পুনরুত্থান

২৬/০১. পুনরুত্থান
Resurgence (রিসারজেন্স)/ ‘ﺒﻌﺚ’ (বা’য়াস)

ভূমিকা (Prolegomenon)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর জন্ম পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক অশালীন মূলক সত্তা জন্ম। এর অন্যান্য বাঙালী পৌরাণিক সহযোগী মূলক সত্তা পুনর্জন্ম, জন্মান্তর, জন্মান্তরবাদ পুরুত্থানবাদ। এর বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা পুনরুত্থান। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা ফিরা ভাসা। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা প্রবসন মন্বন্তর এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা পুনর্জীবন সম্মেলন

অভিধা (Appellation)
পুনঃ অব্যক্রিবিণ পুনশ্চ, পুনরায়, আবার, দ্বিতীয়বার।
পুনরুত্থান (বাপৌরূ)বি জন্মান্তর, পুনর্জন্ম, পুনরুদ্ভব, পুনরায় উত্থান, পুনর্জাগরণ, পুনরোন্নতি, পুনঃ জন্মগ্রহণ, পুনঃ জন্মলাভ, পর জন্মগ্রহণ, resurgence, ‘ﺒﻌﺚ’ (বা’য়াস), resurrected, ‘عودة ظهور’ (আওদা জুহুর), resurrection (ব্য্য) শুক্রপাতরূপ মরণ দ্বারা জরায়ুতে প্রবেশ করে জন্মরূপ উত্থান দ্বারা পুনঃ জন্মগ্রহণ, পিতা-মাতার দেহ পরিবর্তন করে সন্তান রূপে জন্মগ্রহণ (শ্ববি) জন্ম, উৎপত্তি, উদ্ভব, প্রসূত, ভূমিষ্ট, born, birth, বিলাদ (.ﻮﻻﺪﺓ) (রূপ্রশ) ভাসা, আবির্ভাব (ইপ) নাশয়া (.ﻨﺸﺄﺓ), বুরুঝু (.ﺒﺮﻮﺯ) (ইংপ) desent, lineage (দেপ্র) এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর জন্ম পরিবারের একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা (সংজ্ঞা) ১. সাধারণত; সর্বপ্রকার পুনরুদ্ভবকে বাংলায় ‘পুনরুত্থান বলা হয় ২. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, মাতৃগর্ভ হতে পিতা-মাতা সন্তান রূপে ভূমিষ্ঠ হওয়াকে রূপকার্থে ‘পুনরুত্থান বলা হয় (বাপৌছ) পুনর্জীবন ও সম্মেলন (বাপৌচা) প্রবসন ও মন্বন্তর (বাপৌউ) ফেরা ও ভাসা (বাপৌরূ) পুনরুত্থান (বাপৌমূ) জন্ম {বাং. পুনঃ+ বাং. উত্থান˃}

পুনরুত্থানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of resurgence)
১.   “ডরাইলে পুনরুত্থানের ডরে, পার হয়ে যাও গুরু ধরে, বলন কয় মরিলে পরে, জনম মাটি হইবে হইবে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩১১)
(মুখ; হাশরের দিন কৃতকর্মের সুক্ষ্ম বিচার পাইবে, এক জন্মের অপরাধে আরেক জন্ম খাটিবে”)
২.   “দেখ রে মন, পুনর্জনম কেমন করে হয়, মরে যদি ফিরে আসে, হিসাব নিক্বাশ কে কার পায়।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/১)
৩.   “পিতার বীর্যে পুত্রের সৃজন, তাতেই পিতার পুনর্জনম, সুধা শুক্রে দেহের গঠন, আলেক রূপে ফিরে সদাই।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/২)
(মুখ; দেখ রে মন, পুনর্জনম কেমন করে হয়, মরে যদি ফিরে আসে, হিসাব নিক্বাশ কে কার পায়”)

পুনরুত্থানের কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of resurgence)
১.   “অধঃপতনে হয়রে মরণ, তাতেই জীবের পুনর্জনম, বিচারকার্যের হয়রে সূচন, কেউ কেউ বলে উবুদশূল।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৫৭)
২.   “আপনদেশে যেতে পথে, মানুষ খণ্ড হয় মূল হতে, পুনর্জনম কয় সাধু মতে, শাস্ত্রে সন্তান জন্ম হয়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৪)
৫.   “পুনর্জনম গমনে হয়, নিত্যকর্মে অধঃপতন হলে, পুনরায় জীব জন্ম লয়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৪)
৬.   “পুনর্জনম জীবদ্দশায়, তরণী পাপে বোঝাই, করে তার প্রকৃতি নির্ণয়, হও স্বরূপ পাবন।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১০)
৭.   “বারে বারে করি বারণ, নিসনে আর পুনর্জনম।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১০)
৮.   “মরেছিল সাঁইজি লালন, পাই না তাঁর পুনর্জনম, এমন মরা মরে কয়জন, স্বেচ্ছা ঝুলে ফাঁসিতে।” (বলন তত্ত্বাবলী)
৯.   “মানুষে মানুষ গাঁথা রয়, যখন যে খণ্ড হয়, তাহারে পুনর্জনম কয়, হয় না জনম তারণ।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১০)
১০. “লা ইলাহা কালিমা পড়, মুহাম্মাদের দিন ভুলো না, নবির কালিমা পড়লে পরে, পুনঃর্জনম আর হয় না।” (পবিত্র লালন- ৮৭৭/১)

পুনরুত্থানের ওপর দুটি পুর্ণাঙ্গ বলন (A full Bolon on the resurgence)

১.                      “পুনর্জনম গমনে হয়
নিত্যকর্মে অধঃপতন হলে
পুনরায় জীব জন্ম লয়।
দেহত্যাগকে মরণ বলে
পড়ে রইলে গণ্ডগোলে
মরণ গেছে আগে চলে
দেহত্যাগে খেলা ভঙ্গ হয়।
আপনদেশে যেতে পথে
মানুষ খণ্ড হয় মূল হতে
পুনর্জনম কয় সাধু মতে
শাস্ত্রে সন্তান জন্ম হয়।
থাকলে মনে লীলার বাসনা
ঊর্ধ্বরতী সাধন হয় না
শান্তরতীও মুক্তি দেয় না
বলন কাঁইজি ভেবে কয়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৪)

২.                     “শাস্ত্র বিচার করে কেউ কী
সে ভেদ জানতে পায়।
জন্মান্তরবাদের সন্ধান
অবোধ মন তোরে জানাই।
মুসলমানদের পুনরুত্থান মর্ম
হিন্দুরা কয় পুনর্জন্ম
গেল না তোর এমন ভ্রম
তোরে কী দিয়ে শিখাই।
মুসলমানদের সেই পুনরুত্থান
কৃষিবিদরা কয় পুনর্জন্মদান
সাম্প্রদায়িকরা কয় পরলোকধাম
সন্তানের সব রূপক ছাপাই।
বলন কয় যার যার বিবেক
সারা বিশ্বের বিচারালয় এক
সূক্ষ্মবিচার হচ্ছে দেখ দেখ
তুই পড়েছিস রিপুর ধোঁকায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৪)

পুনরুত্থানের সংজ্ঞা (Definition of resurgence)
সাধারণত; কোনকিছুর পুনঃপুন উত্থান হওয়াকেই পুনরুত্থান বলে।

পুনরুত্থানের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theological definition of resurgence)
১. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; মানুষ সন্তান রূপে পুনঃপুন জন্ম নেওয়াকে পুনরুত্থান বলে।
২. বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে; পিতা-মাতা সন্তান রূপে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়াকে রূপকার্থে পুনরুত্থান বলে।

পুনরুত্থানের প্রকারভেদ (Variations of resurgence)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, পুনরুত্থান দুই প্রকার। যথা; ১. উপমান পুনরুত্থান ও ২. উপমিত পুনরুত্থান।

. উপমান পুনরুত্থান (Analogical resurgence)
সাধারণত; কোনকিছুর পুনঃপুন উত্থান হওয়াকেই উপমান পুনরুত্থান বলে।

. উপমিত পুনরুত্থান  (Compared resurgence)
বাঙালী শ্বরবিজ্ঞানে ও বাঙালী পুরাণে, পিতা-মাতা সন্তান রূপে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়াকে উপমিত পুনরুত্থান বলে।

পুনরুত্থানের পরিচয় (Identity of resurgence)
এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর জন্ম পরিবারের একটি বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বিশেষ। সাধারণত; কোনকিছুর পুনঃপুন উত্থান হওয়াকেই পুনরুত্থান বলা হয়। এটি; মুসলমানদের একটি বিখ্যাত মতবাদ। তবে; এর পাশাপাশি হিন্দু মনীষীদের একাংশের জন্মান্তর মতবাদটি সর্ব ঘরানায় প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক কথায় বলা যায়; মুসলমানদের পুনরুত্থানবাদ ও হিন্দুদের একাংশের জন্মান্তরবাদ প্রায় সারাবিশ্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিচে এ মতবাদ দুটির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।


২৬/০. পুনরুত্থানবাদ

Reincarnation (রিইনকারনেশন)/ ‘تناسخ’ (তুনাসিখু)

ভূমিকা (Prolegomenon)

এটি বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী এর জন্ম পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বাঙালী পৌরাণিক সহযোগী মূলক সত্তা পরিভাষা। এর বাঙালী পৌরাণিক অশালীন মূলক সত্তা জন্ম। এর অন্যান্য বাঙালী পৌরাণিক সহযোগী মূলক সত্তা পুনর্জন্ম, জন্মান্তর জন্মান্তরবাদ। এর বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা পুনরুত্থান। এর বাঙালী পৌরাণিক উপমান পরিভাষা ফিরা ভাসা। এর বাঙালী পৌরাণিক চারিত্রিক পরিভাষা প্রবসন মন্বন্তর এবং এর বাঙালী পৌরাণিক ছদ্মনাম পরিভাষা পুনর্জীবন সম্মেলন

অভিধা (Appellation)

