৯৮/১ ধর্ম
Ism (ইজাম)/ ‘دين’ (দীন)

ভূমিকা (Prolegomenon)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর স্বভাব পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা স্বভাব। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা জাত। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা নিসর্গ এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা প্রকৃতি

অভিধা (Appellation)
ধর্ম (বাপৌরূ)বি স্বভাব, প্রকৃতি, গুণ, পুণ্য, মনুষ্যত্ব, নিয়ম, রীতি, সতিত্ব, সৎকর্ম, পুণ্যকর্ম, সদাচার, কর্তব্যকর্ম, প্রত্যেক জীব বা বস্তুর নিজস্ব গুণ, Ism (ইজাম)/ ‘دين’ (দীন) (জ্যো) রাশিচক্রের লগ্ন থেকে নবম স্থান (প্র) পদার্থবিজ্ঞানে বস্তুর বৈশিষ্ট্যকে ধর্ম বলা হয় (শ্ববি) গুণ, প্রত্যেক জীব বা বস্তুর নিজস্ব গুণ, attribute, ‘المهاراة’ (মাহারাত)/ Ism (ইজাম)/ ‘دين’ (দীন) (দেপ্র) এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর স্বভাব পরিবারের বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা ও ভারতীয় বাঙালী পৌরাণিক দেবতা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১. সাধারণত; বাংলা পদার্থ বিজ্ঞানে কোনো বস্তুর গুণাগুণকে ‘ধর্ম বলা হয় ২. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, যৌনতার উপমান ও প্রতীকী সংস্কৃতিকে রূপকার্থে ‘ধর্ম বলা হয় (বাপৌছ) প্রকৃতি (বাপৌচা) নিসর্গ (বাপৌউ) জাত (বাপৌরূ) ধর্ম (বাপৌমূ) স্বভাব।

প্রপক (Extensive)
১.   ব্র‏হ্মার দক্ষিণ অঙ্গ হতে ধর্ম উৎপন্ন হয়। বরাহপুরাণে কথিত আছে যে; ব্র‏হ্মা সৃষ্টি করার মানসে যখন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হন। তখন তাঁর দক্ষিণ অঙ্গ হতে এক পুরুষের (ধর্ম) আবির্ভাব ঘটে। ব্র‏হ্মা তখন তাঁকে বলেন; “তুমি চতুষ্পদ ও বৃষভাকৃতি। তুমি বড় হয়ে প্রজাপালন করো।” তখন; ধর্ম সত্যযুগে চতুষ্পদ, ত্রেতায় ত্রিপদ, দ্বাপরে দ্বিপদ এবং কলিতে একপদ হয়ে ব্রাহ্মণদের সম্পূর্ণ রূপে, ক্ষত্রিয়দের তিন ভাগ, বৈশ্যদের দুই ভাগ ও শূদ্রদের একভাগ রক্ষা ও পালন করতে আরম্ভ করেন। গুণ, দ্রব্য, ক্রিয়া ও জাতি এ চারটি সাম্প্রদায়িক মতবাদের পদ। বেদে এঁর নাম তৃশৃঙ্গ। এঁর মাথা দুটি ও হাত সাতটি। বামনপুরাণ মতে; ধর্মের স্ত্রী অহিংসা। এঁর গর্ভে চারটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে যথা; ১. সন্যকার ২. সনাতন ৩. সনক ও ৪. সনন্দ। অন্যান্য পুরাণে এঁরা ব্র‏হ্মার মানসপুত্র বলে কথিত আছে।

২.   মহাতেজস্বী একজন রাজা। এঁর কন্যার নাম ধর্মব্রতা।

Orthodoxy [ওরথোডক্সি] (GMP)n সনাতন, অনন্ত, চিরন্তন, চিরস্থায়ী, বিশ্বজনীন, শাশ্বত, সার্বজনীন, সর্বজন বিধিত, catholic, eternal, never-dying, ‘أرثوذكسي’ (উর্সুজুক্সি), ‘الأرثوذكس’ (আলউর্সুজুক্স) (প্র) গোঁড়া; সাধারণ্যে গৃহীত বা অনুমোদিত (ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ইত্যাদিতে বিশ্বাসী) {}

ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (A highly important quotations of ism)
“সবাই কী আর হবেরে মন, ধর্মপরায়ণ, যার যার কর্ম সে সে করে, তোমার বলা অকারণ।” (পবিত্র লালন- ৯১৫/১)

ধর্মের কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of ism)
১.   “কোন সাধনে শমনজ্বালা যায়, ধর্মাধর্ম বেদের মর্ম, শমনের অধিকার তায়।” (পবিত্র লালন- ৩৬৯/১)
২.   “ধর্মবাজার মিলাইছে নিরঞ্জনে, এক কানা এক বোবা, ভবের হাটে করে বিকিকিনে।” (পবিত্র লালন- ৫৬৭/১)
৩.   “ধর্মাধর্ম নাই যে বিচার, কৃষ্ণসুখে সুখ গোপীকার, হয় যে নিরন্তরি, তাইতো; দয়াময়- গোপীরে সদাই, মনের ভ্রমে জানতে নারি।” (পবিত্র লালন- ৫৫৮/৩)
৪.   “ধর্মাধর্ম বলতে নাই, শুধু প্রেমের গান গায়, নাই লজ্জা ভয়, জাতির বোল রাখল না সে, সেতো করল একাকারময়।” (পবিত্র লালন- ৪২৩/২)
৫.   “ধর্মাধর্ম সব নিজের কাছে, জানা যায় শাস্ত্র যেচে, লালন কয় আমার ভুল হয়েছে, ভেবে দেখি তাই।” (পবিত্র লালন- ৬৩৭/৪)
৬.   “না মানে সে ধর্মাধর্ম, যার হয়েছে বিচার সাম্য, লালন কয় সাঁই মহামান্য, তবে মানবকরণ সারা।” (পবিত্র লালন- ১৮৫/৪)
৭.   “প্রেম কী সামান্যেতে রাখা যায়, প্রেমে মজলে ধর্মাধর্ম ছাড়তে হয়।” (পবিত্র লালন- ৬৪৩/১)
৮.   “প্রেম পিরিতির এমনই ধারা, এক প্রেমে দু’জন মরা, ধর্মাধর্ম চায় না তারা, লালন বলে প্রেমের রীতি তাই।” (পবিত্র লালন- ৬৪৩/৪)
৯.   “বড়াই করে কপাল পোড়া, বুঝে না সাম্প্রদায়িক মতবাদের আগাগোড়া।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২০৪)
১০. “ধর্মীয় মতবাদ গোত্র জাতির, তুলবে না কেউ জিকির, কেঁদে বলে লালন ফকির, কেবা দেখিয়ে দিবে।” (পবিত্র লালন- ২২৮/৪)
১১.  “সবল দেবধর্ম আমার বৈষ্টমী, ইষ্ট ছাড়া কষ্ট পাই, এঁটে দেয়া নষ্টামি।” (পবিত্র লালন- ৯১২/১)
১২. সাম্প্রদায়িক মতবাদ গোত্র জাতির, তুলবে না কেউ জিকির, কেঁদে বলে লালন ফকির, কেবা দেখিয়ে দিবে।” (পবিত্র লালন- ২২৮/৪)

ধর্মের সংজ্ঞা (Definition of ism)
সাধারণত; সাম্প্রদায়িক, পারম্পরিক ও রাজনৈতিক মতবাদকে ধর্ম বলে।

ধর্মের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theological definition of ism)
১. পদার্থ বিজ্ঞানে; পদার্থের গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্যকে ধর্ম বলে।
২. পদার্থ বিজ্ঞানে; ধাতুর প্রকৃতিকে ধর্ম বলা হয়।

ধর্মের প্রকারভেদ (Variations of ism)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে ধর্ম দুই প্রকার। যথা; ১. সনাতনী ধর্ম ও ২. কৃত্রিম ধর্ম।

. সনাতনী ধর্ম (Orthodoxy ism)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; প্রকৃতির নিয়মাবলীকে সনাতনী ধর্ম বলে।

. কৃত্রিম ধর্ম (Pretended attribute)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; পদার্থের আদি বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে নতুন বৈশিষ্ট্য প্রদানকে কৃত্রিম ধর্ম বলে। যেমন; লোহাকে চুম্বকে পরিণত করা, লোহাকে কম্পাসে পরিণত করা ইত্যাদি।

ধর্মের পরিচয় (Identity of ism)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর স্বভাব পরিবারের অধীন একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা। সাধারণত; কোনো বস্তুর গুণাগুণকে ধর্ম বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে ধর্ম বলতে বাঙালী পুরাণের একটি চরিত্রকে বুঝায়। এছাড়াও; ধর্ম হলো ধাতুর প্রকৃতি। অন্যদিকে; সাম্প্রদায়িক মতবাদকে সাধারণ মানুষ ধর্ম নামে ডাকে। সামাজিক, মানবিক, প্রাকৃতিক, দার্শনিক ও নৈতিকতার ওপর নির্মিত মনগড়া সংস্কার রূপ এসব সাম্প্রদায়িক মতবাদ সারাবিশ্বে প্রায় ৪,৩০০টি ছাড়িয়ে গেছে। যেমন; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্ট ও ইসলাম। প্রত্যেক সাম্প্রদায়িক মতবাদের অনুকূলে আবার রয়েছে কয়েক হাজার পারম্পরিক মতবাদ (কথিত গুরুবাদী মতবাদ)। সাম্প্রদায়িক মতবাদকে ইংরেজিতে Ism (ইজাম) এবং আরবিতে ‘ﺪﻴﻦ’ (দিন) বলা হয়। অন্যদিকে; পারম্পরিক মতবাদকে ইংরেজিতে Sequence এবং আরবিতে ‘تسلسل’ (তাসলিসিলা) বলা হয়।

সাম্প্রদায়িক মতবাদের পরিচয় (Identity of schismatic doctrine)
পূর্বকাল হতেই দেখা যায় একদল লোক সাম্প্রদায়িক মতবাদকে অত্যধিক প্রাধান্য দেয়। আবার একদল লোক একেবারেই গ্রহণ করেন না। যারা কোনো সাম্প্রদায়িক মতবাদকে প্রাধান্য দেন না; তারা প্রায়ই বলে থাকে সাম্প্রদায়িক মতবাদ বলতে কিছুই নেই। তারা এও বলেন যে; “Religion is nothing only blindly faithful” অর্থ; “কেবল অন্ধবিশ্বাস ব্যতীত সাম্প্রদায়িক মতবাদ কিছুই না।” প্রকৃত ব্যাপারটিও তাই। সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ব্যক্তি বিশেষের মনগড়া মতামতকেই প্রচলিত ধর্ম বলা হয়। আর এ ধর্মকেই সাম্প্রদায়িক মতবাদ বলা হয়। তবে; এসব সাম্প্রদায়িক মতবাদ আধুনিকযুগের পূর্বে আদিমযুগ ও মধ্যযুগে পরিবারে ও সমাজে শান্তি ও শৃংখলা বিধানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজন ও গুরুত্ব ছিল। তখন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা কোনকিছুই ছিল না। তাই; সাম্প্রদায়িক মতবাদ অনেক উপকারী ছিল। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রচলিত থাকায় মানুষ আর অন্ধবিশ্বাসের অধীন হতে চায় না। এছাড়াও; বর্তমানে একই রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক বিধান ও রাষ্ট্রীয় বিধান উভয় একসঙ্গে চালু রাখা কোনমতেই সম্ভব নয়। যে কোনো একটি বিধান মান্য করা সবার একান্ত প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে; সাম্প্রদায়িক বিধানগুলো প্রায় রূপকার্থে নির্মিত কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিধানগুলো বাস্তবভাবে নির্মিত। এজন্য; সাম্প্রদায়িক বিধান কখনই রাষ্ট্রীয় বিধানের তুল্য হতে পারে না। তাছাড়া; সাম্প্রদায়িক বিধান কেবল একটি গোত্রের জন্য নির্মিত কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিধান রাষ্ট্রের সর্ব শ্রেণির জনগণের জন্যই সমান অধিকার নিশ্চিত রেখে নির্মিত। আধুনিক যুগের প্রথমদিক হতে রাষ্ট্র গঠন ও রাষ্ট্রীয় বিধান নির্মাণ করা আরম্ভ হয়। তখন হতেই সাম্প্রদায়িক বিধানের প্রয়োজনও ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সাম্প্রদায়িক বিধানের তেমন ব্যবহার নেই।

অন্ধবিশ্বাসের বিষবৃক্ষ রোপণ (Transplanting the venom-tree of fanaticism)
সর্বপ্রথমে পৌরাণিক শিল্পের সূত্রগুলোর দ্বারা বিশ্ববিখ্যাত একজন রূপকার কর্তৃক একটি পুরাণ নির্মিত হয়। তারপর; কয়েকশত বছর বা কয়েক শতাব্দী অতিবাহিত হয়। অতঃপর; আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা আত্মতত্ত্ব জ্ঞানহীন মনীষীরা অতীব পুণ্যের কাজ মনে করে উক্ত পুরাণটির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা দেহতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ত্যাগ করে কেবল বাহ্যিক প্রকৃতি নির্ভর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রণয়ন করা আরম্ভ করে। অন্ধবিশ্বাসপ্রবণ মূঢ় ব্যক্তিরা দিব্যজ্ঞানের দৈন্যতার জন্য শ্বরবিজ্ঞানের ছোট-বড় চমৎকারে ব্যবহৃত দেবতাগণকে হঠাৎ দৈবদূত বা স্বর্গীয় অবতার নামে আখ্যায়িত করতে আরম্ভ করে। তারপর; নীতি নৈতিকতাপূর্ণ ও আত্মশুদ্ধির পরম শিক্ষামূলক প্রপকগুলোকে চমৎকার নামে এবং দেবতাগণের চরিত্রকে বাস্তব জীবনাদর্শ নামে প্রচার প্রসার করতে বা লেখালেখি করতে আরম্ভ করে।

পরবর্তীকালে তার পাঠক বা অনুসারীরাও পুরাণের মধ্যে পৌরাণিক চরিত্র রূপে ব্যবহৃত দেবতাগণেরকে স্বর্গীয় দূত, পৌরাণিক কাহিনীকে স্বর্গীয় দূতগণের ঘটনাবহুল চমৎকার এবং প্রপকগুলোর মধ্যে বর্ণিত ঘটনাগুলোকে দেবতাগণের বাস্তব জীবনাদর্শ নামে অন্ধবিশ্বাস করতে আরম্ভ করে। এভাবেই সর্বপ্রথম অন্ধবিশ্বাস রূপ বিষবৃক্ষের বীজ রোপিত হয়। অতঃপর; দেবতাগণের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তার অনুসারীরা প্রপকগুলোর প্রচার ও প্রসার করা অনেক পুণ্যের কাজ মনে করে। এভাবেই সুসংগঠিত হতে থাকে একটি সম্প্রদায়। কয়েক শতাব্দী পরে এটি একটি বড় দলে পরিণত হয়। সাথে সাথে সঞ্চিত হতে থাকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় নীতিমালা। অতঃপর; থরে-বিথরে সঞ্চিত নীতিমালা একত্রিত করে গড়ে ওঠে একটি সাম্প্রদায়িক মতবাদ। অভিনবভাবে নির্মিত সাম্প্রদায়িক মতবাদ ও সাম্প্রদায়িক নীতিমালা গ্রহণকারীর সংখ্যাও দিনের পরদিন বাড়তে থাকে।

একটি পুরাণ নির্মাণের কয়েক শতাব্দী পর এভাবেই ঐ সাহিত্যটির ওপর নির্ভর করে এক বা একাধিক সাম্প্রদায়িক মতবাদ বা সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করে থাকে। অন্ধবিশ্বাস রূপ এ বিষবৃক্ষের ডালপালা যুগে যুগে চারদিকে কেবল বাড়তেই থাকে। বিষবৃক্ষ রূপ এ দ্রুতগামী ঘোড়াটি একদিন সারাবিশ্বে পরিভ্রমণ করতে সক্ষম হয়। এভাবেই অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সাম্প্রদায়িক মতবাদ রূপ বিষবৃক্ষের ছায়া এক সময় বিশ্বের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পতিত হয়। মানব সভ্যতার ঊনবিংশ শতাব্দীতে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা এ অন্ধবিশ্বাসের ঘোড়ার পিঠে চড়েই অতিক্রম করেছে। এ দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেই তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার অন্বেষণ করছিল। গত ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে দীর্ঘ দুই হাজার পাঁচশত বছর এভাবেই অতিবাহিত হয়েছিল। তখন অধিকাংশ দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ধারণা করতো যে; সূর্য পৃথিবীর চারদিকে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু আজ অন্ধবিশ্বাসের সে লৌহ নিগড় কেটে ও অন্ধবিশ্বাসের কাল্পনিক ঘোড়াটিকে হত্যা করে আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে; সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না বরং পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরে।

সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ পদ্ধতি (Construction methodology of schismatic doctrine)

বিশ্বের যে কোনো এক বা একাধিক পুরাণকে কেন্দ্র করে একটি সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ করা যায়। তারপর; পুরাণটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো জন্য একজন সুবিজ্ঞ সাম্প্রদায়িককে উক্ত পুরাণটি হাতে নিয়ে অবশ্যই বলতে হবে যে; এটি কোনো মানুষের নির্মিত বাণী নয় বরং এটি স্বয়ং স্রষ্টার পক্ষ হতে মহামানবের নিকট অবতীর্ণ বাণী সংকলন। তাকে আরও বলতে হবে যে; কেবল স্রষ্টার পক্ষ হতে দেবতার নিকট যাকিছু অবতীর্ণ হয়েছিল; তিনি কেবল তা-ই প্রকাশ করে ছিলেন। আর তার সঙ্গীসাথীরা সেসব অতি যত্নের সাথে সংরক্ষণ করেছিলেন। সেসব টুকরাটাকরি সংকলন করেই সম্পাদিত হয়েছে এই গ্রন্থ। অতঃএব; এ পবিত্র গ্রন্থের মধ্যে মানুষের নির্মিত কোনো বাণী নেই। কারণ; মানুষের নির্মিত বাণী এমন হতে পারে না। আর মানুষ যদি এমন বাণী নির্মাণ করতে পারতেন, তবে বিশ্বে অনেকেই এমন বাণী নির্মাণ করে দেখাতেন। কেউ শত বছর চেষ্টা করার পরও; অবশ্যই এমন একটি বাণী নির্মাণ বা নির্মাণ করতে পারবে না। এবার সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাতা সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির উচিত যে; সর্বপ্রথমে উক্ত শ্বরবিজ্ঞানের মৌলিক সত্তাদের (The basic elements of theology)- ১. সৃষ্টিকর্তা. পালনকর্তা ৩. সংহার কর্তা ৪. বর্থ্য ৫. স্বর্গীয় দূত (ঐশিদূত) ৬. আদিমানব-আদিমানবী ৭. বসিধ (১-৩) ৮. পাপ-পুণ্য ৯. স্বর্গ-নরক ১০. বিচার ও ১১. মুক্তি; এ ১১টি সত্তার জীবনযাপন প্রণালি, আকার প্রকার, আয়তন অবস্থান, আবাস নিবাস, বংশসারণী, সংখ্যা পরিমাণ ও কার্যক্রম যেক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য তা নির্ধারণ করা। অতঃপর; স্রষ্টাদের সম্মেলন ও দৈব সম্মেলন দ্বারা প্রয়োজনীয় সংস্কার করা আরম্ভ করা।

এক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক মনীষীকে পৌরাণিক চরিত্রের রূপক জীবনী, বংশ, জন্মস্থান, অবস্থান ও আকার-প্রকার নির্মাণের সময় অবশ্যই স্বাতন্ত্র্যতা রক্ষা করতে হবে। যাতে অন্যান্য সাম্প্রদায়িক মতবাদের পৌরাণিক চরিত্রের সাথে না মিলে। একটি নতুন সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণের ক্ষেত্রে তার অভিনবত্ব অটুট রাখা একান্ত প্রয়োজন। নিচে সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণের একটি অভিনব নির্ঘণ্ট তুলে ধরা হলো।

সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণের মৌলিক সত্তা নির্ঘণ্ট
(Fundamental entity index of schismatic doctrine methodology)

শ্বরবিজ্ঞানে; বর্ণিত নরদেহের আদিকারণকে (শুক্র) ধরা হলো আদিমানব। এবং নারীদেহের আদিকারণকে (রজ) ধরা হলো আদিমানবী। মুখের কথাকে ঐশি সাংবাদিক এক (১) এবং নারীদের রজকে ঐশি সাংবাদিক দুই (২) ধরে সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ করা হলো। মুখের কথা, দেহ ও মনের দ্বারা পরিবার, সংসার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। এজন্য এ তিনটিকে (১. বৈচন ২. দৈহিকা ও ৩. মৈনাক) স্বর্গ ধরা হলো এবং বাচালতা, অপকর্ম ও মুখবন্ধ করে থাকা হতে পরিবার, সংসার ও সমাজে তীব্র অশান্তি সৃষ্টি হয়। এজন্য এ তিনটিকে (১. বৈচাল ২. কৈকাজ ও ৩. গোমড়া) নরক ধরা হলো। অতঃপর; দেহধামের বিভিন্ন সত্তা যেমন; দেহ, আত্মা, মন, জ্ঞান, ইন্দ্রিয়াদি, রিপু, রুদ্র, মন্দা, দশা ও ভালা শিরোনামের সত্তাদের ঐশিকর্মী বা দেবকর্মী (দেবতা) ধরা হলো। এছাড়াও; অন্যান্য সত্তাদের পুরাণের প্রায়োগিক অর্থের মতোই রেখে দেওয়া হয়।

১.   সৃষ্টিকর্তা                                             = কাঁই
২.   পালনকর্তা                                         = সাঁই
৩.   সংহার কর্তা                                       = যম
৪.   দৈবকর্মী                                             = দেবতা
৫.   সাংবাদিক (কথা,  রজ ও কামরস)   = বলন, বসিধ ও উষ্ণজল
৬.   বর্থ্য (ব্যত্যয়কারী)                             = বর্থ্য
৭.   আদিমানব                                          = জনক
৮.   আদিমানবী                                        = জননী
৯.   মুক্তি                                                   = অখণ্ডতা
১০.  স্বর্গ (স্বর্গের পরিমাণ ও ছদ্মনাম)     = শান্তি (৩টি; ১. বৈচন ২. দৈহিকা ও ৩. মৈনাক)
১১. নরক (নরকের পরিমাণ ও ছদ্মনাম)   = অশান্তি (৩টি; ১. বৈচাল ২. কৈকাজ ও ৩. গোমড়া)

