষ্যকে নারী ধরতে হবে।

৪.   সাঁইকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই শুক্রকে নারী ধরতে হবে।

৫.   শিশ্নকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই শুক্রকে নারী ধরতে হবে।

৬.   জরায়ুকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই জননপথকে নারী ধরতে হবে।

৭.   ভৃগুকে পুরুষ ধরতে হলে; অবশ্যই ভগকে নারী ধরতে হবে।

২ নারী সম্বন্ধসূত্র (Female relation formula)

১.   দেহকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই আত্মাকে পুরুষ ধরতে হবে।

২.   মনকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই জ্ঞানকে পুরুষ ধরতে হবে।

৩.   শিষ্যকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই গুরুকে পুরুষ ধরতে হবে।

৪.   শুক্রকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই সাঁইকে পুরুষ ধরতে হবে।

৫.   শুক্রকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই শিশ্নকে পুরুষ ধরতে হবে।

৬.   জননপথকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই জরায়ুকে পুরুষ ধরতে হবে।

৭.   ভগকে নারী ধরতে হলে; অবশ্যই ভৃগুকে পুরুষ ধরতে হবে।

এছাড়াও; চমৎকার নির্মাণের জন্য আরও ৩টি সম্বন্ধ রয়েছে। যথা; ১.পুরুষ-পুরুষ সম্বন্ধ ২. নারী-নারী সম্বন্ধ ও ৩. নর-নারী সম্বন্ধ।

. পুরুষ-পুরুষ সম্বন্ধ-সূত্র (Male-male relation formula)

পুরুষের সংজ্ঞা (Definition of Male)

১.   সাধারণত; শিশ্ন চিহ্নধারী জীবকে পুরুষ বলে। যেমন; এঁড়ে।

২.   বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; অপেক্ষাকৃত অধিক শক্তিশালী সত্তাকে পুরুষ বলে।

পুরুষ-পুরুষ সম্বন্ধ-সূত্রের সংজ্ঞা

(Definition of Male-male relation formula)

চমৎকার, পুরাণ ও পুরাণ নির্মাণের জন্য কেবল পুরুষের সাথে পুরুষের সম্পর্ক স্থাপন নিয়মকে পুরুষ-পুরুষ সম্বন্ধ-সূত্র বলে। যেমন; মধুনাথ ও মন্মথ।

বাঙালী পুরাণে ব্যবহৃত পুরুষবাচক দেবতাগুলো হলো; “কন্দর্প, গণেশ, চণ্ডীদাস, চন্দ্রশেখর, জয়ন্ত, ধূর্জটি, নন্দ, নন্দলাল, নন্দিত, নারদ, বলরাম, বলাই, বিশ্বনাথ, বৈদ্যনাথ, ভৈরব, ভোলানাথ, মদন, মধু, মধুনাথ, মন্দর, মন্মথ, মরীচি, মহাদেব, মাধব, মহেন্দ্র, মহেশ, মারীচ, মেঘনাথ, যদু, যযাতি, যোগেশ, যোগেন্দ্র, লখাই, লখিন্দর, লক্ষ্মণ, লম্বোদর, লোকনাথ, শঙ্কর, শঙ্কু, শম্ভু, শিব, শুভঙ্কর, সুদাম ও সুরেন্দ্র।”

আরবীয় পুরাণে ব্যবহৃত পুরুষবাচক দেবতা হলো; “১. আদম ২. ইউনুস ৩. ইউসুফ ৪. ইদরিস ৫. ইনসান ৬. ইব্রাহিম ৭. ইমরান ৮. ইয়াকুব ৯. ইয়াহিয়া ১০. ইলইয়াস ১১. ইসা ১২. জাকারিয়া ১৩. জুলকিফল ১৪. মারুৎ ১৫. মুহাম্মাদ ১৬. শিশ ও ১৭. হাবিল।”

উল্লেখিত পরিভাষাগুলোর যে কোনো একটি পুরুষবাচক দেবতাকে পিতা, পুত্র, দাদা, নানা, রাজা, সম্রাট, ঋষি, তাপস্বী, মনীষী ও দস্যু ইত্যাদি চরিত্র রূপে ব্যবহার করে পুরাণে ব্যবহার উপযোগী সুমহান চমৎকার নির্মাণ করা যায়। নিচে একটি পুরুষ-পুরুষ সম্বন্ধসূচক চমৎকার নির্মাণ করে দেখানো হলো।

“একদা মহাতপস্বী ‘মধুনাথ’ উড়ন্ত সে মায়াশক্তিকে বধ করার জন্য পুত্র ‘মন্মথ’কে আদেশ করলেন। ‘মন্মথ’ পিতাকে জানালেন যে; হে পিতাশ্রী! মায়াকে বধ করতে হলে ‘বৈয়াম্বুবাণ’ একান্ত প্রয়োজন। তা আপনার সপ্তমপুরুষ লম্বোদরের নিকট ছিল। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের অন্যতীরে বাণিজ্য করতে যাবার সময়ে নৌকাডুবী হলে; তিনি তা মহাসাগরের মধ্যে হারিয়ে ফেলেন। সে-ই বৈয়াম্বুবাণ ব্যতীত মায়াকে বধ করা সম্ভব নয়। পুত্রের এহেন বিজ্ঞতাপূর্ণ অমীয় বাণী শ্রবণ করে অবাক হয়ে অপলক নেত্রে; তিনি পুত্র মন্মথের পানে চেয়ে রইলেন। অতঃপর; তিনি পুত্রের নিকট জানতে চাইলেন যে; “কিভাবে সে ‘বৈয়াম্বুবাণ’ উদ্ধার করা সম্ভব?” মন্মথ বললেন; “পরম্পরার সূত্র ধরে সপ্তম পুরুষের নাম উদ্ঘাটন করতে হবে। অতঃপর; সপ্তম পুরুষের নাম দ্বারা স্বর্ণের পাতে রূপার লেখনী দ্বারা পত্র লিখে কালীগঙ্গার দেবীর মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরের জলদেবীর নিকট পাঠাতে হবে। তবে; জলদেবী ১৭৫ বছর পূর্বে মহাসাগরে নৌকাডুবীর মাধ্যমে হারানো ‘বৈয়াম্বুবাণ’ তুলে এনে দিবেন।” এভাবে আগত ভবিষ্যতে পুরুষবাচক যত দেবতা সৃষ্টি হবে সব দেবতাই এ ক্রমিকে বসবে।

. নারী-নারী সম্বন্ধসূত্র (Female-female relation formula)

নারীর সংজ্ঞা (Definition of female)

১.    সাধারণত; ভগ চিহ্নধারী জীবকে নারী বলে।

২.   বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; অপেক্ষাকৃত অধিক দুর্বল-সত্তাকে নারী বলে।

নারী-নারী সম্বন্ধ-সূত্রের সংজ্ঞা

(Definition of Female-female relation formula)

চমৎকার ও পুরাণ নির্মাণের জন্য কেবল নারীর সাথে নারীর সম্পর্ক স্থাপন নিয়মকে নারী-নারী সম্বন্ধ-সূত্র বলে। যেমন; হৈলুপা ও বৈমলা।

বাঙালী পুরাণে ব্যবহৃত নারীবাচক দৈবসত্তাগুলো হলো; “অহল্যা, ইন্দিরা, উমা, ঊষা, কমলা, কল্যাণী, কালী, গৌরী, জয়ন্তী, জানকী, দুর্গা, নন্দিতা, নন্দিনী, পদ্মা, পার্বতী, বৈমলা, ব্রজাঙ্গনা, ভৌমী, মঘবতী, মহামায়া, মায়াদেবী, মহেশ্বরী, মাধবী, মালিনী, মৈথিলী, মোহিনী, যশোদা, রমা, রাই, রাধা, রাধিকা, রেবতী, লক্ষ্মী, শচী, শর্বরী, শর্মিষ্ঠা, শিবানী, সতী, সাবিত্রী, সীতা, সুজাতা, সুমিত্রা, হেমা, হেমাঙ্গী, হৈমবতী ও হৈলুপা।”

আরবীয় পুরাণে ব্যবহৃত নারীবাচক দৈবসত্তা হলো; “১. আছিয়া ২. আয়িশা ৩. কুলসুম ৪. ছকিনা ৫. ফাতিমা ৬. বিলকিস ৭. মরিয়ম ৮. মেহেরজান ৯. হাওয়া ও ১০. হাজেরা।”

উল্লিখিত যে কোনো একটি নারীবাচক দৈবসত্তাকে মাতা, কন্যা, দাদী, নানী, দিদি, বৌদি, মাসী, পিসী, প্রেমিকা, বেশ্যা, সম্রাজ্ঞী, রাণী ও মহারাণী ইত্যাদি চরিত্র রূপে ব্যবহার করে পুরাণে ব্যবহার উপযোগী সুমহান চমৎকার নির্মাণ করা যায়। নিচে একটি নারী-নারী সম্বন্ধসূচক চমৎকার নির্মাণ করে দেখানো হলো। “একদা কষণনগরের উপকণ্ঠে স্বর্গীয় উপবনের মহারাণী ‘হৈলুপা’; রাজপুরীর পরিচারিকা ‘বৈমলা’কে পতি হত্যার দায়ে; পতিঘাতিনী বা ভাতারখাকী বলে অভিযুক্ত করলেন। অতঃপর; দ্বীপান্তর গমনের আদেশ দিলেন। এও বলে দিলেন যে; কোনো পতিঘাতিনী কিংবা ভাতারখাকী এ স্বর্গীয় উপবনে থাকতে পারবে না। স্ত্রীর পূর্বে পতি মারা গেলে সে-ই পতিঘাতিনী বলে গণ্য হবে। এমন নির্মম আদেশ পেয়ে মহারাণীর চরণধূলি নিয়ে দ্বীপান্তর গমনে যাত্রা করলেন। এসময় বৈমলা অত্যন্ত অনুনয় ও কাকুতির স্বরে হৈলুপা রাণীর উদ্দেশ্যে বললেন; “রাণী মা, হতভাগিনীর স্বামী যদি দৈবাৎ পুনর্জীবিত হয়; তবে দম্পতির আশ্রয় ও প্রশ্রয় এ স্বর্গীয় উপবনে যেন হয়! যাবার বেলায় আপনার চরণকমলে শেষবারের মতো; কেবল এ আশ্বাসটুকু ভিক্ষা চাই”। মহারাণী বললেন; “অবশ্যই চিরদিন দম্পতির স্থান থাকবে। কিন্তু কোনো দিন পতিঘাতিনীর স্থান থাকবে না।”