পুনরুত্থানবাদ (বাপৌছ)বি পুনরুত্থান মতবাদ, reincarnation, ‘تناسخ’ (তুনাসিখু), doctrine of resurrection, ‘نظرية التجددية’ (নাজারিয়াত আত্তাজদাদিয়া) (প্র) মৃত্যুর পর বিচারের জন্য পুনরায় উত্তোলন করা হবে এমন সাম্প্রদায়িক মতবাদ বিশেষ।

পুনরুত্থানবাদের সংজ্ঞা (Definition of reincarnation)

১.    সাধারণত; প্রয়াণের পর কর্মফলের গণনা গ্রহণের জন্য মানুষকে আবার পুনরুত্থান করা হবে এমন মতবাদকে পুনরুত্থানবাদ বলে।

২.   সাধারণত; পুনরুত্থান সম্পর্কিত সব মতবাদকে একত্রে পুনরুত্থানবাদ বলে।

পুনরুত্থানের দার্শনিক মতবাদ

(Philosophical doctrin of reincarnation)

দার্শনিকগণ পরকাল, পরকালে দৈহিক পুনরুত্থান, দেহে পুনঃ আত্মা প্রতিষ্ঠা এবং স্বর্গ ও নরকের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। একইভাবে সাম্প্রদায়িক গ্রন্থাদির মধ্যে বর্ণিত স্বর্গের সুখ ও নরকের শাস্তিও তারা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ; তাঁদের মতে; সাম্প্রদায়িক মনীষীদের এসব বর্ণনা হলো myth বা মাজাঝি (ﻤﺟﺎﺯﻯ); বাস্তব বা হাক্বিক্বি (ﺤﻗﻴﻗﻰ) নয়। এদেরকে বাংলায় রূপক বর্ণনা বা ইংরেজিতে allegory, metaphor এবং আরবি ভাষায় একে মাজাঝি (ﻤﺟﺎﺯﻯ) বলা হয়।

হাক্বিক্বি [ﺤﻗﻴﻗﻰ] বিণ মূল, যথার্থ, মর্মার্থ qবি মূলক, বাস্তব {}

মাজাঝি [ﻤﺟﺎﺯﻯ] (বাপৌছ)বি রূপক, ছদ্ম, কলা, কৃত্রিম, অপ্রকৃত (ব্য্য) যে অর্থালঙ্কারে উপমান ও উপমেয়ের অভেদ কল্পনা করা হয়। যথা; মুখ-চন্দ্র, যেসব কাব্য বা নাটকে, কোনো তত্ত্বকে রূপ দেওয়া হয় (পরি) শ্বরবিজ্ঞানের বাঙালী পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণীতে বর্ণিত বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তার রূপক নামে ঈশ্বরায়িত, দেবতায়িত ও মানবায়িত পৌরাণিক চরিত্র দ্বারা নির্মিত মানবকল্যাণমূলক পৌরাণিক কাহিনী (সংজ্ঞা) মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়াদিকে উপমিত পদ ধরে প্রকৃতির উপমান বিষয়বস্তুর সাথে সার্থক তুলনামূলকভাবে নির্মিত কাহিনীকে রূপক বলা হয় যে অর্থালঙ্কারে উপমান ও উপমিত পদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয় তাকে রূপক বলা হয়। যেমন;  শুক্ররণ ও কামনদী ইত্যাদি। দার্শনিকগণ মনে করেন যে; পরকাল হবে, তবে সেটা হবে আত্মিক। পরকালে আত্মাই স্বর্গ ও নরকে সুখ ও দুঃখ ভোগ করবে। পরকাল একান্ত আত্মারই সুখ দুঃখের পরিক্রমা। সেখানে দৈহিক পুনরুত্থানের কোনো সম্ভাবনা নেই। গাজ্জালী দার্শনিকদের এ মতবাদের সমালোচনা করে বলেন; স্রষ্টার পক্ষে দৈহিক পুনরুত্থান ঘটানো অবশ্যই সম্ভব।

পর্যালোচনা (Review)

কী বিজ্ঞানী, কী দার্শনিক বা কী জ্যোতিষী কেউই আত্মদর্শননির্ভর পুরাণের ঘোলাজল খাওয়া হতে আত্মরক্ষা করতে পারে নি।

ঘোলাজলের গল্পটি এমন; “একবার এক রাজসভায় রাজার নির্দেশক্রমে মন্ত্রী রাজ্যের বিভিন্ন স্থান হতে আগত জ্যোতিষীদের নিকট দেশের ভবিষ্যদ্বাণী শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন জ্যোতিষীরা তাদের যার যার ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করলেন। সভার প্রধান জ্যোতিষী সব ভবিষ্যদ্বাণী একত্রিত করে যাচাইবাছাই করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর বিষয়টি রাজসভায় উপস্থিত করার জন্য দাঁড়িয়ে মহারাজের আজ্ঞা কামনা করলেন। তারপর; মহারাজ প্রকাশ করার অনুমতি প্রদান করলেন। এবার প্রধান জ্যোতিষী বললেন; “মহারাজ আগামী মাসের প্রথম দিবস শনিবার রাজ্যে আকাশ থেকে এক প্রকার ঘোলাজল বর্ষিত হবে। ঐ জল যারা পান করবে; তারা সবাই পাগল হয়ে যাবে। ‘ঘোলাজল’ পায়ীরা দিনকে রাত ও রাতকে দিন বলতে আরম্ভ করবে। সভার সবাই মনে মনে স্থির করলেন যে; উক্তজল বর্ষিত হওয়ার পূর্বেই কিছু জল সঞ্চিত রাখবেন। যাতে সত্যিসত্যি ‘ঘোলাজল’ বর্ষিত হলে; সে জল পান না করে সঞ্চিতজল পান করা যায়। ঘটনাক্রমে ঠিক ঐদিনই আকাশ হতে ‘ঘোলাজল’ বর্ষিত হলো। সঞ্চিত জল নিঃশেষ হওয়ার পর রাজ্যের সবাই সে জল পান করলো। কেবল অবশিষ্ট রইল রাজা ও মন্ত্রী। কয়েকদিন পরে রাজা ও মন্ত্রী প্রজাদের সাথে একটি মতোবিনিময় সভার দিবস ও ক্ষণ ধার্য করলেন। দিবসটি ছিল শনিবার সকাল ১০টা। রাজা ও মন্ত্রী যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে দেখলেন লোকজন তেমন নেই। যে ক’জন আছে তারাও তাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত। মন্ত্রী বিষয়টি অনুমান করে দুয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলেন; “ব্যাপার কী?” ক্ষিপ্ত প্রজারা বললো; “আপনাদের আসার কথা ছিল সকাল ১০টায়; এখন বাজে রাত্র ১০টা। মানুষ আর কতক্ষণইবা বসে থাকবে।” মন্ত্রী বললেন; “পাগলের মতো কী বলছো এসব। এখন তো সকাল ১০টাই বাজে।” কয়েকজন প্রজা হো হো করে হেসে বললো; রাজা ও মন্ত্রী পাগল হয়ে গেছেন।” রাজা বিষয়টি অনুমান করে মন্ত্রীকে বললেন; “মন্ত্রী মশাই আজ সভা সমাপ্তি ঘোষণা করুন।” সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রী সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। অতঃপর; রাজা ও মন্ত্রী বাড়ি গিয়ে বিষয়টি নিয়ে বসলেন। রাজা বললেন; “মন্ত্রী মশাই জ্যোতিষীদের কথা তো সবই সঠিক। সবারই তো মাথা পাগল হয়ে গেছে; এখন বলুন কী করা যায়।” মন্ত্রী বললেন; “মহারাজ পাগলের রাজ্যে তো কোনো ভালোমানুষের মূল্য নেই। পাগলরা তো ভালোমানুষকেই পাগল বলে থাকে। তাই; চলুন আমরাও ‘ঘোলাজল’ পান করে পাগল হয়ে যাই। তাহলে; তারাও পাগল আমরাও পাগল হয়ে সমান হবো। আর একত্রে বাস করতে সমস্যাই হবে না।” তখন রাজা বললেন; “মন্ত্রী মশাই আমিও তো তাই ভাবছি। একত্রে বসবাস করতে হলে ঘোলাজল সবাইকেই পান করতে হবে। কেউ পান করবে আর কেউ করবে না; তা হবে না।” অতঃপর; রাজা ও মন্ত্রী উভয়ে উক্ত ‘ঘোলাজল’ পান করে পাগল হয়ে গেলেন।”

পরকাল বা পুনরুত্থান আত্মার হোক বা দেহের হোক; এটা পরের কথা। তবে; এটা যে দেহতাত্ত্বিক পুরাণের রূপকথা; এতে সন্দেহ নেই। দেহতাত্ত্বিক পৌরাণিক কাহিনীকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করাই পুরাণের খপ্পরে পড়া বা পুরাণের ঘোলাজল খাওয়া বলা হয়। পুরাণের মরণ কবলে পতিত দার্শনিকরা পুনরুত্থান বিষয়টিই বুঝে উঠতে পারে নি। এজন্য; তারা পুনরুত্থান আত্মার হবে, নাকি দেহের হবে; এ নিয়ে ভিষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পতিত হয়ে এমন গোলমেলে মন্তব্য করেছেন। বাস্তবে পুনরুত্থান বিষয়টি হলো; পিতা-মাতা মৈথুনে গিয়ে ধুম্রহীন কামাগুনের তাপে গলে; শুক্ররস ও সুধারস রূপে জরায়ুতে পতিত হওয়া। অতঃপর; মাত্র দশমাসের ব্যবধানে আবার সন্তান রূপে পুনরুত্থান করা বা ভূমিষ্ঠ হওয়া। পিতা-মাতার সন্তান রূপে পুনরুত্থান হওয়ার ক্ষেত্রে; আত্মা, মন ও জ্ঞান পুনরুত্থিত হয় না। কেবল দেহই পুনরুত্থিত হয়।