এবার উপরোক্ত বিষয়বস্তু দ্বারা পৌরাণিক চরিত্র প্রস্তুত করতে হবে। তারপর; সেসব পৌরাণিক চরিত্র দ্বারা রূপকভাবে ছোট-বড় নির্মাণ করতে হবে। অতঃপর; উক্ত পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা অত্যন্ত অভিনবভাবে একটি পুরাণ গ্রন্থ নির্মাণ করতে হবে। অতঃপর; উক্ত গ্রন্থের মধ্যে ব্যবহৃত ১. কাঁই ২. সাঁই ৩. যম ৪. দেবতা ৫. বলন ৬. বর্থ্য ৭. জনক ৮. জননী ৯. অখণ্ডতা ১০. স্বর্গ ও ১১. নরক; এ ১১টি সত্তার সম্পূর্ণ অভিনব ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। অতঃপর; পুরাণে বর্ণিত রূপক চরিত্রগুলোর রূপক জীবনী নির্মাণ করতে হবে। এবার এ নতুন সাম্প্রদায়িক মতবাদটি সার্বজনীন বা চিরস্থায়ী করার জন্য গ্রন্থটির মধ্যে ব্যবহৃত কঠিন ও দুর্বোধ্য শব্দগুলো ও নতুন নতুন পরিভাষাগুলোর অভিনব ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। ব্যস নতুন একটি সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ করা শেষ হলো। এবার শ্বরবিজ্ঞানের সারগর্ভ ও শিক্ষামূলক চমৎকারগুলো লোকসমাজে বা পথেঘাটে পুনঃপুন প্রচার-প্রসার করতে আরম্ভ করতে হবে। যারফলে; অত্র অঞ্চলের লোকজন উক্ত চমৎকারগুলোর দ্বারা বর্ণিত দেবতা ও শিক্ষামূলক উপাখ্যানগুলোর প্রতি ক্রমে ক্রমে দুর্বল হতে থাকবে। আর সেসব পৌরাণিক কাহিনী বিশ্বাস করতে থাকবে। এবং চমৎকারগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকবে। সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের লৌহ নিগড়ে একবার মানুষকে আবদ্ধ বা বশীভূত করতে পারলেই সে সাম্প্রদায়িক সংস্কার তার ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় অকাতরে মাথা পেতে নিতে বাধ্য হবে।

সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ শিল্পটিও অতি প্রাচীন। তবে; এর আরও অনেক প্রাচীন হলো পুরাণ নির্মাণ শিল্প। এজন্য; পুরাণ শিল্পকে মানব সভ্যতার প্রথম শিল্প বা আদি শিল্প বলা হয়।

এ শিল্পটির নাম সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ শিল্প। তবে; বিশিষ্ট সাম্প্রদায়িক মনীষীগণের অভাবে বর্তমানে এ শিল্পটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। নতুন কোনো সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ করা হলে বা প্রতিষ্ঠা করা হলে; এখানে; একসঙ্গে অনেক লোকের কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হয়। এতে একদিকে; ভুয়া শাস্ত্রীয়-কর্মও করা হয়; অন্যদিকে; কিছু অজ্ঞ ও মূর্খ সাম্প্রদায়িক অলস লোকের কর্মসংস্থান বা রুটিরুজিরও ব্যবস্থা হয়। আবার কিছু কিছু অজ্ঞ ও মূর্খ লোকের মৌখিকভাবে সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রচারের মাধ্যমেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। আবার কিছু লেখক, গবেষক, মতবাদ বিশারদ, সাম্প্রদায়িক পরিভাষাগুলোর ব্যৈখ্যিক ও টৈকিকদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও; রূপক কাহিনীগুলোর আলোচনার দ্বারাও অনেক গায়ক-বক্তার কর্মসংস্থানের উত্তম ব্যবস্থা হয়। কোনো সাম্প্রদায়িক মনীষী মাত্র একবার যুক্তি, দর্শন ও বিজ্ঞানের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, তা আর ঠেকায় কে? সাম্প্রদায়িক মতবাদ একবার প্রতিষ্ঠালাভ করলে সহজে বিলুপ্ত হয় না। সাম্প্রদায়িক মতবাদ শিল্পে অত্যন্ত সহজ-সরল ও শ্রমহীন এবং আরামে জীবিকা নির্বাহের অফুরন্ত সুযোগ আছে। তাই; সমাজের অল্পজ্ঞানী বা খুষ্কজ্ঞানীরা ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় উক্ত সাম্প্রদায়িক দর্শন গ্রহণ করে। এবং স্বস্ব প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে জনমত সৃষ্টি করার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে। যারফলে; সাম্প্রদায়িক দর্শনের প্রচার ও প্রসার দিনের পর দিন বাড়তেই থাকে।

পরিশেষে বলা যায়; পদার্থের গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে ধর্ম বলা হয়। যেমন;  চুম্বকের ধর্ম আকর্ষণ, কম্পাসের ধর্ম দিকনির্ণয়, জলের ধর্ম নিম্নগমন ও বাতাসের ধর্ম উড়ানো ও আগুনের ধর্ম পুড়ানো ইত্যাদি। কিন্তু বাংভারতীয় উপমহাদেশে যাকে ধর্ম বলা হয়/ হচ্ছে সেগুলো আদৌ ধর্ম নয় বরং সেগুলো হলো সাম্প্রদায়িক মতবাদ। ধর্ম চিরন্তন, শাশ্বত, সর্বকালীন ও সার্বজনীন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক মতবাদ চির আপেক্ষিক। যেমন; পূর্ববঙ্গে পূর্বকালে হিন্দু মতবাদ ছিল। তখন অধিকাংশ মানুষই ছিল হিন্দু। বর্তমানে অধিকাংশই মুসলমান। আবার কিছুদিন পর আজকের ইসলামী মতবাদও হয়তো থাকবে না। এখানকার অধিকাংশ লোক হয়তো আবার গ্রহণ করবে লালন কিংবা লোকনাথ মতবাদ। তাই; সবার না জেনে ও না বুঝে ধর্মকে মতবাদ এবং মতবাদকে ধর্ম বলা হতে বিরত থাকা উচিত।

সাম্প্রদায়িক গ্রন্থকে (ধর্মগ্রন্থ) ঐশিগ্রন্থ বলার কারণ কী? (What cause to say schismatic book the celestial book?)
সাধারণত; ঐশিগ্রন্থ বলে কোনো গ্রন্থ নেই। তবে; কেবল মানবদেহকেই ঐশিগ্রন্থ বলা যায়। যেহেতু; দেহ জঠররূ প ঐশিধাম হতে অবতরণ করে; তাই; দেহকে ঐশিগ্রন্থ বলা হয়। আর আদিকাল হতে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সব মানুষ কেবল দেহকেই পাঠ করে চলেছে। মানবদেহের রোগ পড়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। দেহের রেখা ও তিলক পড়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান। এছাড়াও; যোগ, ইয়োগা, অ্যাকুপ্রেসার ও ধ্যান সবই কেবল দেহপাঠ বিদ্যা। তবে; সাম্প্রদায়িকরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে সস্তা মার্কেট করার জন্যই মানব নির্মিত শ্বরবিজ্ঞানকে ঐশিগ্রন্থ নামে প্রচার-প্রসার করে। সাধারণত; এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো; মানব নির্মিত পুস্তক-পুস্তিকা সাধারণ মানুষ মেনে নেয় না। কিন্তু ঐশিগ্রন্থ বললে সাধারণ মানুষ দ্রুত মেনে নেয়। সারা বিশ্বের সর্ব শ্রেণির সাম্প্রদায়িকরা এ কৌশলটিই কাজে লাগায়। বাস্তবে দেখা যায়; বিশ্বের কোনো সম্প্রদায়ই স্বস্ব সাম্প্রদায়িক গ্রন্থকে মানব নির্মিত বলতে চায় না। যদি হিন্দুদের প্রশ্ন করা হয়; তারা বলবে তাদের গীতা স্বয়ং মহামতি শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত বাণী। অন্যদিকে; যদি বৌদ্ধদের প্রশ্ন করা হয়; তারা বলবে ত্রিপিটক স্বয়ং বুদ্ধদেবের বাণী। আর বুদ্ধদেব স্বয়ং ব্রহ্মা প্রেরিত মহামানব। যদি মুসলমানদের প্রশ্ন করা হয়; তারা বলবে পবিত্র কুরান স্বয়ং আল্লাহর বাণী। যদি ইহুদীদের প্রশ্ন করা হয়; তারা বলবে তৌরাহ স্বয়ং প্রভুর বাণী। কারণ; সাম্প্রদায়িকরা জানে যে; মানুষের বাণী বললে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের সম্মান হ্রাস পায়। সাধারণত; মানব নির্মিত বাণী মানুষ কখনই সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ রূপে মেনে নেয় না। পরিশেষে বলা যায়; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের মান বাড়ানো এবং পুণ্য-ব্যবসা ও স্বর্গ ব্যবসা করার জন্যই সাম্প্রদায়িক গ্রন্থকে ঐশিগ্রন্থ বলা হয়।

উপসংহারে এসে বলা যায় যে; মতবাদ মানুষের সৃষ্টি। অন্যদিকে; ধর্ম সহজাত ও চিরন্তন। মতবাদ ও ধর্ম এক নয়। মতবাদকে ধর্ম ও ধর্মকে মতবাদ বলা কোনমতেই সমীচীন নয়। কোনো মতবাদ, শাস্ত্রীয়-কর্ম, দেব, দেবতা, ঐশিদূত, সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ ইত্যাদি নিয়ে বাড়াবাড়িও করাও একেবারে অনুচিৎ। কোনো মতবাদকে বড়; আবার কোনো মতবাদকে ছোট এসব বলাও সমীচীন নয়।

ধর্মবাজ বনাম মুক্তবাজ (Schismatic versus Freethinker Part)

যাত-পাত যার যার; আত্মদর্শন সবার।” (“Caste creed is respective; but introspection for public.”)

ভূমিকা (Prolegomenon)
মুক্তকথা বলার নামে যারা মুক্তবাজি করছে; অন্যদিকে; ধর্ম রক্ষার জন্য যারা ধর্মবাজি করছে, উভয় দলই সমাজের পুঁজিবাদী শোষক গোষ্ঠীর হাতের পুতুল। ক্ষমতাধর শাসকরাই এদের নির্মাণ করে, নিজেদের কাজে ব্যবহার করে ও প্রয়োজন শেষে নিধন করে। ২টি দলের অনেকেই বিষয়গুলো অনুধানব করতে পারে না। স্বার্থান্ধ শাসকরা হাকিম হয়ে হুকুম করে পুলিশ হয়ে ধরে। অতঃপর; সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ে। অবলার মতো চেয়ে দেখে মুক্তবাজ ও ধর্মবাজরা। চোখের সামনেই কত মানুষ হতাহত হচ্ছে কিছুই করার নেই তাদের। মুক্তবাজরা মরলে কয় বেঁচে গেলো এবং সাম্প্রদায়িকরা মরলে কয় বেহেস্তে গেলো। এখন উভয় দলেরই শোষক-শাসকদের হীনস্বার্থে ব্যবহার হওয়ার হাত হতে মুক্তিলাভের সময় এসেছে। জঙ্গি-পুলিশ খেলা, মৌলবাদী খেলা, আস্তিক-নাস্তিক খেলা, ধর্মখেলা ও ধর্মমেলার স্বরূপ বুঝার সময় এসেছে।

মুক্তবাজ (Freethinker)
মুক্তবাজ বলতে মুক্তমনা লেখক, গবেষক, ব্লগার ও বক্তাদের বুঝানো হয়েছে। মুক্তচিন্তা, মুক্ত লেখা ও মুক্ত কথা বলারও একটা সীমা আছে। বাক্ স্বাধীনতারও একটা সীমা আছে। স্বাধীন দেশ তাই স্বাধীনভাবে চলা-বলার অধিকার সবারই আছে। অধিকার আদাইয়ের কথা বলে আর স্বাধীনতার ধুয়া তুলে একজন অন্যজনের পাকা ধানে মই দিতে পারবে না। তেমন; মুক্ত চিন্তার কথা বলে একজন অন্যজনের শাস্ত্র, মতবাদ ও সংস্কৃতিতে আঘাত দিতে পারবে না। এরূপ করলে কখনই মুক্তচিন্তা থাকে না। বরং তা চরম ধৃষ্টতা ও চরম অন্যায়।

কিছু কিছু লোক ব্লগে, ফেসবুকে ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে ধর্মগ্রন্থ, ধর্মাবতার ও ধর্মীয় সংস্কৃতি নিয়ে যেসব বিকৃত লেখা প্রকাশ করছে; তা সব সভ্য লোকেরই ঘৃণা লাগার কথা। যুক্তি, দর্শন, বিজ্ঞান ও পরামর্শমূলক লেখা কখনই অন্যায় নয়।

ধেনোবিদ্বান এসব লেখকের বিকৃত লেখা মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। এরা বিকৃত লেখা না লেখে যদি বিজ্ঞান, দর্শন, সংস্কৃতি, নদী ও পাখি ইত্যাদি নিয়ে লেখতো; তবে তারা নিজেরাও উপকৃত হতো, জাতিও উপকৃত হতো। তাদের সময়ও অনেক বাঁচতো। কারণ; একটা জাতির মেরুদণ্ড হচ্ছে শিক্ষা। যে বিষয় সম্পর্কে সে জানে না, সে বিষয় নিয়ে তার লেখার কোনো অধিকারই নেই। কথায় বলে কামারের কাজ কুমোর দ্বারা হয় না সাম্প্রদায়িক মতবাদ নিয়ে লেখতে হলে অবশ্যই তার সাম্প্রদায়িক মতবাদ নিয়ে লেখাপড়া করতে হবে ।

মতবাদ, শাস্ত্র, সংস্কার ও সংস্কৃতি নিয়ে টিটকারি না মেরে, সমালোচনা না করে ও ঠাট্টা না করে যদি তারা সংশোধনের চেষ্টা করতো, ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতো, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার চেষ্টা করতো, তবে দেশ ও জাতি অনেক উপকৃত হতো।

মুক্তমনা, মুক্তবাজ, মুক্তজীবী ও মুক্তভৃৎরা মুক্তচর্চা করতে করতে এমন এক স্থানে উপস্থিত হয়েছে যে; শেষ পর্যন্ত তারা প্রত্যেকেই সমাজের শোষক শ্রেণীর বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছে। চিরদিনেই সমাজের পুঁজিবাদী শোষক-শাসক শ্রেণি, ধনীক শ্রেণি ও স্বার্থান্ধ শাসক গোষ্ঠী নিজেদের হীনস্বার্থে সমাজের এসব মুক্তবাজদের বলির পাঁঠা রূপে ব্যবহার করে। যারা এদের প্রশ্রয় দিয়ে লালন করে, তারাই আবার স্বার্থসিদ্ধির পর; সুযোগ বুঝে তাদের নিধন করে। চিরদিনই কথিত মুক্তমনা নামের এরূপ নির্বোধরা বিশ্বের পুঁজিবাদী ধনীক শ্রেণির হাতের পুতুল বা ক্রীড়ানক হয়ে থাকে।

ধর্মবাজ (Sectarian)
অন্যদিকে; ধর্মবাজ বলতে অন্ধভাবে সাম্প্রদায়িক মতবাদ বিশ্বাসী ও গোঁড়া শাস্ত্র-অনুসারীদের বুঝানো হয়েছে। গোঁড়া শাস্ত্রবাদীরা অনেকই জানে না যে; ধর্ম, শাস্ত্র ও মতবাদ কী, কাকে বলে এবং কত প্রকার? ধর্মবাজরা যাকে ধর্ম বলছে তা আদৌ ধর্ম নয়। বরং তা হচ্ছে মতবাদ। অন্যদিকে; ধর্ম হলো পদার্থের বৈশিষ্ট্য বা গুণাগুণ।

ধর্ম চিরন্তন, অনন্ত ও অবিনশ্বর। অন্যদিকে; মতবাদ, ক্ষণস্থায়ী ও আপেক্ষিক। ধর্ম Autogenous. অন্যদিকে; মতবাদ মানুষের সৃষ্টি Artificial. ধর্মের ক্ষয়-লয় ও উত্থান-পতন নেই। অন্যদিকে; মতবাদের ক্ষয়-লয় ও উত্থান-পতন চিরাচরিত। এযাবৎ পৃথিবীতে কত মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে; আর কত মতবাদ মুখধুবড়ে ধ্বংস হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এখনও পৃথিবীতে প্রায় ৪,৩০০ মতো সাম্প্রদায়িক মতবাদ (কথিত ধর্মীয়) রয়েছে। তারমধ্যে ১৯ মতবাদ বৈশ্বিক। সব ধর্মীয় মতবাদের নির্মাণশৈলি এক ও অভিন্ন। সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা, দৈবদূত, বসিধ, আদিমানব, আদিমানবী, অবতার, পাপ-পুণ্য, বিচার, স্বর্গ-নরক ও পরিণতি ন্যূনাধিক সব মতবাদেই আছে। বিশ্বের সব সাম্প্রদায়িক মতবাদেই একজন স্বর্গীয় দূত আছে। যেমন; ইসলামী মতবাদে স্বর্গীয় দূত হলো; জিব্রাইল। জিব্রাইলকে ভারতের নারদ বা গ্রিকের হার্মিস বলা হয় (Gabriel is called the Narada of India and the Hermes of Greek)। অর্থাৎ; হিন্দু ও বৈদিকদের মতে; ব্রহ্মার বাণীবাহক হচ্ছেন নারদ, গ্রিকদের মতে ঈশ্বরের বাণীবাহক হচ্ছেন Gabriel বা Hermes.

সবাই যার যার মতবাদ, শাস্ত্র, সাম্প্রদায়িক অবতার, সাম্প্রদায়িক পরিভাষা, সংস্কৃতি ও শাস্ত্রকর্ম ভালোবাসে। সাম্প্রদায়িকরা সবাই যার যার শাস্ত্রকে ঈশ্বর প্রদত্ত ও স্রষ্টা প্রদত্ত গ্রন্থ রূপেই মান্য করে। যেমন; শিখ ধর্মগুরু নানক অগ্নিবীর গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে লিখেছেন; ওমকার বেদ নির্মায়ে অর্থঃ ঈশ্বর বেদের নির্মাতা

গীতা মূলত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে রচিত একটি ধর্মগ্রন্থ, যে যুদ্ধে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ হতাহত হয় এবং যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। গীতাতে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন; “আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা, স্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তিকে) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।”

গীতা সুগীতা কর্তব্যা কিমনৈঃ শাস্ত্রবিস্তরৈঃ৷ যা স্বয়ং পদ্মনাভস্য মুখপদ্মাদ্ বিনিঃসৃতা।” অর্থঃ “যেহেতু; ভগবদ্ গীতার বাণী স্বয়ং পরম পুরুষোত্তম ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী, তাই এই গ্রন্থ পাঠ করলে আর অন্য কোনো বৈদিক গ্রন্থ পড়ার প্রয়োজন হয় না।” গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিতভাবে ভগবদ্ গীতা শ্রবণ ও কীর্তন করলে সবার অন্তরে ভগবদ্ভক্তির স্বাভাবিক বিকাশ হয়।

গীতা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী। বিশ্বে বহু ধর্মগ্রন্থ রয়েছে। তমধ্যে; বেদ প্রধান। বেদের রহস্য প্রকাশিত হয়েছে উপনিষদে। আর উপনিষদের সার হচ্ছে গীতা। তাই গীতাই বেদের মূল উপাদান। গীতা বেদ ভিন্ন অন্য কোনো গ্রন্থকে সমর্থন করে না। যুদ্ধে জিততে হলে অস্ত্র ধরো না, গীতা ধরো। এতেই তোমার সাফল্য নিশ্চিত

তেমন কুরান সম্পর্কে কুরানে বলা হয়েছে; “وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ” অর্থঃ “নিশ্চয় এটি বিশ্বজগতের পালনকর্তার নিকট থেকে অবতীর্ণ।” “Most surely this is a revelation from the God of the worlds.”

ইমাম গাজ্জালী মিনহাজুল আবেদিন গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন; স্বয়ং প্রভুর পক্ষ থেকে আমার কাছে যে বাণী এসেছে তা-ই আমি এ গ্রন্থে লিখেছি

এমনই ভাবে বিশ্বে এযাবৎ যেসব পুস্তক-পুস্তিকা ধর্মগ্রন্থের মর্যাদালাভ করেছে, সেগুলো সবই ঈশ্বর প্রদত্ত। যেমন;

১. ইহুদিদের ‘Old Testament’ (তোরাত)।
২. কনফুসীদের ‘Lun-yu’ (লুন-ইউ)।
৩. খ্রিস্টানদের ‘New Testament’ (ইঞ্জিল)।
৪. জরথুস্ত্রদের ‘Avesta’ (আবেস্তা)।
৫. জৈনদের ‘জৈনধর্মদর্শন
৬. তাওদের ‘TaoTeChing’ (তাওতেচিং)।
৭. দ্রুজদের ‘রাসাইল আল-হিকাম (জ্ঞানগ্রন্থ)।
৮. নিওপ্লাটোদের ‘প্লেটোদর্শন
৯. বাহাইদের الكتاب الأقدس (কিতাব ই আকদাস)।
১০. বৌদ্ধদের ‘ত্রিপিটক
১১. মাজদাকীদের ‘মাজদাক
১২. মুসলমানদের ‘কুরান
১৩. রাস্তাফারিদের ‘Piby’ (ফিবি)।
১৪. শাক্তদের ‘দেবীভাগবত পুরাণ
১৫. শিখদের ‘জ্ঞানসাহেব (গ্রন্থসাহেব)
১৬. শিন্তোদের ‘Kojiki’ (কোজিকি)।
১৭. সামারিতানদের ‘Halacha’ (হ্যালেছা)।
১৮. হিন্দুদের ‘বেদ’।

তাই এসব পবিত্র গ্রন্থকে কোনভাবেই হেয় করা, ছোট করা ও গালি দেওয়া যাবে না। সাম্প্রদায়িকরা যার যার ধর্মগ্রন্থকে নিজের প্রাণের চেয়েও মূল্যবান মনে করে। ঠাক-পুরুৎ ও মোল্লা-মুন্সিরা আলোচনা করার সময়ে প্রায়সই অন্যান্য মতবাদের গ্রন্থাদির মর্যাদাহানীকর ও কটুক্তিমূলক কথা বলে। তারা মুক্তমনাদের নাস্তিক, যবন, কাফের, ধর্মত্যাগী ও ধর্মচ্যুত ইত্যাদি ভাষায় গালাগালি করে। এ প্রকৃতির ধেনোবিদ্বান, অজ্ঞ ও মূর্খরাই প্রকৃত ধর্মবাজ। এরাই সমাজে বিচ্ছৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। শাস্ত্র ও সাম্প্রদায়িক গ্রন্থের মর্যাদা ও পবিত্রতা অটুট রাখা প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।

অথচ বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক মতবাদের ঠাক-পুরুৎ ও মোল্লা-মুন্সিরা প্রতিনিয়তই একে অন্যের সাম্প্রদায়িক বা পারম্পরিক মতবাদকে গালাগালি ও টিটকারী করে। আর সুকৌশলে বিশ্বের শোষক-শাসক গোষ্ঠী তাদের এসব অজ্ঞতা ও দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে। তারা ধার্মিক নামের মূর্খদের একদলকে অন্যদলের প্রতি আরও উষ্কে দেয়। অর্থ ও পদায়ন করার লোভ দেখায়। ঠাক-পুরুৎ ও মোল্লা-মুন্সিদের পিছে থাকার আশ্বাস দেয়। যখন একাধিক সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে সমর-সংগ্রাম আরম্ভ হয়; তখন ক্ষমতাধর শোষক-শাসকরা অজ্ঞ সাম্প্রদায়িকদের কোনরূপ সাহায্য না করে বরং তাদের শোষণ করা জন্য ওঁৎ পেতে বসে। অবশেষে; পুঁজিবাদী ধনীক শ্রেণির শোষকরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির বলির পাঁঠা রূপে এদের ব্যবহার করে।