অতঃপর; যাবার বেলায় বৈমলা দৈববাণী করে বললেন; মহামান্য মহারাণী আগামী ফাল্গুন মাস হতে প্রতি ফাল্গুনেই আপনার একটি করে পুত্রসন্তান মারা যাবেন। আগামী সাত ফাল্গুনে আপনার সাতজন পুত্রবধু সবাই ভাতারখাকী হবেন। আগামী ফাল্গুনে হতভাগিনী বৈমলার পতি পুনর্জীবিত হবেন। বৈমলা আবার স্বামী সোহাগিনী ও পতিব্রতা হয়ে এ স্বর্গীয় উপবনে ফিরে আসবে। কিন্তু আপনার পুত্রবধুগণ আর কোনো দিন এ স্বর্গীয় উপবনে ফিরে আসতে পারবেন না। দাসী বৈমলার এহেন অসম্ভব দৈববাণী শ্রবণ করে; মহারাণী হৈলুপা তার নির্মম আদেশের প্রতি নিজেই যার পর নাই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেন। এভাবে আগত ভবিষ্যতে নারীবাচক যত দৈবসত্তা সৃষ্টি হবে সব দৈবসত্তাই এ ক্রমিকে বসবে।

৩ পুরুষ-নারী সম্বন্ধ-সূত্র (Male-female relation formula)

পুরুষ-নারী সম্বন্ধ-সূত্রের সংজ্ঞা

(Definition of male-female relation formula)

চমৎকার, পুরাণ ও পৌরাণিক সাহিত্যাদি নির্মাণের জন্য পুরুষের সাথে নারীর সম্পর্ক স্থাপন নিয়মকে পুরুষ-নারী সম্বন্ধ-সূত্র বলে। যেমন; রাধা ও কৃষ্ণ।

১.    বাংভারতীয় শ্বরবিজ্ঞানের পুরুষবাচক দেবতাগুলো হলো; “কন্দর্প, গণেশ, চণ্ডীদাস, চন্দ্রশেখর, ধূর্জটি, নন্দ, নন্দলাল, বলরাম, বলাই, বিশ্বনাথ, বৈদ্যনাথ, ভৈরব, ভোলানাথ, মধু, মন্মথ, মরীচি, মহাদেব, মাধব, মহেন্দ্র, মহেশ, মারীচ, মেঘনাথ, যদু, যযাতি, যোগেশ, লখাই, লখিন্দর, লক্ষ্মণ, লম্বোদর, লোকনাথ, শঙ্কর, শঙ্কু, শম্ভু, শিব, সুদাম ও সুরেন্দ্র।”

২.   বাংভারতীয় শ্বরবিজ্ঞানের স্ত্রীবাচক দৈবসত্তাগুলো হলো; “অহল্যা, ইন্দিরা, ঊষা, কমলা, গৌরী, জয়ন্তী, দুর্গা, নন্দিনী, পদ্মা, পার্বতী, বিমলা, মাধবী, মালিনী, মৈথিলী, মোহিনী, যশোদা, রমা, রাই, রাধা, রাধিকা, রেবতী, লক্ষ্মী, শচী, সতী, সাবিত্রী, সীতা, সুমিত্রা, হেমা ও হৈমবতী।” এবং আরবীয় স্ত্রীবাচক দৈবসত্তাগুলো হলো; ১. আজনিয়া (أذْنِيَة) ২. আজিরা (عَذِراء) ৩. আত্বিয়া (عَطِيَة) ৪. আনিসা (أنِيْسَةُ) ৫. আমিনা (آمِنَةُ) ৬. আয়মান (أيمن) ৭. আয়িশা (عَائِشَةُ) ৮. আরওয়া (أرْوَى) ৯. আলিয়া (عَلِيَّةُ) ১০. আলিয়া (عَلِيَاءُ) ১১. আসমা (أَسْمَاءُ) ১২. আসিফা (أسِفَة) ১৩. আসিয়া (آسِيَةُ) ১৪. আসিয়া (عَاصِيَةُ) ১৫. উমামা (أُمَامَةُ) ১৬. কারিমা (كَرِيْمَةُ) ১৭. কুলসুম (كُلْثُوْمٌ) ১৮. খাওলা (خَوْلَةُ) ১৯. খাদিজা (خَدِيْجَةُ) ২০. জামিলা (جَمِيْلَةُ) ২১. জুলেখা (زُلَيْخَة) ২২. জোহরা (جَوْهَرَة) ২৩. জোহরা (زِهْرَة) ২৪. দারদা (دَرْدَعُة) (دَرْدَاءُ) ২৫. দুররা (دُرَّة) ২৬. নাফিসা (نَفِيْسَةُ) ২৭. ফাত্বিমা (فَاطِمَةٌ) ২৮. ফারিয়া (فَرِيْعَةُ) ২৯. ফারিয়া (فَرِيْعَةُ) ৩০. মারিয়ম (مَرْيَم) ৩১. রহিমা (رَحِيْمَةٌ) ৩২. রাবিয়া (رَبِيْعَيُة) ৩৩. রুকাইয়া (رُقَيَّةُ) ৩৪. রুবিয়া (رَبِيْعَيُة) ৩৫. রোকেয়া (رُوْكِيَّا) ৩৬. যায়নাব (زَيْنَبُ) ৩৭. লাইলা (لَيْلَىْ) ৩৮. লাইলি (لَيْلى) ৩৯. লুবাবা (لُبَابَة) ৪০. শাকিরা (شَاكِيْرَا) ৪১. শিরি (شِيْرِيْ) ৪২. সাইদা (سَعِيْدَة) ৪৩. সাইমা (صَائِمَة) ৪৪. সাওদা (سَوْدَةُ) ৪৫. সাজিদা (سَاجِدَة) ৪৬. সাঞ্জিদা (سَنْجِیْدَه) ৪৭. সাদিকা (صادقة) ৪৮. সাদিয়া (سَادِيَة) ৪৯. সাফিয়া (صَفِيَّةُ) ৫০. সাবা (سَابَا) ৫১. সাবিহা (صَبِيْحَة) ৫২. সামিয়া (سَامِيَة) ৫৩. সারাহ (سَارَة) ৫৪. সারিকা (سَارِقَة) ৫৫. সালমা (سَلاَمَة) ৫৬. সালমা (سَلْمِيَة) ৫৭. সালিমা (سَلِيْمَة) ৫৮. সাহিরা (سَاهِرَة) ৫৯. সুফিয়া (صُوْفِيَةٌ) ৬০. সুমাইয়া (سُمَيَّةُ) ৬১. সুরাইয়া (ثُرَيَّا) ৬২. সোহেলী (سُوهِيْلي) ৬৩. হাওয়া (حَوَاءٌ) ৬৪. হাফসা (حَفْصَةُ) ৬৫. হাজিরা (حَضْرَة) ৬৬. হাজিরা (هَاجِرَة) ৬৭. হানী (حَانِي) ৬৮. হামনা (هَامَانَة) ৬৯. হামিদা (حَمِيْدَةُ) ৭০. হালিমা (حَلِيْمَةُ) ৭১. হাসিনা (حَسْنَاء) ৭২. হাসিনা (حَسِيْنَة) ও ৭৩. হিন্দা (هِنْدَة)।”

উপরোক্ত যে কোনো পুরুষবাচক দেবতার সাথে যে কোনো স্ত্রীবাচক দৈবসত্তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, দাদা-দাদী, নানা-নানী, পিসা-পিসী, মেসো-মাসী, বন্ধু-বান্ধবী, প্রেমিক-প্রেমিকা, রাজা-রাণী ও সম্রাট-সম্রাজ্ঞী ইত্যাদি সম্পর্ক স্থাপন করে এবং রূপক চরিত্র রূপে ব্যবহার করে পুরাণে ব্যবহার উপযোগী সুমহান চমৎকার নির্মাণ করা যায়। নিচে একটি চমৎকার নির্মাণ করে দেখানো হলো। “একবার লম্বোদর তার স্ত্রী বিমলাকে বলেছিল; “আমার প্রাণ তোমার হাতে। তুমি যদি কোনো কুট কৌশলে আমাকে হত্যা না করো; তবে সারাবিশ্বে বিধাতার পরে আমাকে হত্যা করার কেউ নেই।” স্বামীর এমন কথা শুনে অত্যন্ত পতিব্রতা ও সাধ্বিরমণী বিমলা বললেন; “কোনো স্ত্রী কী কখনও স্বামীর হত্যাকারিণী হতে পারেন?”