এবার বলা যায়; দার্শনিকদের বলিষ্ঠ মতবাদের ওপর আবার সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটিরই প্রয়োগ করলেন গাজ্জালী। “স্রষ্টার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব”, এটা তো সাম্প্রদায়িক বাণী। এ বাণী গ্রহণ না করলে সে তো সাম্প্রদায়িকই হতে পারবে না। দার্শনিক যুক্তি খণ্ডণ করতে হয় দার্শনিক যুক্তি দ্বারা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খণ্ডণ করতে হয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দ্বারা। কিন্তু গাজ্জালী দার্শনিক যুক্তি ও দার্শনিক প্রমাণাদিকে সাম্প্রদায়িক খোঁড়া অন্ধবিশ্বাসের হাতুড়ি দিয়ে পুনঃপুন ভাঙ্গার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। হ্যাঁ তিনি যদি দার্শনিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে দার্শনিকদের উত্থাপিত যুক্তি- প্রমাণ খণ্ডণ করতেন; তবে নিশ্চয় তা গ্রহণ করা যেতো। যেমন; চোরের নিকট ধর্মছড়া বলে লাভ নেই; এ যে তেমন দশা দেখছি! যতই; যুক্তি বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হোক না কেন; “স্রষ্টা ইচ্ছা করলে হতে পারে এবং স্রষ্টা ইচ্ছা না করলে হবে না” এসব কথা দ্বারা যবনিকা টানছেন তিনি। যারা পুনঃপুন সাম্প্রদায়িক মতবাদের এসব বাণীর দিব্যি প্রদান করে; তাদের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সমালোচনা করা উচিত নয়।

এক (One)

দার্শনিকগণ বলেন; “কোনো দ্রব্য ধ্বংস হওয়ার পর অনুরূপ একটি নতুনদ্রব্য নির্মাণ করা যায়। তবে; সেটি ঠিক পূর্বের দ্রব্যটির মতো হয় না। একইভাবে; একজন মানুষ প্রয়াত হলে; তার দেহের অনুরূপ আরেকটি মানুষ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু সে প্রয়াণপূর্ব লোকটির মতো হয় না। যারফলে; দৈহিক পুনরুত্থান সম্পূর্ণভাবেই অসম্ভব।”

দার্শনিকগণ আরও বলেন; “ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি দ্রব্যের উপাদান দিয়ে অন্য একটি নতুনদ্রব্য নির্মিত হলে; পূর্বের সবটুকু উপাদান ব্যবহার করতে হবে। প্রয়াণের পরে স্রষ্টা যদি মানুষকে পুনর্জীবিত করতে চান; তবে প্রয়াণের পূর্বে ব্যক্তির শরীরে যে উপাদান ছিল; সমাধি হতে তোলার সময় তার দেহে পূর্বের সবটুকু উপাদান থাকতে হবে। অন্যথায় লোকটা হয়তো অঙ্গহীন হয়ে সমাধি হতে উত্থিত হবে। প্রয়াণের পর মানুষের দেহের কিছু অংশ বাষ্প হয়ে যায়; এবং কিছু অংশ মাটির সাথে মিশে যায়। অর্থাৎ; আদি-পঞ্চভূত পঞ্চভূতে মিশে যায়। কত উদ্ভিদ মানুষের দেহাবশেষ গ্রহণ করে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। এসব উপাদান পুনরায় একত্রিত করে মানুষকে জীবিত করা স্রষ্টার পক্ষে সম্ভব নয়।” দার্শনিকগণ আরও মনে করেন যে; “মানুষ প্রয়াণলাভ করলে তার আত্মাটিও বিশ্বাত্মায় মিশে যায়। বিশ্বাত্মা অসীম, মানুষের দেহ সসীম। অসীম আত্মাকে সসীম দেহে, স্থান দেওয়া যায় না। যারফলে; মানুষের পুনরুত্থান সম্ভব নয়।”

পর্যালোচনা (Review)

এখানে; বলা যায়; দার্শনিকগণ মানুষের পুনরুত্থান বিষয়টি না জেনে ও না বুঝেই উপরোক্ত মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। পুনরুত্থান কথাটির অর্থ প্রয়াণের পরে উত্থান নয় বরং মরণের পরে উত্থান। মাটির সমাধি হতে উত্থান নয় বরং গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ। অন্যদিকে; সমাবেশ কথাটির অর্থ গণসমাবেশ নয় বরং মাতাপিতা ও সন্তানের একত্র হওয়া। শ্বরবিজ্ঞানে; মৈথুন করতে গিয়ে শুক্রপাত করাকে মরণ বলা হয়। শুক্রপাত সদৃশ মরণের দ্বারা মানুষ মাতৃগর্ভ সদৃশ সমাধিতে সমাধিস্থ হয়। অতঃপর; সে মাত্র দশমাস পর; আবার সমাধি হতে পুনরুত্থিত হয়। তারপর; কর্মশালা সদৃশ বিচারালয়ের সম্মুখীন হয়। কিন্তু দার্শনিকগণ মানুষের মরণের স্থলে প্রয়াণ এবং গর্ভের স্থলে সমাধি ও জন্মের স্থলে চৈতন্য কল্পনা করে সব গোলমেলে করে ফেলেছেন। এ গোলমাল সংশোধন করার জন্য নিচে একটি সারণী দেওয়া হলো।

রূপক পরিভাষা ও বাস্তবতার সারণী

(Metaphor terminology and realities table)

রূপক পরিভাষা বাস্তবতা

আত্মতত্ত্ব

আরবি বাংলা
১. মউত (ﻤﻭﺕ) ১. প্রয়াণ ১. শুক্রপাত সদৃশ মরণ
২. ক্ববর (ﻘﺑﺮ) ২. সমাধি ২. দেহ বা গর্ভ / জরায়ু সদৃশ সমাধি
৩. হাশর (ﺤﺸﺭ) ৩. পুনরুত্থান ৩. জন্ম বা ভূমিষ্ঠ সদৃশ পুনরুত্থান

দার্শনিকদের যুক্তির প্রতিবাদে গাজ্জালী বলেন; “দৈহিক পরিবর্তন সাধিত হলেই, এক মানুষ অন্য মানুষে পরিণত হয় না। শিশু যৌবনে পদার্পণ করলে, দৈহিক কাঠামোর পরিবর্তন হয়। তাই; বলে সে অন্য মানুষ হয়ে যায় না। অনুরূপভাবে প্রয়াণোত্তর একজন মানুষকে পুনর্জীবিত করা হলে; তার দৈহিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে সত্য কিন্তু সে আর অন্য মানুষে পরিণত হয় না। গাজ্জালী আরও বলেন; “বিশ্বাত্মা বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নেই। মানুষের প্রয়াণের পর, তার আত্মা অসীমে বিলীন হয়ে যায় না; অস্তিত্বশীল থাকে। বরং অন্যান্য আত্মাগুলো হতে স্বতন্ত্রভাবে সে আত্মা অবস্থান করে।”

পর্যালোচনা (Review)

এবার বলা যায়; গাজ্জালীও আত্মতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিক তত্ত্ব না জেনে ও না বুঝে মরণ ও প্রয়াণ, পুনরুত্থান ও জন্ম এবং সমাধি ও দেহের মধ্যে চরম গোলমাল পাকিয়ে ফেলেছেন। যা পূর্বে দার্শনিকদের উক্তির প্রতিবাদ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিশেষে গাজ্জালীর “বিশ্বাত্মা বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নেই। মানুষের প্রয়াণের পর; তার আত্মা অসীমে বিলীন হয়ে যায় না; অস্তিত্বশীল থাকে। বরং অন্যান্য আত্মাগুলো হতে স্বতন্ত্রভাবেই সে আত্মা অবস্থান করে”; এ বক্তব্যের প্রতি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি কিভাবে এমন কথা বলতে পারলেন যে; বিশ্বাত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই। শক্তি তো সবই বিশ্বব্যাপী। যেমন; আলোক, সৌর, বায়ু, চুম্বক, বিদ্যুৎ, পারমানবিক, বায়বীয় (gaseous) ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ইত্যাদি।

Ether [ইথার] (GMP)n মহাশূণ্যে পরিব্যপ্ত অতি সূক্ষ্ম কাল্পনিক বায়বীয় পদার্থ বিশেষ (রবি) উড়ে যায় এমন বর্ণহীন পদার্থ বিশেষ {}

বায়বীয় (বাপৌছ)বিণ বায়ব, বায়ব্য, বায়তুল্য, বাতাস থেকে উৎপন্ন, বায়ুপথে চলে এমন।

বায়ুশক্তি (বাপৌছ)বি বায়ু, বাতাস, পবন, অনিল, সমীরণ, বাতাস হতে উৎপন্নশক্তি।

এগুলো সবই বিশ্বশক্তি। এতসব বিশ্বশক্তি থাকতে পারে কিন্তু বিশ্ব আত্মাশক্তি বা বিশ্বাত্মা থাকতে পারে না। একথা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি; তাঁর একান্ত মনগড়া ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত উক্তি। দার্শনিক মতবাদের শুধু বিরোধিতা করার জন্যই তিনি এমন ন্যাক্কারজনক উক্তি করতে পেরেছেন। দার্শনিক মতবাদের সাথে সাম্প্রদায়িক মতবাদের ঐক্য করার সদিচ্ছা থাকলে; তিনি কখনই এমন অবাঞ্ছিত ও অবান্তর উক্তি করতে পারতেন না। এর প্রতিবাদে বলা যায়; ১. আলোক ২. সৌর ৩. বায়ু ৪. চুম্বক ৫. বিদ্যুৎ ৬. পারমাণবিক ৭. বায়বীয় (gaseous) ও ৮. মাধ্যাকর্ষণ ইত্যাদি শক্তি; এ শক্তিগুলোর মতো পরমাত্মাও এক প্রকার বিশ্বশক্তি। পরমাত্মা বিশ্বের সর্বত্রই বিরাজিত। প্রতিটি জীব কোষের কেন্দ্রে অবস্থিত জীবাত্মা পরমাত্মার সাথে কোষের সংযোগ স্থাপন করে কোষকে জীবিত রাখে। কোষের জীবিত থাকাকেই জীবের জীবিত থাকা এবং কোষের প্রয়াণ হওয়াকেই জীবের প্রয়াণ হওয়া বলা হয়।