এখন তথ্যপ্রযুক্তির বৈশ্বিক বিপ্লব ঘটেছে। বিশ্বের ইতিহাস জানা অত্যন্ত সহজ-সুলভ হয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার সময় এসেছে। এখন মুক্তবাজ ও ধর্মবাজদের সংযত হওয়ার সময় এসেছে। সময় এসেছে একে অন্যের ছিদ্রান্বেষণ ত্যাগ করে বিশ্ববাসীকে নতুন কিছু দেবার।

ধর্মীয় অনুভুতি কথাটি ভুল, ভুয়া ও অন্তঃসারশূন্য (Religious feelings statement incorrect, false and Empty)

যেমন ধর্মীয় অনুভুতি বাক্যটিও ভুয়া; তেমন এর ব্যবহারও ভুল। কারণ; ধর্ম বলতে পদার্থের বৈশিষ্ট্যকে বুঝায়। যেমন; আগুনের ধর্ম দাহ্য করা, চুম্বকের ধর্ম লোহাজাতীয় পদার্থকে আকর্ষণ করা, দিকনির্ণায়কের (Compass) ধর্ম দিক নির্ণয় করা ও জলের ধর্ম নিম্নগামিতা। যেমন; কোনো আগুন যদি দাহ্য না করে, কোনো চুম্বক যদি লোহাজাতীয় পদার্থকে আকর্ষণ না করে, কোনো দিকনির্ণায়ক যদি দিক নির্ণয় না করে এবং কোনো জল যদি নিম্নগামী না হয়, তবে তাদের ধর্মীয় অনুভুতি নষ্ট হয়ে গেছে। তারা ধর্ম হারিয়ে ফেলেছে।

মানুষের নির্মিত ঈশ্বরের কাঁধে পা রেখে মানুষের নির্মিত মতবাদকে ধর্ম বলে চালানো, মানুষের নির্মিত সাম্প্রদায়িক মতবাদকে ধর্ম নামে চালানো কতটুকুইবা যুক্তিযুক্ত? এখন এ দেশে হয়তো সাম্প্রদায়িক মতবাদ, নয়তো পারম্পরিক মতবাদকে ধর্ম নামে চালানো হচ্ছে। গত ১,৯৬০ খ্রিস্টাব্দে সর্ব প্রথম কলকাতায় বাংলা অভিধান প্রণিত হয়। তারপর; বাংলাদেশে ১,৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর হতে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে বাংলা অভিধানের আংশিক প্রকাশিত হয়। তবে; ১,৯৯০ খ্রিস্টাব্দের পর হতে পূর্ণাঙ্গ বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে প্রকাশিত বাংলা অভিধানে ধর্ম এর যেসব অভিধা গ্রহণ করা হয়েছে;

ধর্ম (রূপ)বি ১. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধিবিধান; (religion) ২. সৎকর্ম; পুণ্যকর্ম; সদাচার; কর্তব্যকর্ম (ক্ষমা শ্রেষ্ঠ ধর্ম) ৩. স্বভাব; প্রকৃতি; প্রত্যেক জীব বা বস্তুর নিজস্ব গুণ (মানবধর্ম, আগুনের ধর্ম) ৪. পুণ্য (ধর্মের সংসারে পাপ) ৫. ন্যায়-অন্যায় পাপ-পুণ্যের বিচারকর্তা; বিশ্ববিধাতা (দোহাই ধর্মের) ৬. মনুষ্যত্ব; মানুষের কর্তব্য-অকর্তব্য সম্বন্ধে জ্ঞান (তার ধর্মজ্ঞান নেই) ৭. আইন; নীতি ৮. সাধনার পথ (সুফি ধর্ম) ৯. সতীত্ব (সতী নারীর ধর্মনাশ) ১০. (জ্যোশা) রাশি চক্রের লগ্ন থেকে নবম স্থান। (৭ম পুনর্মুদ্রণ, জুন ২,০০৫ খ্রিস্টাব্দ)

এর মধ্যে “২. সৎকর্ম; পুণ্যকর্ম; সদাচার; কর্তব্যকর্ম (ক্ষমা শ্রেষ্ঠ ধর্ম) ৪. পুণ্য (ধর্মের সংসারে পাপ) ৫. ন্যায়-অন্যায় পাপ-পুণ্যের বিচারকর্তা; বিশ্ববিধাতা (দোহাই ধর্মের) ৬. মনুষ্যত্ব; মানুষের কর্তব্য-অকর্তব্য সম্বন্ধে জ্ঞান (তার ধর্মজ্ঞান নেই) ৮. সাধনার পথ (সুফি ধর্ম) ৯. সতীত্ব (সতী নারীর ধর্মনাশ)” এসব অভিধা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ; এসব ধর্ম পরিভাষার অভিধা হওয়ার অযোগ্য। ধর্ম পরিভাষাটির সঠিক অভিধা।

ধর্ম (রূপ)বি স্বভাব, প্রকৃতি, গুণ, নিয়ম, রীতি (পবি) প্রত্যেক জীব বা বস্তুর নিজস্ব গুণ (জ্যোশা) রাশি চক্রের লগ্ন থেকে নবম স্থান (প্র) ১. বাঙালী পুরাণে বর্ণিত একটি চরিত্র বিশেষ ২. সাম্প্রদায়িক পণ্ডিতদের মতে; যুগোপযোগী সামাজিক সংস্কার বিশেষ, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন ও সমাজ শাসনমূলক মতবাদ, মানুষের কর্তব্যাকর্তব্য সম্বন্ধে জ্ঞান, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শাস্ত্র নির্দিষ্ট বিধিবিধান (শ্ববি) পৌরাণিক সাহিত্যের ওপর গড়ে তোলা সামাজিক শাসনমূলক সংস্কার বিশেষ।

বি = বিশেষ্য
পবি = পদার্থ বিজ্ঞান
জ্যোশা = জ্যোতিশ শাস্ত্র
প্র = প্রপক (পরিভাষার রূপক ব্যাখ্যা)
শ্ববি = শ্বরবিজ্ঞান (শ্বর (ঈশ্বর) বিজ্ঞান)

অর্থাৎ; ১. ইয়াজিদিবাদ ২. ইয়াসানিবাদ (আহলি ই হক্ব) ৩. ইসলামবাদ (শান্তিবাদ) ৪. ইহুদীবাদ ৫. কনফুসীবাদ ৬. ক্যাওদাইবাদ ৭. খ্রিস্টানবাদ ৮. জরথুস্ত্রবাদ ৯. জুসিবাদ ১০. জেনবাদ ১১. জৈনবাদ ১২. তাওবাদ ১৩. তেনরিকোবাদ ১৪. দ্রুজবাদ ১৫. নিওপ্লাটোবাদ ১৬. বাহাইবাদ ১৭. বৌদ্ধবাদ ১৮. মাজদাকবাদ ১৯. মান্দাই (এশীয়) ২০. মান্দাই (মধ্যপ্রাচ্যীয়) ২১. রাস্তাফারিবাদ ২২. শাক্তবাদ ২৩. শিখবাদ ২৪. শিন্তোবাদ ২৫. শ্যামানিবাদ ২৬. সামারিতানবাদ ২৭. হিন্দুবাদ ও ২৮. হোয়াহাওবাদ। এ মতবাদগুলোকে বর্তমানকালে ধর্ম বলা হচ্ছে। এগুলো মানব রচিত মতবাদ; অথবা মানুষের দ্বারা নির্মিত মতবাদ। সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করার জন্য সব যাজকরাই সুকৌশলে স্বস্ব মতবাদকে ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী বা ঈশ্বরের পরামর্শে নির্মিত বাণী ইত্যাদি বলেছেন। আবার কেউ কেউ ঈশ্বর প্রদত্ত দূতের মাধ্যমে বা ঐশিদূতের পরামর্শে নির্মিত বলেছেন।

মানব নির্মিত মতবাদ কখনই ধর্ম হতে পারে না। কারণ; মানব নির্মিত মতবাদ চির আপেক্ষিক। এটি কিছু দিন চলতে পারে আবার নাও চলতে পারে। যেমন; আমাদের বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানে আজ হতে ৩০০-৪০০ বছর পূর্বেও কোথাও হিন্দুবাদ আবার কোথাও জৈনবাদ প্রচলিত ছিল। কালের বিবর্তনে সেই স্থানেই এখন ইসলামসহ প্রায় শতাধিক সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রতিষ্ঠিত।

মহাত্মা লালন সাঁইজি যথার্থই বলেছেন;

“একেক দেশে একেক বাণী,
পাঠান কি সাঁই গুণমনী,
এসব মানুষের রচনা জানি,
লালন কেন্দে কয়।”

কবি নজরুল বলেছেন;
“পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।”

অন্যদিকে; ধর্ম হচ্ছে ঈশ্বর প্রদত্ত। ধর্ম হচ্ছে চিরন্তন, চিরঞ্জীবি, অলঙ্ঘনীয়, অপরিবর্তনীয়, অপরিবর্তনশীল ও অপরিবর্তন-যোগ্য। মানুষের নির্মিত মতবাদকে ধর্ম বলা কোনমতেই কাম্য নয়। মতবাদ অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন রাজনৈতিকবাদ, অর্থনৈতিকবাদ, পুঁজিবাদ, বৈজ্ঞানিকবাদ, দার্শনিকবাদ, সাম্প্রদায়িকবাদ, পারম্পরিকবাদ, গুরুবাদ, বৈষ্ণববাদ, সহজিয়াবাদ, ক্যাথলিকবাদ, সুফিবাদ ও বাউলবাদ ইত্যাদি। এ দেশে প্রচলিত ধর্ম হচ্ছে; সাম্প্রদায়িকবাদ বা সাম্প্রদায়িক মতবাদ।

মতবাদ নির্মাতা সাম্প্রদায়িক নেতারা গাছ, মাছ, বাতাস, আগুন, পাহাড়, জল বা নিরাকার অজানা সত্তাকে ঈশ্বর বলবে; আর বুদ্ধিজীবী ও বিবেকবানরা তা যাচাইবাছাই না করেই মেনে নিবে; এটা কোন ধরণের ধর্মীয় অনুভুতি?

এক মতবাদের দেবতা ১,৬০০ গোপী খেলেছে (ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত কৃষ্ণ), অন্য মতবাদের দেবতা ৩০০ বিয়ে করেছে (কুরানে বর্ণিত সোলেমান)। আবার কোনো মতবাদের দেবতা ১৪টি বিয়ে করেছে (কুরানে বর্ণিত মুহাম্মদ)। কোনো মতবাদের দেবতা শতাধিক যুদ্ধ করেছে। আবার কোনো মতবাদের দেবতা ৪৭টি যুদ্ধ করেছে (কুরানে বর্ণিত মুহাম্মদ কথিত ইসলামের ইতিহাস)। কোনো মতবাদে একাধিক দেবতা স্বশরীরে স্বর্গে গমন করেছেন। যেমন ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত যুধিষ্ঠির ও রাবণ। এছাড়াও; অমৃতসুধা আনবার ছলে গরুড়ও একবার স্বশরীরে স্বর্গে প্রবেশ করেছিলেন বলে কথিত আছে। আবার আরেক মতবাদে; একাধিক নবি স্বশরীরে স্বর্গে গমন করেছেন। যেমন; ইসলামী মতবাদে বর্ণিত হযরত ইদরিস ও হযরত ইসা স্বশরীরে স্বর্গে গমন করেছেন (কাসাসুল আম্বিয়া)। আবার খ্রিস্টানদের একদলের মতে; হযরত ইসা স্বশরীরে স্বর্গে গমন করেছেন। অন্যদিকে; ইসলামী মতবাদে বর্ণিত আছে যে; কুরানে বর্ণিত মুহাম্মদ স্বশরীরে স্বর্গে গিয়ে ঈশ্বরের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেও ঈশ্বরের দেখা পান নি। এসব কে বিশ্বাস করবে? কত রূপকগল্প বিশ্বাস করবে? আর মিশরীয়, গ্রিক, মায়ান ও চাইনিজ মিথোলজির গল্পের তো শেষ নেই!

কেউ বিপক্ষে যুক্তি-দর্শন উপস্থাপন করলে তাদের বলা হবে নাস্তিক, যবন, ধর্মত্যাগী কিম্বা কাফের। এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে বা লেখালেখি করতে গেলে বলা হবে এটি সেন্সেটিভ ব্যাপার, কারো ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করা ঠিক নয় ইত্যাদি। যারা এসব কথা বলছেন তাদেরও এখন ভেবে দেখতে হবে ধর্ম ও ধর্মীয় অনুভুতি কী?

তবে কেউ যদি বোকার মতো আবোলতাবোল লেখে, যাচ্ছেতাই লেখে ও অযৌক্তিক কথা বলে তাদের ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন ও দুঃজনক। দুয়েকজন কুলাঙ্গারের জন্য সারাদেশের সব মানুষের জ্ঞানচর্চা বন্ধ হতে পারে না। যারা সাম্প্রদায়িকদের দিকনির্দেশনা না দিয়ে, যুক্তি-দর্শন উপস্থান না করে কেবল গালাগালি করে, তারা যেমন লেখক নয় তেমন গবেষকও নয়। তাদের উদ্ভবই হয় কোনো শোষক-শাসক শ্রেণির হাত ধরে। তারা সমাজের ধনীক শ্রেণি, পুঁজিবাদী ও শোষক শ্রেণির হাতের পুতুল। তারা তাদের ক্রীড়ানক কর্তাবাবুদের কথায় কিছুদিন অশ্লীল ভাষায় লেখিলেখি করবে, তারপর; তারা তাদের ঐ কর্তাবাবুদের স্বার্থসিদ্ধির পুঁজার পুষ্পরূপে আত্মাহুতি দিবে। যে কর্তাবাবুরা তাদের অর্থ ও সাহস দিয়ে অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার করিয়ে নিচ্ছে, সে-ই কর্তাবাবুরাই কবে কোথায় কিভাবে তাদের প্রাণনাশ করছে, তা তারা কেউ জানতে পারছে না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো; যখন; ধর্মবাজ, ধর্ম ব্যবসায়ী, ধর্মজীবী, ধর্মভুক ও ধর্মভৃৎ ঠাক-পুরুৎ ও মোল্লা-মুন্সিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক দিয়ে বলে অমুক ধর্ম বাতিল, অমুক ধর্ম মানবরচিত (তাই মান্য করা যাবে না), অমুক ধর্মকে ঈশ্বর স্বীকার করেন না, অমুক ধর্মের অমুক দেবতা এ এ কাজ করেছে। অমুক ধর্মে শূকর খায়, তাদের আচরণও শূকরের মতো, অমূক ধর্মে গোরু খায়, তাই তাদের আচরণও গোরুর মতো, অমুক ধর্মের অনুসারীরা এই এই মন্দকর্ম করে —– ইত্যাদি।

তখন; কি অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগে না? তখন কি সেসব সেন্সেটিভ হয় না? কই তাদেরকে তো কেউ নাস্তিক বলে না। তাদেরকে তো কেউ হত্যার হুমকি দেয় না। বরং আরও অধিক হাসাহাসি ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। আরও অধিক আনন্দ করে। তাহলে মুক্তমনা ও মুক্ত জ্ঞানচর্চাকারীদের কেন নাস্তিক, যবন ও ধর্মত্যাগী বলা হয়? কেন এদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়? মুক্ত জ্ঞানচর্চা করলে, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে লেখালেখি করলে, তাদের ইচ্ছেমতো নাস্তিক, যবন ও ধর্মত্যাগী বলা হবে, তাদেরকে হত্যার হুমকি দেওয়া হবে, তাদেরকে হত্যা করা হবে। তারপরও দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ বলেন কারো ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগে এমন লেখালেখি হতে আপনারা বিরত থাকবেন।

তিনি তো একবারও বলেন না যে; যার যার শাস্ত্রের অবিশ্বাস্য, অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও অগ্রহণযোগ্য কথাগুলো হাট, বাজার, মঠ, মন্দির, গির্জা, স্টল, হোটেল, বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে প্রচার করবেন না। উপাসনালয়ের বাইরে সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িক কাহিনী প্রচার বন্ধ করেন! এর অর্থ কি এমন দাঁড়ায় না যে; শাস্ত্রবাজ, ধর্মবাজ, ধর্মব্যবসায়ী, ধর্মজীবী ও ধর্মভৃৎরা স্বস্ব শাস্ত্রের রূপকথা, অবিশ্বাস্য কথা, অযৌক্তিক কথা ও অবৈজ্ঞানিক কথা প্রচার করেই যাবে; অন্যদিকে; লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা কোনো কথা বলতে পারবে না? এর অর্থ কি এমন দাঁড়ায় না যে; প্রশাসনিকভাবে ধর্মব্যবসাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে! প্রশাসনিকভাবে ধর্মজীবীদের আরও অপকর্ম করার সাহস দেওয়া হচ্ছে!! কিম্বা প্রশাসনিকভাবে ধর্ম ব্যবসায়ীদের উস্কে দেওয়া হচ্ছে!!!

বিশ্বের অনেক দেশেই সাম্প্রদায়িক কার্যক্রম কেবল উপাসনালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে আজো মাইক লাগিয়ে অলিতে-গলিতে ও অঙ্গন-প্রাঙ্গনে সাম্প্রদায়িক মতবাদের সভা-সমাবেশ করা হয়। যারাই সাম্প্রদায়িক মতবাদের প্রচারক ও ধারক-বাহক তাদের পরামর্শ ও উস্কানিতেই মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় বোমা মারা হয়, নাকি বিশ্বের বিভিন্ন গণহত্যা, বোমাবাজি, গণ-অপহরণ, গণডাকাতির সাথে কোনো যবন, নাস্তিক ও ব্লগার জড়িত? মহামান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ কি বলতে পারবেন কোনো মুক্ত জ্ঞানচর্চাকারী ও কোনো মুক্তমনা ওপরোক্ত অপকর্মগুলোর সাথে জড়িত? যে মুক্তমনাদের মধ্যে হতে এসেছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎ ও জসিমুদ্দিন এর মতো বিশ্ববিখ্যত মহামানব। সেই মুক্ত জ্ঞানচর্চা যদি আবারো তাদের ভয়ে সমাজে নিষিদ্ধ হয়; তবে সমাজে সৃষ্টি হবে শুধুই দানব, সমাজে সৃষ্টি হবে শুধুই অসুর। মানব আর সৃষ্টি হবে না, দেবতা সৃষ্টি আর হবে না। ভুলে গেলে চলবে না যে; সমাজে মানবের অভাবেই দানবের উদ্ভব হয়।

স্মরণীয় যে; ধর্মবাজ ও ধর্মজীবীরা চিরদিনই কোনো না কোনো শোষক নেতৃবৃন্দের পদলেহী। একেক সময় একেক পুঁজিবাদী গোষ্ঠী তাদের ব্যবহার করার পর; আবার ছুড়ে ফেলে। ধর্মবাজ নেতারা কখনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এদের অনুসারী সাধারণ মতবাদপ্রবণ মানুষ। কেউ ভুয়া স্বর্গের লোভে শাস্ত্রকর্ম করে; আবার কেউ মতবাদগুরুদের চাপে শাস্ত্রকর্ম করে। এযাৎ; সারা পৃথিবীতে ধর্মবাজদের দ্বারা যত রক্তহানী, প্রাণহানী ও জনপদ ধ্বংস হয়েছে; মুক্তমনাদের দ্বারা কোথাও তার একভাগও কি ঘটেছে?

তাহলে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগা, সেন্সেটিভ স্থানে আঘাত লাগা ও ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি না করা কথাটির গুরুত্ব কোথায়? সাম্প্রদায়িক মতবাদের অনুসারী যাজক, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অনুবাদক ও অভিধানবিদরা যাচ্ছেতাই প্রচার করবে কিন্তু বুদ্ধিজীবী, গবেষক, লেখক, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা কোনকিছুই বলতে পারবে না, লেখতে পারবে না, তাহলে মানুষের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে একবারও কি ভেবে দেখেছেন? কবি নজরুল যথার্থই বলেছেন;

“বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে,
বিবি তালাকের ফোতোয়া খুঁজি কুরান হাদিস চষে।”

বসন শিল্প, মৃৎশিল্প, বয়ন শিল্প, পাট শিল্প, চামড়া শিল্প, বৃহৎ শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প ও হস্ত শিল্পের মতো সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ করাও একটি শিল্প। যেমন; শিল্পীরা মনের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে নির্মাণ করে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দ্রব্য। তেমনই; সাম্প্রদায়িক শিল্পীরাও মনের রঙতুলিতে মাধুরী মিশিয়ে মানুষের দৈনন্দিন আচার আচরণ নির্মাণ করে। নির্মাণ করে বিশ্ববিখ্যাত, জগদ্বিখ্যাত ও কালজয়ী মহামানব। যেমন; বাল্মীকি নির্মাণ করেছেন রামকে, বেদব্যাস নির্মাণ করেছেন কৃষ্ণকে, জারির তাবারি নির্মাণ করেছেন মুহাম্মাদকে ও ললিত করেছেন লালনকে।

যেমন; সাধারণ শিল্পগুলোর কাঁচামাল রয়েছে; তেমনই; সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ শিল্পেরও কাঁচামাল রয়েছে। যেমন; চামড়া শিল্পের কাঁচামাল চামড়া, পাট শিল্পের কাঁচামাল পাট ও মৃৎশিল্পের কাঁচামাল ভালো মাটি; তেমনই; সাম্প্রদায়িক মতবাদ নির্মাণ শিল্পেরও কাঁচামাল হচ্ছে; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা, পৌরাণিক পালনকর্তা, পৌরাণিক সংহারকর্তা, পৌরাণিক ঐশিদূত, পৌরাণিক প্রতীতি, পৌরাণিক বর্থ্য, পৌরাণিক আদিমানব, পৌরাণিক আদিমানবী, পৌরাণিক পাপ-পুণ্য, পৌরাণিক স্বর্গ-নরক ও পৌরাণিক বিচার এর গল্প-কাহিনী।

সারাবিশ্বে অসংখ্য সাম্প্রদায়িক মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে, এখনও হচ্ছে এবং আগামীতে আরও হবে। অতীতে অনেক সাম্প্রদায়িক মতবাদ ধ্বংস হয়েছে, এখনও হচ্ছে এবং আগামীতেও হবে। তাই; কখনই কোনো সাম্প্রদায়িক মতবাদ নিয়ে বাড়াবাড়ি, নির্যাতন-নিপীড়ন, বধ-বলি ও হত্যা-হনন, আগ্রাসন ও গালাগালি করা কোনো বুদ্ধিমান বা বিবেকবানের কাজ হওয়া উচিত নয়। সাম্প্রদায়িক মতবাদ চির আপেক্ষিক। এসব আজ আছে কাল নেই। এখানে আছে ওখানে নেই। তাই; এসব মতবাদের তালে পড়ে নিজের মূল্যবান জীবন বিপন্ন করা, ভুয়া স্বর্গের লোভে আত্মঘাতী কাজ করা, কারো প্রলোভনে পড়ে হত্যা-হননে জড়িত হওয়া ও কোনো সাম্প্রদায়িক সমর-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা কোনো বুদ্ধিমান লোকের উচিত নয়।