বিমলার বৈমাত্রেয় বোন সুভদ্রা তাঁকে স্বর্গের মহা দৈবসম্মেলনে আমন্ত্রণ করলেন। দেবতাগণের মানবকুলে জন্ম নেওয়ার কারণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মহাপ্রভু কাঁই বললেন; “যদি কোনো অপ্সরা তার আপন পতির শিরোচ্ছেদ করে; সে রক্ত দ্বারা স্নান করতে পারেন; তবে তিনি মানবকুলে একবার জন্ম নিতে পারবেন। অন্যদিকে; যদি কোনো দেবতা আপন স্ত্রীর শিরোচ্ছেদ করে সে রক্ত দ্বারা স্নান করতে পারেন; তবে তিনি মানবকুলে একবার জন্ম নিতে পারবেন।”

মহাপ্রভুর এমন মহাবাণী শুনে সভাসদের অনেকেই শিহরিয়ে উঠলেন। আবার অনেকে হেন দুষ্কর্ম সম্পাদন করে মানবকুলে জন্মগ্রহণেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। বিমলা কুট কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে পতিকে হত্যা করে মানব রূপে এক মুচির ঘরে জন্মগ্রহণ করলেন”। এবার যদি বর্তমানকালে অভিনবভাবে নির্মিত সব চমৎকার একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। তবে; অনেক পাঠক মনে করবেন এসব হয়তো অনেক পূর্বে নির্মিত পৌরাণিক চমৎকার। অথচ এসব সদ্য নির্মিত চমৎকার। উপরোক্ত সদ্য নির্মিত পুরাণে ব্যবহার উপযোগী চমৎকারগুলো; না কোনো ইতিহাস এবং আর না কোনো অবতারের বাস্তব জীবনের বাস্তব ঘটনাবলী। বরং; এসব মানুষকে গল্পে গল্পে আত্মদর্শন বা শ্বরবিজ্ঞান শিক্ষা প্রদানের নিমিত্ত বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তাপৌরাণিক সংখ্যা ব্যবহার করে অভিনব রূপে নির্মিত পুরাণ।

আজ হতে প্রায় ছয় হাজার (৬,০০০) পূর্বাব্দে এভাবেই বাংভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম পুরাণ নির্মাণ করার শুভ সূচনা হয়েছিল। তার ফলশ্রুতিতেই প্রায় চার হাজার (৪,০০০) পূর্বাব্দে পৃথিবীর সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ আধ্যাত্মিক মহাগ্রন্থ ‘বেদ’ নির্মিত হয়। অতঃপর; প্রায় সাতশত (৭০০) অব্দের ব্যবধানে ‘রামায়ণ’ নামক অন্য একটি মহাগ্রন্থ নির্মিত হয়। এর সাথে সাথেই প্রায় একলক্ষটি (১,০০,০০০) শ্লোক-সম্বলিত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও প্রাচীনতম মহাগ্রন্থ ‘মহাভারত নির্মিত হয়। অতঃপর; নির্মিত হয় পুরাণগুলো। প্রায় বৌদ্ধদের কথিত দুই হাজার শত (২,৫০০) বছর পূর্বে; সতেরোটি খণ্ডের সমন্বয়ে ‘ত্রিপিটক নামে অন্য একটি মহাগ্রন্থ প্রায় ২০,০০০ পৃষ্ঠা (বর্তমান পৃষ্ঠা) আয়তনে পালিভাষায় নির্মিত হয়। আলোচ্য ‘বেদ ও ‘ত্রিপিটক নির্ভর কত গ্রন্থাদি যে বাংভারতীয় উপমহাদেশে নির্মিত হয়েছে তার ইয়ত্তা কে জানে? অনুরূপভাবে; দেহ  বিশ্বের বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তাগুলোর ছদ্মনাম, পৌরাণিক মূলক সংখ্যা ও সংখ্যা-সূত্রগুলো ব্যবহার করেই গ্রিক মহাজ্ঞানী মনীষীরা ইলিয়াড, ওডিসিঈনিদ নির্মাণ করেছিল। আর মিশরীয় মনীষীগণ নির্মাণ করেছিলেন গিলগামেশ। অন্যদিকে; আরবীয় মনীষীরা কুরান ও হাদিস নির্মাণ করেছিল। নিচে আরবীয় নর ও নারীবাচক দৈবসত্তাগুলো তুলে ধরা হলো;

১.    আরবীয় শ্বরবিজ্ঞানের পুরুষবাচক দেবতা; ১. আইয়ুব (ﺍﻴﻮﺐ) ২. আদম (ﺁﺪﻢ) ৩. আলইয়াসা (الْيَسَعَ) ৪. ইউনুস (ﻴﻨﻭﺱ) ৫. ইউশা (يوشع) ৬. ইউসুফ (ﻴُﻮْﺴُﻑٌ) ৭. ইদরিস (ﺍﺪﺭﻴﺱ) ৮. ইব্রাহিম (ﺍﺑﺭﺍﻫﻴﻡ) ৯. ইয়াকুব (ﻴﻌﻘﻮﺐ) ১০. ইয়াহিয়া (ﻴﺤﻴﻰ) ১১. ইলইয়াস (ﺍﻟﻴﺎﺱ) ১২. ইসমাইল (إِسْمَاعِيل) ১৩. ইসহাক্ব (ﺍﺴﺤﺎﻖ) ১৪. ইসা (عيسى) ১৫. উযাইর (عُزَيْر) ১৬. জুলকিফল (ﺬﻭ ﺍﻟﻜﻔﻝ) ১৭. দাউদ (دَاوُود) ১৮. নূহ (ﻨﻭﺡ) ১৯. মুহম্মদ (ﻤﺤﻤﺪ) ২০. মূসা (موسی) ২১. যাকারিয়া (ﺯﻜﺭﻴﺎ) ২২. লুত্ব (ﻟﻮﻄ) ২৩. শিশ (ﺸﻴﺶ) ২৪. শুয়াইব (شُعَيْب) ২৫. সালেহ (صَالِحً) ২৬. সুলাইমান (ﺴﻟﻴﻤﺎﻦ) ২৭. হারুন (هَارُون) ২৮. হুদ (هُود) ২৯. জিব্রাইল (ﺠﺑﺮﺍﺌﻴﻞ) ও ৩০. ফেরাউন (فِرْعَوْن)।

২.   আরবীয় শ্বরবিজ্ঞানের নারীবাচক দৈবসত্তাগুলো হলো; ১. আজনিয়া (أذْنِيَة) ২. আজিরা (عَذِراء) ৩. আত্বিয়া (عَطِيَة) ৪. আনিসা (أنِيْسَةُ) ৫. আমিনা (آمِنَةُ) ৬. আয়মান (أيمن) ৭. আয়িশা (عَائِشَةُ) ৮. আরওয়া (أرْوَى) ৯. আলিয়া (عَلِيَّةُ) ১০. আলিয়া (عَلِيَاءُ) ১১. আসমা (أَسْمَاءُ) ১২. আসিফা (أسِفَة) ১৩. আসিয়া (آسِيَةُ) ১৪. আসিয়া (عَاصِيَةُ) ১৫. উমামা (أُمَامَةُ) ১৬. কারিমা (كَرِيْمَةُ) ১৭. কুলসুম (كُلْثُوْمٌ) ১৮. খাওলা (خَوْلَةُ) ১৯. খাদিজা (خَدِيْجَةُ) ২০. জামিলা (جَمِيْلَةُ) ২১. জুলেখা (زُلَيْخَة) ২২. জোহরা (جَوْهَرَة) ২৩. জোহরা (زِهْرَة) ২৪. দারদা (دَرْدَعُة) (دَرْدَاءُ) ২৫. দুররা (دُرَّة) ২৬. নাফিসা (نَفِيْسَةُ) ২৭. ফাত্বিমা (فَاطِمَةٌ) ২৮. ফারিয়া (فَرِيْعَةُ) ২৯. ফারিয়া (فَرِيْعَةُ) ৩০. মারিয়ম (مَرْيَم) ৩১. রহিমা (رَحِيْمَةٌ) ৩২. রাবিয়া (رَبِيْعَيُة) ৩৩. রুকাইয়া (رُقَيَّةُ) ৩৪. রুবিয়া (رَبِيْعَيُة) ৩৫. রোকেয়া (رُوْكِيَّا) ৩৬. যায়নাব (زَيْنَبُ) ৩৭. লাইলা (لَيْلَىْ) ৩৮. লাইলি (لَيْلى) ৩৯. লুবাবা (لُبَابَة) ৪০. শাকিরা (شَاكِيْرَا) ৪১. শিরি (شِيْرِيْ) ৪২. সাইদা (سَعِيْدَة) ৪৩. সাইমা (صَائِمَة) ৪৪. সাওদা (سَوْدَةُ) ৪৫. সাজিদা (سَاجِدَة) ৪৬. সাঞ্জিদা (سَنْجِیْدَه) ৪৭. সাদিকা (صادقة) ৪৮. সাদিয়া (سَادِيَة) ৪৯. সাফিয়া (صَفِيَّةُ) ৫০. সাবা (سَابَا) ৫১. সাবিহা (صَبِيْحَة) ৫২. সামিয়া (سَامِيَة) ৫৩. সারাহ (سَارَة) ৫৪. সারিকা (سَارِقَة) ৫৫. সালমা (سَلاَمَة) ৫৬. সালমা (سَلْمِيَة) ৫৭. সালিমা (سَلِيْمَة) ৫৮. সাহিরা (سَاهِرَة) ৫৯. সুফিয়া (صُوْفِيَةٌ) ৬০. সুমাইয়া (سُمَيَّةُ) ৬১. সুরাইয়া (ثُرَيَّا) ৬২. সোহেলী (سُوهِيْلي) ৬৩. হাওয়া (حَوَاءٌ) ৬৪. হাফসা (حَفْصَةُ) ৬৫. হাজিরা (حَضْرَة) ৬৬. হাজিরা (هَاجِرَة) ৬৭. হানী (حَانِي) ৬৮. হামনা (هَامَانَة) ৬৯. হামিদা (حَمِيْدَةُ) ৭০. হালিমা (حَلِيْمَةُ) ৭১. হাসিনা (حَسْنَاء) ৭২. হাসিনা (حَسِيْنَة) ও ৭৩. হিন্দা (هِنْدَة)।