দুই (Two)

মানুষের দৈহিক গঠন ও পরিবর্তনের পিছনে দার্শনিকগণ কার্যকারণ সম্পর্কে আরও একটি নীতিকথা তুলে ধরেন। তাঁদের মতে; “জৈবিক পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণের উপস্থিতির ফলস্বরূপ একটি শিশু জন্মলাভ করে। কিন্তু স্রষ্টার হও বলা মাত্র হয় এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া মাত্র প্রয়াত সমাধিবাসীরা পুনর্জীবিত হবে এটা বলা অবান্তর।”

গাজ্জালী মাটি হতে মানুষের শরীর গঠিত হওয়ার জন্য পরিবর্তন বা কার্যকারণ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার সত্যতা স্বীকার করেন। তবে; তিনি মনে করেন যে; “মানুষ সৃষ্টি হওয়ার জন্য এসব কারণের উপস্থিতি অনিবার্য নয়। এসব কারণ ছাড়াও স্রষ্টা মানুষ সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি তাঁর ইচ্ছা দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আবার তাঁর ইচ্ছা দ্বারাই মানুষকে পুনর্জীবিত করে অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে বলবেন; এটাই সে পুনরুত্থান যা তোমরা মিথ্যে বলেছিলে।”

পর্যালোচনা (Review)

দার্শনিকদের বলিষ্ঠ ও সত্য যুক্তিটি খণ্ডনের নামে গাজ্জালী আবার সাম্প্রদায়িক নীতিকথা টেনে এনেছেন। তাঁর সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের ঝুলি এড়ে, সাম্প্রদায়িক স্রষ্টার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে আরম্ভ করেছেন। সাম্প্রদায়িক স্রষ্টা তো নিতান্ত মতবাদ ভীরুদের, শাসন ও শোষণের জন্য নির্মিত রূপক কিংবদন্তির নায়ক। স্রষ্টা বলে যদি কেউ থেকে থাকেন; তবে তিনি অন্য কোনকিছু হবেন। সাম্প্রদায়িক স্রষ্টার গল্প ও রূপকথার রাক্ষস- খোক্ষসের গল্পের মধ্যে পার্থক্য নেই। গাজ্জালী জানতেন না যে; প্রকৃত স্রষ্টা ও সাম্প্রদায়িক গ্রন্থে বর্ণিত সাম্প্রদায়িক স্রষ্টা এক নয়। তিনি সাম্প্রদায়িক স্রষ্টাকেই প্রকৃত স্রষ্টা ভেবে দার্শনিক মতবাদের খণ্ডণ ও তিরোধান করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক স্রষ্টা হলো; সাম্প্রদায়িক গ্রন্থাদি প্রণেতাদের মনের মাধুরীতে আঁকা রূপকথার কাল্পনিক স্রষ্টা। সাম্প্রদায়িক স্রষ্টার বাড়ি; কোনো মতবাদে আকাশে, কোনো মতবাদে পাতালে; কোনো মতবাদে সপ্তাকাশে; আবার কোনো কোনো মতবাদে মানুষের মাঝে। সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ প্রণেতাদের বর্ণনা অনুযায়ী মনে হয়; হয়তো তাঁরা সবাই সাম্প্রদায়িক স্রষ্টার পরিবারের লোক। এজন্য; তাঁরা স্রষ্টার বর্ণ, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, হাত, পা, চুল, দাড়ি, ক্ষমতা, মুখ, চোখ এবং ওঠা ও বসাসহ সবকিছু নিজ চোখে দেখে এসেছেন। যেমন; উপন্যাসিকরা তাদের বর্ণনায় রাজা-রাণী ও নায়ক-নায়িকাদের বর্ণনা প্রদান করে। রামায়ণ উপন্যাসটি পড়লে মনে হয়; কবি বাল্মীকি অযোদ্ধার যুদ্ধ নিজ চোখে দেখে বর্ণনা করেছেন। বিষাদসিন্ধু উপন্যাসটি পড়লে মনে হয়; মীর মোশাররফ হোসেন কারবালার যুদ্ধ নিজ চোখে দেখে বর্ণনা করেছেন। তেমনই; ইসলামের পৌরাণিক কাহিনী পড়লে মনে হয়; জারির তাবারী বদর, ওহুদ, খন্দক ও তাবুক যুদ্ধ নিজ চোখে দেখে বর্ণনা করেছেন। এসব যে আত্মতত্ত্বনির্ভর রূপক বর্ণনা; তা বর্তমানে বড় বড় গবেষক পর্যন্ত ভুলে বসেছেন।

পরিশেষে বলা যায়; আদিম ও মধ্যযুগীয় দার্শনিক মতবাদ অনেকটায় সঠিক ছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের ধ্বজাধারী মনীষীরা পুনঃপুন দর্শন ও বিজ্ঞানের ওপর অপ্রত্যাশিত আঘাত করে; তা ভেঙ্গে চুরমার করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। এমন একজন অন্ধবিশ্বাসী দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী। তিনি ইসলামী সাম্প্রদায়িক জ্ঞানের মহামনীষী ছিলেন; তা বিশ্বাস করা যায়। অন্যদিকে; তিনি যে দর্শন জগতে শিশু; তা শক্ত করেই বলা যায়। কারণ; সাম্প্রদায়িক মতবাদে অন্ধবিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি দার্শনিক হতে পারে না। দার্শনিক হতে হলে; অবশ্যই তাঁকে সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাস, অলীক, মনগড়া, অনুমান, তুকতাক ও অলৌকিক কিংবদন্তি সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। কারণ; এসব বিষয় সব সময় মুক্ত চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে বা মুক্ত চিন্তার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এসব সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রবণ ব্যক্তি কখনই দার্শনিক হতে পারে না। একই ব্যক্তি একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও দার্শনিক হতে পারে না। কারণ; দর্শনের ভিত্তি যুক্তি এবং সাম্প্রদায়িক মতবাদের ভিত্তি অন্ধবিশ্বাস। যদি কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও দার্শনিক বলে নিজকে উপস্থাপন করে; তবে সে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। অন্যদিকে; দর্শন ও বিজ্ঞান কাছাকাছি হওয়ায় দার্শনিক বিজ্ঞানী হতে পারে। যিনি দার্শনিক তিনিই বিজ্ঞানী হতে পারেন। আবার; যিনি বিজ্ঞানী তিনিই দার্শনিকও হতে পারেন। কিন্তু যে সাম্প্রদায়িক সে বিজ্ঞানী বা দার্শনিক কোনটাই হতে পারে না। যদি; কেউ এমন স্বীকার করে; তবে সে বড় মিথ্যাবাদী, বড় প্রতারক ও সাংঘাতিক ছলনাময়ী। কারণ; দর্শনের ভিত্তি যুক্তি, বিজ্ঞানের ভিত্তি প্রমাণ, সাম্প্রদায়িক মতবাদের ভিত্তি কাল্পনিক পুরাণ ও অন্ধবিশ্বাস। অন্যদিকে; আত্মদর্শন, আধ্যাত্মিক দর্শন বা শ্বরবিজ্ঞানের ভিত্তি বাস্তব আত্মতত্ত্ব।

তিন (Three)

দার্শনিকগণ বলেন যে; “স্রষ্টার কর্ম পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা একটি উত্তম নিয়ম শৃংখলার মধ্যে দিয়ে চলে। এ ব্যাপারে কয়েকটি ঘোষণা বাণীও তুলে ধরা যায়।

১.   “فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَحْوِيلًا” উচ্চারণ; “ফালাং তাজিদা লিছুন্নাতিল্লাহি তাবদিলাও ওয়ালাং তাজিদা লিছুন্নাতিল্লাহি তাওবিলা।” অর্থ; “অবশ্যই কাঁইয়ের কর্মপদ্ধতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন পাবে না এবং অবশ্যই কাঁইয়ের কর্মপদ্ধতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন পাবে না।” (কুরান- ফাতির- ৪৩)

২.   “وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا” “ওয়ালাং তাজিদা লিছুন্নাতিল্লাহি তাবদিলা।” অর্থ; “অবশ্যই কাঁইয়ের আদর্শের মধ্যে কোনো পরিবর্তন পাবে না।” (কুরান- ফাতহ- ২৩)

৩.   “سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا” উচ্চারণ; “ছুন্নাতুল্লাহি ফিদ্দিনা খালুউ মিং ক্বাবলু, ওয়ালাং তাজিদা লিছুন্নাতিল্লাহি তাবদিলা।” অর্থ; “পূর্ব হতেই কাঁইয়ের আদর্শ স্বভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং অবশ্যই কাঁইয়ের আদর্শের মধ্যে কোনো পরিবর্তন পাবে না।” (কুরান- আহযাব- ৬২)

এ হতেই দার্শনিকগণ যুক্তি দেন যে; “দৈহিক পুনরুত্থান একবার সম্ভব হলে তা একটি নিয়মে পরিণত হয়ে যাবে এবং এ নিয়ম পুনঃপুন ঘটতে থাকবে। হয়তো প্রতি অর্ব্যুদ বা নর্ব্যুদবছর পরপর দৈহিক পুনরুত্থানের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। দৈহিক পুনরুত্থান অসম্ভব। তাই; এমন নিয়ম চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। গাজ্জালী এর প্রতিবাদ করে বলেন; “স্রষ্টা একটি সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করেই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। তবে; স্রষ্টা ইচ্ছা করলে; এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে পারেন। যারফলে; তিনি কোনো কারণ ব্যতীতই মানব ও দানবের দৈহিক পুনরুত্থান ঘটাতে পারেন। এমন কোনো কারণ নেই যে; একবার একটি ঘটনা সংঘটিত হলেই পুনঃপুন তার পুনরাবৃত্তি হবে। যেমন; ১,২৪,০০০ সংখ্যক ঐশিদূত প্রেরণের পর তা বন্ধ করেছেন। এজন্য; বলা যায়; এমন কোনো কারণ নেই যে; একবার দৈহিক পুনরুত্থান হলেই তা পুনঃপুন ঘটবে! মোটকথা দৈহিক পুনরুত্থান মাত্র একবারই সংঘটিত হবে।”