বর্তমানে কারোই প্রচলিত সাম্প্রদায়িক (কথিত ধর্মীয়) মতবাদগুলোর পক্ষে ও বিপক্ষে কোনো দিকেই আত্মঘাতী অবস্থান গ্রহণ করা উচিত নয়। নিরপেক্ষ থাকাই উত্তম। যেমন; কুরানে বলা হয়েছে; ‘لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ’ উচ্চারণ; “লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন।” অর্থ; “তোমাদের মতবাদ তোমাদের জন্য আমাদের মতবাদ আমাদের জন্য।” কবিগুরু যথার্থই বলেছেন; “উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি থাকেন তফাতে।” মধ্যম পন্থা অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মতবাদ যেভাবে ধর্ম হলো (How doctrine has been religion)
প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ নতুনভাবে যাকে দেখতো বড় ও শক্তিশালী ভেবে তাকেই ভক্তি করতো। তারপর; ভক্তির নামকরণ করা হয় পূজা। তখন; তারা প্রধানত সূর্য, চন্দ্র, পাহাড়, সাগর, আকাশ ও বাতাসের পূজা করতো।  এক সময় আদিম মানুষ জানতে পারে যে; শিশ্নই হলো সবচেয়ে বড় ঈশ্বর (দেবতা)। আর যোনি হলো তার উত্তম সহযোগী। এটা ছিল মানব সভ্যতার মহা-দর্শন (Super philosophy)। ঐ সময়কে বলা হতো মহা-দার্শনিক যুগ (Super philosophical period)। তখন; হতে মানুষ শিশ্ন (Penis) ও যোনি (Vagina) পূজা করতে আরম্ভ করে। এটা ছিল মানব সভ্যতার মহা-ঈশ্বরতত্ত্ব (Super theosophy)। ঐ সময়কে বলা হতো মহা-ঐশ্বরিক যুগ (Super theosophical period)। অতঃপর; বিগত ৪,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে ১,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মানুষ শিশ্ন-যোনি পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ঐ সময়কে বলা হতো প্রকৃত আত্মদর্শন যুগ (Real theosophical period)।

১,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এসে লজ্জা ও ব্রীড়ার প্রতি লক্ষ্য করে প্রতীকী আত্মদর্শন (Symbolic theosophy) আবিষ্কার হয়। তারপর; আত্মতাত্ত্বিকগণ শিশ্ন ও যোনিকে রূপক দ্বারা আড়াল করার জন্য একের পর এক পরিভাষা আবিষ্কার করতে থাকেন। সাথে সাথে শিশ্ন-যোনির পূজাবিধিরও পরিবর্তন করতে থাকেন।

যারফলে; ১,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এসে মহা-ঈশ্বরতত্ত্ব (Super theosophy) দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা ১. প্রকৃত আত্মদর্শন (Real theosophy) ও ২. প্রতীকী আত্মদর্শন (Symbolic theosophy)।

বিশেষ করে সুস্থজীবন, শুক্রনিয়ন্ত্রণ, অমৃতসুধা-অমৃতমধু আহরণ ও দীর্ঘায়ুলাভ এসবই ছিল তখনকার তাত্ত্বিক বিষয়। তখন এসবের ওপর নির্ভর করে ভারতবর্ষে নির্মিত হয়েছিল বেদ (৪,৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), রামায়ণ (৩,৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), মহাভারত (৩,২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ও পুরাণসমগ্র (৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ- ৮০০ খ্রিস্টাব্দ)।

তখন; বিশ্বের কোথাও মতবাদকে ধর্ম বলা হতো না। বরং সর্বদা তত্ত্ব, মত, বাদ, মতবাদ, ব্যক্তিগত ঈশ্বরবাদ ও ব্যক্তিগত দেবতায় বিশ্বাসবাদ প্রভৃতি বলা হতো। মতবাদগুলো ঈশ্বর প্রদত্ত, ঈশ্বর প্রেরিত ও ঈশ্বরের মনোনীত এসবও বলা হতো না। এই মহান গ্রন্থ অমুক কবি নির্মাণ করেছেন; পূর্বকালে এরূপ বলতেই মানুষ গর্ববোধ করতো। তখন; রীতিমতো প্রতিযোগীতা চলতো ব্যক্তিগত ঈশ্বর বা ব্যক্তিগত দেবতা নির্মাণের। যে যত সুন্দর ঈশ্বর বা যত সুন্দর দেবতা নির্মাণ করতে সক্ষম হতো বলিহারি দেওয়া হতো তাঁকে।

তখনো; প্রতীকী মূর্তির মাধ্যমে মনুষ্য নির্মিত ঈশ্বরের পূজা পদ্ধতি আবিষ্কার হয় নি। প্রতিযোগীতা চলছে কেবল ঈশ্বর নির্মাণের। তখনই; ভারতবর্ষে ঈশ্বর রূপে নির্মিত হয় ব্রহ্মা, কৃষ্ণ, রাম ও বুদ্ধ। তারপর; বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ঈশ্বররূ পে নির্মিত হয়; ‘الله’ (আল্লাহ), ঈশ্বর, ロード (এয়াদা), ওয়াহিগুরু, ‘خدا’ (খোদা), ‘خداوند’ খোদাওন্দ), 主 (চু), Chúa tể (চো তে), Jehovah (জোভ), Tanrı (তানরি), 老爺 (লাংইয়ে), Lord (লর্ড), 범천 (হামসান) ও Here (হিরিই)। এছাড়াও; মারাংবুরু, কারাতারা ও খামিসামা এগুলোও বিশ্বের কোনো কোনো সাম্প্রদায়িক মতবাদের ঈশ্বর।

স্মরণীয় যে; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা ও সাম্প্রদায়িক নিরাকার সৃষ্টিকর্তা এক নয়। যেমন; বাংলা ভাষার বিধাতার নাম সৃষ্টিকর্তা। অন্যদিকে; বাংলা ভাষার নির্মিত সাম্প্রদায়িক সৃষ্টিকর্তার নামগুলো হচ্ছে হিন্দুদের ব্রহ্মা, বৌদ্ধদের ঈশ্বর, আত্মতাত্ত্বিকদের কাঁই ইত্যাদি। ব্রহ্মা, ঈশ্বর ও কাঁইয়ের চরিত্র ও জীবনী আছে। এগুলো ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র। অন্যদিকে; সৃষ্টিকর্তার চরিত্র বা জীবনী কিছুই নেই। কারণ; সৃষ্টিকর্তা পৌরাণিক কোনো চরিত্র নন। এটি আভিধানিক একটি পরিভাষা মাত্র। নিচে কয়েকটি সাম্প্রদায়িক ঈশ্বরের নাম তুলে ধরা হলো।

১. ইয়াজিদীদের      Tanrı (তানরি)।
২. ইয়ারসানীদের     ‘خداوند’ (খোদাওন্দ)।
৩. মুসলমানদের      ‘الله’ (আল্লাহ)।
৪. ইহুদীদের          Jehovah (জোভ)।
৫. কনফুসীদের       老爺 (লাংইয়ে)।
৬. ক্যাওদাইদের     Chúa tể (চো তে)।
৭. খ্রিস্টানদের        Lord (লর্ড)/ ‘לורד’ ()।
৮. জরথুস্ত্রদের        ‘خداوند’ (খোদাওন্দ)।
৯. জুসিদের           범천 (হামসান)।
১০. জেনদের         ব্রহ্মা।
১১. জৈনদের         ব্রহ্মা।
১২. তাওদের         主 (চু)।
১৩. তেনরিকোদের ロード (এয়াদা)
১৪. দ্রুজদের         ‘לורד’ ()।
১৫. নিওপ্লাটোদের   ‘خدا’ (খোদা)।
১৬. বাহাইদের       ‘اللہ’ (আল্লাহ)।
১৭. বৌদ্ধদের         ঈশ্বর।
১৮. মাজদাকদের    ‘خدا’ খোদা।
১৯. মান্দাইদের      ব্রহ্মা।
২০. রাস্তাফারীদের   Here (হিরিই)।
২১. শাক্তদের        ব্রহ্মা।
২২. শিখদের         ওয়াহিগুরু।
২৩. শিন্তোদের       ロード (এয়াদা)
২৪. সামারিতানদের ‘לורד’ ()।
২৫. হিন্দুদের        ব্রহ্মা।
২৬. হোয়া-হাওদের Chúa tể (চো তে)।

যতসম্ভব জানা যায়; ১,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে মনুষ্যনির্মিত ঈশ্বরের পূজা প্রথা আরম্ভ হয়। যেহেতু; ঈশ্বরকে দেবতা বলা হয়। সে সূত্র ধরেই ভারতে দেব-দেবীর পূজা আরম্ভ হয়। যেমন; সরস্বতীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, দূর্গাপূজা ও কালীপূজা প্রভৃতি। এগুলো ছিল প্রতীকী আত্মদর্শনের অবদান।

একদিকে; মানুষের শিশ্ন ও যোনিকে পূজাকে কেন্দ্র করে সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পুস্তক-পুস্তিকা নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে; আবিষ্কার করা হয়েছে আরাধনা, উপাসনা, ধ্যান, পূজা, প্রাণায়াম, যজ্ঞ, যোগ ও সাধনা। দেওয়া হয়েছে একেক দেশে একেক ভাষায় একেক প্রকার নাম। শিশ্ন ও যোনি শুনতে অশালীন। তাই; এ মূলক সত্তা দুটির আভিধানি নাম পরিবর্তন করে রূপক নাম ভগ ও বাণ গ্রহণ করা হয়।

অর্থাৎ; যোনিকে ভগ ও শিশ্নকে বাণ ধরে এর নাম দেওয়া হয়েছে ভগবান (ভগ + বাণ = ভগবান (বাণের ণ সন্ধির পর ন হয়েছে))। তখন থেকে ভগবানই ঈশ্বর নামে পরিচিত ও স্বীকৃত হয়। সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার যোনিজাত সৃষ্টিকুল এই ভগবাণের পূজায় ব্যতিব্যস্ত। তাই; ভগবাণই প্রকৃত দর্শন, ভগবাণই প্রকৃত বিজ্ঞান, ভগবাণই প্রকৃত সাধন, ভগবাণই প্রকৃত উপাসনা, ভগবাণই প্রকৃত আরাধনা ও ভগবাণই প্রকৃত আলোচনা। সারা বিশ্বের সর্ব প্রকার কর্ম, বৃত্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্য এ ভগবানের পুঁজার সাথে কোনো না কোনভাবে সম্পৃক্ত। ভগবানের পুঁজা কোনো ব্যবসা নয় এটা প্রেম-ভালোবাসা। ভগ ও বাণের প্রতীক এক সঙ্গে এক মঞ্চে স্থাপন করে পূজা করা অত্যন্ত লজ্জাস্কর। তাই; সাম্প্রদায়িকরা ভগ ও বাণের আলাদা প্রতীক সৃষ্টি করে আলাদাভাবে পূজার ব্যবস্থা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভগ ও বাণের পৃথক পৃথক পূজার কারণে সাম্প্রদায়িকরা প্রকৃত ভগবানকে হারিয়ে ফেলেছে। তাই; ভগকে যোনি বললে এবং বাণকে শিশ্ন বললে এখন অনেকেই রেগে ওঠে।

সাম্প্রদায়িকদের মূল ভগবাণকে হারিয়ে ফেলা কিম্বা লজ্জাস্করতার কারণে ভগ ও বাণের পৃথক পৃথক পূজা চালু করা; যাইহোক না কেনো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিশ্ন ও যোনির পূজা চলতে থাকে। সেই থেকে ভারতবর্ষে পাথর, কাঠ, বাঁশ বা মাটি দ্বারা শিশ্নের প্রতীক প্রস্তুত করে তার আরাধনা করার প্রথা চালু হয়। এখান থেকেই ভারতীয় সাম্প্রদায়িকদের শিবলিঙ্গ পূজার উদ্ভব হয়। এখান থেকেই জাপানী শিন্তোদের শিশ্ন পূজার (বর্তমানে কানামারা মাৎসুরি নামে প্রচলিত) উদ্ভব হয়। প্রতিবছর বসন্তকালে কানাগাওয়া কেন এর কাওয়াসাকিতে অবস্থিত কানামারা মন্দির (ওয়াকামিয়া হাচিমাঙ্গু মন্দির) প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে কানামারা মাৎসুরি (লৌহ-লিঙ্গ মেলা)।

পারসিক ও আরবীয়রা শিশ্নকে দুই ভাগে ভাগ করে। অটল শিশ্ন ও টল শিশ্ন। মৈথুনে রমণীর মনোরঞ্জনের পূর্বে সহজে শুক্রপাত করে না এমন শিশ্নকে অটল শিশ্ন বলা হয়। আর অটলগণ সব সময়ই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। অটলগণই ব্রজের কৃষ্ণ। তাই; ভারতীয়রা অটল শিশ্নের প্রতীককে শিবের প্রতীক বা শিবলিঙ্গ নামে অভিহিত করে। সেখান থেকে ভারতবর্ষে অটলগণকে কৃষ্ণ জ্ঞানে ভক্তি-পূজার প্রচলন হয়। তখন থেকে প্রতীকী শিশ্নে (শিবলিঙ্গে) দুধ দিয়ে পূজা করার নিয়ম চালু হয়।

অন্যদিকে; মৈথুনে কামিনীর মনোরঞ্জনের পূর্বেই শুক্রপাত করে এমন শিশ্নকে টল শিশ্ন বলা হয়। আর টলরা সব সময়ই তিরস্কার পাওয়ার যোগ্য। তাই; আরবীয়রা টল শিশ্নের প্রতীককে শয়তানের প্রতীক নামে আখ্যায়িত করে। আর তারা পাথরকে গ্রহণ করে কামরসের প্রতীক রূপে। যেমন; মৈথুনকালে উষ্ণ কামরস শিশ্নে ঢেলে শুক্রপাত করতে বাধ্য করা হয়; তেমনই; প্রতীকী শয়তান স্থাপন করে তাতে পাথর মেরে তাকে তিরস্কার করা হয়। এখান থেকে শয়তানের প্রতীকী কাঠিকে তিরস্কার করে পাথর নিক্ষেপ প্রথার উদ্ভব হয়। যা এখনো হাজিরা পালন করে থাকে।

কানামারা মাৎসুরির মিছিল চিত্র

 

আবার; কেউ কেউ পাথর, কাঠ, বাঁশ বা মাটি দ্বারা যোনির প্রতীক প্রস্তুত করে তার আরাধনা করে। এখান থেকে যোনি পূজার উদ্ভব হয়। যেমন; কামরূপের কামাখ্যা দেবীর প্রতীকী যোনি পূজা।

কামাখ্যা দেবীর প্রতীকী যোনি পূজা (তথ্যসূত্র; বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/ পিএম; ১৯ জানুয়ারী, ২০১৬)।

 

 

 

 

 

 

ভারতের কামরূপ রাজ্যে যোনি পূজা

 

 

 

 

 

 

শিবলিঙ্গ এবং শক্তি যোনি মূর্তি (Shiva Lingam and Shakti Yoni Statue)

 

 

 

 

 

 

 

অন্যদিকে; পারসিক ও আরবীরা যোনির প্রতীক প্রস্তুত করে চুমা দিয়ে পূজা করার প্রথার উদ্ভব করে। তারা যোনির প্রতীককে কালো পাথর (হাজরে আসুদ) নামে আখ্যায়িত করে। তারা যোনির প্রতীককে যত্রতত্র না রেখে মক্কার বাইতুল্লাহর দেয়ালে স্থাপন করে। সব হাজির এই কালো পাথরে চুম্বন করা আবশ্যক করে। তখন থেকে যোনির প্রতিকৃতিটি হাজরে আসুদ (কালো পাথর) নামে পরিচিতি লাভ করে। মজার বিষয় হলো যে; এখন কেউ একে যোনির প্রতীক বললে হাজিরা মানতে চায় না।

প্রতীকী দর্শন কোনো না কোনভাবে ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো উপাসনাও নয় এমনকি প্রেম-ভালোবাসা নয়। প্রকৃত আত্মদর্শনের অবদান ভগবানের পূজা, ভ্রতৃত্ব ও প্রেম-ভালোবাসা। অন্যদিকে; প্রতীকী আত্মদর্শনের অবদান ব্যবসা, ধ্বংস ও যুদ্ধ-বিগ্রহ। প্রকৃত আত্মদর্শনকে বলা হয় শ্বরবিজ্ঞান (Theology)। অন্যদিকে; প্রতীকী আত্মদর্শনকে বলা হয় পুরাণ (Mythology)। মানবদেহের (শ্বরবিজ্ঞানের) বিভিন্ন সূত্র দ্বারা নির্মাণ করা পুরাণ। পুরাণের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো ঈশ্বর। দীর্ঘ কয়েক সহস্রাব্দে গড়ে উঠা পৌরাণিক ঈশ্বর পূজার নীতিমালাকে বলা হয় সাম্প্রদায়িক মতবাদ। সাম্প্রদায়িক মতবাদকেই লুকোচুরি করে বর্তমানকালে বলা হচ্ছে ধর্ম (Religion)। সারাবিশ্বে বর্তমানে Religion বা ধর্মের যে আগ্রাসী অবস্থা ও যে করুণ পরিণতি তা আর বলার প্রয়োজন নেই। এখনি সাম্প্রদায়িকদের ব্যবহৃত ধর্ম, ধার্মিক, ধর্মযুদ্ধ, বিধর্মী, ধর্মকর্ম ধর্মবিধান প্রভৃতি পরিভাষার পরিবর্তে; মত, মতবাদ, দর্শন, শাস্ত্র, সাম্প্রদায়িক-বিধান, মনগড়া মতবাদ কল্পনাপ্রসূত মতবাদ প্রভৃতি পরিভাষার ব্যবহার আরম্ভ করা উচিত। তাহলে কিছুটা হলেও তাদের পরিভাষার ভুল ব্যবহারের প্রতিবাদ করা হবে বৈকি।

বাবাও ডেলিভারি রোগে মারা গেছে” (Father has died that delivery disease)
কয়েকজন অশিক্ষিত লোক এক স্টলে বসে চা-আড্ডা করছিল। এমন সময় একজন বললো অমুকের স্ত্রী ডেলিভারিতে মারা গেলো। তখন; ঐ অশিক্ষিতদের মধ্যে একজন বলে উঠলো গত বছর, “আমার বাবাও এ রোগেই মারা গেছে।” এর অর্থ হচ্ছে; ঐ অশিক্ষিত লোকটি ডেলিভারি (Delivery) পরিভাষাটির অর্থ জানে না। সে মনে করেছে কোনো মারাত্মক রোগের নাম ডেলিভারি। বিশেষ করে তার বাবা যে রোগে মারা গেছে হয়তো সে রোগের নাম ডেলিভারি। তেমনই; বর্তমানকালে অধিকাংশ লোক মনে করছে Religion পরিভাষার অর্থ ধর্ম। আর এর ওপরই গড়ে উঠেছে অভিধান, ওয়েবসাইট ও গুগোল অনুবাদ। তাই; এখান থেকে বের হওয়া অনেক কঠিন। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম পরিভাষাটির ইংরেজি অনুবাদ Attribute এবং আরবি سمة (সিমা) হবে। যেহেতু; সারা বিশ্বে ধর্ম পরিভাষাটির ইংরেজি Religion ও আরবি دين (দিন) হয়ে গেছে। সেহেতু; এখন সঠিক অর্থে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার।

খাসি কুকুর হওয়া (The Castrated be dog)
একবার এক ঠাকুর তার যজমানের বাড়িতে গেলো। যজমান ঠাকুরকে দুই দিন পর্যন্ত যথেষ্ট যত্ন-সমাদর করলো। অতঃপর; ঠাকুরের বিদায়ের সময় তার হাতে একটি খাসির দড়ি ধরিয়ে দিয়ে বললো; “ঠাকজি, একটা খাসি তো আপনাকে নিয়ে আমরা খেয়েছি; আর এ খাসিটা মাতাজি যেন বাড়ির অন্যান্যদের নিয়ে খান।” ঠাকুর খাসিটি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠলেন। খাসিটি দেখে তিনজন ঠকের লোভ হলো। তাদের প্রধান বললো; “ঠাকজির খাসিটা খেতে হবে কিন্তু তাকে কোনো প্রকার অসম্মান করা যাবে না। আমরা তিনজন পথের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তাঁর সাথে দেখা করে খাসিটাকে কুকুর বলে তাঁকে ধোঁকা দিবো। তাতেই কাজ হবে।”

কথামতো তারা অন্য পথ দিয়ে ঐ পথের তিন স্থানে বসে রইল। ঠাকুরকে দেখামাত্র তাদের একজন তাঁর পায়ে পড়ে পদচুম্বন করলো। অতঃপর; বললো; “রাম রাম; ঠাকজি আপনি এতবড় কুকুরটি কেন টেনে নিয়ে যাচ্ছেন?” ঠাকুর একেবারে রেগে লাল হয়ে বললেন; “তোর মতো অন্ধরা তা-ই বলে। আমার যজমান আমাকে খাসিটা দিয়েছে বাড়ির লোকজন নিয়ে খাওয়ার জন্য। তুই কিনা বলছিস এটি কুকুর! দূর হ দূর হ।” অতঃপর; ঠাকুর আবার কিছুপথ যেতেই অন্য মোড় দিয়ে দ্বিতীয় টক এসে ঠাকুরের পায়ে পড়ে পদচুম্বন করে বললো; “ছি! ছি! ঠাকজি আমরা সবাই আপনাকে মান্য করি। আর আপনার হাতে এতবড় কুকুরটা! আপনার মান-সম্মান সব ম্লান হয়ে যাবে। দয়া করে কুকুরটাকে ছেড়ে দেন।” ঠাকুর রেগে টগবগ করতে করতে বললেন; “আমার যজমান আমাকে ঠকাতে পারে না। সে-ই এটা আমাকে দিয়েছে।” তখন ঠকটি বললো; “ঠাকজি অবশ্যই আপনার যজমান আপনাকে ঠকিয়েছে।” অবশেষে; ঠাকুর তাকে বকেছকে বিদায় করে খাসিটা নিয়ে যাত্রা করলেন। সর্বশেষে; একটি হাটের কাছে তৃতীয় ঠকটি এসে ঠাকজির পদচুম্বন করে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললো; “ঠাকজি আপনার হাতে এতবড় কুকুরটা! আজ হাটবার। হাটে অনেক লোকের আগম-নিগম। তারা অবশ্যই আপনাকে মন্দ বলবে। আমরা সবাই আপনাকে মান্য করি। আপনার কি মতিভ্রম হয়েছে যে এ পাঁজি কুকুরটার গলায় রশি লাগিয়ে হাটের মধ্যে দিয়ে যাবেন? “এবার ঠাকুর তাকে কিছুই না বলে সামনে যেতে থাকলেন। আর মনে মনে ভাবতে থাকলেন; একজন দুইজন নয় পরপর তিনজন লোক এটাকে কুকুর বলছে। অবশ্যই আমার মতিভ্রম হয়েছে। অথবা যজমান আমাকে খাসি বলে কুকুর দিয়ে ঠকিয়েছে। এবার ডানে বামে সামনে ও পিছনে তাকিয়ে একটা ফাঁকা স্থান দেখে খাসিটা ছেড়ে দিয়ে বাঁচতে হবে। ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যে ঠাকুর খাসিটা ছেড়ে দিয়ে দুর্বা ঘাসে হাত মুছে শুদ্ধ হয়ে হাটের মধ্যে ঢুকে গেলেন। অতঃপর; ঠকরা খাসিটা নিয়ে কেটে পড়লো।