এখন বলা যায়; স্থান, কাল, পাত্র ও ভাষার ব্যবধান থাকলেও বিশ্বের সর্বভাষার সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িক মতবাদের চমৎকার নির্মাণের মূল উপাদান বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা, পৌরাণিক সংখ্যার বাইরে নয়। বিশ্বের সব পুরাণ নির্মাণের মূল উপাদান এক ও অভিন্ন। তবে; ভাব, ভাষা ও উপমা নির্মাণের শিল্পনৈপুন্যতা ভিন্ন ভিন্ন হওয়া আবশ্যক। নতুবা; একটি অন্যটির অবিকল বা হুবহু হলে একটি অন্যটির অনুলিপি বা প্রতিলিপি বা অনুবাদ বলে গণ্য হবে। যারফলে; সাহিত্যাদির স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা থাকবে না। এজন্য; একই ভাষায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও গীতিকারের দ্বারা পুরাণ বা মরমীসঙ্গীত নির্মিত হলে; একটি হতে অন্যটি নির্মাণের ব্যবধান যত যুগ বা যত শতাব্দীই হোক না কেন; সবগুলোর ভাব, উপমা ও শিক্ষাও প্রায় এক ও অভিন্ন বলে ধারণা হয়। অথবা পরেরটি পূর্বেরটির ভাব চুরি বলে মনে হয়। আরও স্মরণীয় যে; পুরাণ চর্চা, অধ্যায়ন ও নির্মাণ করার বিশ্ববিদ্যালয় একমাত্র মানবদেহ। মানবদেহের কার্যাবলী ও রহস্যাবলী নিয়ে; বিশ্বের যে কোনো ভাষায়, যে কোনো সময়, যে কোনো নির্মাতা বা যে কোনো রূপকারই সাহিত্য নির্মাণ করুক না কেন; একাধিক গ্রন্থ যখনই কোনো একটি ভাষায় অনুবাদ করা হবে; তখনই তা এক ও অভিন্ন বলে প্রতীয়মান হবে।

চমৎকারের উপকার (Benefits of miracle)

যে কোনো ব্যক্তিকে মহান বা শ্রেষ্ঠ রূপে গড়ে তোলার জন্য চমৎকার বিদ্যুৎ বেগে কাজ করে। এ কারণে সপ্ত-সত্তার মধ্যে চমৎকারের গুরুত্ব অত্যধিক। কোনকিছুকে মহান বা বৃহত্তম করে গড়ে তোলার একমাত্র হাতিয়ার হলো অভিনব চমৎকার। কোনো ব্যক্তি বা সত্তার ব্যাপারে কোনো লোকশ্রুতি বা কোনো কিংবদন্তি গড়ে তোলার জন্য চমৎকারের কোনো বিকল্প নেই। চমৎকার মানবজীবনে অবর্ণনীয় ও প্রভুত উপকারসাধন করে।

১.    চমৎকার একটি ভাষার অতীব প্রয়োজনীয় পুরাণ সম্পদ।

২.   এর উদাহরণ দ্বারা অনেক জটিল ও কঠিন বিষয়বস্তুকে অতি সহজে বুঝানো সম্ভব হয়।

৩.   এটি; শিশু ও কিশোরদের ঘুম পাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।

৪    এর দ্বারা পালাগান ও সারিগান রচনা করে; তা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা যায়।

৫.   এতে বর্ণিত দেবতা বা মহামানবগণের উত্তম আদর্শ বর্ণনা করার দ্বারা মানবকুলের চরিত্র সংশোধন করা যায়।

৬.   উত্তম ও অত্যুচ্চ চমৎকার নির্মাণ করে; তা প্রচারের দ্বারা ব্যক্তি তার ছদ্মনামকে সহজে সার্বজনীন বা বিশ্বজনীন করতে পারে।

৭.   এতে বর্ণিত অতি উত্তম চরিত্রকে নাট্য রূপ ও ছায়াচিত্র সদৃশ দান করে দেশ ও জাতির সুশিক্ষার সুব্যবস্থা করা যায়।

৮.   কোনো সভা, সমিতি, বৈঠক বা আসরে যথাযথ চমৎকার বর্ণনা করে উপস্থিত সভাসদকে সাময়িক বিমোহিত বা বশীভূত করা যায়। যেমন; হকাররা বিভিন্ন হাটে ঘাটে বা বিপণিচক্রের সামনে চমৎকার বর্ণনা করে শ্রোতামণ্ডলীকে বিমোহন করে।

৯.   উত্তম ও অত্যুচ্চ চমৎকার বর্ণনা করা দ্বারা কোনো অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে অত্যন্ত জ্ঞানী কিংবা সূক্ষ্মজ্ঞানী করে গড়ে তোলা যায়।

১০. রণাঙ্গন কিংবা যুদ্ধের ওপর নির্মিত উত্তম ও অত্যুচ্চ চমৎকার অবিরত বা পুনঃপুন বর্ণনা করার দ্বারা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত সৈনিকদের রণাঙ্গনে প্রাণপণ যোদ্ধা রূপে যুদ্ধ করার জন্য আরও উৎসাহ প্রদান করা যায়।

১১.  মাদকাসক্ত ও কলুষিত চরিত্রধারীদের চরিত্র সংশোধনের জন্য উত্তম ও অত্যুচ্চ চমৎকার ব্যবহার অনস্বীকার্য।

১২.  দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও চমৎকারের অধিক ব্যবহার করে অধিক পরিমাণে জনসমর্থন সৃষ্টি করা যায়।

১৩. বিশ্বের প্রায় সব শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যসূচীর বিভিন্ন শ্রেণিতে অসংখ্য চমৎকার রীতিমত পাঠদান করে কোমলমতী ছাত্র/ ছাত্রীদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার সুব্যবস্থা করা যায়।

চমৎকারের অপকার (Disservice of miracle)

অনেক ক্ষেত্রে চমৎকার বিজ্ঞ সমাজের বিশাল ও অবর্ণনীয় ক্ষতির কারণ হয়। চমৎকারের অপকারিতাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১.    চমৎকার নির্ভর অন্ধবিশ্বাসীরা জীবনে কখনও সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদের মূল ভজন-সাধনের সন্ধান পায় না।

২.   চমৎকার অন্ধবিশ্বাসী সাধারণ জ্ঞানীদেরকে সহজেই বিমোহিত করতে পারে।

৩.   এটা পুরাণ বা পৌরাণিক কাহিনী বিশ্বাসী ও শ্বরবিজ্ঞান বিশ্বাসী রূপে জাতিকে দুইভাগে বিভক্ত করে। যেমন; বর্তমানকালে প্রায় সাম্প্রদায়িক সংস্কারগুলোর মধ্যে একদল সাম্প্রদায়িক সংস্কারের প্রতি অন্ধবিশ্বাসী। অন্যদিকে; আরেক দল প্রকৃত আত্মজ্ঞানী। অর্থাৎ; শরিয়ত (ﺸﺭﻴﻌﺖ) ও মারিফত (ﻤﻌﺮﻔﺔ) বা আহলে জাহির (ﺍﻫﻝﻆﺎﻫﺭ) ও আহলে বাতিন (ﺍﻫﻝﺑﺎﻂﻥ)।

৪.   এটি; অন্ধবিশ্বাসীদের নিরাকার উপাস্যের ছলনা বা প্রলোভন সৃষ্টি করে অন্ধবিশ্বাসীকে ঘোর অন্ধকারের অতলগর্ভে নিক্ষেপ করে। যারফলে; তারা কোনো দিন সাঁই ও কাঁইয়ের বাস্তব সন্ধান পায় না।

৫.   এটি; পৌরাণিকদেরকে ভিত্তিহীন অমূলক ও অবাস্তব নিরাকার দর্শনে নিক্ষেপ করে।

৬.   এটি; পৌরাণিক ও শ্বরবিজ্ঞানীদের মধ্যে যুদ্ধ ও বিগ্রহ সৃষ্টি করে; যুগের পর যুগ লক্ষ লক্ষ প্রাণহানী ও সাগর সাগর রক্তহানী করে।

৭.   এটি; প্রকৃত সত্যকে সহজে অনুধাবন করতে দেয় না।

৮.   এটি; মানবজাতিকে সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের সুকঠিন শৃংখলে চির আবদ্ধ করে। এছাড়াও; এটি; মানুষকে অন্ধবিশ্বাস, অন্ধকার ও হতাশার মুখে ঠেলে দেয়।

৯.   প্রকৃত-সত্তা ও প্রকৃতসত্য আড়ালকৃত চমৎকার; সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদ বৈষম্য সৃষ্টি করে।

১০. একে বাস্তব ঘটনাবলী ভেবে নির্বোধ সাম্প্রদায়িক মনীষীরা সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক সংঘর্ষ ও সংগ্রামের সৃষ্টি করে।

১১.  বর্তমান বিশ্বের সর্বপ্রকার উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব সংঘাতের একমাত্র কারণ এ রূপক চমৎকার।