পর্যালোচনা (Review)

এখানে; বলা যায় যে; গাজ্জালী স্রষ্টার নিয়ম অনুসরণের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু পরবর্তীকালেই সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটি দ্বারা দার্শনিকগণকে ভীতি প্রদর্শন করেন। তাই; বলা যায়; গাজ্জালী কেবলই একজন সাম্প্রদায়িক মনীষী; কিন্তু দার্শনিক নন। কারণ; তাঁর সব কথাই সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের গন্ধমাখা। সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাস থাকাকালীন কোনো ব্যক্তি দার্শনিক কিংবা বিজ্ঞানী হতে পারে না। গাজ্জালীর পুরো বক্তব্যটিই সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসপ্রসূত। অন্ধবিশ্বাস সাম্প্রদায়িক মতবাদ হতে পারে কিন্তু দর্শন বা বিজ্ঞান হতে পারে না। এ ব্যাপারে মাহাত্মা লালন সাঁইজির একটি বাণী তুলে ধরা যায়; “(একই কুরান পড়াশুনা, কেউ মৌলভি কেউ মাওলানা, দাহরিয়া হয় কতজনা, মানে না শরার ক্বাজি।” ভাবার্থ; কুরান অধ্যায়ন করেই কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক মনীষী রূপে গড়ে ওঠে। তারপর; সে সাম্প্রদায়িক মতবাদ যথাযথভাবে মান্য করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে; কুরান অধ্যায়ন করেই কেউ কেউ দার্শনিক রূপে গড়ে ওঠে। তারপর; সে সাম্প্রদায়িক মতবাদ ও সাম্প্রদায়িক মনীষীদের মান্য করে না।

দাহরিয়া [ﺪﻫﺭﻴﺎ] (বাপৌছ)বি নাস্তিক, বস্তুবাদী, জড়বাদী, দার্শনিক, ফালসাফিউ (ﻔﻟﺴﻔﻰ), philosopher, metaphysician {}

পরিশেষে বলা যায়; দার্শনিকগণ সাম্প্রদায়িক অন্ধবিশ্বাসের মরণ কবলে চরমভাবেই আক্রান্ত। এজন্য; তারা দেহতাত্ত্বিক পুরাণের আলোচনাকে সাম্প্রদায়িক আলোচনা মনে করে; এসবকে দর্শনশাস্ত্রের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করেছে। সাধারণ মোল্লা মৌলভীরা কখনই দার্শনিক বা বিজ্ঞানী হতে পারে না। কারণ; তারা সাম্প্রদায়িক শ্বরবিজ্ঞান বুঝেও না এবং বুঝার চেষ্টাও করে না। তারা মাত্র হায়িজ (ﺤﻴﺽ) নিফাস (ﻧﻔﺎﺲ)  ও ত্বালাকের (ﻄﻼﻖ) নিয়মগুলো নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়ে থাকে।

পুনরুত্থান কার; মন, জ্ঞান, আত্মা নাকি দেহের?

(Whose resurrected; mind, wisdom, soul or body?)

পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে; দেহ একটি জড় পদার্থ, জীবাত্মা, মন ও জ্ঞান হলো শক্তি। জীবাত্মা, মন ও জ্ঞান জৈবিকশক্তি এবং পরমাত্মা প্রাকৃতিকশক্তি। প্রাকৃতিক শক্তির রূপান্তর ভিন্ন উত্থানপতন বা সৃষ্টি-ধ্বংস নেই। কিন্তু কোনো কোনো শক্তির সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা উভয় রয়েছে। কোনো শক্তি চির সক্রিয়। চির সক্রিয় শক্তি চিরদিন সক্রিয়ই থাকে। এসব শক্তির কোনো দিন নিষ্ক্রিয়তাও নেই। যেমন; আলোকশক্তি ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ইত্যাদি। আবার কোনো কোনো শক্তিকে কখনও সক্রিয়; আবার কখনও নিষ্ক্রিয় হতে দেখা যায়। যেমন; জীবাত্মা, মন ও জ্ঞান। যদিও মন ও জ্ঞান শক্তি; তবু ঘুমন্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় এদের নিষ্ক্রিয়তা উপলব্ধি করা যায়। এক্ষেত্রে এতটুকু বলা যায় যে; প্রাকৃতিক শক্তি চির সক্রিয় কিন্তু জৈবিকশক্তি কখনও সক্রিয়তা ও কখনও নিষ্ক্রিয়তা অবলম্বন করে। অর্থাৎ; প্রাকৃতিক শক্তির কোনো নিষ্ক্রিয়তা নেই কিন্তু জৈবিক শক্তির সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা উভয় বিদ্যমান।

শক্তি যেখানে যেভাবে আছে; সেখানে সেভাবেই অবস্থান করে। শক্তির কোনো উত্থানপতন (vicissitudinous) নেই। ব্যক্তির প্রধান ৪টি সত্তার মধ্যে; জীবাত্মা, মন ও জ্ঞান; এ ৩টি হলো জৈবিক শক্তি। তাহলে; এ ৩টি সত্তার পুনরুত্থান বা পুনরুদ্ভব কল্পনাও করা যায় না। অবশিষ্ট থাকে দেহ। এজন্য; বলা যায়; পুনরুত্থান হয় একমাত্র দেহের। দেহের পুনরুত্থান কিভাবে সম্ভব? কোথায় কিভাবে দেহের পুনরুত্থান হচ্ছে নিচে এসব প্রশ্নের সমাধান তুলে ধরা হলো।

দৈহিকভাবে পুনরুত্থান (Physically resurrection)

বিশ্বের বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক পুস্তক-পুস্তিকা ও মরমী গীতিকাব্যগুলোর মধ্যে মানুষের দৈহিক পুনরুত্থানের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু আত্মা, মন ও জ্ঞানের পুনরুত্থানের কোনো প্রমাণ পওয়া যায় না। শক্ত করেই বলা যায় যে; সারাবিশ্বের একটি গ্রন্থেও আত্মা, মন ও জ্ঞানের পুনরুত্থানের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

১.                      “দিল দরিয়ায় ডুবে দেখ মনা,

অতি অজানখবর হয় জানা।

মালখানার শহর ভারি,

তাতে আজব কারিগরি,

জোয়ারে জল নাই- ভিটে ডুবে ভাই

কী প্রকারি এ কারখানা।

ত্রিবেণীর পিছনঘাটে,

বিনা হাওয়ায় মৌজ ছোটে,

বোবায় কথা কয়- কালায় শুনতে পায়

আন্ধেলায় পরখ করে কিনা।

বলার যোগ্য নয় সেকথা,

সাগরে ভাসে জগৎমাতা,

লালন বলে মনরে- পিতা জন্মে মাতার উদরে,

পত্নী দুগ্ধ পান করল কিনা।” (পবিত্র লালন- ৫২৭)

২.                     “দেখ রে মন,

পুনর্জনম কেমন করে হয়,

মরে যদি ফিরে আসে,

হিসাব নিক্বাশ কে কার পায়।

পিতার বীর্যে পুত্রের সৃজন,

তাতেই পিতার পুনর্জনম,

সুধা শুক্রে দেহের গঠন,

আলেক রূপে ফিরে সদাই।

কে বুঝে তার নিগূঢ়-মর্ম,স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর জন্ম,

সুধা শুক্রের হলে গম্য,

মনের আঁধার কেটে যায়।

জানা যায়রে কেবা ঈশ্বর,

যার জন্ম সে নেয় বারবার,

সিরাজ সাঁইজি কয় লালন এবার,

সে বুঝে যে যারে বুঝায়।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮)

৩.                     “আজব লীলা দেইখ্যা এলামরে, অচিনশহর ময়দানে,

মাটি ফাইটা উঠছে মানুষ, কারে কেবা চেনেরে।

জলের মাঝে লাগছে আগুন,

শুকনায় দৌড়াদৌড়ি,

বাপের বিয়ের ঘটক হইয়া,

ছেলে যাচ্ছে নানার বাড়িরে।

আকাশেতে লাঙ্গল গোরু,

বায় কোনবা লোকে,

স্ত্রীর পেটে স্বামীর জন্ম,

দুধ খাইল কোন মুখেরে।

চোর গেল ভাই চুরি করতে,

গিরস্ত পড়ল ধরা,

বিচার দিলো হাইকোটেতে,

হাকিম তিনজন মরারে।

আশি বছরের বুড়ি,

মাথায় কাটা সিতি,

কোলের ছাওয়ালের সাথে,

করতেছে পিরিতিরে।” (মরমীকবি জালাল)

“فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنَّ كَثِيرًا مِنْ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ” উচ্চারণ; “ফাল ইয়াওমা নুনাজ্জিকা বিবাদানিকা লিতাকুনা লিমান খলফাকা আয়া, ওয়া ইন্না কাসিরাম মিনান্নাছি আন আইয়াতিনা লা গাফিলুন।” অর্থঃ “অতঃপর; আজ আমরা তোমাকে পুনরুদ্ধার (পুনরুত্থান) করব; তোমার শরীরগতভাবে; যেন তোমার পরবর্তী লোকদের নিদর্শন হয় এবং নিশ্চয় অধিকাংশ মানুষ আমাদের নিদর্শন হতে উদাসীন।” (কুরান- ইউনুছ- ৯২)

বিশ্লেষণ (Analysis)

১.   “দেখ রে মন, পুনর্জনম কেমন করে হয়, মরে যদি ফিরে আসে, হিসাব নিক্বাশ কে কার পায়।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/১)