ওপরের উদাহরণগুলো তুলে ধরার কারণ হলো; সমাজের ঠাক-পুরুৎ ও মোল্লা-মুন্সিরা আলোচনা করতে করতে বর্তমানকালে সাম্প্রদায়িক মতবাদকে ঈশ্বর প্রদত্ত, স্বয়ং ঈশ্বরের মুখের বাণী, স্বয়ং ঈশ্বর না হলেও ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত স্বর্গীয় দূতের মাধ্যমে প্রাপ্ত বাণী। আকাশবাণী, ঐশিবাণী, দৈববাণী, অবতরণকৃত বাণী, স্বর্গীয়বাণী ইত্যাদি বলতে বলতে মানব নির্মিত পৌরাণিক সাহিত্যগুলোই বর্তমানকালে ঐশিগ্রন্থে পরিণত হয়েছে। যেমন; একাধিক ধোঁকায় ঠাকুরের কাছে খাসি কুকুরে পরিণত হয়েছে। তেমন; সাম্প্রদায়িক বাণী নামে শুনতে শুনতে কয়েক শত বছরে পৌরাণিক কাহিনী ইতিহাস হয়েছে। মুসলমানদের আরবীয় ও পারসিক পৌরাণিক কাহিনী বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস নামে পরিচিত। তাহলে; অন্যান্যদের পৌরাণিক কাহিনীগুলোও তাদের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস হবে। তারপর; যাত্রাপালার রূপবান, নাটকের মদনকুমার, পুথির কালু ও বেহুলাও একদিন ইতিহাস হবে। আর হুমায়ুন আহমেদের বাকের ভাইও একদিন ইতিহাস হবে।

তবে মজার বিষয় হলো; একমাত্র মুসলমান ব্যতীত বিশ্বের কোনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়েরই সাম্প্রদায়িক ইতিহাস নেই। বাঙালী মুসলমানদের ধারণা যে; কেবল তাদের কাসাসুল আম্বিয়ায় বর্ণিত পৌরাণিক কাহিনীগুলো ইতিহাস। আর অন্যদের পৌরাণিক কাহিনী মিথ।

রিলিজন অর্থ ধর্ম নয় (Religion meaning is not creed)
Religion [রিলিজন] n শাস্ত্রবিশ্বাস, বিবেকের বিষয়, আশ্রমজীবন (প্র) যার যার সাম্প্রদায়িক ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস। একটি অলৌকিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস করা ও তার পূজা করা। বিশেষ করে প্রত্যেকের একেকজন ব্যক্তিগত ঈশ্বর বা দেবতায় বিশ্বাস করা { }

ইংরেজি Religion পরিভাষাটির অর্থ ছিল “একটি অলৌকিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস করা ও তার পূজা করা। বিশেষ করে প্রত্যেকের একেকজন ব্যক্তিগত ঈশ্বর বা দেবতায় বিশ্বাস করা।” অর্থাৎ; প্রাইভেট ঈশ্বর বা পারসোনাল ঈশ্বর। যেমন; মেয়ের ঈশ্বর তার বয়ফ্রেন্ড, ছেলের ঈশ্বর তার গার্ল ফ্রেণ্ড, বাবার ঈশ্বর টাকা, মায়ের ঈশ্বর সংসার ইত্যাদি। তবে; বর্তমানকালে Religion অর্থ ধর্ম না বলে উপায় নেই। কারণ; বর্তমানকালের সাম্প্রদায়িক ঠাক-পুরুৎ, মোল্লা-মুন্সি, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবিদ ও অনুবাদকরা স্বস্ব পুস্তক-পুস্তিকায় ধর্ম পরিভাষাটির ইংরেজি Religion এবং Religion পরিভাষাটির বাংলা ধর্ম লিখে সব লেজে গোবরে করেছে।

 [তখনো পর্যন্ত বৌদ্ধ বা জৈন মতবাদ কোনো পৃথক মতবাদ রূপে গড়ে ওঠে নি। এমনকি; আজকের ধারনায় যা ধর্মীয় মতবাদ, ঠিক তেমনভাবে ব্রাহ্মণ্য মতবাদকেও ধর্মীয় মতবাদ বলা যেতো না। পাঠকগণ এখানে একটু বিভ্রান্ত হতে পারেন; তাই পরিস্কার করে বলা প্রয়োজন। আজ আমরা ধর্মীয় মতবাদ বলতে Religionকে বুঝি। কিন্তু সেযুগে Religion সম্বন্ধে কোনো ধারনাই ভারতীয় মানসে ছিল না। Religion হলো একটি আব্রাহামিক ধারনা। বর্তমানকালে যার প্রতিশব্দ বলছি ধর্ম। কিন্তু সে সময় জীবনযাপনের জন্য মানুষের প্রয়োজনীয় আদর্শকেই মতবাদ বলা হতো। সুতরাং; আমরা একথা বলতেই পারি যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও অন্যান্য ভারতীয় মতবাদগুলো Religion-ই নয়। বরঞ্চ এগুলো Religion-এর থেকে অবশ্যই অধিক কিছু। way of life… (তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট) (নাগরিক)।]

এছাড়াও; Religion এর বর্তমানকালের অর্থ হচ্ছে ধর্ম, ধর্মাচরণ, আস্তিকতা, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস। Religion এর আদি অর্থ ও বর্তমানকালের প্রচলিত অর্থ দ্বারাও বহুঈশ্বর, নিরিশ্বর ও সর্বেশ্বরবাদী মতবাদগুলোকে Religion বলা যায় না। কারণ; Religion অর্থ একক ঈশ্বরে বিশ্বাস করা। অর্থাৎ; স্ব স্ব ব্যক্তিগত ঈশ্বরে বিশ্বাস করা। যার যার ব্যক্তিগত ঈশ্বরে বিশ্বাস করা।

অর্থাৎ; কারো ঈশ্বর বিবাহিত ও সন্তানাদি আছে (হিন্দু মতবাদ; নারায়ণ ও মনু ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং লক্ষ্মী মানসী কন্যা), কারো ঈশ্বর অবিবাহিত ও সন্তানাদি নেই (ইসলামী মতবাদ; আল্লাহ)। আবার কারো ঈশ্বর ক্ষেত্রজপুত্র উৎপাদন করেছেন। তা হলো; খ্রিস্টানদের একাংশের মতে ইসা । কারো ঈশ্বর মানুষের রূপধারণ করে (Non semitism). আবার কারো ঈশ্বর মানুষের রূপধারণ করে না (Semitism)। কোনো মতবাদে একাধিক ঈশ্বর। একে বলা হয় বহুঈশ্বরবাদ। আবার কোনো মতবাদে সবকিছুই ঈশ্বর। একে বলা হয় সর্বেশ্বরবাদ। আবার কোনো মতবাদে একক কোনো ঈশ্বরই নেই। একে বলা হয় নিরিশ্বরবাদ। এতো জানা বুঝার পর একজন অন্যজনের ভুয়া ঈশ্বরতন্ত্র মান্য করবেইবা কেন? আর একেকজনের ভুয়া ঈশ্বর অন্যজন না মানলেই সে নাস্তিক, যবন ও কাফির হবে! যারা ভুয়া ঈশ্বরতন্ত্র মানবে তারাই হবে আস্তিক। এমন হতেই পারে না। তাই; আজ আমাদেরকে প্রকৃত ধর্ম সম্পর্কে জানতে হবে। মতবাদকে ধর্ম বলা যাবে না। ধর্ম হচ্ছে পদার্থের গুণাগুণ। ধর্ম হচ্ছে পদার্থের বৈশিষ্ট্য। বর্তমানকালে যাকে ধর্ম বলা হচ্ছে তা হলো সাম্প্রদায়িক মতবাদ। মতবাদকে কোনক্রমেই ধর্ম নামে মেনে নেওয়া যাবে না। সাম্প্রদায়িক মতবাদকে ঘৃণা করতে গিয়ে ধর্মকে গালি দেওয়া যাবে না। ধর্মকে গালি দেওয়া অর্থই হচ্ছে চিরন্তনাতকে গালি দেওয়া, সত্যকে অস্বীকার করা।

যেমন; বাবাও ডেলিভারি রোগে মরে নি; কেবল অজ্ঞতার কারণেই সে এমন বিশ্বাস করেছে। তেমনই ঠাকুরকেও খাসি নাম করে কুকুর দেওয়া হয় নি। ঠকরা ঠাকজিকে খাসিকে কুকুর রূপে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করেছে। তেমন Religion অর্থও ধর্ম নয়। অনুবাদক ও অভিধানবিদ, বক্তা, গায়ক ও আলোচকরা ধর্মকে Religion নামে এবং Religion কে ধর্ম নামে বুঝতে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করেছে।

মতবাদ অর্থ ধর্ম নয় (Doctrine meaning is not creed)
মতবাদ অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন; বৈজ্ঞানিক মতবাদ, দার্শনিক মতবাদ, সাম্প্রদায়িক মতবাদ, রাজনৈতিক মতবাদ, বিবর্তন মতবাদ ও পুনর্জাগরণ মতবাদ। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে; বর্তমানকালের অনুবাদক ও অভিধানবিদরা প্রায় ক্ষেত্রেই মতবাদ বলতেই ধর্ম বুঝে ও বুঝিয়ে থাকে। ইংরেজি Religion অর্থও যেমন ধর্ম নয় বাংলা মতবাদ অর্থও তেমন ধর্ম নয়। ধর্ম হচ্ছে পদার্থ বা বস্তুর গুণাগুণ।

বর্তমানকালে একদল সাম্প্রদায়িক মতবাদকে ধর্ম বলে প্রচার করছে। অন্যদল Religion কে ধর্ম বলে প্রচার করছে। বাংলা ভাষায় সাম্প্রদায়িক মতবাদকে ধর্ম বলা হচ্ছে। মতবাদকে মতবাদ না বলে ধর্ম বলার কারণে কয়েকটি সমস্যার উৎপত্তি হচ্ছে।

১.   ধর্মভীরুরা ধর্মের প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
২.   দুর্বৃত্তদের দুর্বৃত্তায়ন সহজ হচ্ছে।
৩.   ধর্মের দোহাই দিয়ে বধ, বলি, হত্যা ও হননের পথ সুগম হচ্ছে।
৪.   ধর্মের দোহাই দিয়ে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজকিস্তিতে ধুমধাড়াক্কা স্বর্গ বাণিজ্য হচ্ছে।
৫.   ধর্মের দোহাই দিয়ে উপসনাগারে বসে-শুয়েই ধ্বংসযজ্ঞের পরিকল্পনা করা সহজ হচ্ছে।
৬.   ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার রূপে জীবন দেবার জন্য সাধারণ মানুষকে সহজ কিস্তিতে কেনা যাচ্ছে।
৭.   ধর্মের দোহাই দিয়ে কেবল সাধারণ মানুষ নয় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষকেও বোকা বনিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এসব কারণেই মতবাদকে মতবাদই বলা উচিত। মতবাদকে ধর্ম বলা যাবে না। আর ধর্ম বলতে হলে পদার্থ বা বস্তুর গুণাগুণকেই ধর্ম বলতে হবে। মতবাদ যেমন বস্তুর গুণাগুণ হতে পারে না; বস্তুর গুণাগুণও তেমন মতবাদ হতে পারে না।

এখন ব্যাখ্যা করে দেখতে হবে কোন যুক্তিতে মতবাদকে ধর্ম বলা হচ্ছে? কি কারণে মানুষের নির্মিত শাস্ত্রকে ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্ত্র বলা হচ্ছে? আকাশকে আকাশ ও পাহাড়কে পাহাড় বলা হয় চিরায়িত নিয়মে। এদের নামই এরূপ রাখা হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় মতবাদের বয়স তো তেমন নয়। তবে; কেন একে ধর্ম বলা হচ্ছে? আপেক্ষিক মতবাদকে চিরন্তন রূপে প্রতীয়মান করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে? সাম্প্রদায়িক মতবাদের কোন অংশটি চিরন্তন? কি পূজা, কি রোজা, কি পশুবধ সবই তো পরিবর্তনশীল! সবই তো রূপান্তরশীল। এদেশে পূজাবিধি এক প্রকার, অন্যদেশে পূজাবিধি অন্য প্রকার। এখানে নামাজ এক প্রকার অন্য স্থানে নামাজ অন্য প্রকার। এখানকার ইসলাম এক প্রকার; সৌদির ইসলাম আরেক প্রকার। একই মতবাদে একাধিক দল-উপদল। একেক দলের একেক সংস্কৃতি। তবে; মতবাদের কোন অংশটি নিত্য বা চিরন্তন? যেহেতু; মতবাদের কোনো অংশই চিরন্তন বা চিরস্থায়ী নয়; সেহেতু; মতবাদকে কোনমতেই ধর্ম বলা যাবে না।

অন্যদিকে; ধর্ম নিত্য, ধর্ম চিরন্তন, ধর্ম চিরস্থায়ী, ধর্ম অপরিবর্তনশীল। ধর্ম মানুষের সৃষ্টি নয়। ধর্ম লৌকিক নয়। বরং ধর্ম স্বয়ং বিধাতার সৃষ্টি। ধর্ম অলৌকিক। মতবাদকে ধর্ম মনে করে যারা ধর্মকে গালি দেয়; তারা ধর্মকে নয় বরং মতবাদকেই গালি দেয়। ধর্ম গালি দেওয়ার মতো কোনো বিষয়বস্তু নয়। ধর্মকে বিধাতার নির্মিত ও চিরন্তন জেনেও গালি দিলে সে চরম বোকা। তাই; ধর্মকে সর্ব প্রকার গালাগালির ঊর্ধ্বে রাখা একান্ত প্রয়োজন।

অন্যদিকে; কথিত ধর্মবাজ, ধর্মজীবী, ধর্মব্যবসায়ী ও ধর্মভৃৎ অজ্ঞদেরও জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে; তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে যেসব মুখস্ত কথা বলছে তা আদৌ ধর্ম নয় বরং তা অবশ্যই কারো না কারো দ্বারা নির্মিত মতবাদ। আর সাম্প্রদায়িক মতবাদগুলো একদিনে গড়ে উঠে নি। যুগের পর যুগ; শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে গড়ে উঠে সাম্প্রদায়িক মতবাদ। তাই; এর সংশোধন, পরিসংশোধন, বর্ধিত সংশোধন ও সংযোজন-বিয়োজন হতে হতে এটি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে; জ্ঞানীরা কেউ এসব নিয়ম গ্রহণ করতে চায় না। কারণ; সাম্প্রদায়িক মতবাদের কোনকিছুই বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তির সাথে মিলে না। সাম্প্রদায়িক মতবাদের সবকিছুই রূপক ও তাত্ত্বিক।

তাহলে সাম্প্রদায়িক মতবাদের যুক্তিভিত্তিক সমালোচনা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করা ও সেন্সেটিভ স্থানে আঘাত করা ইত্যাদি কথাগুলোর ভিত্তি কোথায়? তাই এ নিবন্ধের মাত্রিকা করা হয়েছে “মুক্তবাজ বনাম ধর্মবাজ”। কোনো মতবাদকে কটাক্ষ করা বা কোনো মতবাদকে হেয় করার কোনো অভিপ্রয়াস আমাদের নেই। বরং আমরা সর্বদা বিশ্বের সর্ব প্রকার মানবকল্যাণকর মতবাদকে, সংস্কৃতিকে, দেব-দেবীকে ও মতবাদকর্মকে শ্রদ্ধা করি।

সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাস (Communalism virus)
মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি লক্ষ্য করা যায়; যেমন, মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি আসক্তি, জুয়ার প্রতি আসক্তি, ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি, অপরিণত বয়সে প্রেম ফাঁদে পতিত হওয়া ইত্যাদি। এমন মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে; যা ভাইরাসের সাথে তুলনা করা যায়। বর্তমানে সাম্প্রদায়িক মতবাদের অনুসারীরাও মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির কবলে পড়ছে; কিন্তু তা তারা বুঝতে পারছে না। এখন সেটিই চিন্তার বিষয়। সাম্প্রদায়িক মতবাদের প্রতি মানুষকে আসক্তকারী এবং সাধারণ মানুষকে পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা আক্রমণকারী ভাইরাসের নাম হলো সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাস। মারাত্মক এই ভাইরাসটির কবল হতে রক্ষা পায় নি; অধিকাংশ শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, শিল্পী, পালাকার, গায়ক, এমপি, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী।

যেমন; হেপাটাইটিস বি নামক জৈবিক ভাইরাসে আক্রান্ত অনেক রোগীই জানে না যে; সে কখন কিভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তেমনিভাবে; এখন সারাবিশ্বের প্রায় ৮৪% মানুষ সাম্প্রদায়িক ভাইরাসে আক্রান্ত। অধিকাংশ সাম্প্রদায়িক মানুষই অন্ধবিশ্বাসী, টেঁসে, একপেশে, তার্কিক ও মানসিক রোগী। তাই; রাজনৈতিকরা সাম্প্রদায়িকদের অতি সহজেই ব্যবহার করতে পারে। রাজনৈতিকরা সাম্প্রদায়িকদের বলির পাঁঠা রূপে কিম্বা ক্রীড়ানক (হাতের পুতুল) রূপে ব্যবহার করে। ব্যবহার শেষে হয়তবা; সন্ত্রাসী আখ্যায় হত্যা করে; নয়তবা; টয়লেট পেপারের মতো আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে। তারপরও; রাজনৈতিক ভোলে পতিত সাম্প্রদায়িকরা একবার মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ গড়ে। আবার; মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির গড়ে। ১৯৪৭, ১৯৪৮ ও ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের রায়ট (Riot) এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ই তার প্রমাণ। পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তের দিকে তাকালে দেখা দেখা যায় যে; এখনও সাম্প্রদায়িকরা ধ্বংসযজ্ঞ, বধ, বলি, হত্যা, হননের হেয়ালি খেলায় মত্ত। সাম্প্রদায়িকরা পৌরাণিক ঘোলাজল পায়ী। সাম্প্রদায়িকরা অন্ধ ও বধির। তাই; তারা সত্য বুঝে না; যুক্তি মানে না, দর্শন গ্রহণ করে না। এমনকি; তারা বিজ্ঞানও প্রত্যাখ্যান করে। কেবলই তারা যার যার কাকতালীয় চমৎকার, মিরাকল ও মুজেঝা বিশ্বাসী।

সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য (The characteristics of communalism virus)
১.   এই ভাইরাসটির প্রাণ হলো সৃষ্টিকর্তা।
২.   এই ভাইরাসটির বাহন হলো দেবতা, ঐশিদূত ও মহামানব।
৩.   এই ভাইরাসটি মানুষকে প্রথমে মানসিকভাবে সংক্রমণ করে।
৪.   এই ভাইরাসটি নিজস্ব মতবাদ রক্ষা ও অন্য মতবাদ প্রতিরোধ করে।
৫.   ভাইরাসটি মানুষের বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক কার্যকরী প্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে।
৬.   এই ভাইরাসটি বিশেষ কিছু কৌশলের মাধ্যমে বিস্তারলাভ করে।
৭.   এই ভাইরাসটি বাহককে স্বয়ংক্রিয় কার্যকরী পদ্ধতির (Automatic functioning system) মধ্যে আবদ্ধ করে। যেমন; কম্পিউটার সফ্টওয়ার।

———–***———–

১. এই সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসটির প্রাণ হলো সৃষ্টিকর্তা (1. The creator is the soul of this communalism virus)
সৃষ্টিকর্তাকে সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসের প্রাণ বলার কারণ হলো; সাম্প্রদায়িক ভাইরাসটি পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তার কাঁধে ভর করেই চলাফেরা করে। সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের মূলেই পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা। সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস ভাইরাসের মূলেও পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা। তাই; বলন কাঁইজি বলেছেন; যার সৃষ্টিকর্তা সমস্যার সমাধান হয় নি; তার কোনো সমস্যারই সমাধান হয় নি; অন্যদিকে; যার সৃষ্টিকর্তা সমস্যার সমাধান হয়েছে; তার সব সমস্যারই সমাধান হয়েছে একবার পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞানার্জন করলে এই ভাইরাসটি আর মানুষকে সংক্রমণ করতে পারে না।

‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিভাষাটিকে যদি একটি মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ এর সাথে তুলনা করা হয়; তখন মুদ্রার এক পিঠকে বলা যায় প্রাকৃতিক সৃষ্টিকর্তা আর অপর পিঠকে বলা যায় পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা। এই পরিভাষাদ্বয়কে আবার একে অপরের পরিপূরক রূপে ব্যবহার করা হয়। যখন যেমন তখন তেমন নীতিতে। এর কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো;

. প্রকৃতিকে পঙ্ক্ষাণুপঙ্ক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে দৃষ্টান্ত রূপে সৃষ্টিকর্তাকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয় যেমন; একদিকে; প্রাকৃতিক সৃষ্টিকর্তা যা যা করেন, পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা দ্বারা তা বারবার বলানো হয় অন্যদিকে; প্রাকৃতিক সৃষ্টিকর্তা যা যা করেন না; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা দ্বারা তাও বারবার করানো হয় যেমন;

  • কখনও কখনও আদেশ-নিষেধমূলক বাণী (স্রষ্টার বিধান) প্রেরণ করানো হয়।
  • কখনও কখনও মানুষকে নরকের ভয় ও স্বর্গের লোভ দেখানো হয়।
  • কখনও কখনও মানুষের নিকট ইঙ্গিত (দৈববাণী/ অহি) পাঠানো হয়।
  • কখনও কখনও মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলানো হয়।
  • কখনও কখনও মানুষের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করানো হয়। যেমন; কৈলাসে রাবণ ও তুরে মুসা প্রভুর সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন।
  • কখনও কখনও এক ঐশিদূতকে অন্যান্য ঐশিদূতের কাহিনী শোনানো হয়। যেমন; বলা হয়; আপনি কি অমুক গোত্রের কাহিনী শোনেন নি! কাহিনীটি হলো; —-।
  • কখনও কখনও মানুষের প্রতিটি কর্মকে সৃষ্টিকর্তার সরাসরি নজরে রাখা হয়।

এসব দেখেই মনে হয়; সৃষ্টিকর্তা যেন; রূপকারগণের নিকট আত্মীয়। সৃষ্টিকর্তা যেন তাদের চা চক্রের সঙ্গী।

খ. পৌরাণিক সাহিত্যে যেসব প্রাকৃতিক উপাদানকে (সত্তা বা বৈশিষ্ট্য) ঐশ্বরিক সত্তা (বৈশিষ্ট্য) রূপে উপস্থাপন করা হয়;