১২.  রূপক যুদ্ধ কাহিনী আকারে নির্মিত চমৎকার দুর্বলচিত্ত শাস্ত্র-ভীরুদের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ ও উগ্রবাদে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগায়।

১৩. মতবাদ ভীরুদের সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি, নৈরাজ্য, ধ্বংসযজ্ঞ, অস্থিতিশীলতা, অগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িকতার জন্য রূপকার্থে নির্মিত চমৎকারগুলোই একমাত্র দায়ী।

১৪. এটি; দুর্বল চিত্তের মতবাদ ভীরুদের মধ্যে স্বস্ব সাম্প্রদায়িক মতবাদের প্রচারের অনুপ্রেরণা ও সাম্প্রদায়িক বাড়াবাড়ির সৃষ্টি করে।

১৫. এটি; অন্ধবিশ্বাসীকে যার যার সাম্প্রদায়িক মতবাদ শ্রেষ্ঠ বলে; আত্মগর্ব বা আত্ম-অহংকার করতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

১৬.  চমৎকারের মরণ কবলে পতিত হয়ে মানুষ সত্য ও বাস্তবতাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে।

১৭. চমৎকারে বর্ণিত স্বর্গ ক্রয়ের জন্য অন্ধবিশ্বাসী উগ্রপন্থীরা নিজেদের জীবন ধ্বংস করতেও দ্বিধা করে না।

১৮. পৌরাণিক চমৎকারের অন্ধবিশ্বাসের মরণ কবলে পতিত দুর্বল চিত্তের মতবাদ ভীরুদের দ্বারাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উৎপত্তি হয়।

১৯.  এটি; সনাতন বিশ্বাসে কুঠারাঘাত করে; সাম্প্রদায়িক গোত্রীয় ও দলীয়ভাবে মানব জাতিকে খণ্ডবিখণ্ড করে। যেমন; এটি; বর্তমানে প্রতিটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়কে একাধিক দল ও উপদলে বিভক্ত করেছে।

এছাড়াও; বিজ্ঞানী, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, ঐতিহাসিক, আয়ুর্বেদিক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাস দর্শনের কবলে আক্রান্ত গবেষকরা অনেকেই চমৎকারের মরণ কবল হতে বাঁচতে পারে নি। এযাবৎ অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরাও পুনঃপুন চমৎকারের করালগ্রাসে পতিত হয়েছে। নিচে কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো।

চমৎকারের মরণ কবলে পতিত ঐতিহাসিক দল

(Fallen dying morsel historiographer group of the Miracle)

“ঋগ্বেদের পরিচয়” নামক চমৎকারনির্ভর অনুচ্ছেদটি নিচে তুলে ধরা হলো। বর্তমানকালের ঐতিহাসিকরাও কী পরিমাণ চমৎকার নির্ভর হয়ে পড়েছে; তা পাঠককুল কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারবে।

“হুইলারের ধারণা এ সময় ঋগ্বেদে বর্ণিত প্রাচীন আর্যজাতি উত্তর পশ্চিশ ভারতে প্রবেশ করে এবং হরপ্পা সংস্কৃতির ধারক বাহক যে মানুষ্য গোষ্ঠী ছিল তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে যারা বিজয়ী হয়েছিল তাদের আদর্শেই ঋগ্বেদের দেবতা ইন্দ্রের চরিত্রটি রূপায়ণ করা হয়েছিল। তিনি বলেন ঋগ্বেদের ‘পুরন্দর’ কথাটি ইন্দ্রের উপাধি রূপে ব্যবহৃত। সিন্ধুনদের অববাহিকায় যে সভ্য প্রাচীন জাতির নগর ছিল; সেসব ইন্দ্র ধ্বংস করেন বলেই তার নাম পুরন্ধর। সিন্ধু অববাহিকাবাসীরা প্রস্তর ও মৃত্তিকা দ্বারা দুর্গ নির্মাণ করতো। সম্প্রতিক কালে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এ অঞ্চলে অনেক ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছে। ঋগ্বেদে বর্ণিত ইন্দ্র এ ধরণের অনেক দুর্গ ধ্বংস করেছিলেন। এমর্মে যে বর্ণনা রয়েছে; তা এসব দুর্গকেই সূচিত করে (Wheeler Indian Civilisation p. 900)।

পিগোট হুইলারও এ প্রতিপাদ্যই গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন; এটা সুবিদিত যে; দুই হাজার (২,০০০) খ্রিস্টপূর্বাব্দ অর্থাৎ; আজ হতে প্রায় চার হাজার (৪,০০০) বছর পূর্বে; হরপ্পা সংস্কৃতি পরিপূর্ণ মহিমায় অধিষ্ঠিত ছিল। তাদের সংস্কৃতিটি ছিল সম্পূর্ণ নগর কেন্দ্রিক এবং সে নগরগুলো দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। আর্যজাতি ভারতে প্রবেশ করলে; তাদের সাথে ব্যাপক যুদ্ধ হয়। অতঃপর; আর্যরা তাদের সুরক্ষিত দুর্গগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীরই ছায়াপাত হয়েছে ঋগ্বেদে ইন্দ্রের বীরত্বসূচক কীর্তির বর্ণনায়। বৈদিক সাহিত্যের বর্ণনা অনুযায়ী যে জাতির সঙ্গে তারা সংঘর্ষ ও সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল; তাদের দস্যু বা দাস বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের আকৃতি সম্পর্কে বলা হয়েছে; তারা কৃষ্ণকায় এবং ‘অনাস’ অর্থাৎ; তাদের নাসা চেপ্টা ছিল। আমরা পূর্বেই বলেছি যে; এ প্রাচীনতম জাতির মানুষের অধিকাংশই ছিল অস্ট্রেলীয় গোষ্ঠীভুক্ত। তারা কৃষ্ণকায় ছিল এবং তাদের নাসিকা চেপ্টা ছিল।

এ প্রসঙ্গে ইন্দ্রের বীরত্বসূচক ভূমিকায় ঋগ্বেদে যে জাতি সম্পর্কে উল্লেখ আছে; সে বিষয় তিনি প্রসঙ্গত আলোচনা করেছেন। যেমন; ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ৫৩ সুক্তে উল্লিখিত হয়েছে; “হে ইন্দ্র! তুমি শত্রুধর্ষণকারী রূপে যুদ্ধ হতে যুদ্ধান্তরে গমন করো, বল দ্বারা নগরের পর নগর ধ্বংস করো।” (রমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদ)। ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলের ১৫ সুক্তে আছে; “ইন্দ্র বলকে বিদীর্ণ করেছিল। পর্বতের দৃঢ়দ্বার উদ্ঘাটিত করেছিল ও এদের কৃত্রিম রোধাদি উদ্ঘাটিত করেছিল।” ইন্দ্রকে যে পুরন্দর বলা হয়; সেকথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এসব তথ্য হতে অনুমান করা হয় যে; প্রায় চার হাজার বছর পূর্ব হতে; উত্তর পশ্চিম হতে আর্যরা ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে। তারপরঃ সেখানে অধিষ্ঠিত প্রাচীনতম যে নগরভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছিল; তাদের সাথে সংঘর্ষ ও সংগ্রামে লিপ্ত হয়। ঋগ্বেদের অনেক মন্ত্রের মধ্যে এ সংঘর্ষের ছায়াপাত হয়েছে।

সব সময়; ভৃগুর কামযুদ্ধ হয় শিশ্নের সাথে। কিন্তু শ্বরবিজ্ঞানে; এসব লজ্জাস্কর পরিভাষা পরিহার করার জন্য; ভৃগুর ছদ্মনাম রাখা হয়েছে ইন্দ্র। অতঃপর; নরদেহের ছদ্মনাম রাখা হয়েছে নগর। ইন্দ্র কামযুদ্ধে শুক্রপাত করার দ্বারা সব নরদেহই ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করে। এজন্য; ইন্দ্র অনেক নগর ধ্বংস করেছে বলা হয়েছে। চমৎকারের মরণ কবলে পতিত হয়ে অনেক বড় বড় ঐতিহাসিকগণও পুরাণ নির্ভর কথিত অনেক সাম্প্রদায়িক ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। তাই; বলা হয়; রাজনৈতিক ইতিহাস বাস্তব কিন্তু সাম্প্রদায়িক ইতিহাস কথিত, অবাস্তব, রূপক ও আত্মদর্শন ভিত্তিক। বাস্তব ঘটনা না ঘটলে রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা যায় না। কিন্তু বিশ্বের যে কোনো একটি পুরাণকে কেন্দ্র করে; যে কোনো সময় যে কোনো সাম্প্রদায়িক ইতিহাস নির্মাণ করা যায়- যা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।এবার ঋগ্বেদের রচনাকালের একটি মীমাংসা করা যায়। ঋগ্বেদ নির্মিত হয় আর্যজাতি সিন্ধু উপত্যকাবাসীদের পরাস্ত করার পর। অর্থাৎ; এ অঞ্চলে নগর কেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠারও অনেক পরে। অতঃপর; আর্যরা ভারতে প্রবেশ করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতিকে ধ্বংস করে তাদের বসতি স্থাপন করে। এমন মহাগ্রন্থ নির্মাণ করতে তাদের কয়েক শতাব্দী সময় লাগবে; তা সহজে অনুমান করা যায়। এ তথ্যের ভিত্তিতে ঋগ্বেদের রচনাকালকে পঞ্চদশ (১,৫০০) খ্রিস্টপূর্বাব্দ অর্থাৎ; আজ হতে প্রায় পঁয়ত্রিশ শত (৩,৫০০) বছর পূর্বে ধরে নেওয়া যায়। এ আলোচনার সমর্থনে বলা যায়; একটি মিটানিয়ান নথী পাওয়া গেছে; যার আনুমানিক কাল তেরশত আশি (১,৩৮০) খ্রিস্টপূর্বাব্দ অর্থাৎ; আজ হতে প্রায় তেত্রিশ শত আশি (৩,৩৮০) বছর পূর্ব ধার্য করা হয়েছে। ঋগ্বেদের কয়েকজন দেবতার নাম তাতে লেখা রয়েছে। তা হতে পিগোট অনুমান করেন যে; ঋগ্বেদের রচনাকাল পনেরোশত (১,৫০০) খ্রিস্টপূর্বাব্দ অর্থাৎ; আজ হতে প্রায় পঁয়ত্রিশ শত (৩,৫০০) বছর পূর্ব হবে। এটা একটি যুক্তি সঙ্গত অভিমত”।