২.   “পিতার বীর্যে পুত্রের সৃজন, তাতেই পিতার পুনর্জনম, সুধা শুক্রে দেহের গঠন, আলেক রূপে ফিরে সদাই।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/২)

৩.   “স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর জন্ম, কে বুঝে তার নিগূঢ়-মর্ম, শোণিত শুক্রের পেলে গম্য, মনের আঁধার কেটে যায়।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/৩)

৪.   “লালন বলে মনরে- পিতা জন্মে মাতার উদরে, পত্নী দুগ্ধ পান করল কিনা।” (পবিত্র লালন- ৫২৭/৪)

৫.   “স্ত্রীর পেটে স্বামীর জন্ম, দুধ খাইলো কোন মুখে।” (মরমীকবি জালাল)

৬.   “তোমাকে পুনরুদ্ধার (পুনরুত্থান) করব, তোমার শরীরগতভাবে।” “نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ” (কুরান, ইউনুস- ৯২)

মৈথুন করতে গেলে ধুম্রহীন ও শিখাহীন কাম আগুনে নরদেহ পুড়ে শুক্ররসে পরিণত হয়। অতঃপর; সে শুক্র নারীর গর্ভে প্রবেশ করে। মাত্র দশমাসের ব্যবধানে জীব আবার সন্তান রূপ-ধারণ করে। অর্থাৎ; পূর্বে যে ব্যক্তি পিতা ছিল সে ব্যক্তিই চামড়া পরিবর্তন করে সন্তানে পরিণত হয়েছে। পিতাই যখন সন্তানে পরিণত হয়েছে; তখন সন্তান রূপে মাতা সদৃশ স্ত্রীর দুগ্ধ পান করা ছাড়া কোনো গত্যান্তর নেই। এটি; প্রকৃতির অমোঘ কারণ (compulsive cause)। প্রকৃতির অমোঘ কারণ হতে আত্মরক্ষা করার জন্যই অধিকাংশ সিদ্ধপুরুষ পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ; পিতা সন্তান রূপে স্ত্রীগর্ভে প্রবেশ করে; ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর স্ত্রীর দুগ্ধ পান করতে চায় না। কারণ; সাধুগণ মনে করেন যে; স্বামী শুক্র রূপে স্ত্রীগর্ভে প্রবেশ করে সন্তান রূপে ভূমিষ্ঠ হলে; স্ত্রী আর স্ত্রী থাকে না। তখন স্ত্রী মাতায় পরিণত হয়ে যায়। তাঁরা আরও ধারণা করেন যে; স্ত্রীকে একবার মাতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করলে; তার সাথে আর স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণ করা সম্ভব নয়। কারণ; একই রমণীকে একবার স্ত্রী নির্ধারণ করে তার সাথে সংসার করা হবে; আবার শুক্র রূপে তার গর্ভে প্রবেশ করে সন্তান রূপে জন্মগ্রহণ করে; তার স্তন্য পান করা হবে; এটা সম্ভব নয়। এজন্য; কোনো সিদ্ধ পুরুষের সহধর্মিনী বা সাধনসঙ্গিনী সন্তান গ্রহণের জন্য বল প্রয়োগ করলে; তাঁকে কেবল একটি সন্তান দিয়ে স্ত্রীর সম্পর্কটি চির বঞ্চিত করে দিতেন। খাওয়া চলাফেরা ওঠা-বসা সব ঠিকঠাক থাকত; শুধু স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণটির সম্পর্ক চির বিচ্ছিন্ন করে দিতেন।

যে সিদ্ধপুরুষগণের সহধর্মিনীগণ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে পারতেন; তারা আর কোনো দিন সন্তান গ্রহণের কথা বলতেন না এবং সন্তানও গ্রহণ করতেও চাইতেন না। এজন্য; দেখা যায়; অধিকাংশ মহাপুরুষের সন্তান রূপে পুনরুত্থান নেই। শ্বরবিজ্ঞানে; জীবের সন্তান রূপে পুনর্জন্ম গ্রহণ করাকেই পুনরুত্থান বলা হয়। সবাই সন্তান না নিলে বংশে বাতি দিবে কে? অর্জিত সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে কে? মানবজাতি টিকে থাকবে কেমন করে? এমন কথার উত্তর হলো; এটা কিছু কিছু সুবিজ্ঞ ও সিদ্ধপুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সবার ক্ষেত্রে এমন মহৎকার্য করা সম্ভব নয়। মহান সাধু ও সন্ন্যাসীগণ তো সব সময় একেশ্বর বা অখণ্ড থাকার কথা প্রচার করেই চলেছেন। কিন্তু বাস্তবে অখণ্ড বা একেশ্বর আছেন কয়জন? অর্থাৎ; মহাপুরুষগণ বলেই যাবেন; সাধারণ মানুষ তাদের কাজ করেই যাবে। না জেনে ও না বুঝে এমন ব্যতিক্রমসূচক কথার প্রতিবাদ করা কারো পক্ষেই শোভনীয় নয়।

পর্যালোচনা (Review)

১.   “পিতার বীর্যে পুত্রের সৃজন, তাতেই পিতার পুনর্জনম, সুধা শুক্রে দেহের গঠন, আলেক রূপে ফিরে সদাই।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/২)

২.   “স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর জন্ম, কে বুঝে তার নিগূঢ়-মর্ম, শোণিত শুক্রের পেলে গম্য, মনের আঁধার কেটে যায়।” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/৩)

৩.   “লালন বলে মনরে- পিতা জন্মে মাতার উদরে, পত্নী দুগ্ধ পান করল কিনা।” (পবিত্র লালন- ৫২৭/৪)

৪    “স্ত্রীর পেটে স্বামীর জন্ম, দুধ খাইলো কোন মুখে।” (মরমীকবি জালাল)

৫.   “তোমাকে পুনরুদ্ধার (পুনরুত্থান) করব, তোমার শরীরগতভাবে।” “نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ” (কুরান, ইউনুস- ৯২)

উপরোক্ত আলোচনা হতে দেখা যায়; “লালন বলে মনরে; পিতা জন্মে মাতার উদরে, পত্নী দুগ্ধ পান করল কিনা।” (পবিত্র লালন- ৫২৭)। অর্থাৎ; স্বামীই ধুম্রহীন ও শিখাহীন কাম আগুনে দগ্ধ হয়ে শুক্ররসে পরিণত হয়। অতঃপর; স্ত্রীগর্ভে প্রবেশ করে মাত্র দশমাসের ব্যবধানে আবার সন্তান রূপে ভূমিষ্ঠ হয়ে স্ত্রীর দুগ্ধ পান করে। অর্থাৎ; আমার পিতাই আমার মায়ের উদরে প্রবেশ করেছিলেন। অতঃপর; আমি সদৃশ সন্তান আকারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তারপর; মাতা সদৃশ পত্নীর দুগ্ধ পান করে এতবড় হয়েছি। উক্তিটি যথার্থ যুক্তিযুক্ত ও সারগর্ভ হয়েছে। ঘটনাটির চরম বাস্তবতা রয়েছে। আবার “স্ত্রীর পেটে স্বামীর জন্ম, দুধ খাইলো কোন মুখে।” (মরমীকবি জালাল)। অর্থাৎ; স্বামীই ধুম্রহীন ও শিখাহীন কামাগুনে দগ্ধ হয়ে শুক্ররসে পরিণত হয়। অতঃপর; স্ত্রীগর্ভে প্রবেশ করে মাত্র দশমাসের ব্যবধানে সন্তান রূপে ভূমিষ্ঠ হয়ে স্ত্রীর দুগ্ধ পান করেন।

আবার “তোমাকে পুনরুদ্ধার (পুনরুত্থান) করব, তোমার শরীরগতভাবে।” “نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ” (কুরান, ইউনুস- ৯২)। মৈথুনে গিয়ে ধুম্রহীন ও শিখাহীন কামাগুনে পুড়ে নরদেহে শুক্ররস সৃষ্টি হয়। উক্ত শুক্ররস স্ত্রীর গর্ভে প্রবেশ করে। অতঃপর; মাত্র দশমাসের ব্যবধানে আবার সন্তান রূপে সে পুনরুত্থিত হয়। এ বিষয়টিকেই “তোমাকে পুনরুদ্ধার (পুনরুত্থান) করব, তোমার শরীরগতভাবে।” “نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ” (কুরান, ইউনুস- ৯২) এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যক্তির প্রধান ৪টি সত্তা। যথা; ১. দেহ ২. আত্মা ৩. মন ও ৪. জ্ঞান। এরমধ্যে; কেবল দেহ ভিন্ন অন্য ৩টি সত্তার কোনো পুনরুত্থান হয় না। কারণ; জীবাত্মা, মন ও জ্ঞান জৈবিক শক্তি এবং পরমাত্মা প্রাকৃতিক শক্তি। জৈবিক শক্তির সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রাকৃতিক শক্তির রূপান্তর ভিন্ন পুনরুত্থান নেই। এবার নিশ্চিতভাবেই বলা যায়; পুনরুত্থান হয় একমাত্র দেহের।