  • প্রাকৃতিক আচরণকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) চরিত্র রূপে।
  • প্রাকৃতিক ইঙ্গিতকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) বাণী রূপে।
  • প্রাকৃতিক উপহারকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) দান রূপে।
  • প্রাকৃতিক কৌশলকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) কৌশল রূপে।
  • প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) ক্ষমতা রূপে।
  • প্রাকৃতিক দানকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) করুণা রূপে ।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) শাস্তি রূপে।
  • প্রাকৃতিক নিয়মকে (গুণ) উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) ধর্ম রূপে।
  • প্রাকৃতিক প্রযুক্তিকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) দূত রূপে।
  • প্রাকৃতিক বিধানকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) বিধান রূপে।
  • প্রাকৃতিক সত্তাকে উপস্থাপন করা হয় ঐশ্বরিক (ঐশী) সত্তা রূপে।
  • প্রকৃতিকে উপস্থাপন করা হয় ঐশী গ্রন্থ রূপে।

গ. পুরাণে যেসব মানবিক সেবাকে স্বয়ং ঈশ্বরের সেবা রূপে উপস্থাপন করা হয়;

  • অসহায়ের সম্পত্তি রক্ষা করাকে উপস্থাপন করা হয় স্বয়ং ঈশ্বরের সম্পত্তি রক্ষা করা রূপে।
  • ক্ষুধার্থ মানুষকে অন্ন দান করাকে উপস্থাপন করা হয় স্বয়ং ঈশ্বরকে অন্নদান রূপে।
  • জ্ঞানীর সম্মান করাকে উপস্থাপন করা হয় স্বয়ং ঈশ্বরকে সম্মান করা রূপে।
  • বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করাকে উপস্থাপন করা হয় স্বয়ং ঈশ্বরকে সাহায্য করা রূপে।
  • বিপন্ন মানুষকে সেবা করাকে উপস্থাপন করা হয় স্বয়ং ঈশ্বরকে সেবা করা রূপে।
  • বৃদ্ধ পিতামাতা লালানপালন করাকে উপস্থাপন করা হয় স্বয়ং ঈশ্বরকে লালানপালন করা রূপে।

. একদিকে প্রাকৃতিক সৃষ্টিকর্তাকে বলা হচ্ছে; স্বয়ম্ভূ, সর্বত্র বিরাজমান ও নিরাকার বা দেহহীন সত্তাঅন্যদিকে; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তাকে দেহধারী রূপে উপস্থাপন করা হচ্ছেযেমন; বলা হচ্ছে; প্রভুর মুখ, হাত, পা চোখ ইত্যাদি আছেঅর্থাৎ; পুরাণে মানুষের প্রত্যঙ্গকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার প্রত্যঙ্গ রূপে উপস্থাপন করা হয়;

  • মানুষ যে চোখ দিয়ে উত্তম কিছু দেখে, পৌরাণিক সাহিত্যে সেই চোখকে সৃষ্টিকর্তার চোখ নামে অভিহিত করা হয়।
  • মানুষ যে মুখ দিয়ে নীতিকথা বলে; পৌরাণিক সাহিত্যে সেই মুখকে সৃষ্টিকর্তার মুখ নামে অভিহিত করা হয়।
  • মানুষ যে পা দিয়ে কল্যাণের পথে চলে, পৌরাণিক সাহিত্যে সেই পাকে সৃষ্টিকর্তার পা নামে অভিহিত করা হয়।
  • মানুষ যে হাত দিয়ে ভালো কাজ করে, পৌরাণিক সাহিত্যে সেই হাতকে সৃষ্টিকর্তার হাত নামে অভিহিত করা হয়।
  • মানুষ যে মন দিয়ে ভালো ধ্যান-ধারনা চর্চা করে, পৌরাণিক সাহিত্যে সেই মনকে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা নামে অভিহিত করা হয়।
  • মানুষ যে ঘরে যার যার উপাস্যের উপাসনা করে, পৌরাণিক সাহিত্যে সেই ঘরকে সৃষ্টিকর্তার ঘর নামে অভিহিত করা হয়।

জ্ঞানী মানুষগণ নিজের সব চিন্তা, কথা, কাজ ও ভাব স্বয়ং ঈশ্বরের পক্ষ থেকে আসা বাণী রূপে উপস্থাপন করেন। সারাবিশ্বের সব সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ (কথিত ধর্মগ্রন্থ) এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পিথাগোরাসের নিজের সিদ্ধান্তকে ঐশ্বরিক বাণী রূপে প্রচার করার ক্ষমতার বাহার বিস্ময়ের সাথে স্মরণ করা যায়। যেমন; রোমান ইতিহাসবিদ সিসেরো (Cicero) বলেছেন; “যখন কেউ পিথাগোরাসকে তার কোনো তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতো; তখন তিনি নির্দ্বিধায় উত্তর দিতেন;’প্রভু বলেছেন, ………;’ আর সেই প্রভু ছিলেন স্বয়ং পিথাগোরাস!” আবার; মরমী কবি মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন; “আল্লাহ কে বুঝে তোমার অপার লীলে, আপনি (মানুষ) আল্লাহ ডাকো আল্লাহ বলে।” (পবিত্র লালন- ১৭৮/১)। সাঁইজি বলেছেন যে; মানুষ মানুষের সৃষ্টিকর্তা। আরবীয় পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তার এক নাম আল্লাহ। আর মানুষ আল্লাহকে ডাকে। তাই; যুক্তিতে বলা যায় আল্লাহই আল্লাহকে ডাকে।

কোনো মতমাদের সৃষ্টিকর্তা মানসপুত্র ও মানসকন্যা দ্বারা তার সৃষ্টি কার্য আরম্ভ করেছেন। যেমন; ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত ব্রহ্মা। তিনি প্রথম মানস পুত্র নারায়ণ ও মানসী কন্যা লক্ষ্মীকে সৃষ্টি করেন। অতঃপর; তাদের বিবাহ দেন। তারপর; মানস পুত্র মনু ও মানসী কন্যা শতরূপাকে সৃষ্টি করেন এবং তাদের বিয়ে দেন। আর সেই মনু হতেই মানব সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়।

আবার; কোনো মতবাদের সৃষ্টিকর্তা ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদন করেন। যেমন; খ্রিস্টানদের একাংশের (ত্রিত্ববাদ) মতে; স্রষ্টার ক্ষেত্রজ পুত্র কানীন (হযরত ইসা (আঃ))। আবার; কোনো মতবাদের সৃষ্টিকর্তা দেবদূত দ্বারা মাটি আনিয়ে দৈত্য দ্বারা মানুষের কাঠামো প্রস্তুত করিয়ে নিজে আত্মা ফুঁকে দেন।

. একদিকে; কোনো বিষয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে চিন্তাগত/ বিশ্বাসগত/ দর্শনগত/ স্বার্থগত বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। অন্যদিকে; ঐ একই বিষয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আচারণগত/ দৃশ্যমানগত সাদৃশ্য দেখা যায়;

  • সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি বা নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষ তার প্রিয় বস্তুকে (মনের পশু) উৎসর্গ করার পাশাপাশি নিরহপ্রাণীর প্রাণ উৎসর্গ করাকে পুণ্যকর্ম মনে করে।
  • কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাকার সৃষ্টিকর্তার আকারী প্রতিমা পূজাকে মহা পূণ্যকর্ম মনে করে। তাই; নিরাকার সৃষ্টিকর্তার পূজা আকারের মাধ্যমে করার জন্য আকার দিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতিমা নির্মাণ করে। তারপর; তারা তাতে প্রতীকী প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে তার পূজা করে। তারপর; পূজা শেষে প্রতিমা বিষর্জন দেয়। যেমন; হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়। আবার; কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাকার সৃষ্টিকর্তার উপাসনা নিরাকারের মাধ্যমে করার জন্য সৃষ্টিকর্তার ঘর নির্মাণ করে এবং তারা সেই ঘরে; সেই নিরাকার সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করে। যেমন; ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমান সম্প্রদায় স্রষ্টার ঘর মসজিদ, গির্জা, দেবমন্দির নির্মাণ করে নিরাকার সৃষ্টিকর্তার পূজা করে। এরা নিরাকার সৃষ্টিকর্তার প্রতিমা পূজা করাকে ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ মনে করে। তাই; তারা এই প্রথার বিরুদ্ধে অনেক কটুকথাও বলে। যেমন; ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমান সম্প্রদায়।
  • কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ উত্থিত শিশ্ন মূর্তিকে (Phallus) দুধ দিয়ে পূজা করাকে বড় পূণ্যের কাজ মনে করে। যেমন; হিন্দু সম্প্রদায় দুধ দিয়ে শিবলিঙ্গ পূজা করে। তাই; তারা দুধ দিয়ে শিবলিঙ্গ পূজা করে। আবার; কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ উত্থিত শিশ্নের প্রতীকে (Phallus) পাথর মেরে ঘৃণাভরে তিরস্কার করাকে বড় পূণ্যের কাজ মনে করে। যেমন; মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ উত্থিত শিশ্ন মূর্তিকে প্রতীকী শয়তান রূপে স্থাপন করে; তাতে পাথর নিক্ষেপ করাকে অনেক পূণ্যের কাজ মনে করে। তাই; তারা প্রত্যেকে প্রতীকী শয়তানে পাথর মেরে হজের মুস্তাহাব আদায় করে। আবার; কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ উত্থিত শিশ্নের প্রতীক (Phallus) প্রদর্শন অনুষ্ঠান করাকে অনেক পূণ্যের কাজ মনে করে এবং তারা তাই করে। যেমন; জাপানের শিন্তো মতবাদীরা প্রতি বছর (Phallus festival) করে থাকে।

. বিশ্বের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীতে যেসব কালজয়ী ও শক্তিমান পৌরাণিক চরিত্র দেখা যায়; সেসব পূর্বকার বাস্তব ও ঐতিহাসিক চরিত্র ছিল না বরং তখন সেগুলো পৌরাণিক চরিত্রই ছিল তারপর; সেগুলো ক্রমে ক্রমে কয়েক যুগ বা কয়েক শতাব্দি ধরে মানুষের কাছে বাস্তব ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রূপে গৃহীত ও স্বীকৃত হয়েছে যেমন; বাঙালী পুরাণ রামায়ণে বর্ণিত পৌরাণিক রামের ভগবান শ্রী রামচন্দ্রে উন্নীত হওয়া অনুরূপভাবে; আরবীয় পুরাণ কুরানে বর্ণিত পৌরাণিক মুহাম্মদের হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ উন্নীত হওয়া এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয় যে; মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদির রূপক নামে ঈশ্বরায়ন, দেবতায়ন ও মানবায়ন করে এসব পৌরাণিক চরিত্র নির্মাণ করা হয়েছে অর্থাৎ; পৌরাণিক মূলক সত্তাটির অর্থ ও চরিত্রকে পরিবর্তন করে রূপক ভাবার্থ ও পৌরাণিক চরিত্র প্রদান করা হয়েছে অর্থাৎ; প্রকৃত মূলক সত্তাকে আড়াল করে পৌরাণিক চরিত্রের মাধ্যমে তার রূপক কাহিনী উপস্থাপন করা হয়েছে

. পৌরাণিক ঈশ্বর (Mythological god)
আভিধানিক সত্তা              হতে       পৌরাণিক সত্তা
চোখ                     হতে                দ্রষ্টা।
সুধা                      হতে                সাঁই।
মধু                                হতে       কাঁই।

. পৌরাণিক দেবতা (Mythological deity)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা
শিশ্ন/ বলাই          হতে     মহাদেব, শিব, শুক্রচার্য ও ইব্রাহিম।

. পৌরাণিক দেবী (Mythological goddess)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা
শুক্র                      হতে     সীতা, লক্ষ্মী ও হাজেরা।
রজ                       হতে     সরস্বতী, শতরূপা, ইভ ও হাওয়া।

. পৌরাণিক কাহিনী (Myths)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা

মূলক সত্তার কর্মকাণ্ড হতে পৌরাণিক কাহিনী। যেমন; শুক্রপাকে বলা হয় মরা। সেখান থেকেই মরার আগেই মরো; এরূপ গুরু বাক্যের উদ্ভব। যেমন; বলা হয়; “মরার আগে মরো” বা ‘موت قبل أن تموت’ (মাওতু কাবলা আন তা‘মুতু) বা (Death before you die)।

. পৌরাণিক জীবজন্তু (Mythological creature)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা
জরায়ুমুখ                         হতে     গড়ুর, হুদহুদ, হুপি।

. পৌরাণিক বাণী (Mythological message)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা
মানবদেহের প্রাকৃতিক ইঙ্গিত  হতে     ঐশী ইঙ্গিত (বাণী, প্রত্যাদেশ), ওহি।

. সাম্প্রদায়িক বিধান (Communal provision)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা
মানবদেহের প্রাকৃতিক বিধান   হতে     ঐশীবিধান/ শাস্ত্রীয় বিধান।

. পৌরাণিক যুদ্ধ (Mythological war)
আভিধানিক সত্তা  হতে     পৌরাণিক সত্তা
মৈথুন                 হতে     লঙ্কা, কুরুক্ষেত্র, ওহুদ, বদর, তায়েফ, তাবুক ও কারবালা।
মৈথুন                 হতে     সাম্প্রদায়িক উপাসনা।

. পৌরাণিক সংখ্যা (Mythological number)
আভিধানিক সত্তা   হতে      পৌরাণিক সত্তা
ষাট                   হতে       ষাইট্যা
তিন শত ষাট         হতে                তিন শত ষাট মূর্তি

১০. পৌরাণিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান (Mythological important place)
আভিধানিক সত্তা              হতে       পৌরাণিক সত্তা
যোনি                 হতে       অন্ধকূপ, মক্কা
যোনি নালি         হতে       বৈতরণী
জরায়ু                 হতে       মথুরা, মদিনা
পুরুষদেহ            হতে       বৃন্দাবন
নারীদেহ             হতে       নিধুবন, নবদ্বীপ

১১. শাস্ত্রীয় মন্ত্র (Scriptural hymn)
আভিধানিক সত্তা   হতে      পৌরাণিক সত্তা
মনকে শান্তকরণ বাণী হতে    ঐশী মন্ত্রপাঠ বা দোয়াপাঠ

১২. সাম্প্রদায়িক উৎসব (Communal festival)
আভিধানিক সত্তা   হতে     পৌরাণিক সত্তা
দেহের পঞ্চরস সাধনা হতে      কোজাগর, শব ই বরাত ও শব ই কদর।
রজকালের বিরতি     হতে       উপোস ও সিয়াম,
পবিত্রকালের সাধন   হতে       কোজাগর, শব ই বরাত, শব ই কদর ও শব ই মি’রাজ।

সাম্প্রদায়িক মতবাদ (সাম্প্রদায়িক দর্শন) মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক বিধান এবং পুরাণে মানুষের ধর্মীয় চেতনার বিকাশ হয়েছে। সাম্প্রদায়িক আচরণবিধি এবং পুরাণ মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করছে। পুরাণের শক্তি নিয়ে বিখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক জোসেফ ক্যাম্পবেল দেখিয়েছেন মানুষের জীবনের একটা বিশাল অংশ পুরাণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পুরাণ ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। কোনো সমাজে পুরাণের চর্চা না থাকলে; নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠার সাথে তাদের নিজেদের পুরাণ গড়ে নেয়। ব্যস্ত নগরের বস্তিতে পুরাণের তেমন প্রভাব নেই। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে ঐসব অঞ্চলে গ্যাং ও কাল্ট ইত্যাদি তাদের নিজস্ব পুরাণ প্রস্তুত করে নেয়। যেমন; আমেরিকার লস এঞ্জেলেসের মতো বড়, ব্যস্ত এবং আধুনিক নগরে প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্যাং এবং কাল্ট আছে। এসব গ্যাং এর নিজস্ব কালচার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচরণবিধি আছে। যা তারা কঠোরভাবে মেনে চলে।  তাই; পুরাণ মৃত বা অতীতের কিছু নয়, মানুষের জীবনে পুরাণের বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুরাণ জীবন্ত হয়ে ওঠে। পুরাণের প্রাচীনত্বের কারণে দর্শন এবং বিজ্ঞান পুরাণের অনুসারী; এর উল্টোটা নয়।

বেদ, মহাভারত, রামায়ন ও বাইবেলের মতো শাস্ত্রীয় গ্রন্থের সাহিত্যিক মূল্য আছে। বস্তুতঃ মানুষের সাম্প্রদায়িক জীবন কাটে এক ধরনের পৌরাণিক সাহিত্য সমালোচনায়। এক পুরাণ আশ্রয়ী দল অন্য পুরাণ আশ্রয়ী দলকে সমালোচনা করে। সম্পদ ও জনপদ ধ্বংস করে এবং আগ্রাসন চালায়। সাম্প্রদায়িক গ্রন্থগুলোর ভুল ব্যাখ্যা, ভুল বিশ্লেষণ দ্বারা সৃষ্টি হয় দল-উপদলের। সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থা। এসব পৌরাণিক সাহিত্য বিশ্লেষণ করে একদল মানুষ অন্যের বিচার করে। তারা একে অপরকে বিভিন্ন মতবাদ ও পন্থার অনুসারী মনে করে। যার থেকে অনেক হানাহানি এবং বিবাদ-বিসংবাদের উৎপত্তি। সেভাবে বিচার করলে মানুষ প্রত্যেকে একেক জন কট্টর সাহিত্য সমালোচক। প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় সাহিত্যের একটা বিশাল অংশ পুরাণ নিয়ে। মানুষের গল্প বলা, শোনা এবং অন্যের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার একটা প্রবণতা আছে। তাই; সে গল্প বলতে এবং শুনতে ভালোবাসে। ভারতের কথক নাচ, আদতে গল্প বলার নাচ। তেমনি আদিম সব সমাজেই পৌরাণিক গল্প চালু আছে। যার দ্বারা তারা জগতের সাথে সম্পর্কিত হতো। কিন্তু আধুনিক সমাজের মানুষ সমাজে জনবিচ্ছিনভাবে বাস করে। যারফলে; মানুষের জীবনে পৌরাণিক প্রভাব হ্রাস পেয়েছে।

পুরাণের মতো সমাজে বিভিন্ন দর্শনের চর্চা হয়ে আসছে। এসব দর্শন অনুসরণ করে তাদের অনুসারীরা স্ব স্ব জীবনাচরণ নির্ধারণ করে। একটা দর্শনের সাথে তার উপযোগী পৌরাণিক কাহিনী ব্যবহার করে মতবাদের উৎপত্তি হয়। কোনো সমাজে নির্দিষ্ট দর্শনের কোনো প্রভাব দেখা না গেলে সেটা মৃত দর্শন, কিন্তু পুরাণের মরণ হয় না। পুরাণ সবসময় জীবিত, কখনও হারায় না।  একটা সমাজে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে পুরাণের প্রভাব দেখা না গেলেও যে কোনো সময়ে সেটা ফেরত  আসতে পারে।

ছ. একদিকে বলা হয়; প্রকৃতির বিধান লঙ্ঘন করা হলে প্রাকৃতিক শাস্তি তাৎক্ষণিক বা ধীরে ধীরে আরম্ভ হয়অন্যদিকে বলা হয়; মানুষের পাপের শাস্তি পরকালে সৃষ্টিকর্তাই দিবেন

   মানবদেহে বিদ্যমান একটি প্রাকৃতিক বিধানের অনুকূলে চলাকে ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ বলা হয়। যারজন্য; কেবল মানুষের পুর্বপুরুষকেই দায়ী করা হয়। আবার; ঐ পাপ থেকে মানুষকে বিরত থাকার জন্য বারবার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। যেমন; সাম্প্রদায়িক শাস্ত্রীয় গ্রন্থে ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ নামে কেবল মুর্তিপুজাকে প্রচার করা হচ্ছে। একদিকে; এই পাপের জন্য মানুষের পুর্বপুরুষদেরকেই দায়ী করা হয়। অন্যদিকে, মানুষকে বারবার মুর্তিপুজা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। আবার বলা হয়, সৃষ্টিকর্তার কাছে সকল পাপের ক্ষমা আছে কিন্তু মুর্তিপুজার কোনো ক্ষমা নেই।

মানবদেহে বিদ্যমান ঐ প্রাকৃতিক বিধানের প্রতিকুলে চলাকে মহাপুণ্য বলা হয়। যা কেবল মহামানবগণই অর্জন করেন। যেমন; সাম্প্রদায়িক শাস্ত্রীয় গ্রন্থে মহাপুণ্য নামে কেবল সৃষ্টিকর্তার দর্শনকে প্রচার করা হচ্ছে। একদিকে; এই মহাপুণ্য অর্জনের জন্য মহামানবগণকে বাহবা দেওয়া হয়। অন্যদিকে; মহামানবগণের প্রেমিকগণ এই মহাপুণ্য অর্জন করলে তিরস্কৃত হন।

জ. মানবদেহে বিদ্যমান সার্বজনীন কিছু প্রাকৃতিক রহস্যাবলী বা বিধানকে ঐশীবিধানে রূপান্তর করে; তা সামাজিক নীতি নৈতিকতা বা বিধানের অনুকুলে উপস্থাপন করা হয়। যেমন; স্বর্গ ও মৃত্যু সম্পর্কে কিছু ঐশীবাণীর উদাহরণ দেওয়া হলো

  • মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের স্বর্গ অবস্থিত। (আল হাদিস)
  • দরিদ্ররা স্বর্গে প্রবেশ করবে ধনীদের ৫০০ বছর আগে (আল হাদিস)
  • আবার আমি তোমাদের বলছি, একজন ধনী লোকের ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করার চেয়ে বরং; একটি উট, একটি সুচের ছিদ্র দিয়ে যাওয়া সহজ (ম্যাথিউ ১৯: ২৪)
  • শাস্ত্রীয় বর্ণনায় প্রদেয় সবকিছু পাবে মৃত্যুর পর, দেহত্যাগের পর কিছুই নেই। (বলন কাঁইজি)
  • মৃত্যু বারবার, দেহত্যাগ জীবনে একবার। (বলন কাঁইজি)
  • তারপর; তিনি আমাকে বললেন; “আমিই আল্ফা ও ওমেগা, আদি ও অন্ত আমিই, আমিই বিনা ব্যয়ে জীবন জলের নহর থেকে তৃষ্ণার্তকে দেব।“ যে জয়ী হবে সে এসব জলের উত্তরাধিকারী হবে, আর আমি তার ঈশ্বর হব। আর সে আমার পুত্র হবে। কিন্তু ভীরু, কপর্দকহীন, অবিশ্বাসী, ঘৃণ্য খুনী, অনৈতিক ব্যক্তি, জাদুকর, মূর্তিপূজারী ও মিথ্যাবাদীর জন্য তাদের স্থান হবে এক হ্রদে। যেখানে আগুন এবং গন্ধক দ্বারা তাদের পোড়ানো হবে, যা দ্বিতীয় মৃত্যু।” (প্রকাশিত বাক্য ২১: ৬-৮)
  • মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে শোকের কোনো ব্যাপার নয়। যেমন; হিন্দুদের মতে; তীর্থস্থান বেনারস বা কাশীতে মৃত্যুও একটা উৎসবের ব্যাপার। অন্যদিকে; মুসলমানদের তীর্থস্থান মক্কা ও মদিনায় হজের সময় মৃত্যুও তাদের নিকট অতীব পুণ্যের বিষয়। (সূত্র; প্রচলিত প্রবাদ)