চমৎকারের মরণ কবলে পতিত জ্যোতিষী দল

(Fallen dying morsel nostradamus group of the miracle)

“ইসলামের ইতিহাসে জ্যোতিষশাস্ত্র ও মুসলমান মনীষীদের জীবনে জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা” নামক চমৎকার নির্ভর অনুচ্ছেদটি নিচে তুলে ধরা হলো। বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও কী পরিমাণ চমৎকার নির্ভর হয়ে পড়েছে তা পাঠককুল কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারবে। “একজন ভবিষ্যদ্বক্তার (জ্যোতিষীর) সঠিক সুপরামর্শের কারণে মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ দয়া ও একান্ত ইচ্ছায় হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর পিতা আব্দুল্লাহর প্রাণ রক্ষা পায়। ইসলামী সাম্প্রদায়িক মতবাদের প্রচারক মানবদরদী মানুষের মুক্তির বাণী বাহক ও কল্যাণের উৎস হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পৃথিবীতে আগমনের পথ হয়েছিল সুগম। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পিতামহ আব্দুল মুত্তালিবের ওপর তৎকালে মক্কার কাবাগৃহের তীর্থযাত্রীদের জল সরবরাহের ভার ন্যস্ত ছিল। তীর্থের সময় প্রতিবছর সুপেয় জলের অভাব ঘটত। আব্দুল মুত্তালিব এতে বিচলিত হয়ে জল সরবরাহের কোনো নতুন উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টায় ছিলেন। “কালক্রমে মাটির তলে চাপা পড়ে যাওয়া হযরত ইসমাইলের (আঃ) সময়কার সে বিখ্যাত ‘যমযম’ কূপ পুনঃ আবিষ্কারের জন্য আব্দুল মুত্তালিব দৃঢ় প্রতীজ্ঞ হন। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও ‘যমযম’ উৎসটির সন্ধান না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাই; একদিন প্রতীজ্ঞা করলেন যদি আমার ১০টি সন্তান জন্মে এবং ‘যমযম’ কূপ আবিষ্কার করতে পারি; তবে একটি পুত্রকে হযরত ইব্রাহিমের (আঃ) ন্যায় আমিও আল্লাহর রাহে কুরবানি করব।

“কালক্রমে তিনি ‘যমযম’ কূপের আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেন। ১০টি পুত্র সন্তানও লাভ করলেন। এতে তিনি পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো এক পুত্রকে কুরবানি দিতে মনস্থ করলেন। পুত্রদের মধ্যে ‘তীর’ এর সাহায্যে ভাগ্য পরীক্ষার মাধ্যমে পুত্র আব্দুল্লাহর নাম নির্বাচিত হলো। তখন তাকে কোরবানির জন্য কাবাগৃহে নিয়ে গেলেন। তখন ‘মক্কার কুরাইশরা ও আব্দুল মুত্তালিবের অন্যান্য পুত্ররা এ কাজ করতে নিষেধ করলেন। ওঁরা আরও বললেন; “এভাবে যদি ছেলেকে কুরবানি করা হয়; তবে অনাগতকাল পর্যন্ত তা চলতে থাকবে। লোকেরা নিজ-নিজ সন্তানকে এনে কুরবানি দিতে থাকবে এবং এভাবে মানববংশ একে একে নিঃশেষ হয়ে যাবে।”

পুনঃপুন নিষেধ করা ও বুঝানোর পর আব্দুল মুত্তালিব ‘শিআ’ নামক একজন ভবিষ্যদ্বক্তার (জ্যোতিষীর) নিকট গিয়ে পরামর্শ গ্রহণ করলেন। ‘শিআ’ নির্দেশ দিলেন আব্দুল্লাহর বিনিময়ে ১০টি উট নির্ধারণ করো। অতঃপর; আব্দুল্লাহ ও ঐ ১০টি উট এর মধ্যে ভাগ্য পরীক্ষা করো। তিনি আরও বললেন যে; যতবার পর্যন্ত উটের নাম না উঠবে প্রতিবারই ১০টি করে উটের সংখ্যা বাড়াতে থাকবে। এরূপে যখন উটের নাম উঠবে; তখন নির্দিষ্ট সংখ্যক উট কুরবানি করতে হবে। জ্যোতিষী ‘শিআ’র নির্দেশ অনুযায়ী তাই করা হলো। দশবারের বার উটের নাম উঠল এবং উটের সংখ্যা দাঁড়ালো ১০০টিতে। তখন আব্দুল মুত্তালিব সন্তুষ্টচিত্তে ১০০টি উট কুরবানি করলেন। সে হতে কারো প্রাণের বিনিময়ে ১০০টি উট কুরবানির প্রথা আরবে প্রচলিত হয়ে গেল। এভাবেই পরবর্তীকালে যিনি বিশ্বনবির পিতা হবার গৌরব অর্জন করলেন; সে মহাভাগ্যবান আব্দুল্লাহ একজন ভবিষ্যদ্বক্তা (জ্যোতিষীর) সঠিক পরামর্শে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা পেয়েছিলেন”। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) বাল্যকালেই আরেক জ্যোতিষী বলেছিলেন ‘এ এক অসাধারণ বালক’। পিতামহ আব্দুল মুত্তালিবের পরলোকগমনের পর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) চাচা আবু তালিবের নিকট লালিতপালিত হতে লাগলেন। “তৎকালে বনু লাহাব গোত্রের একজন নজ্জম (জ্যোতিষী) মানুষের দৈহিক লক্ষণাদি দেখে মানবজীবনের শুভাশুভ বিচার করতেন (মানুষের চেহারা ও দৈহিক লক্ষণাদি বিচার বিশ্লেষণ করে শুভাশুভ নির্ণয় জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি প্রাচীন পদ্ধতি)। এ পদ্ধতিকে সামুদ্রিকবিদ্যা  Physiognomy বলে। এ পদ্ধতিটি জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি বিশেষ শাখা।

বনু লাহাব গোত্রের এ জ্যোতিষী প্রায়ই মক্কায় আসতেন। কুরাইশরা তাদের ছেলেদের নিয়ে শুভাশুভ জানার জন্য তার কাছে ভিড় করতেন। একদিন আবুতালিবও বালক মুহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে উক্ত জ্যোতিষীর নিকট গেলেন। জ্যোতিষী শিশু মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই গভীরভাবে মনোযোগী হলেন। আবুতালিব বালক মুহাম্মদ এর প্রতি জ্যোতিষীর অধিক মনোযোগ লক্ষ্য করে অজানা আশঙ্কায় কৌশলে বালক মুহাম্মদকে জ্যোতিষীর সম্মুখ হতে সরিয়ে দিলেন। এতে জ্যোতিষী বললেন; “ছেলেটিকে আবার আমার কাছে নিয়ে এসো। শপথ! এ এক অসাধরণ বালক”। সেদিনের সে ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তীকালে সত্যে পরিণত হয়েছিল। আজ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পৃথিবীতে এক অসাধারণ মহামানব রূপে স্বরণীয় ও বরণীয়।

হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পঁচিশ বছর বয়সে চল্লিশ বছর বয়সের বিধবা মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের প্রভুত ধনসম্পদের অধিকারিণী ও অশেষ গুণবতী বিবি খাদিজাকে (রাঃ) বিবাহ করেন। বিবাহের পর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সাম্প্রদায়িক মতবাদের চিন্তায় অধিক মনোযোগী হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে অধিকাংশ সময়ই তিনি মক্কার সন্নিকটে একটি পর্বতের গুহায় নির্জনে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। দীর্ঘ পনেরো বছর তিনি কাটিয়েছিলেন এ ধ্যানমগ্নতায়। অবশেষে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসের ৬ তারিখে প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে তিনি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের (আঃ) কাছ থেকে আল্লাহর বাণীলাভ করেন। অর্থাৎ; নবুয়ত প্রাপ্ত হন। বাণী প্রাপ্ত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সর্বপ্রথম বিবি খাদিজার (রাঃ) নিকট ফিরে গিয়ে এ সুসংবাদ জ্ঞাপন করেন।

বিবি খাদিজার (রাঃ) চাচাত ভাই তৎকালে নজ্জুমিয়ৎ (জ্যোতিষশাস্ত্র) চর্চা করতেন। খাদিজা (রাঃ) তার চাচাত ভাইয়ের নিকট গমনপূর্বক সবকিছু বিস্তারিত অবহিত করলেন। তখন তিনি নক্ষত্রের অবস্থান বিশ্লেষণপূর্বক বললেন; “এ সে পবিত্র মহাপুরুষ, যার কথা পবিত্র গ্রন্থ তৌরাতে উল্লেখ রয়েছে। আমি আরও দেখতে পাচ্ছি যে; তার বংশধরগণ তার ওপর নিদারুণ অত্যাচার করবে। যদি ততদিন বেঁচে থাকি তবে আমি তাঁর পক্ষ অবলম্বন করব। একথা শ্রবণের পর বিবি খাদিজা (রাঃ) গৃহে ফিরে এসেই ইসলামী মতবাদ গ্রহণ করলেন। বিবি খাদিজাই (রাঃ) বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী। সুতরাং বলা যায় যে; মহান ইসলামী সাম্প্রদায়িক মতবাদের প্রারম্ভেই জ্যোতিষ শাস্ত্রের ভূমিকা রয়েছে।