এছাড়াও; বিশ্বের সর্বত্র সুপ্রতিষ্ঠিত; বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল (Bible) (তোরাহ, যাবুর, ইঞ্জিল), কুরান, লালন ও বলন ইত্যাদি মহা গ্রন্থের মধ্যে কোথাও কেবল দেহ ভিন্ন ব্যক্তির অন্য কোনো সত্তার পুনরুত্থান হয় বা হচ্ছে এমন আলোচনা পাওয়া যায় না। এ হতেই সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে; একমাত্র দেহ ভিন্ন ব্যক্তির অন্য কোনো সত্তার পুনরুত্থান হয় না। তাছাড়া; কুরানে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে; “তোমাকে পুনরুদ্ধার (পুনরুত্থান) করব, তোমার শরীরগতভাবে।” “نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ” (কুরান, ইউনুস- ৯২)। অন্যদিকে; ব্যক্তির অন্যান্য সত্তার পুনরুত্থানের ব্যাপারে কোনো গ্রন্থে বলিষ্ঠ প্রমাণ নেই। আলোচনা দৃষ্টে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে! বিষয়টি তো একান্ত ফিরাউনের ব্যাপারে বলা হয়েছে। কিন্তু ফিরাউনের বিষয়টি দিয়ে মানুষের সন্তান রূপে পুনরুত্থান প্রমাণ হয় কিভাবে? যেমন; বিষয়টি হলো; “(কুরানের কাল্পনিক কাহিনী অনুসারে) ফিরাউন মুসার সাম্প্রদায়িক নিয়ম অমান্য করলো। অতঃপর; মুসা ও তাঁর অনুসারীদের হত্যা করার জন্য; তাঁর পশ্চাৎধাবন করলো। তখন; মুসা হাতের লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত করলে নদীর জল দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। অতঃপর; নদীর মধ্যে পথের সৃষ্টি হয়। তখন তিনি ও তাঁর অনুসারী শিষ্যরা অনায়াসে নদী পার হয়ে যান। কিন্তু যখন; ফিরাউন ও তাঁর শিষ্যরা ঐ পথ ধরে অগ্রসর হতে আরম্ভ করলেন; তখন হঠাৎ; নদীর জল পূর্ববৎ একাকার হয়ে গেল। যারফলে; ফিরাউনের শিষ্যদের সবার সলীল সমাধি হলো। কিন্তু দৈবাৎ ফিরাউন তখনও জীবিতই রয়ে গেলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু কাঁই তাঁর অন্তিম প্রার্থনা গ্রহণ না করায়; শেষ পর্যন্ত তাঁরও সলিল সমাধি হলো। নদীর জলে সবার শব পচে গলে গেলো। অন্যদিকে; কেবল ফিরাউনের শবটি অক্ষত রয়ে গেলো। এ ব্যাপারেই কুরানে একথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে।”

যেমন; লালন সাঁইজি লিখেছেন; “এ দেহেতে মদনরাজা মিলিয়ে কাছারি, কর আদাই করে নিয়ে দেয় হুজুরি, মদন সে দুষ্ট ভারী- তারে দাও তহসিলদারী, করে সে মুন্সিগিরী, গোপনে।” (পবিত্র লালন- ২৬৬/২)। আলোচ্য রূপক ব্যাখ্যাটিও যে পিতা-মাতার সন্তান রূপে পুনরুত্থান হওয়াই সমর্থন করে তা নিচে আলোচনা করা হলো।

রূপক পরিভাষা ও মূলক সত্তা সারণী

(The metaphor terminology and the radical entity table)

ক্র ছদ্মনাম ব্যাখ্যা রূপক মূলক
. ফিরাউন (ﻔﺮﻋﻮﻦ) বৈঠা বলাই (শিশ্ন)
. মুসা (ﻤﻭﺴﻰٰ) অর্থ ক্ষুর ত্রিবেণী ভৃগু (জরায়ুমুখ)
. সাম্প্রদায়িক বিধান প্রকৃতির নিয়ম
. লাঠি বৈঠা বলাই (শিশ্ন)
. নদী নদী বৈতরণী (যোনিপথ)
. জল দুইভাগ হওয়া অমৃত ও মূত্র
. পথ নদী বৈতরণী (যোনিপথ)
. নদী পার হওয়া শুক্ররুদ্ধ গমনাগমন করা শুক্রধর
. জল পূর্ববৎ হওয়া পিতা-মাতা সন্তান রূপে জন্ম জন্ম
১০. সলিল সমাধি শুক্রপাত সদৃশ মৃত্যু শুক্রপাত

মানুষে বিদ্যমান বিষয়বস্তু, ইন্দ্রিয়াদি, শক্তি ও অবস্থার রূপক নামে ঈশ্বরায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক ঈশ্বর, দেবতায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক দেবতা-দেবী ও মানবায়ন করে নির্মিত পৌরাণিক মানুষ, জীবজন্তু, দৈত্য-দানব দ্বারা নির্মাণ করা হয় পুরাণ। রূপকভাবে মানুষকে যৌন, শুক্রনিয়ন্ত্রণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ শিক্ষা দেওয়াই পুরাণের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এ বিদ্যার সাথে জড়িত; “শিশ্ন, জরায়ুমুখ, জননপথ, অমৃতজল ও মূত্র, শুক্ররুদ্ধ অটল গমনাগমন করা, পিতা-মাতার সন্তান রূপে জন্মগ্রহণ করা, শুক্রপাত সদৃশ মৃত্যুবরণ করা, সন্তান রূপে দেহের পুনরুত্থান হওয়া”; এসব লজ্জাস্কর পরিভাষা ও বাক্য দ্বারা সাহিত্য নির্মাণ করলে; তা সর্ব সাধারণের পাঠ করার অযোগ্য হয়ে পড়ে। এজন্য; এসব লজ্জাস্কর পরিভাষা ও বাক্য দ্বারা কখনও পুরাণ নির্মাণ করা যায় না। পক্ষান্তরে; “ফিরাউন (ﻔﺮﻋﻮﻦ), মুসা (ﻤﻭﺴﻰٰ), সাম্প্রদায়িক বিধান, লাঠি, নদী, জল দুই ভাগ হওয়া, পথ, নদী পার হওয়া, জল আবার পূর্ববৎ হওয়া, সলিল সমাধি হওয়া, শব অক্ষত থাকা”; এসব বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা বা বাক্য দ্বারা পুরাণ নির্মাণ করা হলে; একদিকে যেমন; সাহিত্যের গাম্ভির্যতাও রক্ষা হয়; অন্যদিকে; তেমন; সাহিত্যের সার্বজনীনতাও অটুট থাকে। এজন্য; পূর্বকাল হতেই বাঙালী পৌরাণিক মূলক সত্তা গোপন রেখে তার বাঙালী পৌরাণিক রূপক পরিভাষা নির্মাণ করে; পুরাণ নির্মাণ করার পরম্পরা চলে আসছে।

ব্যক্তির দেহের পুনরুত্থানের সাথে সাথে; আত্মা, মন ও জ্ঞানের পুনরুত্থান হয় কী না?

(With the resurrection of the body of the person; soul, psyche and wisdom are whether resurrected?)

ব্যক্তির দৈহিকভাবে পুনরুত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যক্তির আত্মা, মন ও জ্ঞান ইত্যাদির পুনরুত্থান বিষয়ে সন্দিহান গবেষকগণের ব্যাপারে এতটুকু বলা যায় যে; জীবাত্মার পুনরুত্থান হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ; জীবাত্মা জৈবিকশক্তি। জৈবিকশক্তির সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা ভিন্ন কোনো উত্থানপতন নেই। প্রতিটি ভ্রূণ সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জীবাত্মা সঞ্চারিত হয়। অর্থাৎ; যত জীব সৃষ্টি হয়; ততো জীবাত্মা সঞ্চারিত হয়। আবার জীবাত্মা নিষ্ক্রিয় হলে জীব প্রয়াণলাভ করে। এটি; জীবদেহের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। এজন্য; এর কোনো পুনরুত্থান কল্পনা করা যায় না। অন্যদিকে; পরমাত্মা বিশ্বশক্তি বা বিশ্বাত্মা। এটি; বিশ্বের সর্বত্র বিরাজিত। এর কোনো উত্থানপতন বা সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তা বা সৃষ্টি-ধ্বংস নেই। এজন্য; এর কোনো পুনরুত্থান কল্পনা করা যায় না। অর্থাৎ; জীবাত্মা বা পরমাত্মার পুনরুত্থান কল্পনা করা চরম বোকামি ও চরম দৈন্যতা।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে; পুনরুত্থান ব্যক্তির প্রয়াণলাভের সুদীর্ঘকাল পরে সমাধি হতে হয় না। বরং যখন; ব্যক্তি মৈথুনে গিয়ে শুক্রপাত সদৃশ মরণের পর জরায়ু সদৃশ সমাধিতে ক্ষণকালের জন্য সমাধিস্থ হয়; তখন মানুষের ক্ষেত্রে মাত্র দশমাসের ব্যবধানে; আবার সন্তান রূপে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মাধ্যমেই পুনরুত্থান সম্পাদিত হয়। সন্তান রূপে ব্যক্তির দৈহিক পুনরুত্থানের সাথে সাথে ব্যক্তির মন ও জ্ঞানের পুনরুত্থান হয় কী? এমন প্রশ্নের সমাধানে বলা যায়; যদি ব্যক্তির দৈহিক পুনরুত্থানের সাথে সাথে মন ও জ্ঞানও পুনরুত্থিত হতো; তবে নতুন করে ব্যক্তির স্মৃতিভাণ্ডার ও জ্ঞানভাণ্ডার নির্মাণ করার প্রয়োজন হতো না। ব্যক্তির পূর্বজন্মের স্মৃতিভাণ্ডার ও জ্ঞানভাণ্ডার অবিকল রূপে পাওয়া যেত। যেমন; ব্যক্তির দেহটি পাওয়া যায়। যখন; ব্যক্তি দৈহিক পুনরুত্থান করে সন্তানে পরিণত হয়। তখন; সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও পিতা-মাতার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনেক মিল পাওয়া যায়। অন্যদিকে; সন্তানের মন-জ্ঞান ও পিতা-মাতার মন-জ্ঞানের মধ্যে তেমন মিল পাওয়া যায় না। বরং যখন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়; তখন দেখা যায়; তার স্মৃতিভাণ্ডার ও জ্ঞানভাণ্ডার একেবারেই শূন্য। এজন্য; দেখা যায় সন্তান জন্মের পর; জ্ঞানার্জন দ্বারা জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তুলতে আরম্ভ করে। নবজাতক আবার নতুন করে স্মৃতিভাণ্ডার গড়ে তোলে। যদি; দেহের সাথে সাথে ব্যক্তির মন ও জ্ঞানের পুনরুত্থান হতো; তবে প্রতি জন্মেই নতুন করে সন্তানের স্মৃতিভাণ্ডার ও জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলার প্রয়োজন হতো না। উল্লেখ করা যায় যে; মাতৃগর্ভে সন্তানের দেহ গড়ে তোলার প্রয়োজন হয় নি। মাতার খাদ্য-পুষ্টি অনুযায়ী গর্ভে সন্তানের দেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে ওঠেছে। এসব আলোচনা হতে যেসব স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়; তা নিচে তুলে ধরা হলো।