ঝ. মানবদেহে বিদ্যমান সার্বজনীন কিছু প্রাকৃতিক রহস্যাবলী বা বিধানকে ঐশীবিধানে রূপান্তর করার পর; তা সার্বজনীন সামাজিক নীতি নৈতিকতা বা বিধানের প্রতিকুলেও উপস্থাপন করা হয়। যেমন; মৃত্যু ও ধর্মযুদ্ধ সম্পর্কে কিছু ঐশীবাণীর উদাহরণ দেওয়া হলো

  • পাপের মুজুরী মৃত্যু। (রোমীয় .২৩)
  • পুণ্যের প্রতিদান অমরত্ব আর পাপের প্রতিদান মৃত্যু। (বলন কাঁইজি )
  • ঈশ্বর বললেন; তোমাদের পিতামাতাকে সম্মান করো; এবং যে পিতামাতার সাথে মন্দ কথা বলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। (ম্যাথিউ ১৫.)
  • যে তার পিতামাতাকে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করা হবে। (যাত্রাপুস্তক ২১:১৫)
  • হে বিশ্বাসীগণ! কাঁইকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করো। এবং অবশ্যই অতিশয় ভদ্র না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (কুরান; ৩ নং সুরা ইমরান; আয়াত-১০২)
  • হে বসিধ; যবন ও কপটদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো ও তাদের প্রতি কঠোর হও। (কুরান; সুরাঃ তাওবা; আয়াত -৭৩)
  • আর যারা কাঁইয়ের পথে নিহত হয়, কখনো তুমি তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত; তাদের আহার দেওয়া হয়। (কুরান; ৩ সুরা ইমরান; আয়াত-১৬৯)
  • যদি কেউ কাঁইয়ের পথে যুদ্ধ করে মারা যায়; তবে; তার জন্য রয়েছে উদ্যান (কুরান; ৯ নং সুরা তওবা; আয়াত- ১১১)
  • যারা কাঁইয়ের পথে নিহত হয়, কাঁই কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। (কুরান; ৪৭ নং সুরা মুহাম্মদ; আয়াত-৪)
  • যে লোক ঈশ্বরের আরাধনা করে না এবং যার মনে ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ নেই, তাকে পা দিয়ে পাড়িয়ে হত্যা করতে হবে। (ঋগবেদ ১/৮৪/৮)
  • তাদের হত্যা কর যারা বেদ ও উপাসনার বিপরীত। (অথর্ববেদ ২০/৯৩/১)
  • ধর্মের বাইরে যারা; তাদের সবাইকে যুদ্ধের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করাতে হবে। (যজুর্বেদ ৭/৪৪)
  • সেনাপ্রধান হিংস্র ও নির্দয়ভাবে শত্রুদের পরিবারের সদস্যদের সাথে যুদ্ধ করবে। (যজুর্বেদ ৭/৩৯)
  • শত্রুদের পরিবারকে হত্যা করো, তাদের জমি ধ্বংস কর। (যজুর্বেদ ৭/৩৮)
  • যুদ্ধই তোমাদের উন্নতির উৎস, এজন্যই তোমাদেরকে আমি যুদ্ধে প্রেরণ করি। (যজুর্বেদ ৭/৩৮)
  • তার প্রতি শ্রদ্ধা, যার রয়েছে তলোয়ার ও তীর। তার প্রতি সন্মান; যার রয়েছে ধারালো অস্ত্র। তার প্রতি খাদ্য নিবেদন; যার রয়েছে ভাল অস্ত্র। (যজুর্বেদ ১৬/৩৬ )
  • আমরা যেন সামরিকঅস্ত্রের মাধ্যমে বিশ্ব অধিকার করতে পারি। আমরা যেন আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে শান্তিপ্রিয় শত্রুদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করতে পারি। এভাবে আমরা যেন অস্ত্র দিয়ে সারা বিশ্বের সকল অঞ্চলকে বশ্যতা স্বীকার করাতে পারি। (যজুর্বেদ ২৯/৩৯)
  • হে সেনাপ্রধান! আমাদের আশা পুর্ণ করো। হে ধনসম্পদের বাদশা, তোমার সহায়তায়আমরা যেন সম্পদশালী হতে পারি এবং যুদ্ধে জয় লাভ করে প্রচুর ধন সম্পদের অধিকারী হতে পারি। (যজুর্বেদ ১৮/৭৪)

২. এই সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসটির বাহন হলো দেবতা, ঐশিদূত ও মহামানব
(2. The the deity, angels and superman is the vehicle of this communalism virus)
বাংভারতীয় পুরাণ মতে; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা প্রতি মন্বন্তরে অবতার রূপে অবতরণ করেন। কিন্তু আরবীয় পুরাণ মতে; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা নিজে অবতরণ করেন না; তবে; ঐশিদূতের মাধ্যমে প্রেরিতগণের কাছে তাঁর বাণী প্রেরণ করেন। তাই; দেবতা, অবতার, ঐশিদূত ও মহামানবগণকে এই ভাইরাসের বাহন বলা হয়।

সৃষ্টিকর্তা এবং দেবতা, ঐশিদূত ও মহামানব এই পরিভাষাগুলোকে; একে অপরের পরিপূরক রূপে ব্যবহার করা হয়। যখন যেমন তখন তেমন নীতিতে। মনে হয় যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এর কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো।

ক.   একদিকে বলা হয়; তোমরা সৃষ্টিকর্তার চরিত্রে চরিত্রবান হও। অন্যদিকে; বলা হয়; নিশ্চয় মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রেরিত ঐশিদূতগণই সর্বোত্তম চরিত্রে চরিত্রবান। অতএব; তোমরা তাদের আদর্শ অনুসরণ করো।
খ.   একদিকে বলা হয়; তোমরা সৃষ্টিকর্তাকে মান্য করো। অন্যদিকে; বলা হয়; তোমরা সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রেরিত ঐশিদূতগণকেই মান্য করো। এবং তোমাদের মধ্যে আদেশদাতাগণকে মান্য করো।
গ.   একদিকে বলা হয়; সৃষ্টিকর্তার বিধানে কোনো পরিবর্তন নেই। অন্যদিকে; মানুষকে ঐশিদূত কর্তৃক প্রদত্ত যুগোপযোগী বা বিভিন্ন ছলনায় সদা পরিবর্তনশীল বিধান মানতে বাধ্য করা হয়।
ঘ.   একদিকে বারবার পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তা দ্বারা কোনো কাজের নির্দেশ করানো হয়। অন্যদিকে; বারবারই সেই কাজ ঐশিদূতের দ্বারা বিনাবাক্যে পালন করানো হয়।
ঙ.   যেমন একদিকে; পৌরাণিক সৃষ্টিকর্তাকে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে; তেমনই; কোনো প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়াই অসুর বা শয়তানকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে; ঐশিদূতের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে মানুষকে মাইনকা চিপায় রাখা হয়েছে।

মাইনকা চিপা বি গ্যাঁড়াকল, কঠিন সমস্যা, যে বিপদ হতে অব্যাহতি পাওয়া কঠিন (ব্য্য) ফার্সি মাহ (ﻤﺎﻩ) পরিভাষার অর্থ মাস (চন্দ্রের উদয় অস্তের একটি পর্যায়, বছরের বারো ভাগের এক ভাগ) (Month)। আর ফার্সি মাহিনা (ﻤﺎﻫﻴﺎﻧﻪ) পরিভাষার অর্থ মাসিক (সারা মাসের সাথে সম্পর্কিত যে কোনো বিষয়) (Monthly)। আর বাংলা চিপা অর্থ সঙ্কীর্ণ। অল্প বেতনের চাকুরিজীবিরা প্রতি মাসের ২০ তারিখ হতে মাহিনা (বেতন) পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আর্থিক চিপায় থাকে। অর্থাৎ; মাহিনা অর্থ মাস, চিপা অর্থ অল্প বেতনের চাকুরিজীবিদের প্রতি মাসের ২০ তারিখ হতে মাহিনা (বেতন) পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আর্থিক চিপা। এখান থেকেই মাহিনা চিপা হয়েছে। তারপর; সেখান থেকে মাহিনাকা চিপা হয়েছে। তারপর; সেখান থেকে মাইনকা চিপা প্রবচনটির উদ্ভব হয়েছে। অর্থাৎ; (ফা. মাহিনা + বাং. চিপা) > মাহিনা চিপা > মাহিনাকা চিপা > মাইনকা চিপা হয়েছে। মাহ [ﻤﺎﻩ] (বাপৌরূ)বি চাঁদ; (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) মাস, চন্দ্রের উদয় অস্তের একটি পর্যায়, বছরের বারো ভাগের এক ভাগ {ফা} মাহিনা [ﻤﺎﻫﻴﺎﻧﻪ] (বাপৌরূ)বি বেতন, নিষ্ক্রয়, ভাড়া, মূল্য, পারিশ্রমিক, বিনিময়, মাণ, মাসিক বেতন, মাসিক ভাড়া (প্র) সারা মাসের সাথে সম্পর্কিত যে কোনো বিষয় {ফা} চিপা ক্রি চেপা, নিংড়ানো, নিষ্পেষিত করা, চাপ দেওয়া, দলিত করা, মথিত করা (কাপড় চিপা) বিণ আঁট, আঁটিল, সঙ্কীর্ণ, সরু {সং.} {ফা. মাহিনা + বাং. চিপা}

চ.    একদিকে ঐশিদূত বা মহামানব দ্বারা একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলানো হয়। অন্যদিকে; ঐশিদূত বা মহামানব  মাধ্যমে একই কাজ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে করানো হয়।
ছ.   মানুষকে দিয়ে যা যা করানো হয়, তার জন্য; একদিকে যেমন; ঐশিদূত বা মহামানব দ্বারা বারবার আদেশ করানো হয়। আরও বলা হয়, ঐশিদূতদের সকল পরামর্শ এবং অনুশীলনগুলো তিনি নিজে পরখ করে দেখেছেন। অন্যদিকে; ঐশিদূত বা মহামানবদের অগণিত শিষ্যদের মাধ্যমে তা বারবার বিনাবাক্যে পালন করানো হয়।

সাম্প্রদায়িক গ্রন্থে ঐশিদূত বা মহামানবদের ভক্ত বা শিষ্য হওয়ার কঠিন থেকে কঠিনতম শর্তসমূহ;

  • রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে। অর্থাৎ রথে আরোহণরত জগন্নাথদেবকে দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। জন্মমৃত্যু চক্রের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবদ্ধামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া যায় (পদ্ম পুরাণ)
  • রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে। অর্থাৎ; রথের ওপর খর্বাকৃতি বামন শ্রী শ্রী জগন্নাথকে দর্শন করলে তার পুনর্জন্ম হয় না (পদ্ম পুরাণ)
  • নিশ্চয় তোমার (মুহাম্মদ) প্রিয়জন (কোনো ক্রমেই দুশমন নয়) নিঃসন্তান (অটল,অখণ্ড ও আটখুড়া) (কুরান; সুরাঃ কাওসার; আয়াত -৩)
  • যারা তার পিতামাতাকে আমার (যিশু) চেয়ে বেশি ভালোবাসে তারা আমার আপনজন হবার যোগ্য নয়; এবং যারা তার ছেলেমেয়েকে আমার (যিশু) চেয়ে অধিক ভালোবাসে, তারা আমার আপনজন হবার যোগ্য নয়। যে কেউ স্ত্রী (Cross) গ্রহণ না করে আমার (যিশু) অনুসরণ করে তারা আমার আপনজন হবার যোগ্য নয়। (ম্যাথিউ ১০.৩৪৩৮)
  • এখন অনেক লোক তাঁর সঙ্গে গেল, তিনি ফিরে তাকালেন এবং তাদের বললেন; যদি কেউ আমার (যিশু) কাছে আসে এবং তার নিজের পিতা, মাতা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, এমনকি; তার নিজের জীবনকেও ঘৃণা না করে, সে আমার শিষ্য হতে পারে না। যে কেউ স্ত্রী (Cross) গ্রহণ না করে আমার অনুসরণ করে সে আমার শিষ্য হতে পারে না (লূক ১৪.২৬-২৭)

৩. এই সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসটি মানুষকে প্রথমে মানসিকভাবে সংক্রমণ করে
(3. This communalism virus at first infected humans psychologically)

এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে নরকের ভয়ে ভীত হয়; অন্যদিকে; স্বর্গের সুখ-সাচ্ছন্দের লোভী হয়। এ হতেই তারা পাপ মোচনের জন্য সহজ উপায় খুঁজে বেড়ায়। এ সুযোগে সাম্প্রদায়িক পুরোহিতগণ অত্যন্ত সুকৌশলে মানুষের মনের মধ্যে প্রবেশ করে। তাদের অস্ত্রটি হলো; শাঁখের করাত এর মতো; একদিকে বিভিন্ন কর্মে পুণ্য অর্জনের প্রলোভন; অন্যদিকে; বিভিন্ন কর্মে নরকের শাস্তির ভয়। যেমন; প্রথমে মানুষের প্রতিটি কর্মের তিল পরিমাণ ভুলও খুঁজে বের করে। তারপর; তারা তাকে নরকের কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তির বিবরণ শুনিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত করে। অতঃপর; মানুষকে মানসিকভাবে আতঙ্কিত করে তোলে। প্রথমে বিভিন্ন কর্মে পুণ্য অর্জনের প্রলোভন দেখায়; পরিশেষে সব পাপ মোচনের শেষ অবলম্বন রূপে বিভিন্ন পন্থা উপস্থাপন করে। আর এসব পন্থার আড়ালে মানুষকে অকাতরে অর্থদানের দিকে উৎসাহিত করে। যদি মানুষ একবার তাদের খপ্পরে পতিত হয়; তাহলে সেই নীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

আবার; এই ভাইরাসে আক্রান্ত অনুসারীগণ “প্রতিদিনের পাপ প্রতিদিন মোচন” এই মনোভাব নিয়ে প্রতিদিনের উপাসনা পালন করে থাকে। এরা পাপ মোচনের বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ নেয় না। পাপের কুফল সমাজে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে দায়মুক্তির দৃঢ় আশ্বাস সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে পেয়ে থাকে। আবার; এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সহজে পুণ্যার্জনে ব্যতিব্যস্ত থাকে। যেমন; সৃষ্টিকর্তার অবাধ্য হওয়া যাবে না। শাস্ত্রীয় বিধান অমান্য করা যাবে না। সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি বা প্রিয়জনদের অবাধ্য হওয়া যাবে না। সাম্প্রদায়িক দেবতাকে গালি দেওয়া যাবে না। এই ভাইরাসে আক্রান্ত অনুসারীগণ মানসিকভাবে সব সময় প্রতিটি কাজে বা চিন্তায় ঐশিদূতের আদর্শ কি তা অনুসন্ধান ও প্রচার করেন অধিক কিন্তু অনুসরণ করেন কম। আবার; এই ভাইরাসে আক্রান্ত অনুসারীগণ মানসিকভাবে সব সময় প্রতিটি কাজে বা চিন্তায় সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারনার ছাপ রাখার চেষ্টায় রত থাকেন। আবার; এই ভাইরাসে আক্রান্ত অনুসারীগণ মানসিকভাবে সব সময় প্রতিটি কাজের সূচনায় ও শেষে সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ আস্থা ও সাহায্য কামনা করেন। এই ভাইরাসে আক্রান্ত অনুসারীগণ মানসিকভাবে সব সময় “যাই করি না কেন সমস্ত পাপমোচন শেষে; শেষ পর্যন্ত স্বর্গই আমাদের ঠিকানা।” এই ধারনা পোষণ করে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে; মুখে মুখে জ্ঞানচর্চা করা ও জ্ঞানীকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারের ইঙ্গিতত স্ব স্ব শাস্ত্রীয় গ্রন্থে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় এবং যদি কোনকিছুর ইঙ্গিত পায় তা প্রচার করায় ব্যস্ত থাকে। অন্যদিকে; কোনো বিষয়ে মতবিরোধ নিষ্পত্তিতে জ্ঞানীর সিদ্ধান্তকে এই বলে উপেক্ষা করে যে;

“শয়তানের জ্ঞান বেশি।”
“একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই সবকিছু জানেন ও বুঝেন।”
“আমরা শাস্ত্রীয় বিধানের বাহিরে কোনো কিছুই মানি না।”
“এসব কথা কুরান হাদিসে নেই। এমন কথা এর আগে কখনো শুনি নি।”

 ৪. এটি নিজস্ব মতবাদ রক্ষা অন্য মতবাদ প্রতিরোধ করে
(4. It protects its own doctrine and prevents another doctrine)
মানুষ মাত্রই নিজ নিজ মতবাদকে শ্রদ্ধা করে এবং অন্য মতবাদকে ঘৃণা করে। যেমন; একদিকে সাধারণ হিন্দুরা মুসলমানদেরকে ঘৃণা করে; অন্যদিকে; সাধারণ মুসলমানরা হিন্দুদেরকে ঘৃণা করে। আবার; একই মতবাদের মধ্যে এক উপদল অন্য উপদলকে ঘৃণা করে। যেমন; হিন্দু ব্রাহ্মণরা চণ্ডালদের ঘৃণা করে। তেমন; মুসলমান সুন্নীরা শিয়াদের ঘৃণা করে। আবার; শরিয়তপন্থীরা গুরুবাদীদের ঘৃণা করে।

  1. এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা; একদিকে, সাম্প্রদায়িক মতবাদের বিবিধ ‘পরিভাষার’ ওপর ‘শর্তহীন বিশ্বাস’ স্থাপন করেন; অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক মতবাদের বিবিধ ‘নেতৃত্বের’ ওপর ‘শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন করেন।
  2. এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা; একদিকে, সাম্প্রদায়িক মতবাদ ও সাম্প্রদায়িক পবিত্র গ্রন্থকোনটিই সঠিকভাবে বুঝতে বা বুঝাতে পারে না।; অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক মতবাদ ও সাম্প্রদায়িক পবিত্র গ্রন্থ কেউ বুঝতে বা বুঝাতে চাইলে তাকে নানা অপযুক্তি ও প্রাণনাশের ভীতি প্রদর্শন করা করে।
  3. এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা; একদিকে, মানুষকে সৎপথে আহবান বা অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সঙ্কট উত্তরণে বা নিজ মতবাদ প্রচারে অনন্য দৃষ্টান্ত রূপে সৃষ্টাকর্তা বা মহামানবদের মু’জিযার ব্যপক প্রচার করে। অন্যদিকে, বর্তমানে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সঙ্কট উত্তরণে সৃষ্টাকর্তা বা সাম্প্রদায়িক পুরোহিত কর্তৃক মু’জিযা প্রদর্শন কামনাকে অন্যায় আবদার রূপে প্রচার করে।
  4. এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবেই বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মতবাদকে নিজের যুক্তির অনুকূলে না হলে গ্রহণ করে না। এমনকি; সঠিক ও সত্য যুক্তিও অনুকূলে না হলে গ্রহণ করে না। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজ মতবাদ বিষয়ে কোনরূপ সমালোচনা সহ্য করতে পারে না; বরং তা ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ মনে করে। অপরের ভুল খোঁজা বা অন্য মতবাদের সমালোচনা করাই এদের মুখ্য কাজ। সব সময় তাদের নীতি হলো;

“তুমি আমার পক্ষে আছো না বিপক্ষে আছো।”
“আমি বা আমরা ঠিক, তুমি বা তোমরা ভুল।” অর্থাৎ; “আমিই শ্রেষ্ট।”

নিজ নিজ মতবাদে বড় ধরনের কোনো বিরোধ বা কুকর্ম প্রকাশ্যে দেখা দিলে; তার সমাধান না খুঁজে; অথবা কোনমতেই দোষ স্বীকার না করে; অথবা প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা না করে; বরং অন্যের ওপর সরাসরি দোষ চাপাতে চেষ্টা করে। আর বলে; এটা অমুক উপদল বা অমুক মতবাদের গভীর ষড়যন্ত্রের ফল। পরিশেষে; এই সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিরকালই নতুন নতুন ষড়যন্ত্রমূলক স্বপ্ন দেখার অপেক্ষায় থাকে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ভক্তদের নিয়ে মুশকিল, যখনই বিজ্ঞানের কোনো নব আবিস্কার তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বিশ্বাসের বিপরীতে যায়; তখন; তারা খোদ বিজ্ঞানকেই আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে চায়। নিজেদের ধারণায় উদ্বুদ্ধ হতে অন্যদেরকেও বাধ্য করতে চায়। নিজেরা যা ঘৃণা করে, অন্যদেরও তা ঘৃণা করতে বাধ্য করতে চায়। তারা পৃথিবীর সব স্থান অধিকার করতে চায়। সব সরকারকে তাদের প্রচারক নিয়োগ দিতে চায়, সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের সমর্থক করতে চায়, সব মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সেই রূপকথায়, যে রূপকথায় তারা নিজেরা বিশ্বাস করে।

৫. এই সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসটি মানুষের বিশেষ কিছু শারীরিক মানসিক কার্যকরী প্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে (5. This communalism virus controls some of the special physical and emotionally functional organ of human)

এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যার যার শাস্ত্রীয় উপোসের ক্ষেত্রে পাকস্থলিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে; অর্ধ দিন, একদিন কিংবা দেড় দিন পর্যন্ত খেতে না দিয়েও রাখতে পারে। যেমন; হিন্দুরা যে দেবতার উদ্দেশ্যে উপোস করে; সে দেবতার পূজা আরম্ভ হওয়ার লগ্ন হতে পূজা শেষ হওয়া অবধি উপোস পালন করে।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যার যার অন্ন-পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে জিহ্বার ওপর এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে; হিন্দুরা জিহ্বাকে গোরুর মাংস দেয় না। অন্যদিকে; মুসলমানরা জিহ্বাকে শূকরের মাংস দেয় না। অনুরূপভাবে; নিরামিষভোজীরা আমিষ খায় না। মুসলমানরা কেবলার দিকে পা দেয় না। এমনকি; মুসলমানরা কেবলার দিকে মুখ বা পিছন ফিরে প্রস্রাব ও পায়খানা করে না। গুরুবাদীরা যার যার গুরুর বাড়ির দিকে পা দেয় না। শরিয়তপন্থীরা কেবল নামাজ ব্যতীত অন্য ক্ষেত্রে মাথা নোয়াতে চায় না। যেমন; শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির পদধূলি গ্রহণের সময়ে মাথা নোয়াতে চায় না।