ইসলামী সাম্প্রদায়িক মতবাদের মহান ব্যক্তিত্ব জ্ঞান-সমুদ্র আমিরুল মোমেনিন হযরত আলি (রাঃ) খলিফা রূপে সর্বপ্রথম জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অধিক দৃষ্টি দিয়েছিলেন। তার অসংখ্য নীতিবাক্য ও দার্শনিক উক্তি বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ‘আনওয়ারুল আকওয়াল’ নামক তার একটি কাব্যগ্রন্থের কথাও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। তাঁর নামে প্রচলিত আরও একটি কাব্যগ্রন্থ ‘দীওয়ানে আলি’ আজও আরবি মাদ্রাসাগুলোতে পাঠ্যপুস্তক রূপে বিদ্যমান। আরবি ব্যাকরণসহ আরও অনেক সূক্ষ্ম ও জটিল শাস্ত্রের প্রবর্তক রূপে হযরত আলির (রাঃ) নাম সর্বজন স্বীকৃত। তাঁর আবিষ্কৃত বা প্রবর্তিত অনেক শাস্ত্র জ্ঞানের তালিকাও গবেষকগণ পেশ করেছেন। কেরাত, ফরায়েজ, কালাম, খেতাব, কেতাবত, তাবীর, নক্ষত্রবিদ্যা, তিব্ব, কবিতা, ছন্দবিদ্যা ও অংক প্রভৃতি শাস্ত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। মুসলমানরা সর্বক্ষেত্রেই তাঁকে মুসলমানদের ইমাম মান্য করে। তিনি সুফি শাস্ত্রেও ইমাম ছিলেন। এ শাস্ত্রের অসংখ্য বুজর্গ সাধক নিজেদেরকে হযরত আলির (রাঃ) ত্বরিক্বাপন্থী বা অনুসারী বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন।

‘নাহাজুল বালাগাহ’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি হযরত আলির (রাঃ) নির্মিত বলে প্রচলিত। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রন্থে হযরত আলি (রাঃ) জ্যোতিষশাস্ত্র সম্পর্কে বলেন;

      “হে মোমেন সব তোমরা জ্যোতিষশাস্ত্র শিক্ষা করো না,

            হ্যাঁ ততটুকু শেখো যতটুকু দ্বারা আত্মরক্ষা করা চলে”।

হযরত আলি (রাঃ) জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করতেন বলেও কথিত আছে। সুতরাং; বলা যায়; খোদার ওপর খোদকারী নয়; প্রকৃতপক্ষে জ্যোতিষ শাস্ত্র দ্বারা স্রষ্টার অপার মহিমা; জীবন পথের পাথেয় নির্দেশনা; জীবন দর্শনের গতিধারা; আধ্যাত্মিকতার সন্ধান; বাস্তব জীবনের রূপরেখা ও বর্তমান সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। আর এর ভিত্তি হচ্ছে জন্মকালীন গ্রহ ও গ্রহদের অবস্থানের সঠিক গণনা।”।

উল্লেখ্য; এখানে যদিও আলি আরবীয় পৌরাণিক চরিত্র; তবুও; কেবল যুক্তির জন্য আলোচনা করা হয়েছে। আর কেবল শিক্ষার জন্য আলোচনা করা হয়েছে।

অত্যন্ত চমৎকার বিষয় হলো শ্বরবিজ্ঞানে ও পুরাণে আত্মতত্ত্বের সব বিষয়বস্তুকে অনেক ব্যবধানে দেখানো হয়। অর্থাৎ; মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তুকে আড়াল করে উপমার মাধ্যমে আলোচনা করা হয়। যাতে পাঠকরা পড়েও বুঝতে না পারে, ও শ্রোতারা শুনেও বুঝতে না পারে। নিচে আরবীয় পুরাণে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলোর দেহতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি উদ্ঘাটন করা হলো;

আবু তালিব (অন্বেষীর পিতা)               = শিষ্য।

আব্দুল মুত্তালিব (জ্ঞানান্বেষীর পিতা)       = শিষ্য।

আলি (অটল)                                 = অটল।

কুরাইশ (বিখণ্ডিত)                           = সন্তান।

জিব্রাইল (অত্যন্ত কঠিন)                    = বাক্ দেবতা বলন।

জ্যোতিষী                                     = জ্ঞান।

নজ্জম (জ্যোতিষী)                           = জ্ঞান।

নবুয়ত (প্রচারকাল)                          = রজকাল।

যমযম (কূপ)                                 = জননপথ (বৈতরণী)।

বনু লাহাব (অগ্নিধারী)                       = কাম আগুনধারী যুবক/যুবতী।

মক্কা (চুষণকারী)                             = যোনি (কবন্ধ)।

মুহাম্মদ (প্রশংসিত)                          = সাঁই।

পনের বছর                                   = কিশোরীর রজস্বলা হওয়ার বয়স।

মহাপুরুষ                                     = সাঁই।

হিরা (পর্বত)                                  = দেহ।

১০টি সন্তান                                  = ১০ ইন্দ্রিয়।

১০টি উঠ                                     = ১০ ইন্দ্রিয়।

২৫ বছর                                      = ২৫ গুণ।

৪০ বছর                                      = ৪০ তলা।

১০০টি উঠ                                   = শতদল।

চমৎকারের মরণ কবল হতে আত্মরক্ষার উপায়

(Bulwark from dying morsel of the miracle)

চমৎকারের মহাবিভ্রান্তিকর সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাস হতে আত্মরক্ষা করার জন্য প্রত্যেকের নিম্নোক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা অবশ্য উচিত।

১.   চমৎকারকে সর্বসময় রূপক ও অলৌকিকভাবে নির্মিত বলে মনে করা।

২.   চমৎকারকে কখনই বাস্তব মনে না করা।

৩.   এতে ব্যবহৃত রূপক ও ব্যাপক পরিভাষা সম্পর্কে সর্বাগ্রে ভালোভাবে জানা ও বুঝা।

৪.   এতে ব্যবহৃত দৈবসত্তাগুলো ও সংখ্যা-সূত্রগুলোর মূলোদ্ঘাটন করে বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার দেহাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি জানা।

৫.   চমৎকারের মধ্যে বর্ণিত সব সত্তা, তথ্য-উপাত্ত ও উপাদান একমাত্র মানুষের মধ্যে অন্বেষণ করা।

৬.   একে জানা ও বুঝার জন্য আগে বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীপৌরাণিক সংখ্যা সারণী অবশ্যই ভালোভাবে জানা ও বুঝা প্রয়োজন।

চমৎকারের মরণ কবল হতে বাঁচতে হলে সর্বপ্রথমে বিশ্বের সব সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদের পৌরাণিক কাহিনীকে অবাস্তব ও শিক্ষামূলক বলে মনে করা। বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক নামে দেবতায়ন করেই বাঙালী পৌরাণিক দেবতা নির্মাণ করা হয়। অতঃপর; নির্মিত ঐসব দেবতা দ্বারাই পৌরাণিক চরিত্র নির্মাণ করা হয়। পুরাণে বর্ণিত চমৎকার বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কার্যকলাপের রূপক ব্যাখ্যা মাত্র। পুরাণে বর্ণিত যুদ্ধগুলো হলো; হয়তো মন ও জ্ঞানের নীরব দ্বন্দ্ব; নয়তো ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্ণয়। অথবা শিশ্ন ও যোনির কামযুদ্ধ। চমৎকারের মধ্যে বর্ণিত স্থানগুলো হলো; স্থানবাচক বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা। তেমনই; কালগুলো হলো; কালবাচক বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা, অবস্থাগুলো হলো; অবস্থাবাচক বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা এবং বস্তুগুলো হলো  বস্তুবাচক বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা

রূপক কাহিনী ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সম্পর্কে আগে জানতে হবে। যেমন; ঐতিহাসিক ঘটনাবলী কখনও পৌরাণিক কাহিনী নয়। তেমনই; পৌরাণিক কাহিনীও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী নয়। সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পৌরাণিক কাহিনী যুগে যুগে সুমহান আত্মজ্ঞানী মনীষীদের দ্বারা নির্মিত। কিন্তু ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সমসাময়িক লেখক ও সংকলকদের দ্বারা সংকলিত। রাজা, সম্রাট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিগণের অতীত কার্যক্রমই হলো ইতিহাস। কিন্তু দেবতাগণের কার্যক্রমই হলো চমৎকার। চমৎকার হতে সর্বশ্রেণির মানুষই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু ইতিহাস হতে কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। চমৎকার দ্বারা মানুষের নৈতিক ও জাগতিক উভয় শিক্ষা প্রদান করা হয়। কিন্তু ইতিহাস দ্বারা কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বগণকে শিক্ষা প্রদান করা যায়। এজন্য; কখনই ইতিহাসকে চমৎকার এবং চমৎকারকে ইতিহাস মনে করা ঠিক নয়।