অনুসিদ্ধান্ত (Corollary)

১.   ব্যক্তির দেহের পুনরুত্থান হয়।

২.   ব্যক্তির মন ও জ্ঞানের পুনরুত্থান হয় না।

৩.   ব্যক্তির জীবাত্মা ও পরমাত্মার পুনরুত্থান কল্পনা করা চরম বোকামি।

৪.   ব্যক্তির জরায়ু (সমাধি) হতে সন্তান রূপে পুনরুত্থান হয়।

৫.   ব্যক্তির মাটির সমাধি হতে কখনই পুনরুত্থান হয় না।

মনের পরিবর্তে আত্মার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ভুল

(Mistakes to beg forgiveness for the mind instead soul)

অত্র গ্রন্থের ২য় খণ্ডের আত্মা অধ্যায়ে বিভিন্ন শিরোনামে আত্মার নির্দোষীতা প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের কোনো সাম্প্রদায়িক গ্রন্থে আত্মাকে দোষারোপ করে কোনকিছু লেখা হয় নি। এমনকি; কোনো সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ বা মহাকাব্যে আত্মার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করারও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। তবুও; কিভাবে আত্মার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার প্রবণতা; বাঙালী সমাজে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে; সেটিই এখন ভাববার বিষয়! বিস্তারিত আলোচনা পর্যালোচনা শেষে দেখা যায় যে; ব্যক্তির কৃতকর্মের জন্য একমাত্র মনই দায়ী। প্রার্থনা করতে হলে; কেবল মন সংশোধন ও আত্মশুদ্ধি ব্যাপারে করা যায়। যেমন; দোষীর পরিবর্তে নির্দোষীর জামিন চেয়ে লাভ নেই; তেমনই; মনের পরিবর্তে আত্মার ক্ষমা প্রার্থনা করেও লাভ নেই। মানুষের উচিত; এসব জাতীয়ভুল হতে বের হয়ে আসা। “সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে, নাকি পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে?” জ্যোতির্বিজ্ঞানিরা এক সময় এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বে পতিত হয়েছিল। তারপর; “সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে”; এমন ভুল মতবাদ প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল। কারো কারো মতে; দীর্ঘ সতেরো শত বছর; আবার কারো কারো মতে; দীর্ঘ দুই হাজার পাঁচশত বছর পর্যন্ত এ ভুল মতবাদ প্রতিষ্ঠিত থাকার পর; গত সতেরো শত খ্রিস্টাব্দে এ মতবাদটির চির বিদায় হয়। অতঃপর; “পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে”; এ মতাবাদটি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়; যা আজও টিকে আছে। এটি; ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক ভুল। তেমনই; মনের পরিবর্তে আত্মার ক্ষমা চাওয়া এটিও সাম্প্রদায়িক আন্তর্জাতিক ভুল। একজন সুস্থজ্ঞানী মানুষ একবার জীবাত্মা, পরমাত্মা, মন ও জ্ঞানকে সঠিকভাবে চি‎হ্নিত করার পর; এমন ভুল কখনও করতে পারে না। আত্মজ্ঞানীগণ ধারণা করেন যে; মানুষ নিজের আত্মা, মন ও জ্ঞানকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে নি। তাই; এমন ভুলের উৎপত্তি হয়েছে। বর্তমান সভ্যজগতে এমন ভুল হতে বের হয়ে আসা মানুষের একান্ত প্রয়োজন।

জন্মান্তর ও পুনরুত্থানের মধ্যে পার্থক্য

(The difference between rebirth and resurrection)

           জন্মান্তর পুনরুত্থান
১. জন্মান্তর সম্পর্কিত সব আলোচনাকে একত্রে জন্মান্তরবাদ বলে। ১.   পুনরুত্থান সম্পর্কিত সব আলোচনাকে একত্রে পুনরুত্থানবাদ বলে।
২. জন্মান্তর দুই প্রকার। ১. বাস্তব জন্মান্তর ও ২. রূপক জন্মান্তর। ২.   পুনরুত্থান দুই প্রকার। যথা; ১. বাস্তব পুনরুত্থান ও ২. রূপক পুনরুত্থান।
৩. এটি; হিন্দুদের দ্বারা সমর্থিত। ৩.   এটি; মুসলমানদের দ্বারা সমর্থিত।
৪. এটি; অতি প্রাচীনতম মতবাদ। ৪.   এটি; নব্য মতবাদ।
৫. বেদ দ্বারা এর সমর্থ করানো হয়। ৫.   কুরান দ্বারা এর সমর্থন করানো হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে; যেভাবে সারা ইসলামী বিশ্বে মনের পরিবর্তে আত্মার ক্ষমা প্রার্থনা করা আরম্ভ হয়েছে; এবং যেভাবে জ্ঞানার্জনের দ্বারা আত্মশুদ্ধি করার পরিবর্তে কেবল প্রার্থনা দ্বারা আত্মশুদ্ধি করার প্রথা আরম্ভ হয়েছে; শ্বরবিজ্ঞান ও আত্মতত্ত্ব দর্শন জানা ও বুঝা ব্যতীত তা হতে ফিরে আসার কোনো উপায় নেই।

প্রামাণ্য গ্রন্থাদি (Authoritative books)

১.     তুফ্ফাতুল ফালাসিফা; আল মানসুর প্রকাশনী, বায়তুল মুকাররাম দক্ষিণ গেইট, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ, ডিসেম্বর; ২০০০ ইং।


তথ্যসূত্র (References)

(Theology's number formula of omniscient theologian lordship Bolon)

১ মূলক সংখ্যা সূত্র (Radical number formula)
"আত্মদর্শনের বিষয়বস্তুর পরিমাণ দ্বারা নতুন মূলক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়।"

রূপক সংখ্যা সূত্র (Metaphors number formula)

২ যোজক সূত্র (Adder formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে ভিন্ন ভিন্ন মূলক সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন যোজক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, গণিতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা-সহগ যোগ করে নতুন রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায় না।"

৩ গুণক সূত্র (Multiplier formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে এক বা একাধিক মূলক-সংখ্যার গুণফল দ্বারা নতুন গুণক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৪ স্থাপক সূত্র (Installer formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে; এক বা একাধিক মূলক সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে স্থাপন করে নতুন স্থাপক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

৫ শূন্যক সূত্র (Zero formula)
"শ্বরবিজ্ঞানে মূলক সংখ্যার ভিতরে ও ডানে শূন্য দিয়ে নতুন শূন্যক রূপক সংখ্যা সৃষ্টি করা যায়; কিন্তু, মূলক সংখ্যার কোন পরিবর্তন হয় না।"

< উৎস
[] উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
() ব্যুৎপত্তির জন্য ব্যবহৃত
> থেকে
√ ধাতু
=> দ্রষ্টব্য
 পদান্তর
:-) লিঙ্গান্তর
 অতএব
× গুণ
+ যোগ
- বিয়োগ
÷ ভাগ

Here, at PrepBootstrap, we offer a great, 70% rate for each seller, regardless of any restrictions, such as volume, date of entry, etc.
There are a number of reasons why you should join us:
  • A great 70% flat rate for your items.
  • Fast response/approval times. Many sites take weeks to process a theme or template. And if it gets rejected, there is another iteration. We have aliminated this, and made the process very fast. It only takes up to 72 hours for a template/theme to get reviewed.
  • We are not an exclusive marketplace. This means that you can sell your items on PrepBootstrap, as well as on any other marketplate, and thus increase your earning potential.

পৌরাণিক চরিত্রায়ন সত্তা সারণী

উপস্থ (শিশ্ন-যোনি) কানাই,(যোনি) কামরস (যৌনরস) বলাই (শিশ্ন) বৈতরণী (যোনিপথ) ভগ (যোনিমুখ) কাম (সঙ্গম) অজ্ঞতা অন্যায় অশান্তি অবিশ্বাসী
অর্ধদ্বার আগধড় উপহার আশ্রম ভৃগু (জরায়ুমুখ) স্ফীতাঙ্গ (স্তন) চন্দ্রচেতনা (যৌনোত্তেজনা) আশীর্বাদ আয়ু ইঙ্গিত ডান
চক্ষু জরায়ু জীবনীশক্তি দেহযন্ত্র উপাসক কিশোরী অতীতকাহিনী জন্ম জ্ঞান তীর্থযাত্রা দেহাংশ
দেহ নর নরদেহ নারী দুগ্ধ কৈশোরকাল উপমা ন্যায় পবিত্রতা পাঁচশতশ্বাস পুরুষ
নাসিকা পঞ্চবায়ু পঞ্চরস পরকিনী নারীদেহ গর্ভকাল গবেষণা প্রকৃতপথ প্রয়াণ বন্ধু বর্তমানজন্ম
পালনকর্তা প্রসাদ প্রেমিক বসন পাছধড় প্রথমপ্রহর চিন্তা বাম বিনয় বিশ্বাসী ব্যর্থতা
বিদ্যুৎ বৃদ্ধা মানুষ মুষ্ক বার্ধক্য মুমুর্ষুতা পুরুষত্ব ভালোবাসা মন মোটাশিরা যৌবন
রজ রজপট্টি রজস্বলা শুক্র মূত্র যৌবনকাল মনোযোগ রজকাল শত্রু শান্তি শুক্রপাত
শুক্রপাতকারী শ্বাস সন্তান সৃষ্টিকর্তা শুক্রধর শেষপ্রহর মূলনীতি সন্তানপালন সপ্তকর্ম স্বভাব হাজারশ্বাস
ADVERTISEMENT
error: Content is protected !!