৬. এই ভাইরাসটি বিশেষ কিছু কৌশলের মাধ্যমে বিস্তারলাভ করে
(6. This virus spreads through some certain strategies)
এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িক বসন ও চিহ্ন ধারণ করে। যেমন; সাম্প্রদায়িক বসন, তিলক, পৈতা, ত্রিশূল, উপবিত, জপমালা, ওড়না, উষ্ণীষ, কোপনি, করঙ্গ ও বালা ব্যবহার করে। যেমন; হিন্দু রমণীরা কপালে সিঁদুর ও হাতে শাখা ব্যবহার করে। এসব বসন ও চিহ্ন দ্বারা মানুষকে যার যার মতবাদে আকৃষ্ট করে।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাম্প্রদায়িক উপাসনাগুলো এককভাবে পালনের চেয়ে দলবদ্ধভাবে পালনে অধিক জোর দেয়। আবার; যত অধিক লোক সমাগম তত অধিক পুণ্য অর্জন, এই নীতিতে জোর দেয়। যেমন; মুসলমানদের দৈনিক ও সাপ্তাহিক উপাসানাগুলো মসজিদে গিয়ে পালনে অধিক জোর দেওয়া হয়। এছাড়াও; হজ্বে গমন, ধর্মীয় সমাবেশ ইত্যাদি। অন্যদিকে; হিন্দু সমাজে কাশী, বৃন্দাবন ও গয়াতে গমন, রথযাত্রা, বিবিধ নদীতে পুণ্য স্নান, বিভিন্ন পুজামণ্ডপ ইত্যাদিতে যত অধিক লোক সমাগম তত অধিক পুণ্য অর্জন মনে করা হয়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজ মতবাদে নব দীক্ষিত কিন্তু জগত বিখ্যাত বা কুখ্যাত কোনো ব্যক্তির আগমনকে প্রচুর ফলাও করে প্রচার করে। আবার; তথাকথিত প্রবাদ ও নীতিবাক্যও (So-called proverbs) ব্যবহার করে। উদাহরণত; শয়তানের জ্ঞান বেশি। ঈশ্বর সবকিছু দেখেন ও বুঝেন।

৭. এই সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাসটি বাহককে স্বয়ংক্রিয় কার্যকরী পদ্ধতির মধ্যে আবদ্ধ করে যেমন; কম্পিউটার সফ্টওয়ার। (7. This communalism virus prevents its carrier into automatic functioning. Such as; computer software)

এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণভাবে একই কথা বারবার বলে। আবার; একই উপাসনা সারাজীবন করে। দেখে মনে হয় যেন এরা কম্পিউটারের প্রগ্রামে আবদ্ধ।

এই ভাইরাসে সাধারণ মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূচিবাই রোগীতে পরিণত করে। যেমন; যে যেই শাস্ত্রীয় কাজে অভ্যস্ত হয়; সে সহজে সেই কাজ ত্যাগ করতে পারে না। টুপি পরিহিতরা সহজে টুপি ত্যাগ করতে পারে না। নামাজিরা সহজে নামাজ ত্যাগ করতে পারে না। অনুরূপভাবে তিলক-ত্রিশূলধারীরা সহজে তিলক-ত্রিশূল ত্যাগ করতে পারে না। আবার; নিরামিষভোজীরা আমিষ খায় না। হিন্দুরা সহজে গোরুর মাংশ খায় না। আবার মুসলমানরাও শূকরের মাংস খায় না। সাম্প্রদায়িক প্রথা বা আভ্যাস এমনই একটা শক্তিশালী স্বয়ংক্রিয় কার্যকরী পদ্ধতি যে; যখনই কোনো শাস্ত্রীয় প্রথা বা আভ্যাস বিশ্বের কোথাও উদ্ভব হয়; তখন সেটা চলতেই থাকে। একদল কোনো কারণে বন্ধ করলেও আরেক দল তা করতেই থাকে। এককথা সেটা আর বন্ধ হয় না কোনদিন। (তথ্যসূত্র; লেখক; মোঃ খলিলুজ্জামান শাকিল)

বহিঃসংযোগ (External links)

  1. Religion Is a Virus – Mother Jones
  2. The Religion Virus: Why We Believe in God – TheHumanist.com
  3. The Virus of Faith
  4. The Virus of Faith; Richard Dawkins

সাম্প্রদায়িকতা ভাইরাস নিরাময় (Communalism virus cure)
বিজ্ঞান এবং ধর্মের অবস্থান সম্পূর্ণ দুটি আলাদা বলয়ে; যে বলয় দুটি একে অপরের সাথে থাকে অসম্পৃক্ত। এক বলয়ে থাকে বিজ্ঞান; যার কাজ হচ্ছে ভৌত বাস্তবতার আলোকে প্রাকৃতিক রহস্যাবলীর ব্যাখ্যা দেওয়া। আর অন্য বলয়ে অবস্থিত সাম্প্রদায়িক মতবাদ (কথিত ধর্ম)। এর কাজ হচ্ছে নীতি নৈতিকতার চর্চা করা এবং তার আলোকে সমাজ নির্মাণ করা। ধার্মিক নামধারীরা প্রায়সই রাজনৈতিক বলির পাঁঠায় পরিণত হয়। অথবা রাজনীতিবিদদের ক্রীড়ানক রূপে বেঁচে থাকে। সত্যের প্রকৃতি কখনোই দুই বলয়ে বিভক্ত নয়। সামগ্রিকভাবে সত্যের সন্ধান করা যেতে পারে শুধুমাত্র একটি পদ্ধতিতেই। সেটা হলো বৈজ্ঞানিক অণুসন্ধিৎসা। বৈজ্ঞানিক অণুসন্ধিৎসাকে ধর্মীয় বিশ্বাস এর বলয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অর্থই হলো জোর করে সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস, অপবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বাজার টিকিয়ে রাখা। (তথ্যসূত্র; আত্মতত্ত্ব ভেদ; লেখক বলন কাঁইজি)

শ্বরবিজ্ঞানের সংজ্ঞা (Definition of Theology)
১.   শ্বর (ঈশ্বর) সম্পর্কিত বিজ্ঞানকে শ্বরবিজ্ঞান বলে।
২.   পৌরাণিক নিয়ম ও নীতিমালা প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞানকে শ্বরবিজ্ঞান বলে।
৩.   যে বিজ্ঞান দ্বারা মানুষে বিদ্যমান শ্বরের (অমৃতসুধা, অমৃতমধু ও শুক্র এই ৩টি পৌরাণিক মূলক সত্তার) রূপক নামে ঈশ্বরায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক ঈশ্বর এবং মানুষে বিদ্যমান অন্যান্য বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির রূপক নামে দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক দেবদেবী ও মানবায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক মানবকে উপমিত পদ ধরে প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তুর সাথে সার্থক তুলনা করে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সূক্ষ্ম কার্যকলাপমূলক চমৎকার বা কাহিনী সৃষ্টি করা হয় তাকে শ্বরবিজ্ঞান বলে। যেমন; ভারতীয় বেদ, রামায়ণ ও মহাভারত; বাইবেল, তোরাহ, জাবুর, ইঞ্জিল ও কুরান ইত্যাদি (তথ্যসূত্র; আত্মতত্ত্ব ভেদ; লেখক বলন কাঁইজি)
৪.   মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির রূপক নামে ঈশ্বরায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক ঈশ্বর, দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক দেবতা দেবী, মানবায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক মানব; আর মানুষের প্রত্যঙ্গের রূপক নামে জীবনদান করে নির্মিত পৌরাণিক জীবজন্তু; মানুষের প্রত্যঙ্গের রূপক নামকে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে এবং মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যাকে শতাব্দী, অব্দ, সময়, দিবস, ওজন, দৈর্ঘ্য, জনসংখ্যা ও সৈন্য সংখ্যা ধরে মানুষের মৈথুন ও নৈতিকতা শিক্ষার নিমিত্তে সুকৌশলে রূপকভাবে নির্মিত ছোট-বড় চমৎকার, ছোটকি, উপকথা, রূপকথা ও রূপক কাহিনী সংকলনকে শ্বরবিজ্ঞান বলে। যেমন; ভারতীয় বেদ, রামায়ণ ও মহাভারত; বাইবেল, তোরাহ, জাবুর, ইঞ্জিল ও কুরান ইত্যাদি (তথ্যসূত্র; আত্মতত্ত্ব ভেদ; লেখক বলন কাঁইজি)

পুরাণের সংজ্ঞা (Definition of mythology)
১.   মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদিকে উপমিত পদ ধরে প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তুর সাথে সার্থক তুলনা করে নির্মিত কাহিনী সংকলনকে পুরাণ বলে।
২.   মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির রূপক নামে ঈশ্বরায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক ঈশ্বর, দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক দেবতা দেবী, মানবায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক মানব; আর মানুষের প্রত্যঙ্গের রূপক নামে জীবনদান (vitalization) করে নির্মিত পৌরাণিক জীবজন্তু; মানুষের প্রত্যঙ্গের রূপক নামকে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে এবং মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির পরিমাণ জ্ঞাপক সংখ্যাকে শতাব্দী, অব্দ, সময়, দিবস, ওজন, দৈর্ঘ্য, জনসংখ্যা ও সৈন্য সংখ্যা ধরে মানুষের মৈথুন ও নৈতিকতা শিক্ষার নিমিত্তে সুকৌশলে রূপকভাবে নির্মিত ছোট-বড় চমৎকার, ছোটকি, উপকথা, রূপকথা ও রূপক কাহিনী সংকলনকে পুরাণ বলে। যেমন; বাঙালী পুরাণ, গ্রিক পুরাণ, কারবালা ইত্যাদি (তথ্যসূত্র; আত্মতত্ত্ব ভেদ; লেখক বলন কাঁইজি)

পৌরাণিক চরিত্র (Mythological character)
মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু বা ইন্দ্রিয়াদির আভিধানিক নাম আড়াল করে রূপক নামকরণ করে সেই রূপক নামে ঈশ্বরায়ন, দেবতায়ন ও মানবায়ন করে নির্মিত চরিত্রকে পৌরাণিক চরিত্র বলে। যেমন; শুক্র হতে দুর্গা এবং শিশ্ন হতে মহাদেব।

পৌরাণিক দেবতার সংজ্ঞা (Definition of mythological deity)
মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদির রূপক নামে দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক চরিত্রকে দেবতা বলে। যেমন; চোখ হতে দ্রষ্টা, বলাই হতে শুক্রচার্য, রজ হতে বসিধ, সুধা হতে সাঁই ও মধু হতে কাঁই ইত্যাদি।

অথবা; শ্বরবিজ্ঞানের পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত মূলক সত্তার রূপক নামে দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক চরিত্রকে দেবতা বলে। যেমন; বলন ও বসিধ প্রভৃতি। এখানে মানুষের বাকশক্তির রূপক নামে দেবতায়ন করে কণ্ঠ দেবতা বা পৌরাণিক বলন দেবতা নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ; কণ্ঠে বসে যিনি কথা বলেন তিনিই বলন দেবতা। একে গ্রিক পুরাণে Gabriel ও আরবীয় পুরাণে জিব্রাইল (جبريل) বলা হয়। আর জিব্রাইল এসেছে গ্রিক Gabriel হতে। গ্রিক Gab > Gabble > Gabriel.

নরত্বারোপ (Anthropomorphism/ Personification)
‘التجسيم’ (আত্তাজসিমু)/ ‘الادميه’ (আলয়াদমিহু)
প্রথমে মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদির রূপক নামে ঈশ্বরায়ন, দেবতায়ন ও মানবায়ন করা হয়। তারপর; এগুলোকে উপমিত ধরে প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তু ও জীবজন্তুকে গ্রহণ করা হয়। অতঃপর; প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তু ও জীবজন্তুকে মানুষের মতো কথা বলার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ; প্রকৃতির যে কোনো উপমান বিষয়বস্তুর ওপর সাময়িক ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়। এভাবেই পৌরাণিক ঈশ্বর, দেবতা ও মানব সৃষ্টি করা হয়। একেই বলা হয় নরত্বারোপ। এছাড়াও; একে ঈশ্বরত্বারোপ, দেবত্বারোপ, ঈশ্বরায়ন, দেবতায়ন ও মানবায়ন ইত্যাদি বলা হয়। সারাবিশ্বের সব পৌরাণিক চরিত্র এভাবেই নির্মিত।

সাধারণ সাহিত্যে প্রকৃতির যে কোনো বিষয়বস্তুর ওপর নরত্বারোপ করে গল্পকাহিনী নির্মাণ করা হয়। যেমন; একটি আংটির আত্মকাহিনী, একটি বটগাছের আত্মকাহিনী ও একটি নদীর আত্মকাহিনী প্রায় সবারই জানা। বস্তুত; আংটি, বটগাছ ও নদী কোনটিই কথা বলতে পারে না। তবুও; স্বয়ং লেখক এসবের মুখ দিয়ে কথা বলায়। অর্থাৎ; স্বয়ং সাহিত্য নির্মাতা প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তুর মুখ দ্বারা কথা বলায়।

অন্যদিকে; সারাবিশ্বের সব ভাষায় সর্ব প্রকার শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ ও সাম্প্রদায়িক পুস্তক-পুস্তিকায় ব্যক্তির যে কোনো বিষয়বস্তুর ওপর নরত্বারোপ করে; প্রতীতি, দেবতা, ফেরেস্তা (فرشته), মালাকি (ملاك) ও এঞ্জেল (Angel) নির্মাণ করা হয়। যেমন; স্বাভাবিক স্থূল দৃষ্টিতে যুবকের কামোত্তেজনা সৃষ্টি করে শিশ্ন। তাই; শিশ্নকে বলা হয় মদন। যে মাদন সৃষ্টি করে সেই মদন। এখানে মদন অর্থ; অচেতন, অচৈতন্য, অজ্ঞ, অবিজ্ঞ, অবিচক্ষণ, অবোধ, অর্বাচীন, ক্ষীণবুদ্ধি, ক্ষীণমতি, খট্বারুঢ়, গবা, জ্ঞানরহিত, জ্ঞানহীন, তুচ্ছ, নির্বুদ্ধি, নির্বোধ, বিচারবুদ্ধিহীন, বিমুঢ়, বেকুব, বোকা, মতিচ্ছন্ন, মূর্খ, মূর্খতাপূর্ণ ও হাস্যকর, foolish, stupid, imprudent ইত্যাদি।

কিন্তু যখন; মদনের ওপর নরত্বারোপ করে কামের দেবতা করা হবে; তখন; তিনি মানুষের মতো আচরণ করবেন। মদনের ওপর নরত্বারোপের পর মদন অর্থ; অতনু, অনঙ্গ, কামদেব, শিব, মহাদেব, Cupid (প্র) রোমানদের প্রণয়দেবতা। এ হতে বুঝা যায়; কোনো বিষয়বস্তুর ওপর নরত্বারোপ করার পর; সাধারণ সাহিত্যে উক্ত বিষয়বস্তুর অর্থ পরিবর্তন হয় না। যেমন; আংটি, বটগাছ ও নদী। কিন্তু সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শ্বরবিজ্ঞানে, পুরাণে এবং সাম্প্রাদায়িক ও পারম্পরিক গল্পকাহিনীতে; কোনো বিষয়বস্তুর ওপর নরত্বারোপ করার পর; উক্ত বিষয়বস্তুর অর্থ সম্পূর্ণই পরিবর্তন হয়ে যায়। এমনকি; উক্ত বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ নতুন অর্থ ধারণ করে।

যেমন; উক্ত আংটির ভাবার্থ হয় ‘ভগ। কেননা; আংটি একটি গোলাকার বলয়; ভগও গোলাকার বলয়ের মতো (অনুমান)। তাই; আংটিকে উপমান ধরা হয় কিন্তু উপমিত থাকে ভগ। বটগাছের ভাবার্থ হয় ‘শিশ্ন ও ‘মানুষ। যেমন; বটগাছে বটফল ধরে; তেমনই; শিশ্ন গাছে শুক্রফল ধরে। অনুরূপভাবে; মানুষ গাছে মানুষফল (সন্তান) ধরে। তাই; বটগাছকে উপমান ধরা হয় কিন্তু উপমিত থাকে শিশ্ন ও মানুষ। নদীর ভাবার্থ হয় ‘বৈতরণী (যোনিপথ)। যেমন; নদীতে সব সময় জোয়ার-ভাটা চলতে থাকে (মরা নদী প্রয়োজ্য নয়)। তেমনই; যোনিপথে রজ, সুধা, মধু ও শুক্র চলাচল করতে থাকে। তাই; নদীকে উপমান ধরা হয় কিন্তু উপমিত থাকে যোনিপথ।

এবার বলা যায় যে; সাধারণ সাহিত্যে কোনো বিষয়বস্তুর ওপর নরত্বারোপ করার পূর্বে যে অভিধা থাকে; নরত্বারোপ করার পরও সে অভিধায়ই বিদ্যমান থাকে। যেমন; একটি আংটির আত্মকাহিনী, একটি বটগাছের আত্মকাহিনী ও একটি নদীর আত্মকাহিনী ইত্যাদি। অন্যদিকে; শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ এবং সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পুস্তক-পুস্তিকায় কোনো বিষয়বস্তুর ওপর নরত্বারোপ করার পূর্বে যে অভিধা থাকে; নরত্বারোপ করার পর সে অভিধা থাকে না। যেমন; নরত্বারোপ করার পূর্বে; আংটি, বটগাছ ও নদী স্ব স্ব অভিধায় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু নরত্বারোপ করার পর আংটির ভাবার্থ হয়েছে ‘ভগ, বটগাছের ভাবার্থ হয়েছে ‘শিশ্ন বা ‘মানুষ এবং নদীর ভাবার্থ হয়েছে ‘বৈতরণী (যোনিপথ)। যেহেতু; শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ এবং সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পুস্তক-পুস্তিকা সর্বদা উপমিত বা উপমেয় প্রধান সাহিত্য; সেহেতু; এসবের পাঠ করা ও পাঠদান করার সময়ে সর্বদাই উপমেয় অর্থ বা ভাবার্থ গ্রহণ করতে হবে। নরত্বারোপ বিদ্যা জানা-বুঝা ছাড়া কোনমতেই শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ এবং সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পুস্তক-পুস্তিকা জানা-বুঝা যায় না। তাই; নরত্বারোপ বিদ্যা সম্পর্কে সব গুরু-গোঁসাইয়ের জানা-বুঝা অতীব প্রয়োজন। (তথ্যসূত্র; আত্মতত্ত্ব; ভেদ; লেখক; বলন কাঁইজি)

নরত্বারোপ, ব্যক্তিরূপদান (মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদি, প্রকৃতি ও জীবজন্তু ইত্যাদিতে মানুষের রূপ দান বা নরত্ব আরোপ), ঈশ্বরায়ন, দেবতায়ন, মানবায়ন, শ্বরবিজ্ঞান, পুরাণ, মতবাদ, ধর্ম, রাজনীতি, পুঁজিবাদ, দর্শন ও বিজ্ঞান জানা-বুঝাই হলো সাম্প্রদায়িক ভাইরাস নিরাময়ের একমাত্র ঔষধ। সমাজের অন্যান্য বিদ্যার মতো এসব বিদ্যার যতো চর্চা হবে; যতো গবেষণা হবে ও যতো প্রচার হবে ততই সমাজ হতে সাম্প্রদায়িক ভাইরাস নিরাময় হবে। আর সমাজ হতে সাম্প্রদায়িক ভাইরাস নিরাময় না হলে সমাজে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না। বিশ্বের কোথাও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে না। বিশ্বের কোনো সমাজে মানব সৃষ্টি হবে না। সাম্প্রদায়িক ভাইরাসে আক্রান্ত সমাজে কেবলই দানবের সৃষ্টি হয়। নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাই এক যোগে কাজ করতে হবে। সমাজ হতে সাম্প্রদায়িক ভাইরাস নির্মূল করতে হবে। ধর্মকে ধর্মই বলতে হবে আর মতবাদকে মতবাদই বলতে হবে। সাম্প্রদায়িক কাহিনীকে ইতিহাস বলা বন্ধ করতে হবে। পৌরাণিক কাহিনীকে ইতিহাস বলা বন্ধ করতে হবে।

বহিঃসংযোগ (External links)

  1. Religion Is a Virus – Mother Jones
  2. The Religion Virus: Why We Believe in God – TheHumanist.com
  3. The Virus of Faith
  4. The Virus of Faith; Richard Dawkins

তথ্যসূত্র (References)

(Theology's number formula of omniscient theologian lordship Bolon)

১ মূলক সংখ্যা সূত্র (Radical number formula)
"আত্মদর্শনের বিষয়বস্তুর পরিমাণ দ্বারা নতুন মূলক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়।"

রূপক সংখ্যা সূত্র (Metaphors number formula)

২ যোজক সূত্র (Adder formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে ভিন্ন ভিন্ন মূলক সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন যোজক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, গণিতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায় না।"

৩ গুণক সূত্র (Multiplier formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে এক বা একাধিক মূলক-সংখ্যার গুণফল দ্বারা নতুন গুণক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৪ স্থাপক সূত্র (Installer formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে; এক বা একাধিক মূলক সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে স্থাপন করে নতুন স্থাপক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৫ শূন্যক সূত্র (Zero formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন শূন্যক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

< উৎস
[] উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
() ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
> থেকে
√ ধাতু
=> দ্রষ্টব্য
 পদান্তর
:-) লিঙ্গান্তর
 অতএব
× গুণ
+ যোগ
- বিয়োগ
÷ ভাগ

Here, at PrepBootstrap, we offer a great, 70% rate for each seller, regardless of any restrictions, such as volume, date of entry, etc.
There are a number of reasons why you should join us:
  • A great 70% flat rate for your items.
  • Fast response/approval times. Many sites take weeks to process a theme or template. And if it gets rejected, there is another iteration. We have aliminated this, and made the process very fast. It only takes up to 72 hours for a template/theme to get reviewed.
  • We are not an exclusive marketplace. This means that you can sell your items on PrepBootstrap, as well as on any other marketplate, and thus increase your earning potential.

পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী

উপস্থ (শিশ্ন-যোনি) কানাই,(যোনি) কামরস (যৌনরস) বলাই (শিশ্ন) বৈতরণী (যোনিপথ) ভগ (যোনিমুখ) কাম (সঙ্গম) অজ্ঞতা অন্যায় অশান্তি অবিশ্বাসী
অর্ধদ্বার আগধড় উপহার আশ্রম ভৃগু (জরায়ুমুখ) স্ফীতাঙ্গ (স্তন) চন্দ্রচেতনা (যৌনোত্তেজনা) আশীর্বাদ আয়ু ইঙ্গিত ডান
চক্ষু জরায়ু জীবনীশক্তি দেহযন্ত্র উপাসক কিশোরী অতীতকাহিনী জন্ম জ্ঞান তীর্থযাত্রা দেহাংশ
দেহ নর নরদেহ নারী দুগ্ধ কৈশোরকাল উপমা ন্যায় পবিত্রতা পাঁচশতশ্বাস পুরুষ
নাসিকা পঞ্চবায়ু পঞ্চরস পরকিনী নারীদেহ গর্ভকাল গবেষণা প্রকৃতপথ প্রয়াণ বন্ধু বর্তমানজন্ম
পালনকর্তা প্রসাদ প্রেমিক বসন পাছধড় প্রথমপ্রহর চিন্তা বাম বিনয় বিশ্বাসী ব্যর্থতা
বিদ্যুৎ বৃদ্ধা মানুষ মুষ্ক বার্ধক্য মুমুর্ষুতা পুরুষত্ব ভালোবাসা মন মোটাশিরা যৌবন
রজ রজপট্টি রজস্বলা শুক্র মূত্র যৌবনকাল মনোযোগ রজকাল শত্রু শান্তি শুক্রপাত
শুক্রপাতকারী শ্বাস সন্তান সৃষ্টিকর্তা শুক্রধর শেষপ্রহর মূলনীতি সন্তানপালন সপ্তকর্ম স্বভাব হাজারশ্বাস
ADVERTISEMENT
error: Content is protected !!