উল্লেখ্য; চমৎকারকে ইতিহাস কল্পনা করেই সর্বপ্রথম সাম্প্রদায়িক মতবাদের উদ্ভব হয়েছে। কবে কিভাবে সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদের সূচনা হয়েছে সেকথা এখন সঠিকভাবে বলা দুষ্কর। সে-ই সাম্প্রদায়িক মতবাদ হতেই ক্রমে ক্রমে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদই মরণব্যাধি ক্যান্সারের চেয়েও মহামারী রূপধারণ করেছে। মতবাদ ভীরু কোমলমতি যুবক/ যুবতীরা এখনও সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পৌরাণিক চমৎকারকে পৌরাণিক কাহিনী বলে বিশ্বাস করতে চায় না। দেবতাগণের পৌরাণিক কাহিনীকে তারা চরম ও পরম বাস্তব ঘটনাবলী বলে বিশ্বাস করে। অধিক অন্ধবিশ্বাসী ও অতিভক্তিকারীদের (pietists) কারণেই শ্বরবিজ্ঞানের নির্মিত শিক্ষামূলক পৌরাণিক কাহিনী মতবাদ ভীরু মানুষের নিকট বাস্তব ঘটনাবলী বা ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বলে প্রতীয়মান হওয়া আরম্ভ হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়; মুসলমান দেবতাগণের পৌরাণিক কাহিনীর পুস্তক-পুস্তিকাকে আজও কাসাস নামেই নামকরণ করা হয়। যেমন; কাসাসুল কুরান, কাসাসুল আম্বিয়া, কাসাসুল আউলিয়াহেকায়াতে সাহাবা ইত্যাদি। মজার ব্যাপার হলো; গ্রন্থের নাম ‘কাসাস’ যার অর্থ পুরাণ বা রূপককাহিনী। কিন্তু বাংভারতের মতবাদপ্রবণ মুসলমানরা পুরাণকে ইতিহাস রূপে স্বীকার করছে। হ্যাঁ যদি গ্রন্থের নাম ‘তাওয়ারিখুল কুরান’ বা ‘তাওরিখুল আম্বিয়া’ হতো; তবে; তাকে ইতিহাস বললে কোনো দোষ হতো না। কারণ; আরবি তারিখ অর্থ ইতিহাস এবং তাওয়ারিখ অর্থ ইতিহাসগুলো।

কাসাস [ﻘﺼﺺ] (আপৌছ)বি কাহিনী, গল্প, রূপকথা। এটি; আরবি ক্বিস্সা (ﻘﺼﺔ) পরিভাষা হতে বহুবচন {}

ক্বিসসা [ﻗﺼﺔ] (আপৌছ)বি কাহিনী, গল্প, রূপকথা, ঘটনাবলী (পরি) শিক্ষামূলক ছোট ছোট পৌরাণিক কাহিনী (শ্ববি) উপমা, তুলনা, সাদৃশ্য, বর্ণনা, উদাহরণ, কোনকিছুর রূপক বর্ণনা (আসং) মু’জিযা (.ﻤﻌﺠﺯﺓ) (রূপ্রশ) ছোটকি, লৌকিকা, চমৎকার (শ্ববি) বাহ্যিক আকৃতিগত তুলনা, রূপক উপমা, মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তুর সাথে প্রকৃতির বিষয়বস্তুর তুলনা (ইপ) তাশবিহ (.ﺘﺸﺒﻴﻪ), মিসাল (.ﻤﺜﺎﻝ) (ইংপ) similitude, likeness (দেপ্র) এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর উপমা পরিবারের ইসলামী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা ও শ্বরবিজ্ঞানের একটি সংস্কার বিশেষ (সংজ্ঞা) . সম মতবাদ বা সমগুণ বিশিষ্ট দুটি ভিন্নজাতীয় বিষয়বস্তুর সাদৃশ্যমূলক বর্ণনাকে উপমা বা কাহিনী বলা হয় . মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদিকে উপমিত পদ ধরে প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তুর সাথে সার্থক তুলনামূলকভাবে নির্মিত কাহিনীকে ক্বিসসা (ﻘﺼﺺ) বলা হয় (বাপৌছ) অলৌকিককার্য (বাপৌচা) আলেয়া (বাপৌউ) লৌকিকা (বাপৌরূ) চমৎকার (বাপৌমূ) উপমা {}

তারিখ [ﺘﺎﺭﻴﺦ] (আপৌছ)বি দিন, দিবস, যুগ, অব্দ, বর্ষ, অয়ণ, পুরাকীর্তি, ইতিহাস {}

তাওয়ারিখ [ﺘﻮﺍﺭﻴﺦ] (আপৌছ)বি ইতিহাস, ইতিবৃত্ত, পুরোনো ঘটনাবলী (ব্য্য) আরবি তারিখ (ﺘﺎﺭﻴﺦ) পরিভাষাটির বহুবচন বিশেষ {}

উল্লেখ্য; অত্র গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের এ বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপমান, চারিত্রিক ও ছদ্মনাম পরিভাষার অনুকূলে অবশিষ্ট আলোচনা করা হয়েছে।

প্রামাণ্য পুস্তক-পুস্তিকা (Authoritative books)

.   পৌরাণিক অভিধান; সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত; নবম সংস্করণ; পৌষ ১৪১২; দাস অফসেট প্রসেসর; ২৫, গুলু ওস্তাগর লেন; কলকাতা ৭০০ ০৩৬।

.   বেদ; ঋগ্বেদ পরিচয়; হরফ প্রকাশনী; এ ১২৬, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট; কলকাতা ৭০০ ০০৭; চতুর্থ মুদ্রণ; ৫ ফাল্গুন ১৪০৬; ভূমিকা; ঋগ্বেদের রচনাকাল।

.   জ্যোতিষ শাস্ত্রের কথা; দ্বিতীয় প্রকাশ; ১০ই জুন ২০০১; আর কে ভূঁইয়া রেডিক্স সার্ভিস; ২১ শান্তিনগর (দোতালা); ঢাকা- ১২১৭; পৃষ্ঠা ৩৩-৩৩।

তথ্যসূত্র (References)

(Theology's number formula of omniscient theologian lordship Bolon)

১ মূলক সংখ্যা সূত্র (Radical number formula)
"আত্মদর্শনের বিষয়বস্তুর পরিমাণ দ্বারা নতুন মূলক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়।"

রূপক সংখ্যা সূত্র (Metaphors number formula)

২ যোজক সূত্র (Adder formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে ভিন্ন ভিন্ন মূলক সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন যোজক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, গণিতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায় না।"

৩ গুণক সূত্র (Multiplier formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে এক বা একাধিক মূলক-সংখ্যার গুণফল দ্বারা নতুন গুণক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৪ স্থাপক সূত্র (Installer formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে; এক বা একাধিক মূলক সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে স্থাপন করে নতুন স্থাপক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৫ শূন্যক সূত্র (Zero formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন শূন্যক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

< উৎস
[] উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
() ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
> থেকে
√ ধাতু
=> দ্রষ্টব্য
 পদান্তর
:-) লিঙ্গান্তর
 অতএব
× গুণ
+ যোগ
- বিয়োগ
÷ ভাগ

Here, at PrepBootstrap, we offer a great, 70% rate for each seller, regardless of any restrictions, such as volume, date of entry, etc.
There are a number of reasons why you should join us:
  • A great 70% flat rate for your items.
  • Fast response/approval times. Many sites take weeks to process a theme or template. And if it gets rejected, there is another iteration. We have aliminated this, and made the process very fast. It only takes up to 72 hours for a template/theme to get reviewed.
  • We are not an exclusive marketplace. This means that you can sell your items on PrepBootstrap, as well as on any other marketplate, and thus increase your earning potential.

পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী

উপস্থ (শিশ্ন-যোনি) কানাই,(যোনি) কামরস (যৌনরস) বলাই (শিশ্ন) বৈতরণী (যোনিপথ) ভগ (যোনিমুখ) কাম (সঙ্গম) অজ্ঞতা অন্যায় অশান্তি অবিশ্বাসী
অর্ধদ্বার আগধড় উপহার আশ্রম ভৃগু (জরায়ুমুখ) স্ফীতাঙ্গ (স্তন) চন্দ্রচেতনা (যৌনোত্তেজনা) আশীর্বাদ আয়ু ইঙ্গিত ডান
চক্ষু জরায়ু জীবনীশক্তি দেহযন্ত্র উপাসক কিশোরী অতীতকাহিনী জন্ম জ্ঞান তীর্থযাত্রা দেহাংশ
দেহ নর নরদেহ নারী দুগ্ধ কৈশোরকাল উপমা ন্যায় পবিত্রতা পাঁচশতশ্বাস পুরুষ
নাসিকা পঞ্চবায়ু পঞ্চরস পরকিনী নারীদেহ গর্ভকাল গবেষণা প্রকৃতপথ প্রয়াণ বন্ধু বর্তমানজন্ম
পালনকর্তা প্রসাদ প্রেমিক বসন পাছধড় প্রথমপ্রহর চিন্তা বাম বিনয় বিশ্বাসী ব্যর্থতা
বিদ্যুৎ বৃদ্ধা মানুষ মুষ্ক বার্ধক্য মুমুর্ষুতা পুরুষত্ব ভালোবাসা মন মোটাশিরা যৌবন
রজ রজপট্টি রজস্বলা শুক্র মূত্র যৌবনকাল মনোযোগ রজকাল শত্রু শান্তি শুক্রপাত
শুক্রপাতকারী শ্বাস সন্তান সৃষ্টিকর্তা শুক্রধর শেষপ্রহর মূলনীতি সন্তানপালন সপ্তকর্ম স্বভাব হাজারশ্বাস
ADVERTISEMENT
error: Content is protected !!